Published : 29 Aug 2026, 03:17 PM
আমি গত চার দশক ধরে বারবার ভারত, নেপাল ও ভুটানের হিমালয় পর্বতমালায় গিয়েছি। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর, অথচ নাজুক এই অঞ্চলের সীমাহীন ক্ষতি হতে দেখেছি। অনিয়ন্ত্রিতভাবে পরিবেশ ধ্বংস করা ও পৃথিবীর তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ার ফলে উঁচু পাহাড়ের বরফ গলে বড় বড় সব বিপদ ঘটছে।
বারবার সতর্ক করা হলেও মানুষের লালসা কমেনি। উল্টো পাহাড়ের ওপর চাপ বেড়েছে। ফলে বিভিন্ন উপত্যকা ও নদীর তীরের মানুষ মৃত্যুর মুখে পড়ছে এবং অনেক সম্প্রদায় বিলুপ্ত হচ্ছে।
এবার তিব্বত সীমান্তের পাহাড় থেকে নেমে আসা ভয়ঙ্কর বন্যার শিকার হলো নেপাল। বলা হচ্ছে, হিমবাহের হ্রদের বাঁধ ভেঙেই এই বন্যা হয়েছে।
হিমবাহের কোনো অংশ ভেঙে অথবা তুষারধসে পাহাড়ি নদীর উজানে পানি আটকে পড়ে হ্রদ তৈরি হতে পারে। পরে অধিক পানির চাপে সেই হ্রদের বাঁধ ভেঙে গেলে প্রবল বেগে পানি ভাটির দিকে নেমে যায়।
জানা গেছে, নেপাল-তিব্বত সীমান্তের রাসুয়াগাধি থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার পূর্বে বড় একটি তুষারধস হয়। এতে লেন্দে নদীতে পানির স্রোত ও কাদার ঢল নামে। মুহূর্তের মধ্যে ভাটির বিভিন্ন গ্রাম ও বসতি ভেসে যায়। বহু মানুষ পানিতে তলিয়ে যায়। এর মাত্র কয়েক মিনিট আগে ওই এলাকায় ৪ দশমিক ৪ মাত্রার একটি ভূমিকম্প হয়েছিল। সম্ভবত সেই ভূমিকম্পের কারণেই তুষারধসটি ঘটে থাকতে পারে।
নেপালের রাসুয়া জেলা তিব্বতের গিরং কাউন্টির সঙ্গে যুক্ত। চীনা সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সীমান্তের ওপারেও একই ধরনের প্রাণহানি ও সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। বন্যা রাসুয়া থেকে দক্ষিণে ধাদিং, গোর্খা ও নুয়াকোট জেলায় ছড়িয়ে পড়েছে। এর প্রভাব ভারতের সীমান্তের কাছের এলাকাতেও পড়বে। ভাটি অঞ্চলে অন্তত ছয়টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ধ্বংস হয়ে গেছে। এতে ৪০৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষমতা নষ্ট হয়েছে, যা নেপালের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ১২ শতাংশ। বিদ্যুতের এই ক্ষতি দেশটির জন্য ভীষণ সমস্যা তৈরি করছে। সবকিছু ঠিক করতে এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনে কয়েক বছর লেগে যেতে পারে।
রাসুয়াগাধি শুধু বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কোনো সাধারণ এলাকা নয়। নেপাল ও তিব্বতের মধ্যে বাণিজ্য ও পর্যটনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সীমান্ত পথ। কৈলাস-মানস সরোবর যাওয়ার পথের জন্য এর আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। জানা গেছে, ১৬০ জনের বেশি ভারতীয় তীর্থযাত্রী নিখোঁজ আছেন। তারা যে হোটেল ও গেস্ট হাউসে ছিলেন, সেগুলো বন্যার পানিতে ভেসে গেছে। সামনে সেই সীমান্ত দিয়ে বাণিজ্য ও যাতায়াত বন্ধ থাকতে পারে।
নেপালের এই বন্যা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। হিমালয়ের ৪৮ হাজার বর্গকিলোমিটার জুড়ে হিমবাহ রয়েছে; কারাকোরাম পর্বতমালায় আছে আরও ১৮ হাজার বর্গকিলোমিটার। গবেষকরা হিমালয়ে ৫ হাজারের বেশি হিমবাহের তৈরি হ্রদ খুঁজে পেয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৫০০টি খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। হিমালয় ও কারাকোরামে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩৮৮টি হিমবাহের হ্রদের বাঁধ ভেঙে বন্যা হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। গত কয়েক বছর ধরে এ ধরনের ঘটনা বেড়েই চলছে।
৫ অগাস্ট ২০২৫, ভারতের উত্তরাখণ্ডের ধারালিতে আকস্মিক বন্যার সময় ভূমিধসে বাড়িঘর আংশিকভাবে মাটির নিচে চাপা পড়ে
