বন সংরক্ষণের সিদ্ধান্তে আদিবাসীদের কথা কতটা শোনা হচ্ছে?
বন রক্ষা এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় কাগজে-কলমে নীতিমালা তৈরির চেয়ে বনের সঙ্গে দীর্ঘকাল ধরে বসবাসকারী মানুষের অভিজ্ঞতা ও অধিকারকে প্রাধান্য দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
আমার দেখা বন ও বনজীবী আদিবাসী মানুষদের কথা ভাবতে গেলে তাদের দৈনন্দিন জীবনের কথাই আগে মনে আসে। বন নিয়ে আলোচনায় গাছের সংখ্যা, সীমানা ও প্রকল্পের হিসাব যতটা জায়গা জুড়ে থাকে, মানুষের খাবার, পানির উৎস ও জমি ব্যবহারের কথা ততটা শোনা যায় কি? একটি পরিবারের জীবনে বন সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত কী পরিবর্তন আনছে, আমি ওই দিকটি বুঝতে চাই। বনের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে গেলে তার ওপর নির্ভরশীল মানুষের ভবিষ্যৎও আলোচনায় আনতে হবে।
বাইরে থেকে বন দেখতে যাওয়া মানুষের সঙ্গে সেখানে বসবাসকারী মানুষের অভিজ্ঞতার পার্থক্য আছে। দর্শনার্থী গাছের ছায়া, নির্জনতা ও পাখির ডাক উপভোগ করে ফিরে আসেন। বনজীবী মানুষকে সেখানেই পরের দিনের খাবার সংগ্রহ করতে হয়। মৌসুম বদলালে কাজের ধরন বদলায়, পানির উৎস শুকালে অন্য পথ ধরতে হয়। সংরক্ষণের নতুন নিয়ম তার চলাচল আটকে দিলে সংসারের হিসাবও বদলে যায়। অথচ প্রকল্পের সাফল্যের হিসাবে এই বাড়তি শ্রম ও ব্যয় কতটা ধরা হচ্ছে, তা জানার সুযোগ সীমিত।
আমার কাছে বন সংরক্ষণের আলোচনায় সবচেয়ে জরুরি বিষয় সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। যাদের জীবনে একটি নিয়ম সরাসরি প্রভাব ফেলবে, তারা ওই নিয়ম তৈরিতে কতটা যুক্ত? সভায় উপস্থিত থাকা, বক্তব্য দেওয়া এবং সিদ্ধান্ত বদলাতে পারা আলাদা বিষয়। পরিকল্পনা চূড়ান্ত হওয়ার পর মানুষকে ডেকে মতামত নিলে তাদের আপত্তি গ্রহণের সুযোগ কতটুকু থাকে? অংশগ্রহণের হিসাব করতে হলে জানতে হবে, কার প্রস্তাবে কী পরিবর্তন এসেছে।
গত ২২ অক্টোবর দ্য ক্লাইমেট ওয়াচের এক প্রতিবেদনে জাতিসংঘের জীববৈচিত্র্য সনদের ১৭তম সম্মেলন (কপ-১৭) ঘিরে জীববৈচিত্র্য রক্ষা, প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার এবং সংরক্ষণে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। সম্মেলনের জন্য বাংলাদেশের অবস্থানপত্রে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত করা নিয়ে মতবিরোধের কথাও প্রতিবেদনে আছে। পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন সরকারি আলোচক বলেছেন, আদিবাসী পরিচয়ের সংজ্ঞা নিয়ে মতপার্থক্য থাকায় কিছু সুপারিশ বাদ দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সরকারি প্রতিনিধিদের বক্তব্য, জনগোষ্ঠীর সুপারিশ অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। তবে কোন সুপারিশগুলো বাদ পড়েছে, প্রতিবেদনে তা স্পষ্ট করা হয়নি। ফলে শুধু ওই প্রতিবেদনের তথ্য দিয়ে নির্দিষ্ট কোনো অধিকার সংক্রান্ত প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়েছে বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
