Published : 12 Sep 2025, 07:43 AM
বর্তমান বিশ্বে বিজ্ঞান, অর্থনীতি, সমাজনীতি সর্বত্র কতরকম যে এফেক্টের ছড়াছড়ি তা বলে শেষ করা যাবে না। তবে এসময়কার সবচেয়ে বিখ্যাত এমন এফেক্টের দুটি হলো: গ্রিন হাউজ এফেক্ট ও ট্রাম্প এফেক্ট। আর এ দুটি এফেক্টই এখন বিশ্বব্যাপী মানুষের জীবনকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করছে। আরও উল্লেখযোগ্য দিক হলো এ দুটি প্রভাব বা এফেক্ট আন্তঃসম্পর্কিত, এমনকি বলা যায় একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। আরও সঠিকভাবে বললে, গ্রিন হাউজ এফেক্ট আসলে ট্রাম্প এফেক্টেরই একটা অংশ। এগুলোর প্রভাব কত বিস্তৃত ও গভীর তা খুঁটিয়ে না দেখলে বিশ্বাস করাই মুশকিল।
এ দুই প্রভাবই বিশ্বে বাড়াচ্ছে তাপমাত্রা, দুর্যোগ, অস্থিরতা, অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু ও ভবিষ্যতের অনিশ্চিয়তা। তবে একটি এফেক্ট ভৌগোলিক ও জলবায়ু ক্ষেত্রে, আরেকটি সামাজিক-রাজনৈতিক ক্ষেত্রে— দুইই পরিবেশের জন্য মারাত্মক হুমকি স্বরূপ। ডনাল্ড ট্রাম্প ও তার সাগরেদরা বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির সত্যে বিশ্বাস করেন না, তারা একে চীনের প্রচারিত মিথ্যাচার বলে দাবি করে থাকেন। জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধিসহ বৈশ্বিক উষ্ণতার জন্য দায়ী সকল কর্মকাণ্ডকেই তারা উৎসাহিত করছেন। আর এর জন্য সবচেয়ে বেশি দাম দিতে হবে বাংলাদেশের মত কয়েকটি দেশকে।
এই দুই প্রভাবই পৃথিবীজুড়ে বাড়িয়ে চলেছে তাপমাত্রা, দুর্যোগ, অস্থিরতা, অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু আর ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা। একটি এফেক্ট ভৌগোলিক ও জলবায়ুর খাতে, আরেকটি সামাজিক-রাজনৈতিক খাতে। তবে দুটোই পরিবেশের জন্য ভয়াবহ হুমকি। ডনাল্ড ট্রাম্প আর তার অনুগতদের দলবল বৈশ্বিক উষ্ণতার সত্যটাকে মানতেই নারাজ—তাদের মতে, এটা নাকি চীনের বানানো গল্প! মজার ব্যাপার হলো, নিজেরা আবার তেল-গ্যাস- কয়লার মতো জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর জন্য দিনরাত প্রচার চালান। বৈশ্বিক উষ্ণতার জন্য দায়ী যত কর্মকাণ্ড, তার সবকিছুকেই তারা যেন ব্যাপক উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছেন। আর এই বেপরোয়া উৎসাহ দানের আসল মূল্য গুনতে হবে বাংলাদেশসহ কয়েকটা দুর্বল দেশকে—যারা অপরাধে শরিক হয়নি, কিন্তু শাস্তি ভোগ করতে বাধ্য হবে।
অথচ বাংলাদেশে নদী ভাঙনের বা জলোচ্ছ্বাসের কবলে পড়ে বাস্তুচ্যুত হয়ে শহরে ঠাঁই নেওয়া ভাসমান লোকটি জানছেনই যে, তিনি ট্রাম্পের জলবায়ুকেন্দ্রিক বিশ্বাসঘাতকতার শিকার। আবার দেশে দেশে শারীরিকভাবে আক্রান্ত মানুষ, এমনকি মৃতদেহ ও বইপুস্তক পর্যন্ত, জানেই না যে এ ট্রাম্প এফেক্টেরই আরেক রূপ। ট্রাম্পের মুখ থেকে ছিটকে বের হওয়া কদর্য শব্দগুলো আজ বিশ্বজুড়ে এক ধরনের ভাষা-বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলেছে। সেই ঢেউ আছড়ে পড়ছে সর্বত্র। আর আশ্চর্য হলেও সত্যি—বিশ্বজুড়ে এফ-ওয়ার্ড আর চ-বর্গীয় শব্দের বন্যা হয়তো বৈশ্বিক উষ্ণতার চেয়ে কম বিপজ্জনক নয়।
ইরান-ইসরায়েল সংঘর্ষ থামাতে গত ২৪ জুন হোয়াইট হাউসে একেবারে সাংবাদিকদের সামনেই ট্রাম্প ছুড়ে মারলেন একটি এফ-বোমা—আর সঙ্গে সঙ্গে গোটা দুনিয়া হাঁ করে তাকিয়ে রইল। এইসব বোমা এখন নাকি আইফেল টাওয়ারের মাথার ওপর দিয়েই আমদানি হয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে—তার দুয়েকটা এখানে কারো টিনের চালে গিয়ে পড়লেও পড়তে পারে। কানে আঙুল দিয়ে শোনা কাউয়ার ডাকের মতন একেকটা ‘কাব্যিক’ বিস্ফোরণ এখানে ট্রাম্প এফেক্টের উজ্জ্বল উদাহরণ।
এফ-বোমা ছাড়াও আরও অনেক আধুনিক উদ্ভাবনের জন্য ট্রাম্প একক কৃতিত্বের যোগ্য দাবিদার। ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটাল হিলে কংগ্রেস সভায় ট্রাম্প বাহিনীর আক্রমণ মবের ইতিহাসে এক অনন্য নজির স্থাপন করেছে। ক্যাপিটলে নিয়োজিত ১৪০০ পুলিশ সদস্য সেদিন নীরব দর্শকের ভূমিকা পালনের উল্লেখযোগ্য গৌরব অর্জন করেছেন! সেই ঐতিহাসিক বিজয়ের পর মববাহিনীগুলোর আর বিশ্বের কোথাও পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। যারা এই মব তৈরি করেছিলেন তাদের নাম উচ্চারণ করা মাত্র গর্বে বুক ভরে যায়, বিশেষ করে আমাদের! প্রাউড বয়েজ, ওথ কিপারস— অর্থাৎ গর্বিত ছেলে, শপথ রক্ষাকারী ইত্যাদি, আহা কী সুন্দর— আর তাদের মিছিলের নাম ছিলো আরও সুন্দর: আমেরিকা বাঁচাও!
