২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮ আশ্বিন ১৪৩৩

বাংলাদেশে কি ‘ডার্ক পলিটিক্সে’র উত্থান হচ্ছে?

বাংলাদেশে নতুন নেতৃত্ব রাজনীতিতে নতুন ভাষা আনবে, নাকি পুরোনো আক্রমণাত্মক ‘ডার্ক পলিটিক্সে’র ধারায় নাম লেখাবে?

বাংলাদেশে কি ‘ডার্ক পলিটিক্সে’র উত্থান হচ্ছে?
ক্ষমতা ও রাজনীতিতে ডার্ক ট্রায়াডের প্রভাব ব্যক্তির চেয়ে পুরো রাজনৈতিক সংস্কৃতির বেশি ক্ষতি সাধন করে। কোলাজ: এআই

সাজ্জাদ সাব্বির সাজ্জাদ সাব্বির

Published : 02 Sep 2026, 10:32 AM

Updated : 19 Sep 2026, 02:26 PM

রাজনীতিতে নেতাদের মূল্যায়নের সময় আমরা সাধারণত তাদের আদর্শ, নেতৃত্ব ও সাংগঠনিক সক্ষমতার দিকে তাকাই। তবে একজন রাজনীতিকের ব্যক্তিত্ব তার রাজনৈতিক আচরণ, বক্তব্য, প্রচারণার ধরন এবং ভোটারদের সঙ্গে সম্পর্ককে কীভাবে প্রভাবিত করে, সেই বিষয়টিও এখন রাজনৈতিক গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক নেতাদের ব্যক্তিত্বকে আরও পদ্ধতিগতভাবে বিশ্লেষণ করে এর সঙ্গে ভোটার আচরণ, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং গণতন্ত্রের সম্পর্ক খোঁজার কাজ বেড়েছে। সেখান থেকেই সামনে এসেছে ডার্ক পলিটিশিয়ানস এবং ডার্ক পলিটিক্সের ধারণা।

ডার্ক পলিটিশিয়ান মূলত রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব বিশ্লেষণের একটি ধারণা। এর অন্যতম তাত্ত্বিক ভিত্তি হলো মনোবিজ্ঞানের বহুল আলোচিত ডার্ক ট্রায়াড বা অন্ধকার ত্রয়ী। এর তিনটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো নার্সিজম, সাইকোপ্যাথি এবং ম্যাকিয়াভেলিজম। সহজ ভাষায় বললে, অতিরিক্ত আত্মমুগ্ধতা, অন্যের অনুভূতির প্রতি কম সংবেদনশীলতা, প্রতিপক্ষকে হেয় করা এবং রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে অত্যন্ত কৌশলী ও কখনো কখনো প্রতারণামূলক আচরণ এই বৈশিষ্ট্যগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত।

আলেসান্দ্রো নাই এবং তার সহকর্মীদের ২০২৩ সালের ইলেক্টোরাল স্টাডিজ গবেষণায় ২০২০ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ১,০৬৪ জন ভোটারের তথ্য এবং ১,৩৩০ জন মার্কিন ভোটারকে নিয়ে পরীক্ষামূলক গবেষণা ব্যবহার করা হয়। গবেষণায় দেখা যায়, রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্যের বাইরে প্রার্থীর ব্যক্তিত্বও ভোটারের মূল্যায়নে প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে নেতিবাচক ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্য প্রার্থীর প্রতি ভোটারের পছন্দকে প্রভাবিত করতে পারে।

নাই এবং ইয়ুর্গেন মাইয়ারের ২০২৩ সালের বই ‘ডার্ক পলিটিক্স: দ্য পার্সোনালিটি অব পলিটিশিয়ানস অ্যান্ড দ্য ফিউচার অব ডেমোক্রেসি’ এই আলোচনাকে আরও বিস্তৃত করেছে। শতাধিক নির্বাচনের তথ্য, বিভিন্ন দেশের নির্বাচন-পরবর্তী জরিপ এবং পরীক্ষামূলক গবেষণার ভিত্তিতে তারা দেখেছেন, ডার্ক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন রাজনীতিকরা সাধারণ জনগণের কাছে সবসময় জনপ্রিয় না হলেও জনতুষ্টিবাদী মনোভাবসম্পন্ন এবং একই ধরনের বৈশিষ্ট্যের ভোটারদের কাছে তুলনামূলক বেশি গ্রহণযোগ্য হতে পারেন। কিছু পরিস্থিতিতে বিশেষ করে ক্ষমতাসীন রাজনীতিকদের ক্ষেত্রে ডার্ক ব্যক্তিত্ব নির্বাচনি সাফল্যের সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে।

