Published : 05 Oct 2019, 07:26 PM
গত কয়েকদিন হলো দিল্লির আবহাওয়া বেশ ভালো। গরমের মাত্রা সহনীয়। মাঝে মাঝে বৃষ্টি, সন্ধ্যার পরে দুই-একদিন ঝড়সহ বৃষ্টিও হচ্ছে। এছাড়া সারাদিন ঝকঝকে রোদ। সবুজের পরিমাণ বাড়াতে এই ঝকঝকে রোদেও রাস্তা দিয়ে হাঁটতে ক্লান্তি কমই হচ্ছে সাধারণ মানুষের। রাস্তায় আগের মত পায়রার ঝাঁকের পাশাপাশি এবার দেখা যাচ্ছে গরুরা দল বেঁধে হেটে বেড়াচ্ছে। গরুর সংখ্যা বেড়েছে যে দিল্লিতে তা দেখলেই বোঝা যায়।
এমনই অবস্থায় প্রায় ১৫ শ বর্গ কিলোমিটার আয়তনের এই শহরের লাখ লাখ সাধারণ মানুষের প্রায় কেউই জানে না দিল্লির হোটেল তাজ প্যালেসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সম্মেলন হচ্ছে। আর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেখানে অন্যতম আকর্ষণ। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিল্লি এলে একটি চাপা আনন্দ ও উত্তেজনা দেখা যায় দিল্লির প্রায় ২০ লাখ বাঙালির ভেতর। এবার তারা সে আনন্দ বা উত্তেজনা দেখানোর সময় পাচ্ছেন না। এমনকি শেখ হাসিনার হোটেলে উঁকি দেবারও সময় পাচ্ছেন না অনেক বাঙালি। কারণ, তাদের প্রিয় শেখ হাসিনা এবার যখন দিল্লিতে এসেছেন তখন তাদের আরাধ্য দেবতা মাতা দুর্গাও মর্ত্যে আসছেন। আর সে মর্ত্যের ভেতর একটা জায়গা দিল্লির বিভিন্ন বাঙালি পাড়া। উত্তর প্রদেশের নয়াড়ায় গড়ে ওঠা বাঙালি পাড়া থেকে দিল্লির পুরোনো বাঙালি পাড়া সি আর পার্ক (চিত্ত রঞ্জন পার্ক) – এ মিলে প্রায় হাজারখানেক পূজো হচ্ছে। এই পূজোর মণ্ডপ আর তাদের আরাধ্য মাকে মর্ত্যে আনা, আবার তার সঙ্গে মায়ের সামনে যাবার জন্যে নতুন পোশাক কেনা এইসব নিয়ে ব্যস্ত বিশ লাখের বেশি দিল্লিস্থ বাঙালি।
বাইরের পরিবেশ এমনটা হলেও, আরেকটি পরিবেশ আছে দিল্লিতে। সেখানে অনেক স্বস্তির ও খুশির হাওয়া শেখ হাসিনার এই অর্থনৈতিক ফোরামের সামিটে যোগ দেয়া নিয়ে। এই পরিবেশটি হলো দিল্লির নীতিনির্ধারক মহলের ভেতরে। শেখ হাসিনা দিল্লিতে আসার দুই দিন আগেই ঘরোয়া পরিবেশে একটি মধ্যাহ্নভোজনে ছিলাম। সেখানে ছিলেন বর্তমানে দিল্লির ক্ষমতাসীন দলের সিনিয়র রাজনীতিক ও বেশ কয়েকজন ব্যবসায়িক নীতিনির্ধারক ও গবেষক। ব্যবসায়িক নীতিনির্ধারকদের বক্তব্য হলো, ভারতের ব্যবসায়ীদের আয়োজিত এই সামিটে শেখ হাসিনা যোগ দেয়ায় ভারতের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের ভেতর অনেক বেশি আস্থা বাড়বে। তাদের বক্তব্য, শেখ হাসিনা যে চীনের ব্যবসায়ীদের ও শিল্পপতিদের একচেটিয়াভাবে ব্যবসা করার সুযোগ দেবেন না, তিনি ভারতকেও সমান সুযোগ বা নিকট প্রতিবেশী হিসেবে একটু বেশি সুযোগ দেবেন, এটা তার এই সামিটে যোগ দেবার ভেতর দিয়েই ইঙ্গিত দিয়ে যায়।
ক্ষমতাসীন দলের সিনিয়র রাজনীতিক যিনি আজীবন ফরেন রিলেশন নিয়ে কাজ করে আসছেন, তার বক্তব্য ছিল, শেখ হাসিনা যে তার দেশকে কোনোমতেই শ্রীলঙ্কা বা আফ্রিকার কিছু দেশের মত চীনের ঋণের ফাঁদে ফেলে চীনের অর্থনৈতিক কলোনি বানাবেন না, তিনি চীন ও ভারতের মাঝখানে একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে গড়ে উঠতে চান। আর সেক্ষেত্রে ভারতকে তার পাশে চান সেটারই ইঙ্গিত দিয়ে যাবার জন্যই তার এই অর্থনৈতিক সামিটে যোগ দেয়া।