এফ-বোমা ছাড়াও আরও বহু আধুনিক উদ্ভাবনের জন্য ট্রাম্প নিঃসন্দেহে একক কৃতিত্বের দাবিদার। ২০২১ সালের ৬ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ক্যাপিটল হিলে কংগ্রেস অধিবেশনে তার বাহিনীর আক্রমণ মবের ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছে। ওইদিন ক্যাপিটলে নিয়োজিত ১৪০০ পুলিশ সদস্যও চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে অলিম্পিকের দর্শকসুলভ গৌরব অর্জন করেছিলেন। সেই ঐতিহাসিক ‘বিজয়ের’ পর থেকে বিশ্বজুড়ে মব বাহিনীগুলোকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। যারা এই মব তৈরি করেছিলেন তাদের নাম উচ্চারণ করলেই বুক ভরে ওঠে গর্বে! প্রাউড বয়েজ, ওথ কিপারস—মানে গর্বিত ছেলে আর শপথ রক্ষাকারী! কী চমৎকার নাম! আর তাদের মিছিলের শিরোনামও কম যায় না: ‘আমেরিকা বাঁচাও!’
ট্রাম্পের এই দিগন্তবিস্তারী প্রভাবের কথা বিদ্বেষপ্রসূতভাবে বলছি না। আমি বরং ট্রাম্পের এক একনিষ্ঠ বাংলাদেশি অনুরাগী। তার আচার-আচরণ ও কথাবার্তায় প্রায়ই তাকে আমার খুব কাছের এক দেশি ভাই বলেই ভ্রম হয়! আ্যমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এ বছর এপ্রিলে প্রকাশিত তাদের মানবাধিকারের বৈশ্বিক প্রতিবেদনে এরচেয়েও বেশি বলেছে। মুখবন্ধের শুরুটা পড়ি কেবল: “বিশ্ব এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে। অচেনা শক্তিরা মানবাধিকারের আদর্শকে ভূলুণ্ঠিত করছে ...। মানবাধিকারের প্রতি দায়বদ্ধতার বিরুদ্ধে, আন্তর্জাতিক আইনকানুনের বিরুদ্ধে ও জাতিসংঘের বিরুদ্ধে পরিচালিত বহুমুখী আক্রমণসমূহ হলো ২০২৫-এ প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ১০০ দিন শাসনপূর্তির উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর কয়েকটি।”
মুখবন্ধে বলা হয়েছে: “সংক্ষেপে, ২০২৪ আমাদের সবার বিমানবকিকীকরণের বছর।” এবং “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরও আগে শুরু হওয়া এই বিশ্বঝোঁকের একজন সুপার এক্সিলারেটর মাত্র।” সংস্থাটি ২৯ এপ্রিল তাদের অনলাইন বার্তায় (অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্নস অব গ্লোবাল হিউম্যান রাইটস অ্যাজ ‘ট্রাম্প এফেক্ট’ এক্সিলারেটস ডেস্ট্রাকটিভ ট্রেন্ডস) বলেছে, “দ্বিতীয় মেয়াদের প্রথম একশো দিনে ট্রাম্প বিশ্ব মানবাধিকারের প্রতি কেবল চরম ঘৃণাই দেখিয়েছেন। তার সরকার তড়িৎ গতিতে ও সুচিন্তিতভাবে মার্কিন ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোগসমূহকে আক্রমণের লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করেছে, যে প্রতিষ্ঠান ও উদ্যোগসমূহ নির্মিত হয়েছিল আমাদেরকে একটি নিরাপদ ও সুন্দর বিশ্ব উপহার দেবার জন্য। এসব প্রতিষ্ঠান ও নীতিমালা যে বহুমত, নিরাপদ আশ্রয়, জাতিগত ও লিঙ্গ বৈষম্যহীনতা, বৈশ্বিক স্বাস্থ্য ও জীবনরক্ষাকারী পরিবেশ সৃষ্টির আদর্শকে ধারণ করেছে সেগুলোর বিরুদ্ধে তার সর্বব্যাপী আক্রমণ বহুবিধ ক্ষতিসাধন করেছে। আর তা বিশ্বের অন্যান্য অধিকারবিরোধী ও আন্দোলনসমূহকে তার সঙ্গে যোগ দিতে প্ররোচিত করছে,” যোগ করেন মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড।