এখানেই বিষয়টির সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক। একজন সাধারণ মানুষ হয়তো ব্যক্তিগত জীবনে অহংকারী, প্রতারক বা নির্মম কাউকে পছন্দ করেন না। কিন্তু রাজনীতির মাঠে একই বৈশিষ্ট্যকে তিনি অনেক সময় ভিন্নভাবে দেখতে পারেন। রাজনীতির ভাষাও তখন বদলে যায়। নীতির জায়গায় আসে ব্যক্তিগত আক্রমণ, যুক্তির জায়গায় আসে উত্তেজনা এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ হয়ে ওঠে শত্রু।

বিশেষ করে রাজনৈতিক সংকটের সময়ে এই প্রবণতা আরও শক্তিশালী হতে পারে। ২০২৫ সালে আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়, ভ্রিজে বিশ্ববিদ্যালয় আমস্টারডাম এবং লওসান বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা ৪০টি জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়া ৯০ জনের বেশি গুরুত্বপূর্ণ রাজনীতিকের ব্যক্তিত্বের তথ্যের সঙ্গে ভোটারদের রাজনৈতিক মনোভাব বিশ্লেষণ করেন। ডনাল্ড ট্রাম্প, জাইর বোলসোনারো, ভিক্টর অরবান, নরেন্দ্র মোদী, রিসেপ তায়িপ এরদোয়ান, সিলভিও বার্লুসকোনি, মেরিন ল্য পেন, বরিস জনসনসহ বহু নেতাকে নিয়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের এই গবেষণায় আলোচনা হয়েছে। তবে এখানে একটি সতর্কতা জরুরি। গবেষণায় কোনো নেতাকে ক্লিনিক্যাল অর্থে নার্সিসিস্ট বা সাইকোপ্যাথ ঘোষণা করা হয়নি। এমনকি এক্ষেত্রে গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত নেতাদের ব্যক্তিগত স্কোরও প্রকাশ করা হয়নি।

এই গবেষণায় দেখা যায়, ডার্ক ট্রায়াডের বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন নেতাদের ক্ষেত্রে তাদের নিজ দলের সমর্থকদের মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি আবেগগত শত্রুতা বাড়ার প্রবণতা থাকে। বিশেষ করে ম্যাকিয়াভেলিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন নেতারা আবেগীয় মেরুকরণ বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

গবেষকরা আরও দেখেছেন, রাজনৈতিক উত্তেজনার সময়ে ভোটারদের একটি অংশ নিয়মভাঙা বা সংঘাতমুখী আচরণ করলেও শক্তিশালী এবং কঠোর অবস্থানের নেতাদের প্রতি আকৃষ্ট হতে পারে। অর্থাৎ একজন নেতার রূঢ়তা সবসময় তার দুর্বলতা হয়ে দাঁড়ায় না। নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পরিবেশে সেটিই তার রাজনৈতিক সম্পদে পরিণত হতে পারে।

আধুনিক সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রবণতাকে আরও তীব্র করতে পারে। শান্তভাবে একটি নীতিগত বক্তব্য ব্যাখ্যা করার চেয়ে আক্রমণাত্মক বক্তব্য, ব্যক্তিগত সংঘাত বা বিতর্কিত মন্তব্য বেশি মনোযোগ তৈরি করে। ফলে নীতির চেয়ে ব্যক্তিত্ব, যুক্তির চেয়ে সংঘাত এবং কর্মসূচির চেয়ে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ বেশি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে এই আলোচনাটি তাই মোটেও অপ্রাসঙ্গিক নয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আগে এবং পরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ভাষার পরিবর্তনের দিকে তাকালে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

জুলাইয়ের আগে আমাদের রাজনীতিতে ক্ষমতা, দলীয় আনুগত্য এবং রাজনৈতিক পরিচয় এমন এক পরিবেশ তৈরি করেছিল, যেখানে ভিন্নমত প্রকাশের জায়গা অনেক ক্ষেত্রে সংকুচিত হয়ে গিয়েছিল। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শুধু প্রতিপক্ষ হিসেবে না দেখে শত্রু হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা ছিল দীর্ঘদিনের। ব্যক্তিগত আক্রমণ, অপমান, হুমকি এবং প্রতিপক্ষকে ছোট করার প্রবণতাও ছিল নিয়মিত।

