ডনাল্ড ট্রাম্প: ভেলকিবাজির জবরদস্ত খেলোয়াড়

যুক্তরাষ্ট্রের সেনেট ও সিন্ডিকেট নির্বাচনে রিপাবলিকানদের জোরালো অবস্থান ট্রাম্পের পুনরায় ফিরে আসাকে ইঙ্গিত করছে না তো!

মোস্তফা সারওয়ারমোস্তফা সারওয়ার
Published : 9 Nov 2022, 11:28 AM
Updated : 9 Nov 2022, 11:28 AM

ভেলকিবাজির জবরদস্ত খেলোয়াড় ডনাল্ড ট্রাম্পের জন্ম হয়েছিল ১৯৪৬ সালের ১৪ জুন নিউ ইয়র্কের কুইন্স বরো- এর জ্যামাইকা হাসপাতালে। ১৯৮৮ সালের ডেমোক্রেটিক ন্যাশনাল কনভেনশনে তৎকালীন যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশকে কটাক্ষ করে প্রদত্ত এন রিচার্ড (টেক্সাসের সাবেক গভর্নর)  এর কৌতু্কপ্রদ মন্তব্যটি ডনাল্ড ট্রাম্পের নিমিত্ত প্রয়োগের লোভ সংবরণ করতে আমি ব্যর্থ হলাম- He was born with a silver foot in his mouth (বাংলায় “তার জন্ম হয়েছিল একটি রুপোর পা মুখে নিয়ে?)।  ইংরেজি মন্তব্যের ‘silver foot’ এ দুটো আমেরিকান বাগধারার সম্মেলন ঘটানো হয়েছে।  অনাবিল সম্পদের পাহাড়ে  জন্ম হলে বলা হয়, মুখে  রুপোর চামচ নিয়ে  জন্ম ‘born with a silver spoon in his mouth’। আর  যারা কথা বলে নিজেদের বিব্রত করে তাদের বলা হয় ‘নিজের পা মুখে ঢুকিয়েছে’- putting his foot in his mouth।

কোভিড-১৯ থেকে রক্ষা পেতে ‘ক্লোরেক্স পান’ করার পরামর্শ যখন ট্রাম্প দেন তখন মনে হয় তিনি তার নিজের পা মুখে ঢুকিয়েছেন। স্ট্যাবেল জিনিয়াস, যুদ্ধবিদ্যায় জেনারেলদের  চেয়ে পারদর্শী, চিকিৎসাবিদ্যায় পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম ডাক্তারদের চেয়ে বিজ্ঞ, ইত্যাদি আত্মপ্রশংসার হাস্যস্পদ বচন সাবেক প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড  ট্রাম্পের মুখ থেকে নির্গত হয়েছে।

জার্মানি থেকে অভিশংসিত নাপিত যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ পল্লীর ব্যবসায়ীর  পৌত্র তিন প্রজন্মের ডনাল ট্রাম্প ‘রুপোর পা  মুখে’  থিতু হয়েছিলেন  নিউ ইয়র্কের কুইনন্সে তার পিতার নির্মিত তেইশ রুমের এক জাঁকালো জর্জিয়ান অট্টালিকায় (Ref: Martha Brackenbrough, unpresidented page 41)।

আবাসন নির্মাণ ও বাণিজ্যে বিস্ময়কর সাফল্যের অধিকারী ফ্রেড ট্রাম্প এবং ম্যারি এন ম্যাক্লয়েডের চতুর্থ সন্তান  ট্রাম্প শিশুকাল হতেই বিপুল অর্থের মালিক। বয়স এক বছর না পেরোতেই বর্তমান বাজার মূল্যে বাৎসরিক দুই লাখ ডলার ছিল ডনাল্ড ট্রাম্পের উপার্জন- যার বড় অংশ আসতো জমির ভাড়া হিসেবে। ফ্রেড ট্রাম্প তার দালান বাদ দিয়ে শুধু জমিটুকুর মালিকানা ট্রাস্টের মাধ্যমে হস্তান্তর করেছিলেন তার পাঁচ ছেলেমেয়ের মালিকানায়। তার মালিকানাধীন অসংখ্য  দালানের জমিগুলো ছিল ছেলেমেয়েদের নামে। আর দালানগুলো ছিল ফ্রেডের নিজের নামে। এগুলো তিনি সরকারি সাহায্যে নির্মাণ করেছিলেন। নিজের খরচ ছিল নামমাত্র। জমির ভাড়া বাবদ বিপুল অর্থ জমা দেওয়া হত ছেলেমেয়েদের ট্রাস্ট ফান্ডে। সরকারি কর ফাঁকির সূক্ষ্ণ কারিগর ছিলেন ডনাল্ড ট্রাম্পের বাবা। পিতা কর্তৃক আইনের ফাঁক-ফোকরের দক্ষ ব্যবহারের ফলে মাত্র আট বছর বয়সে ডোনাল্ড ট্রাম্প বনে ছিলেন শিশু মিলিয়নিয়ার। সতেরো বছর বয়সে তার ব্যবসায়িক বাৎসরিক উপার্জন ছিল বর্তমান বাজার মূল্যে এক মিলিয়ন ডলার (Ref: Andrew Bernstein, American Oligarchs, page 64)।  