এই মতবিরোধের বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পেতে সংশ্লিষ্ট নথি প্রকাশ করা দরকার। জমা দেওয়া প্রস্তাবের সঙ্গে গৃহীত অবস্থান মিলিয়ে সরকার জানাতে পারে, কোন সুপারিশ গ্রহণ করেছে, কোনটি বাদ দিয়েছে এবং কেন। তবে আলোচনা শুধু ওই প্রতিবেদনের মধ্যে আটকে রাখলে দেশের বন ব্যবস্থাপনায় মানুষের অংশগ্রহণের দৈনন্দিন সমস্যাগুলো আড়ালেই থেকে যাবে।
প্রথমেই জমি ব্যবহারের বাস্তবতা বুঝতে হবে। সরকারি মানচিত্রে একটি সীমানা টানা সহজ। ওই এলাকার সঙ্গে মানুষের দীর্ঘদিনের সম্পর্ক বুঝতে সময় লাগে। কোথায় চাষ হয়, কোথা থেকে খাবার সংগ্রহ করা হয়, কোন পথ ধরে পানির কাছে পৌঁছাতে হয়, এসব তথ্যও পরিকল্পনার অংশ হওয়া দরকার। শুধু মালিকানার কাগজ দেখলে জমির যৌথ ব্যবহারের অনেক তথ্য বাদ পড়তে পারে। পুরোনো বসতির বিবরণ, মৌখিক ইতিহাস ও মৌসুমি ব্যবহারের তথ্য স্থানীয় মানুষের সঙ্গে বসে নথিবদ্ধ করা সম্ভব।
বনজীবী মানুষের কথা বলতে গিয়ে শুধু তাদের অভাবের কথা তুলে ধরতে চাই না। দীর্ঘদিন বনের সঙ্গে বসবাসের অভিজ্ঞতা থেকে তারা জানেন, কোন মৌসুমে কী পাওয়া যায়, কোথায় পানির উৎস আছে, কোন গাছের ফল সংগ্রহের পরও বংশবিস্তারের জন্য কিছু রেখে দিতে হয়। এই জ্ঞানের পাশাপাশি বন রক্ষায় তাদের শ্রম এবং নিজেদের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারকেও গুরুত্ব দেওয়া দরকার। সংরক্ষণের পরিকল্পনা করার সময় তাদের কাছ থেকে তথ্য নেওয়ার সঙ্গে তাদের মতামত শুনতে হবে। প্রস্তাবিত নিয়ম মেনে জীবিকা চালানো কতটা সম্ভব, তা তাদের সঙ্গে আলোচনা করেই বুঝতে হবে।
তবে স্থানীয় সব চর্চাই পরিবেশের উপকার করে, এমন ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। কোথাও অতিরিক্ত বনজ সম্পদ সংগ্রহের ফলে গাছের পুনর্জন্ম কমে গেলে, প্রাণীর খাবারে টান পড়লে ওই ক্ষতির কারণ ও মাত্রা যাচাই করা দরকার। স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতার সঙ্গে বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ মিলিয়ে ঠিক করা সম্ভব, কোন মৌসুমে কতটুকু সম্পদ সংগ্রহ করা যাবে এবং কোন এলাকাকে কিছুদিন বিশ্রাম দিতে হবে। এসব নিয়মের ফলও নিয়মিত পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তবে সংগ্রহ বন্ধ করার আগে তার ওপর নির্ভরশীল পরিবারগুলোর খাবার ও বিকল্প আয়ের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। নতুন কাজ শিখে আয় শুরু করতে সময় লাগে। সেই সময়ে সংসারের খরচ কীভাবে মিটবে, তার স্পষ্ট ব্যবস্থা দরকার। ভবিষ্যতে প্রশিক্ষণ দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে আজকের খাবারের প্রয়োজন মেটানো যায় না।
বন ধ্বংসের দায় নির্ধারণেও একই সতর্কতা দরকার। সংসারের প্রয়োজনে সম্পদ সংগ্রহকারী পরিবার এবং বাণিজ্যিক লাভের জন্য ব্যাপক ক্ষতিসাধনকারী পক্ষের কাজের মাত্রা ও পরিণতি আলাদাভাবে যাচাই করতে হবে। কার কাজে কত ক্ষতি হচ্ছে, কে লাভবান হচ্ছে, কার ওপর বিধিনিষেধের চাপ পড়ছে, তার হিসাব প্রকাশ করা জরুরি। শুধু সহজে নিয়ন্ত্রণ করা যায় এমন মানুষের ওপর কড়াকড়ি বাড়ালে ক্ষতির বড় উৎসগুলো অক্ষত থাকতে পারে।