এই পরিমাপকে গত দেড় দশকের অনেক নেতাকেই ডার্ক পলিটিশিয়ান হিসেবে আখ্যা দেওয়া যেতে পারে। তবে বাংলাদেশের নির্দিষ্ট কোনো নেতাকে বৈজ্ঞানিকভাবে ডার্ক পলিটিশিয়ান হিসেবে চিহ্নিত করার মতো পর্যাপ্ত ব্যক্তিত্বগত গবেষণা এখনো নেই। তাই নাম ধরে কাউকে এই শ্রেণিতে ফেলা গবেষণাগতভাবে দায়িত্বশীল হবে না।

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিসরে নতুন প্রজন্মের বহু মেধাবী ও সাহসী নেতৃত্ব সামনে এসেছে। তাদের অনেকেই প্রচলিত রাজনৈতিক ভাষার চেয়ে সরাসরি কথা বলেন এবং পুরোনো রাজনৈতিক ভদ্রতার অনেক কাঠামোকে প্রত্যাখ্যান করেন। এর ইতিবাচক দিক অবশ্যই আছে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ভীতি ও অতিরিক্ত আনুষ্ঠানিকতার বাইরে গিয়ে সরাসরি কথা বলা তরুণ নেতৃত্বের একটি শক্তি হতে পারে।

কিন্তু এখানেই একটি সূক্ষ্ম সীমারেখা অবশ্যই রয়েছে।

মনে রাখা জরুরি, সাহসী হওয়া আর আগ্রাসী হওয়া এক বিষয় নয়। আত্মবিশ্বাস আর আত্মমুগ্ধতা এক বিষয় নয়। আপসহীনতা আর প্রতিপক্ষকে অপমান করা এক বিষয় নয়। সরাসরি কথা বলা আর অশালীন ভাষায় কথা বলা এক বিষয় নয়।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে দাঁড়ানো আর সেই সংস্কৃতির নতুন সংস্করণ তৈরি করা এক বিষয় নয়।

এই সীমারেখা যদি মুছে যায়, তাহলে বাংলাদেশে ডার্ক পলিটিশিয়ানসের উত্থান নতুন কোনো রাজনৈতিক বাস্তবতা তৈরি করবে না। পুরোনো রাজনীতিই নতুন মুখ, নতুন ভাষা এবং নতুন ধারায় ফিরে আসবে।

জুলাইয়ের পর মানুষ নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতিরও প্রত্যাশা করেছে। এমন একটি রাজনীতি চেয়েছে যেখানে ক্ষমতা প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকবে না, ভিন্নমত মানেই শত্রুতা হবে না এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে অপমান না করেও কঠোর রাজনৈতিক লড়াই করা যাবে।

ডার্ক পলিটিক্সের সবচেয়ে বড় বিপদ হচ্ছে, একজন নেতা হয়তো নির্বাচনে সফল হতে পারেন, তার অনুসারী বাড়তে পারে এবং তার বক্তব্য সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে যদি তার রাজনৈতিক পরিচয় তৈরি হয় ভয়, অপমান এবং প্রতিপক্ষের প্রতি ঘৃণার ওপর, তাহলে ক্ষতিটা শুধু তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের হয় না; ক্ষতিটা হয় পুরো রাজনৈতিক সমাজের। আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাটিও একই বিষয়ে সতর্ক করেছে।

বাংলাদেশে জুলাইয়ের পর একটি বিষয় স্পষ্ট হয়েছে যে, সরকার বদলানো তুলনামূলক সহজ, কিন্তু রাজনৈতিক সংস্কৃতি বদলানো অনেক কঠিন।

জুলাই আমাদের যে সুযোগ দিয়েছে তা কাজে লাগাতে হলে নতুন রাজনীতির সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হবে—নতুন রাজনীতি কি নতুন ভাষা তৈরি করবে, নাকি পুরোনো আক্রমণ, অপমান এবং প্রতিপক্ষকে শত্রু বানানোর সংস্কৃতি নতুন মুখে ফিরে আসবে? আমরা কি শুধু নতুন রাজনীতিক চাই, নাকি সত্যিই নতুন রাজনীতি চাই?

সাজ্জাদ সাব্বির এনসিপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। ই-মেইল: sajjadsabbir24@gmail.com