Published : 27 Feb 2026, 12:21 AM
নাগরিক সেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব মূলত স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ওপরই নির্ভর করে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেশের ছয়টি সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন উঠছে—এটি কি সত্যিই নাগরিক সেবা উন্নত করার উদ্যোগ, না রাজনীতি প্রচ্ছন্ন হিসাব-নিকাশ? বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, জনপ্রতিনিধির অনুপস্থিতিতে নাগরিক সেবার কার্যকারিতা অনেক ক্ষেত্রেই কমে যায়। ফলে প্রশাসনিক দক্ষতা আর গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে পাওয়াই এখন বড় সংকট হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর থেকেই এসব সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব প্রশাসকদের হাতে। সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়ার ঘটনা নতুন নয়; অতীতেও নানা সময়ে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় এ ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি না থাকলে নগর সেবার ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নেওয়া যেতে পারে। জনপ্রতিনিধিত্বশীল স্থানীয় সরকার কাঠামোকে পাশ কাটিয়ে দীর্ঘ সময় প্রশাসক-নির্ভর ব্যবস্থা চালু রাখা হলে নাগরিক অংশগ্রহণ ও গণতান্ত্রিক জবাবদিহিতার জায়গা দুর্বল হয়ে পড়ে।
সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার বাসিন্দারা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান থেকে অন্তত অন্তত ১২ ধরনের নাগরিক সেবা পান। জন্ম–মৃত্যু নিবন্ধন, ওয়ারিশান সনদ, নাগরিকত্বের প্রত্যয়নপত্র, বিবাহ বিচ্ছেদের সনদ, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ভাতার সত্যায়িত সনদসহ বিভিন্ন প্রত্যয়নপত্র এবং জাতীয় পরিচয়পত্র ও ভোটার তালিকায় নাম তোলা ইত্যাদি। এগুলো নাগরিকদের কাছে পৌঁছে দেয় মূলত সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলররা, যারা এক ধরনের ‘প্রথম যোগাযোগ’ হিসেবে কাজ করেন। মেয়র বা প্রশাসক এই প্রক্রিয়ার অভিভাবক হলেও, তারা সরাসরি নাগরিকদের সেবা দিতে পারেন না।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়। একযোগে দেশের ১২টি সিটি করপোরেশন ও ৩৩০টি পৌরসভার মেয়র ও কাউন্সিলরদের বরখাস্ত করা হয়। সব মিলিয়ে চার হাজারেরও বেশি জনপ্রতিনিধি একসঙ্গে তাদের দায়িত্ব হারান। একই সময়ে উপজেলা ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান ও সদস্যদেরও অপসারণ করা হয়। ফলে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার প্রায় পুরো কাঠামোই প্রশাসক-নির্ভর হয়ে পড়ে।
এরপর সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোতে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হলে নাগরিক সেবার ক্ষেত্রে ভোগান্তি আরও বাড়ে—এমন অভিযোগও সামনে আসে। স্থানীয় পর্যায়ের সেবা ব্যবস্থাপনায় আকস্মিক নেতৃত্ব পরিবর্তনের ফলে প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা ও সেবার দ্রুততা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করে।
একই সময়ে রাজনৈতিক আইনি লড়াইও শুরু হয়। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনে বিএনপি নেতা শাহাদাত হোসেন নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে মামলা করে মেয়র পদ ফিরে পান। একইভাবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে বিএনপি নেতা ইশরাক হোসেন মামলায় জয়ী হলেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকার তাকে মেয়র পদে পুনর্বহাল করেনি। এই ঘটনাগুলো স্থানীয় সরকার কাঠামোর স্বাভাবিকতা, আইনি বৈধতা ও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের ভারসাম্য নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে।