বাস্তবে শেখ হাসিনার এই ভারত সফরটির ফোকাল পয়েন্ট অর্থনৈতিক সামিটে যোগ দেয়া এবং সেখানে গুরুত্বপূর্ণ আসন অলঙ্কৃত করা। এই লেখা যখন লিখছি তখন তিনি দ্বিপক্ষীয় সফরে। অর্থাৎ তার সফরের শেষ দিনে। এটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছুই নয়। কারণ শেখ হাসিনার মূল ভারত সফর হবে পরে। অর্থাৎ আগে নরেন্দ্র মোদী বাংলাদেশে যাবেন তারপরে তিনি দিল্লিতে তার মূল দ্বিপক্ষীয় সফর করবেন। এবার শেখ হাসিনার আদৌ ইচ্ছে ছিল না শেষের এই একটা দিন দ্বিপক্ষীয় সফর করার। এটা হয়েছে মূলত ভারতের পীড়াপীড়িতে। এক্ষেত্রে ভারতের বক্তব্য হলো যতই নিউ ইয়র্কে শেখ হাসিনার সঙ্গে নরেন্দ্র মোদীর বৈঠক হোক না কেন, তিনি দিল্লিতে আসবেন আর শুধু ইকোনমিক সামিটে যোগ দিয়ে চলে যাবেন, নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে তার কোন বৈঠক হবে না এটা ভারতের জন্যে মোটেই কোন সুখবর নয়। সৌজন্যও নয়। কারণ, শেখ হাসিনা তাদের অনেক বড় বন্ধু।
তাছাড়া তখন প্রেসও উল্টোপাল্টা খবর প্রকাশ করবে, ফেইক নিউজে ভরে যাবে ওয়াল যে শেখ হাসিনা এলেন অথচ নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে তার বৈঠক হলো না। এ কারণে ভারত ছিল মরিয়া অন্তত কিছু চুক্তি, উদ্বোধন ও অ্যাগ্রিমেন্টের ভেতর দিয়ে যেন সফরে একটি দিন শেখ হাসিনা বাড়ান। শেখ হাসিনা শেষ পর্যন্ত রাজি হওয়াতে তারা খুশি।
আর এই খুশি দেখা গেছে নীতিনির্ধারক মহলে তিন ও চার তারিখে। কারণ, তাদের সিনিয়র ওই রাজনীতিকের বক্তব্য অনুযায়ী এই সামিটে শেখ হাসিনা যোগ দেয়াতে তারা তাদের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের আশ্বস্ত করতে পারবেন, শেখ হাসিনা মোটেই শ্রীলঙ্কা বা আফ্রিকান ওই সব দেশের মতো তার দেশকে একচেটিয়াভাবে চীনের হাতে তুলে দিচ্ছেন না। ভারতের শিল্পপতিদের ও ব্যবসায়ীদের সুযোগ রয়েছে ক্রমবর্ধমান বাংলাদেশের বাজারে প্রবেশ করা। এছাড়া তাদের আরো সন্তুষ্টি দিয়েছে যে সময়ে এনআরসি (নাগরিকপঞ্জি) নিয়ে বাংলাদেশের মিডিয়া বেশ সরব, সেই সময়ে দৃঢ়তার সঙ্গে ভারতে এসে জানিয়ে দেয়া যে, তিনি মোটেই এনআরসি নিয়ে চিন্তিত নন। তাদের নীতিনির্ধারকদের বক্তব্য হলো, ভারত যে বাংলাদেশের সরকার প্রধানকে আশ্বস্ত করতে পেরেছে, এনআরসি তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয় এটা তাদের জন্যে অনেক বড় মাপের পাওয়া। অবশ্য এনআরসি নিয়ে, ভারতের ক্ষমতাসীন দলের বাইরের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বক্তব্য হলো, আর যাই হোক ভারত মায়ানমার নয়। এখানে সংবিধান কার্যকর। বিজেপি নেতারা মাঠের বক্তৃতায় যাই বলুন না কেন, একজনকেও দেশের বাইরে ঠেলে দেয়া সম্ভব নয়। তারপরেও আরো বড় বিষয় হলো, কোর্টের মাধ্যমে এনআরসি-এর এই যাচাই বাছাইয়ে আসতে সময় লেগেছে পঁয়ত্রিশ বছর। তাই এটা শেষ হতেও আরো পঁয়ত্রিশ বছর অপেক্ষা করতে হবে। আর এখান থেকে পঁয়ত্রিশ বছর পরে ইতিহাস কোন দিকে মোড় নেয় সেটা ভিন্ন বিষয়।