বন সংরক্ষণ প্রকল্পে স্থানীয় মানুষের সম্মতি নিতে হলে কাগজে তাদের সই নেওয়ার পাশাপাশি প্রকল্পের ফলে তাদের জীবন ও জীবিকায় কী পরিবর্তন আসবে, তা স্পষ্টভাবে বুঝিয়ে বলতে হবে। প্রকল্পে কী সুবিধা হবে, কী হারানোর আশঙ্কা আছে, কত দিন চলবে, এসব তাদের পরিচিত ভাষায় জানাতে হবে। নিজেদের মধ্যে আলোচনা করার সময় দিতে হবে। উপস্থিতিপত্রে স্বাক্ষরকে সম্মতি ধরে নেওয়া অনুচিত। মানুষ আপত্তি জানাতে পারছেন কি না, আপত্তির কারণে অসুবিধায় পড়ছেন কি না, তাও দেখতে হবে। শর্ত বদলে গেলে আগের সম্মতির ওপর ভর করে কাজ এগিয়ে নেওয়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
প্রতিনিধি নির্বাচনের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। প্রশাসনের পরিচিত কয়েকজনের বক্তব্যে পুরো জনগোষ্ঠীর অভিজ্ঞতা ধরা পড়বে, এমন নিশ্চয়তা নেই। দূরের বসতির মানুষ, নারী ও তরুণদের কথা আলাদাভাবে শোনার ব্যবস্থা দরকার। দিনের যে সময়ে সভা হচ্ছে, তখন কার কাজ থাকে? যাতায়াতের খরচ কে দেবেন? ছোট শিশুকে কোথায় রেখে একজন মা আলোচনায় আসবেন? এই ব্যবহারিক বিষয়গুলো উপেক্ষা করে সবাইকে আমন্ত্রণ জানালেও অনেকের অংশ নেওয়া কঠিন হবে।
অর্থ বরাদ্দের আলোচনায়ও মানুষের এই কর্তৃত্ব থাকা দরকার। কোন কাজে অর্থ লাগবে, তা বাইরে থেকে ঠিক করে স্থানীয় মানুষকে শুধু বাস্তবায়নের দায় দিলে অংশগ্রহণ অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। কোনো এলাকার অগ্রাধিকার পানির উৎস রক্ষা, অন্য এলাকার প্রয়োজন ক্ষতিগ্রস্ত জমি পুনরুদ্ধার হতে পারে। প্রকল্পে মোট কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে, পরিচালনার পেছনে কত খরচ হয়েছে এবং স্থানীয় মানুষের জন্য নির্ধারিত কাজে কত টাকা ব্যয় হয়েছে, সেই হিসাব সহজ ভাষায় প্রকাশ করা জরুরি। হিসাবরক্ষণে সহায়তা দেওয়ার সঙ্গে স্থানীয় সংগঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগও বাড়াতে হবে।
বন সংরক্ষণ প্রকল্পের মূল্যায়নে গাছের হিসাবের পাশাপাশি মানুষের জীবনে কী পরিবর্তন এসেছে, তা জানতে চাই। পানি সংগ্রহের জন্য আগের চেয়ে কম দূরত্ব হাঁটতে হলে মানুষের সময় ও শ্রম বাঁচে। বনজ সম্পদ সংগ্রহের নিয়মে আয় কমে গেলে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার ক্ষতিপূরণ পেয়েছে কি না, তার হিসাবও জরুরি। জমিসংক্রান্ত অভিযোগের নিষ্পত্তি এবং বন রক্ষার কাজে যুক্ত মানুষ হুমকির মুখে পড়লে তাদের সুরক্ষায় নেওয়া পদক্ষেপও মূল্যায়নে রাখতে হবে।
এসব বিষয়ে স্থানীয় মানুষের অভিজ্ঞতা ও বক্তব্য শুনেই প্রকল্পের সাফল্য বিচার করা দরকার। বন ও বনজীবী মানুষদের কথা মনে রেখে সংরক্ষণের এমন ব্যবস্থা চাই, যেখানে তারা নিজের জীবিকা নিয়ে নির্ভয়ে কথা বলতে পারবেন। তাদের অভিজ্ঞতা শুনে পরিকল্পনা সংশোধনের সুযোগ থাকবে। বন রক্ষার দায় তাদের ওপর দেওয়া হলে সিদ্ধান্তের ক্ষমতা ও অর্থ ব্যবহারের সুযোগও দিতে হবে। তাদের কথা কতটা শোনা হচ্ছে, তার উত্তর সভার ছবিতে মিলবে না। মিলবে তাদের মতামত অনুসারে বদলে যাওয়া সিদ্ধান্তে।
শাহেদ কায়েস: কবি ও মানবাধিকার কর্মী। ই-মেইল: shahedkayes@gmail.com