মেয়র–কাউন্সিলরদের বরখাস্তের পর যখন নাগরিক সেবা ব্যবস্থাপনায় অস্থিরতা ও ভোগান্তি বাড়তে থাকে, তখন পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের উদ্যোগ নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। তবে সেই উদ্যোগ রাজনৈতিক জটিলতার মুখে পড়ে। তখন সবার আগে জাতীয় নির্বাচন দাবি করে বেঁকে বসে বিএনপি এবং নির্বাচন করা আর সম্ভব হয়নি। তাদের অবস্থানের কারণে স্থানীয় নির্বাচন আয়োজনের প্রক্রিয়া কার্যত স্থবির হয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত নির্বাচনও করা সম্ভব হয়নি। ফলে স্থানীয় সরকার কাঠামোতে জনপ্রতিনিধির শূন্যতা দীর্ঘায়িত হয়, যা নাগরিক সেবা ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় পর্যায়ের জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করে।
নগর সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা আমাকে সরাসরি দেখিয়েছে, কাউন্সিলরদের অনুপস্থিতিতে নাগরিকরা কী পরিমাণ ভোগান্তির মুখোমুখি হয়েছেন। শুধু একটি জন্মসনদ পেতে মানুষকে এক মাস ধরে দপ্তর থেকে দপ্তরে ঘুরতে হয়েছে। কারণ কাউন্সিলরদের দায়িত্ব তখন সিটি করপোরেশনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাদের— যারা আনিক নামে পরিচিত—তাদের হাতে দেওয়া হয়। কিন্তু ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে আনিকের পদ ১০টি করে ২০টি। আবার অনেক আনিককে একাধিক অঞ্চলের দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। তাদের দাপ্তরিক অন্য কাজ থাকায় তারা দুই সিটি করপোরেশনে থাকা ১২৬টি ওয়ার্ডের বাসিন্দাদের প্রয়োজনীয় নাগরিক সেবা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন।
অতিরিক্ত সমস্যা হলো, স্থানীয়দের সঙ্গে আনিকদের পরিচয় কম থাকায় অনেক নাগরিক সঠিক সেবা পাননি। কাউন্সিলর না থাকার ফলে নগরবাসী নানা ধরনের বিড়ম্বনার শিকার হয়েছেন, যার ইয়ত্তা নেই। সেই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে রাজধানীর দুই সিটিতে প্রশাসক ঘন ঘন বদল হয়েছেন। নতুন প্রশাসকরা সাধারণত মাঠ পর্যায়ের সমস্যাগুলো বোঝার চেষ্টা করেননি।
উদাহরণস্বরূপ, গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক হিসেবে এক বছরের চুক্তিতে নিয়োগ পান পরিবেশকর্মী ও জুলাই যোদ্ধা মোহাম্মদ এজাজ। কিন্তু কিছু দিন যেতেই তার বিরুদ্ধে নানা ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। বর্তমানে তাকে দুদকে হাজিরা দিতে হচ্ছে এবং বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা পড়েছে। এটি শুধু ব্যক্তিগত দুর্নীতির ঘটনা নয়, বরং প্রশাসক-নির্ভর ব্যবস্থার অকার্যকারিতা এবং স্বচ্ছতার অভাবকেও প্রকাশ করছে।
ভেবেছিলাম, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর নাগরিক ভোগান্তির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে সিটি করপোরেশনগুলোতে দ্রুত নির্বাচনের আয়োজন করবে। এমনকি স্থানীয় সরকার বিভাগ থেকে নির্বাচন কমিশনকেও এ বিষয়ে একটি চিঠিও পাঠানো হয়েছিল। স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, আসন্ন ঈদুল ফিতরের পরপরই সিটি করপোরেশন নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে ভুক্তভোগী নগরবাসীর মধ্যে কিছুটা আশার সঞ্চার হয়েছিল।
কিন্তু বাস্তবে ঘটল ভিন্ন ঘটনা। চেয়ারে বসার মাত্র পাঁচ দিনের মধ্যেই তার মন্ত্রণালয় থেকে ছয় সিটি করপোরেশনে প্রশাসক নিয়োগের আদেশ জারি করা হয়। এই সিদ্ধান্ত নতুন করে সন্দেহ তৈরি করেছে—সিটি করপোরেশন নির্বাচন কি ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্বিত করা হচ্ছে? এর পেছনে কি কোনো রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ কাজ করছে? কারণ সমালোচকদের একটি অংশের মতে, প্রশাসক নিয়োগের মাধ্যমে নির্বাচনি প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