ডনাল্ড ট্রাম্প নামের এই সৌভাগ্যবান ছেলেটি সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন বাড়ি থেকে কাছে একই পাড়ায় অবস্থিত কিউ-ফরেস্ট স্কুল কিন্ডারগার্টেনে। তারপর ১৯৫৯ সালে ডনাল্ড ট্রাম্পকে পাঁচ বছরের জন্য পাঠানো হলো নিউ ইয়র্ক মিলিটারি অ্যাকাডেমিতে। এই স্কুলটিকে কিছুটা তুলনা করা যায় বাংলাদেশের ক্যাডেট  কলেজগুলোর সাথে। হাই স্কুল পাশের পর তিনি দু'বছর লেখাপড়া করেন নিউ ইয়র্কের ব্রঙ্কসে অবস্থিত ফোর্ডহ্যাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। পরবর্তী দু বছর বদলি ছাত্র হিসেবে তিনি লেখাপড়া করেন  আইভি লীগের অন্তর্গত ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভেনিয়ার ওয়ারটন স্কুলে। ১৯৬৮ সালের মে মাসে তিনি অর্থনীতিতে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেছিলেন। তরুণ বয়স থেকেই ডাহা মিথ্যা বলার হাতেখড়ি লাভ করেন ডনাল্ড। ওয়ারটন স্কুলের সম্মান (honor) তালিকায় ডনাল্ড ট্রাম্পের নাম ছিল না। তথাপি নিউ ইয়র্ক টাইমসের সাংবাদিক জুডি ক্লেমাসরড (Judy Klemesrud)-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছিলেন যে ওয়ারটন স্কুলের ১৯৬৮ সালের হেমন্তকালীন স্নাতক উত্তীর্ণদের মাঝে তিনি প্রথম স্থান অধিকার করেছেন। ২০১৫ হলে যখন সাংবাদিকরা এর যথার্থতা যাচাই করার চেষ্টা করেছিলেন, তখন  ডনাল্ড ট্রাম্পের কৌঁসুলী মাইকেল কোহেন প্রাইভেসি আইন উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোকে বিদ্যালয় সংক্রান্ত দলিলপত্র প্রকাশের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি দিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যালয় সংক্রান্ত দলিলপত্রের গোপনীয়তা রক্ষা করা বাধ্যতামূলক। এমনকি ছেলেমেয়েদের উচ্চশিক্ষা বিষয়ক পরীক্ষার নম্বর পিতামাতাকে পর্যন্ত জানানো যায় না। 

ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় প্রাপ্ত বয়স্ক নাগরিকদের সামরিক বাহিনীতে যোগদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে। প্রাণ ভয়ে ভীত ডনাল্ড কিছুতেই যুদ্ধে যাবেন না। তিনি চার বার সামরিক বাহিনীতে যোগদান স্থগিত করেছিলেন। ১৯৭২  সালে পায়ের হাঁড়ের ভুয়া সমস্যা (bone spar) দেখিয়ে তিনি সামরিক কর্তব্য থেকে স্থায়ীভাবে অব্যাহতি লাভ করেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় অনেক অর্থশালী ক্ষমতাধর ব্যক্তিরা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে জীবন বিসর্জন দিতে অন্যদের উৎসাহিত করত। নিজেদের ছেলেদের ব্যাপারে তাদের সিদ্ধান্ত ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। ভিয়েতনাম যুদ্ধে মিথ্যা অজুহাতে অব্যাহতি দেওয়া  ডোনাল্ড ট্রাম্প যুদ্ধে আহত, বন্দী, ও বীরত্বে সম্মানিত জন মেকেইনকে বহুবার কঠোর সমালোচনা করেছেন  তথাকথিত  ভীরুতার জন্য।