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সভাপতির ভাষণটি যদিও ছিল ভারতের অর্থনীতিকেই কেন্দ্র করে। তারপরেও ওই ভাষণের অন্যতম ফোকাল পয়েন্ট হলো, অর্থনীতি যে এখন ইউনিপোলার থেকে মাল্টিপোলার শেইপ নিয়েছে- সেটাই। এককেন্দ্রিক থেকে এই যে বহুমুখী কেন্দ্রে বেড়ে উঠছে অর্থনীতি সেটাকেই তিনি গুরুত্ব দিয়েছেন। আর এই গুরুত্ব দিয়েই তিনি ভারতের অর্থনীতির পাশাপাশি দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনীতির গুরুত্বের কথা বলেছেন। অর্থাৎ তার এই বক্তব্যের ভেতর দিয়ে স্পষ্ট হয়, দক্ষিণ এশিয়াতেও অর্থনীতি আর শুধু ভারতকেন্দ্রিক থাকছে না। এরও অনেকগুলো কেন্দ্র হবে। আর তার একটা কেন্দ্র যে বাংলাদেশ সেটা ভারতের ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিরা বুঝতে পেরেছেন, তার প্রমাণ তাদের কথাবার্তায়ও মিলছে। তারা এখন সত্যিকার অর্থে বাংলাদেশমুখী। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সভাপতি দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশ ও তার চারপাশের অবকাঠামোর কথা উল্লেখ করেছেন। আর যখনই তিনি দক্ষিণ এশিয়ার কথা বলেন তখন এই অবকাঠামো যে শুধু ভারতকে সুবিধা দেবে তা বোঝায় না। বাংলাদেশও এই সুবিধা পাবে।
দক্ষিণ এশিয়ার এই বহুমুখী অর্থনৈতিক কেন্দ্রের ভেতর অন্যতম কেন্দ্র হতে চলা বাংলাদেশের অর্থনীতি তাই যাতে বাধাগ্রস্ত না হয়, সেজন্যও সচেষ্ট ভারতের নীতিনির্ধারক মহল। নীতিনির্ধারক মহলে বেশ কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে বোঝা যায়, এগার লাখ রোহিঙ্গা যে বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্যে বোঝা ও ক্ষতি করছে দেশটির অর্থনৈতিক গ্রোথে সেটা মাথায় রেখেই তারা বিষয়টি ভাবছেন। আপাতত তারা বাংলাদেশের ওপর থেকে চাপ কিছুটা কমানোর জন্যে শরণার্থী শিবিরের আর্থিক সহযোগিতা বাড়িয়েছে এবং আরো বাড়াবে। পাশাপাশি তারাও সচেষ্ট মিয়ানমার যেন তাদের নাগরিকদের ফেরত নেয়। তবে তারাও বাংলাদেশের মত মিয়ানমারের একটি জটিল আশ্বাসে বিশ্বাস করে পথ চলছে যে, মায়ানমার রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব যাচাই-বাছাই করে ফেরত নেবে। বাংলাদেশ ও ভারতের নীতিনির্ধারকদের এক্ষেত্রে একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে, মিয়ানমারের এই নৃগোষ্ঠীগত নাগরিকত্ব সমস্যা দীর্ঘদিনের। গত ষাট বছরের বেশি সময় ধরে তারা সেটা সমাধান করতে পারেনি। তাই এটা সমাধান করতে তাদের আরো ষাট বছর লেগে যেতে পারে। এছাড়া সে দেশের মিলিটারিদের এক ধরনের গোয়ার্তুমি আছে। যেখানে সুচিও নিরুপায়। দিল্লিতে ব্যক্তিগত আলোচনায় সুচির এক সহপাঠির বক্তব্য থেকে জানা গেল, সূচি তাকে বলেছেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে মমার্হত। কিন্তু সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে তারও কিছু করার নেই।
ভারত অর্থনৈতিক সাহায্য বাড়াতে যাচ্ছে। পাশাপাশি তাদের নীতিনির্ধারকদের কপালে একটা ভাঁজও আছে যে, দীর্ঘদিন এই রোহিঙ্গারা ক্যাম্পে সাধারণ শরণার্থী হিসেবে থাকবে না। সেখানে নানান রকম মেটামরফোসিস ঘটবে।
নয়াদিল্লি, ভারত থেকে