উত্তরাখণ্ডের ঘটনাগুলোও একই কথা মনে করিয়ে দেয়। ২০২৫ সালের অগাস্টে ধারালিতে হিমবাহের হ্রদের বাঁধ ভেঙে ভয়ঙ্কর বন্যা হয়। এতে অনেক মানুষ মারা যান। ঘরবাড়ি ও জিনিসপত্রের ক্ষয়ক্ষতি হয়। তারও আগে ২০১৩ সালে কেদারনাথে ভারী বৃষ্টির সময় উত্তরের একটি হিমবাহ হ্রদের বাঁধ ভেঙে বন্যা হয়। পানি ও কাদার স্রোত গঙ্গোত্রী মহাসড়কের আশপাশের রাস্তা ও বসতি ভাসিয়ে নিয়ে যায়। সেই ঘটনার পর পাহাড়ের তীর্থস্থানে কতজন মানুষ একসঙ্গে থাকা উচিত হবে, তা নিয়ে কথা হয়। ঠিক করা হয়, নদীর তীর থেকে ৫০০ মিটারের মধ্যে কোনো ঘরবাড়ি অথবা অন্য কিছু বানানো যাবে না, কিন্তু পরে সেই নিয়ম মানা হয়নি। নদীর তীরে আবারও হোটেল ও গেস্ট হাউস গড়ে উঠেছে।
তীর্থযাত্রার সময় কেদারনাথে প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ হাজার মানুষ আসেন। জায়গাটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১৮ হাজার ফুট উঁচু। তারপরও সেখানে গেস্ট হাউস, রেস্তোরাঁ ও ভোজনালয় আছে। ঘর গরম রাখা ও রান্নার জন্য নিয়মিত সিলিন্ডার গ্যাস নিয়ে যাওয়া হয়। অথচ ময়লা ফেলা ও জায়গা পরিষ্কার রাখার ভালো ব্যবস্থা নেই। শোনা যাচ্ছে, উত্তরাখণ্ড সরকার বদ্রীনাথ ও কেদারনাথ সারা বছর তীর্থযাত্রীদের জন্য খোলা রাখার কথা ভাবছে।
৫ অক্টোবর ২০২৩, ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রকাশিত এই ছবিতে সিকিমের বন্যাকবলিত এলাকায় কাদায় আটকে পড়া ট্রাক উদ্ধারের চেষ্টা করছেন সেনাসদস্যরা
অন্যদিকে, হিমালয় পর্বতমালায় জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র বানানোর কাজ চলছে। অথচ হিমবাহের হ্রদের বাঁধ ভেঙে বন্যা আসতে পারে, ভূমিকম্পও হতে পারে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে সিকিমের দক্ষিণ লোনাক হ্রদের বাঁধ ভেঙে ভয়ঙ্কর বন্যা হয়। এতে ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের তিস্তা-৩ জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র পুরোপুরি ভেসে যায়। এর আগে ২০২১ সালে উত্তরাখণ্ডের চামোলিতে হিমবাহ ধসে হঠাৎ বন্যা হয়। তাতে ঋষিগঙ্গা জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ধ্বংস হয়ে যায় এবং চামোলি সুড়ঙ্গ বন্ধ হয়ে পড়ে। এত ঘটনার পরও পাহাড়ে বড় বড় জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র বানানোর কাজ চলছেই। ফলে মানুষের জীবন ও ঘরবাড়ি ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে।
তিব্বত মালভূমি থেকে জন্ম নেওয়া কিছু নদী নেপাল ও ভারতের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে। এসব নদীতে হঠাৎ বন্যা হলে ভারতের অনেক জায়গায় বড় ক্ষতি হয়। কিন্তু ভারত ও চীনের মধ্যে বন্যার খবর, আগাম সতর্কবার্তা নিয়মিত দেওয়া-নেওয়া হয় না।
এখন তিব্বত সীমান্তে ভারতের সামনে আরও বড় বিপদ দেখা দিয়েছে। সীমান্তের কাছে ব্রহ্মপুত্র নদে চীন ‘মেডোগ’ নামে বিশাল বাঁধ বানাচ্ছে। এই বাঁধ থেকে বছরে ৩০০ বিলিয়ন কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ তৈরির লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এটি হবে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র, যা ইয়াংজি নদীর ‘গেঝৌবা’ কেন্দ্রের চেয়ে কয়েক গুণ বড়।
চীনের বিজ্ঞানীরা বলেছেন, বাঁধটি পাইঝেন ফল্টের খুব কাছেই অবস্থিত। তাই সেখানে ভূমিকম্পের ঝুঁকি আছে। ওই এলাকায় বড় ভূমিকম্প হলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে দ্রুতগতিতে পানি ও কাদা নেমে আসতে পারে।
হিমালয়ের বরফ থেকে নেমে আসা নদীগুলোর ওপর ৫০ কোটির বেশি মানুষ নির্ভরশীল। অথচ আমরা সেই নদীগুলোকেই ধ্বংস করে চলছি; আমাদের পরের প্রজন্মকে এজন্য চরম মূল্য চুকাতে হবে।
হিমালয় যেন বারবার বড় বিপদের কথাই জানিয়ে দিচ্ছে, কিন্তু আমরা তা শুনছি না। এভাবে চলতে থাকলে সামনে আরও বড় বিপদ আসতে পারে।
লেখাটি ‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’ থেকে অনূদিত; এর লেখক শ্যাম শরণ ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র সচিব এবং সিপিআর-এর জ্যেষ্ঠ ফেলো। ২০০২ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত তিনি নেপালে ভারতের রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।