ডনাল্ড ট্রাম্পের বিয়ে তিনটে। কিন্তু এর বাইরে তার যৌন প্রমোদ বিহারকে বলা যাবে বহুল প্রচারিত বাসি খবর। যৌন ব্যবসায়ী নারীদের নিয়ে তার কেলেঙ্কারি বিচারালয়ের আঙ্গিনা পর্যন্ত পদধূলি দিয়েছে। 

১৯৭৭ সালে ইভানা জেলনিকোভা নামে চেক দেশীয় এক ফ্যাশন মডেলের সাথে তার বিয়ে হয়েছিল। অভিবাসন নিয়ে ইভানা যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হয়েছিলেন ১৯৮৮ সালে। পনেরো বছর পর বিয়ে ভেঙ্গে যায়। বিবাহিত অবস্থায়ই যুক্তরাষ্ট্রের ফ্যাশন মডেল মারলা ম্যাপেলসের সাথে ডনাল্ডের ঘনিষ্ঠতা শুরু হয়েছিল। ১৯৯৩ সালে মার্লা ম্যাপেলসকে বিয়ে করেন ডনাল্ড ট্রাম্প। মাত্র ছয় বছরের মাথায় দ্বিতীয় বিয়েটির সমাপ্তি ঘটে তালাকে। তৃতীয় বিয়েটি হয়েছিল ২০০৫ সালে এক স্লোভেনিয়ান ফ্যাশন মডেল মেলানিয়া ক্লাউসের সাথে। মেলানিয়া যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পেয়েছিলেন ২০০৬ সালে।

ডনাল্ড ট্রাম্পের বিয়েগুলো পর্যালোচনা করলে একটি প্যাটার্ন লক্ষ্য করা যায়। তিনজনই হলেন অনিন্দ্য সুন্দরী মডেল। দুইজন হলেন বিদেশিনী। কিন্তু বিস্ময় হলো, ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট হিসেবে অভিবাসনের বিরুদ্ধে হয়েছিলেন নিদারুণ খড়্গ হস্ত। ১৯৯২ সালে তার তালাক হয়েছিল প্রথমা স্ত্রী  ইভানার সাথে।  বিবাহিত অবস্থায় ১৯৯০ সালের ১৬ই  ফেব্রুয়ারি নিউ ইয়র্ক পোস্ট নামে বহুল সঞ্চালিত এক দৈনিক পত্রিকার প্রথম পাতাজুড়ে ব্যানার হেডলাইনে চাঞ্চল্যকর খবর ছাপা হয়েছিল। তখনও ইভানার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ ডনাল্ড ট্রাম্পের বিবাহ বহির্ভূত মেয়েবন্ধু মারলা ম্যাপেলস তার বন্ধুদের দম্ভ করে বলেছেন ‘বেস্ট সেক্স আই হ্যাভ এভার হ্যাড’। খবরে মারলার বর্ণিত ভাষায় উল্লেখ করা হয়েছিল ডনাল্ড ট্রাম্পের যৌন দক্ষতা। এটা ছিল পৃথিবীর ইতিহাসে সবচেয়ে প্রচারিত ট্যাবলয়েড পত্রিকার হেডলাইন। সবচেয়ে মজাদার খবর হল এই গল্পটি ছাপাবার জন্য ডনাল্ড ট্রাম্প নিজেই নিউ ইয়র্ক পোস্টের সম্পাদক জেরি ন্যাকম্যানকে ফোন করেছিলেন (Ref: Jill Broke, The Real Story Behind Donald Trump’s infamous ‘Best Sex I’ve Ever Had’ Headline (Guest Column), The Hollywood Reporte Magazine, April, 2028)।