আরও একটি বিতর্কের বিষয় হলো, ছয়টি সিটি করপোরেশনেই বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নেতারাই প্রশাসকের দায়িত্ব পেয়েছেন—যা রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের প্রশ্নও সামনে এনেছে। ফলে প্রশাসনিক প্রয়োজনের পাশাপাশি রাজনৈতিক স্বার্থের বিষয়টি নিয়েও আলোচনা আরও জোরালো হয়ে উঠেছে।
ইউনূস সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোতে নির্বাচন আয়োজনের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিল। তখনই প্রশ্ন উঠেছিল—তারা কি স্থানীয় সরকারে এনসিপি, জুলাই যোদ্ধা বা ইউনূস–অনুগত নেতাদের জায়গা করে দিতে চায়? এটাই ছিল বিএনপির বাধা হয়ে দাঁড়ানোর কারণ। তারা তখন আগে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবি করেছিল।
এখন পরিস্থিতি নতুন মোড় নিয়েছে। খোদ রাজধানী ঢাকায় জামায়াতে ইসলামী তিনটি আসন পেয়ে গেছে, তাদের জোটসঙ্গী এনসিপিও একটি আসনে বিজয়ী হয়েছে। এই রাজনৈতিক বাস্তবতাতে কি জাতীয় সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল বিএনপিকে ভয় পাইয়ে দিয়েছে? এমন কি, সেই ভয় থেকেই তারা নির্বাচনের পথ রুদ্ধ করে দলীয় লোকদের প্রশাসক পদে বসিয়ে সুবিধা দিয়ে নির্বাচনি মাঠ প্রস্তুত করতে চাইছে? যদি তা সত্যি হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠতে বাধ্য—নাগরিক স্বার্থের চেয়ে কি দলীয় স্বার্থই তাদের কাছে বড় হয়ে গেছে?
নাগরিক সেবা ও স্থানীয় সরকারের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে উপেক্ষা করে রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশে যদি নিয়োগ ব্যবস্থার অপব্যবহার করা হয়, তা শুধু প্রশাসনিক অকার্যকারিতা তৈরি করবে না, গণতান্ত্রিক বিশ্বাস এবং অংশগ্রহণমূলক রাজনৈতিক ব্যবস্থার ক্ষতি করবে।
নানা তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে মানুষ জনপ্রতিনিধিদের বড় একটি অংশকে খুব একটা ইতিবাচক চোখে দেখেন না। তবুও বাস্তবতা হলো—দিনশেষে জনপ্রতিনিধিরাই মানুষের কাছে যাওয়ার সবচেয়ে কার্যকর মাধ্যম। কমবেশি হলেও তাদের জনগণের কাছে যেতে হয়, আবার জনগণও তাদের কাছে যেতে বাধ্য হয়। একজন কাউন্সিলর সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা ও স্থানীয় বাস্তবতাকে যতটা গভীরভাবে বোঝেন, একজন আমলার পক্ষে তা সম্ভব হয় না। আবার বুঝতে বুঝতেই বদলি হয়ে অন্যত্র চলে যান, ফলে স্থানীয় সমস্যার স্থায়ী সমাধানও অধরা থেকে যায়।
বর্তমানে আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাদের (আনিক) মাধ্যমে নাগরিক সেবা চালানোর যে ব্যবস্থা রয়েছে, তা দিয়ে ভোগান্তি কমবে—এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। যদিও নাগরিক ভোগান্তি কমানোর যুক্তি দেখিয়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিদের প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, কিন্তু বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে—নগরবাসী নির্বাচিত কাউন্সিলর না পাওয়া পর্যন্ত সেবার মান নিশ্চিত করা কঠিন।
এর সবচেয়ে সাম্প্রতিক প্রমাণ হিসেবে রাজধানীতে মশার দৌরাত্ম্যকে দেখা যায়। রাজধানীতে প্রায় তিন দশক কাটানোর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে বলতে ঢাকায় এত মশার এত বেশি উপদ্রব আর আগে কোনো দিনই সহ্য করতে হয়নি।
বাংলাদেশের সংবিধানের ৫৯(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী স্থানীয় সরকার পরিচালনার দায়িত্ব নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতেই থাকার কথা। স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিলম্বিত করা সাংবিধানিক চেতনার পরিপন্থী। এর পেছনে মানুষ যে দূরভিসন্ধি দেখতে পাচ্ছে, তা নবনির্বাচিত বিএনপি সরকারের জনপ্রিয়তা হ্রাসের কারণ হবে। এই বাস্তবতায় দ্রুত সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোতে নির্বাচন আয়োজন করা জরুরি। এতে নাগরিক সেবা কিছুটা হলেও উন্নত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে জবাবদিহির সংস্কৃতি শক্তিশালী হবে।