“কিন্তু পরিষ্কার বলছি: এই অসুস্থতা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডের চেয়েও গভীরে বহমান। বহু বছর ধরে বিশ্বব্যাপী রাষ্ট্রসমুহের অভ্যন্তরে কর্তৃত্ববাদী আচরণের বিস্তার হতে আমরা দেখেছি, যাকে লালন করেছেন ধ্বংসযজ্ঞের বাহক সব উচ্চাকাঙ্ক্ষী ও নির্বাচিত নেতারা। তারা যখন আমাদেরকে দুর্বিপাক ও নিষ্ঠুরতার নতুন যুগে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন, আমরা যারা স্বাধীনতা ও সমতায় বিশ্বাস করি আমাদেরকে আন্তর্জাতিক আইন ও বিশ্ব মানবাধিকারের ওপর এই ক্রমবর্ধমান আক্রমণ প্রতিহত করতে শক্তভাবে দাঁড়াতে হবে।”
অ্যামনেস্টির এই প্রতিবেদন প্রকাশের কয়েক মাস আগে টাইম সাময়িকীতে রে ডালিও যা লেখেন (হাউ এ সেকেন্ড ট্রাম্প অ্যাডমিনিস্ট্রেশন উইল চেঞ্জ দ্য ডোমেস্টিক অ্যান্ড ওয়ার্ল্ড অর্ডার, ২০ নভেম্বর ২০২৪) তার মর্ম বা সারসংক্ষেপ হলো: সর্বসম্মতভাবে গৃহীত আচরণ ও আইনকানুন থেকে বিশ্বব্যবস্থাটি পরিবর্তিত হবে এক ভগ্ন ব্যবস্থায় যেখানে আত্মকেন্দ্রিক ও জঙ্গলের আইন প্রতিষ্ঠা পাবে। নীতি ও নৈতিকতার ধারণাগুলো অপ্রাসঙ্গিক হয়ে উঠবে। শত্রু ও মিত্র নির্বাচিত হবে কেবল স্বার্থ উদ্ধারের বিবেচনায় কে কার পক্ষে সেই কৌশলের ভিত্তিতে। এ লেখাটিতে যেসব জাতীয় ও বৈশ্বিক পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে তার ইতিমধ্যে প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। যদিও এতে জাতীয় ও বৈশ্বিক পর্যায়ের নৈতিক বিপর্যয়ের ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে— এগুলোর ব্যক্তিক ও সামাজিক প্রতিফলন থাকাও স্বাভাবিক।
যুক্তরাষ্ট্রসহ দেশে দেশে যে ঘৃণা, অসহিষ্ণুতা, আক্রমণ, বিদ্বেষ, গোত্রবদ্ধতা, সংকীর্ণতা, অনুদারতা, শক্তির আস্ফালন, ধর্মীয় উন্মত্ততা, মতান্ধতা, ক্ষুদে জাতীয়তা ইত্যাদির স্ফূরণ দেখা যাচ্ছে তার পরিণতি বিশ্ব মানবতাকে এক চরম বিপর্যয়ের দিকে ঠেলে দিবে। এসবেরই বিস্ফোরণ হবে আপন আপন দেশের অভ্যন্তরে গৃহযুদ্ধের মত পরিস্থিতির উদ্ভবে এবং ভিন্ন ভিন্ন দেশের মধ্যে নতুন নতুন দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ, আত্মরক্ষার নামে হামলা ও ছোটবড় নানারকম গণহত্যার আয়োজনে।
এ ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির কবল থেকে বাঁচার উপায় সহিষ্ণুতা, উদারতা, সহমর্মিতা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, পরমতের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা, বিজ্ঞানমনস্কতা ও সর্বোপরি সমাজে ও রাষ্ট্রে ‘শত ফুল ফুটতে দাও’য়ের নীতি। আর যুদ্ধবাজদের ষড়যন্ত্র ছুঁড়ে ফেলে এক দেশের সঙ্গে আরেক দেশের জনগণের মাঝে ক্রমবর্ধমান সৌহার্দ্য ও মৈত্রী সৃষ্টি। ইতিহাসের এই সন্ধিক্ষণে ও বিমানবিকীকরণের এই দুর্যোগ মুহূর্তে ঘরে ও বাইরে সর্বত্র অশুভ ট্রাম্প এফেক্টের মোকাবেলা করেই কেবল বাঁচবে মানবতা, আগামী প্রজন্ম ও গণতান্ত্রিক পৃথিবী।