ভেলকিবাজির দক্ষ খেলোয়াড় ডনাল্ড ট্রাম্প প্রচারণায় সিদ্ধহস্ত। ভালো হোক আর মন্দ হোক পত্রিকা অথবা ম্যাগাজিনের পাতায় তার খবর থাকতেই হবে। পত্রিকায় বিজ্ঞাপনে খরচ পড়ে প্রচুর। কিন্তু ডনাল্ড ট্রাম্প পত্রিকা এবং ম্যাগাজিনে কাভারেজ পাচ্ছেন অনেক সময় বিনা খরচে। অল্প কয়েক বার তিনি চাঞ্চল্যকর এবং বিতর্কিত বিজ্ঞাপনও দিয়েছেন।  

ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভেনিয়ার ওয়ারটন স্কুলে ছাত্র থাকাকালীন ডনাল্ড ট্রাম্প তার পিতার আবাসন কোম্পানিতে কাজ শুরু করেছিলেন। স্নাতক ডিগ্রি লাভের তিন বছর পর ১৯৭১ সালে পিতার কোম্পানি ‘এলিজাবেথ অ্যান্ড সান’ এ প্রেসিডেন্টের পদ লাভ করেই কোম্পানির নতুন নাম করেন ‘ট্রাম্প অর্গানাইজেশন’। অতীতে এই কোম্পানির ব্যবসা মূলত সীমাবদ্ধ ছিল ম্যানহাটনের বাইরের পার্শ্ববর্তী বরোগুলোতে। মধ্যবিত্তদের জন্য ভাড়াটে আবাসনে। চার বছর যেতে না যেতেই ডনাল্ড ট্রাম্প পারিবারিক আবাসন ব্যবসাকে চমকপ্রদভাবে ম্যানহাটনে প্রসারিত করেন। ১৯৭০ এ  দেউলিয়া হয়ে যাওয়া সেন্ট্রাল ট্রান্সপোর্টেশন নামের রেলরোড কোম্পানির মালিকানাধীন ৯৩ এবং ৪৪  একরের দুইটি বিশাল প্লট ১৯৭৫ সালে ডনাল্ড ট্রাম্প কিনে নিয়েছিলেন ৬২ মিলিয়ন ডলার মূল্যে দেউলিয়া আদালতের রায় অনুযায়ী। ট্রাম্পের নিজের ওই পরিমাণ অর্থ ছিল না। তিনি দক্ষতার সাথে ব্যবস্থা করেছিলেন সরকারি ঋণ এবং পিতার কাছ থেকে ধার নেওয়া অর্থ।

ভেলকিবাজির দক্ষ কারিগর ডনাল্ড ট্রাম্প ম্যানেজ করেছিলেন প্যান সেন্ট্রালের জমি বিষয়ক ভারপ্রাপ্ত কৌঁসুলী ভিক্টর পালমেয়ার Victor Palmieri) এবং নিউ ইয়র্কের মেয়র এব বীম (Abe beame)-কে। মেয়রকে ডনাল্ডের ম্যানেজ করতে সুবিধা করে দিয়েছিল মেয়রের নির্বাচনী তহবিলে ডনাল্ড ট্রাম্পের পিতা ফ্রেডের ত্রিশ বছর ধরে চাঁদা প্রদান। এইসব কারণে প্যান সেন্ট্রাল (Pan Central) ট্রাম্পের প্রস্তাব গ্রহণ করেছিল এবং দেউলিয়া আদালত দ্বারা প্রস্তাবটি অনুমোদিত হয়েছিল।

ম্যানহাটনে ডনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় প্রকল্প ছিল গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল স্টেশনের কাছে এককালের  জৌলুসের প্রতিভূ কমোডোর হোটেল ক্রয় এবং গ্র্যান্ড হায়াত হোটেল নামে বিনির্মাণ। ১৯১৯ সালে্র ২৯ শে জনুয়ারি কমোডোর খুব ঘটা করে উদ্বোধন করা হয়েছিল। কিন্তু সাতান্ন বছর পর ১৯৭৬ সালের ১৮ই মে হোটেলটি জরাজীর্ণ অবস্থায় বন্ধ হয়ে যায়। হোটেলের ব্যবস্থা থেকে পেন সেন্ট্রালের লোকসান হচ্ছিল অসহনীয়। এমনকি বকেয়া সম্পদ কর জমে জমে হয়েছিল ১৫ মিলিয়ন ডলার। নিউ ইয়র্ক শহরের আর্থিক অবস্থা তখন ছিল খুবই করুণ। ভয়ের শহর (Fear City) হিসেবে তখন পরিচিত নিউ ইয়র্ক দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে।

ডনাল্ড ট্রাম্প কমোডর হোটেল পরিচালকদের ম্যানেজ করে হোটেলটির চারিদিকে দৃষ্টিকটু শাটার (Shutter) লাগিয়ে দিয়েছিলেন শহর কর্তৃপক্ষের কর মওকুফের সিদ্ধান্ত নেওয়ার মাত্র দুই দিন আগে। এইসব ভেল্কিবাজির মাধ্যমে ট্রাম্প মাত্র সাড়ে নয় মিলিয়ন ডলারে এবং চল্লিশ বছর কর মওকুফের অনুমোদন লাভ করে কমোডোর হোটেলকে কব্জা করেছিলেন। হোটেল এর নতুন নামকরণ করলেন ‘গ্র্যান্ড হায়াত’। ছত্রিশ বছরের কর মওকুফের পরিমাণ ছিল ৩৬০মিলিয়ন ডলার (Ref: Jame Nevins, The Winding history of Donald Trump’s first major Manhattan real estate project, CURBED, April 13. 2019)।

পরবর্তী প্রকল্প ছিল ট্রাম্প টাওয়ার। নির্মাণ কাজে ডনাল্ড ট্রাম্পের খরচ হয়েছিল দুই শ মিলিয়ন ডলার। কন্ডো বিক্রি করেই তিনি পেয়েছিলেন তিন শ মিলিয়ন।

অভিশংসন (Immigration) এবং অনথিভুক্ত অভিবাসীদের (Undocumented immigrant) বিরুদ্ধে অহরহ বিষোদ্গারকারী ডনাল্ড ট্রাম্পের ভেলকিবাজি সীমাহীন। বনউইট টেলার এবং কোম্পানির (Bonwit Teller and company) ১২ তলা ডিপার্টমেন্ট স্টোর ভেঙে নির্মাণ করা হয়েছিল ট্রাম্প টাওয়ার। ভাঙার জন্য নিযুক্ত করা হয়েছিল পোল্যান্ড থেকে আসা অনথিভুক্ত অভিবাসীদের। ১৯৮৮ সালে ডনাল্ড ট্রাম্প ৪২৫ মিলিয়ন ডলার ব্যাংক লোনের সাহায্যে অর্জন করেছিলেন প্লাজা হোটেল।

ডনাল্ড ট্রাম্প পরে ক্যাসিনো ও গলফ কোর্স ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছিলেন। টেলিভিশনে প্রচারিত ‘অ্যাপ্রেন্টিসশিপ’ অনুষ্ঠানে তার সাফল্য ছিল আকাশচুম্বী। সেই সাফল্যকে দক্ষতার সাথে ব্যবহার করে ট্রাম্প নামে বিভিন্ন ভোগ্য পণ্যের ব্রান্ডিং করা হয়। তার নামে ছিল গরুর মাংসের স্টেক,  সুগন্ধি, টাই, জামা,  সুট, ইউনিভার্সিটি, বিমান এবং আরও অনেক জিনিস।

মিডিয়া স্যাভি ডনাল্ড ট্রাম্প ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করেছিলেন ভোটারদের এক অংশের নৈরাশ্য, বর্ণবিদ্বেষ ও ঘৃণাকে উস্কে দিয়ে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার প্রেসিডেন্সিকে প্রশ্নবিদ্ধ এবং অকার্যকর করার উদ্দেশ্যে এই ভেলকিবাজ শুরু করেছিলেন বার্থার (Birther movement) আন্দোলন। ট্রাম্প প্রচার করেছিলেন- ওবামার জন্ম কেনিয়াতে, তার যুক্তরাষ্ট্রের জন্মসনদ ভুয়া ইত্যাদি ইত্যাদি। বর্ণবিদ্বেষী শ্বেতাঙ্গদের উপরোক্ত প্রচারণার মাধ্যমে সংগঠিত করেছিলেন। আরও বলেছিলেন যে, ওবামা মুসলিম যেহেতু ওবামার বাবা ছিলেন মুসলিম। অথচ ওবামা তার তালাকপ্রাপ্ত মায়ের খ্রিস্টধর্মে ধর্মে দীক্ষিত ছিলেন এবং মায়ের ও নানীর অভিভাবকত্বে লালিত হয়েছিলেন। মুসলিম বলার মূল উদ্দেশ্য ছিল মুসলিমদের বিরুদ্ধে ঘৃণা জর্জরিত খ্রিস্টানদের তার পক্ষে সংগঠিত করা।

২০১৫ সালের ১৬ই জুন, তার জন্ম দিবসের দুইদিন পর, ম্যানহাটনের ট্রাম্প টাওয়ারে, তার প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচনী প্রচারণার উদ্বোধনী বক্তৃতায় ডনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করলেন, “তারা [মেক্সিকানরা] নিয়ে আসেন ড্রাগ। তারা নিয়ে আসেন ক্রাইম। তারা ধর্ষণকারী।” আর কী কথা আছে! শ্বেতাঙ্গ  বর্ণবিদ্বেষীদের জন্য এর চেয়ে অমৃতবাণী আর কী হতে পারে? সব শ্বেতাঙ্গ  বর্ণবিদ্বেষী নন এবং এর সংখ্যাটাও বেশ বড়। এদের দলে  ভিরাতে ট্রাম্পের ভেলকিবাজি ব্যর্থ হয়। পাকিস্তানের আইয়ুব খানের মৌলিক গণতন্ত্রের মতো ইলেকটোরাল কলেজের ভোটে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেও গণভোটে হিলারি ক্লিনটনের সাথে বিপুল ভোটে হেরে গিয়েছিলেন। মামলাবাজ ডনাল্ড ট্রাম্পের ব্যবসায়ের বিরুদ্ধে চার হাজারের মতো স্টেট ও কেন্দ্রিয় মামলা দায়ের করা হয়েছিল।  

তার কোম্পানিগুলো ছয়বার দেউলিয়া হয়ে যায়। পৃথিবীর নামজাদা কোন ব্যাংক তাকে আর ঋণ দিচ্ছে না। ঠিকাদারদের পাওনা অর্থ না দেওয়ার জন্য তার বিরুদ্ধে হয়েছিল অনেক মামলা। বিখ্যাত দৈনিক ওয়াশিংটন পোস্টের কয়েক বছর আগের হিসেব অনুযায়ী  দুই হাজারের বেশি মিথ্যা বলেছেন এই ধান্দাবাজ। তার বিরুদ্ধে পঁচিশ জন নারী ধর্ষণ, যৌন নির্যাতন, অথবা যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছেন। তিনটি মামলা বিচারের অপেক্ষায় রয়েছে। বারবনিতাকে অর্থ দিয়ে মুখ বন্ধ করার প্রকাশ্য অভিযোগ প্রচারমাধ্যমে ছিল শিরোনাম। ভিডিও টেপে তার নিজের কণ্ঠে রয়েছে জোরপূর্বক মেয়েদের যৌন হয়রানির ‘কীর্তি কাহিনী’।        

খ্রিস্টধর্ম পালনে তার তেমন কোনো প্রমাণ নেই। কিন্তু কৌতুকের বিষয় হলো যুক্তরাষ্ট্রের ইভানজেলিক্যাল খ্রিস্টধর্মের উর্ধ্বতন নেতৃবৃন্দসহ ধর্মভীরু জনসাধারণ ডনাল্ড ট্রাম্পকে মর্যাদা দিচ্ছেন ‘পুনরুত্থিত যীশু খ্রিস্ট’ হিসেবে। এখনো শতকরা সত্তর ভাগ রিপাবলিকান বিশ্বাস করেন ট্রাম্প গত নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন। অথচ তারই বাছাই করা এবং তারই নিয়োজিত লোকাল, স্টেট, অথবা কেন্দ্রীয় পর্যায়ের বিচারকরা ষাটেরও বেশি নির্বাচন অনিয়মের মামলা খারিজ করে দিয়েছেন এবং নির্বাচন পরিচালকরা দল-মত নির্বিশেষে বলেছেন- ২০২০ সালের তেসরা নভেম্বর নির্বাচন ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কারচুপিবিহীন নির্বাচন।

ভেলকিবাজির জবরদস্ত খেলোয়াড় ডনাল্ড ট্রাম্প লক্ষ-কোটি যুক্তরাষ্ট্রবাসীকে জাদুকরী সম্মোহনে আচ্ছাদিত করে আছেন। ভবিষ্যতের গবেষকদের দ্বারা এটার কারণ বের করা হবে খুবই মজাদার।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক