Published : 27 Mar 2026, 11:04 PM
ক্যারিকেচার শিল্পের একজন পথপ্রদর্শক ব্যক্তিত্ব হলেন মাসউদ শোজায়ে তাবাতাবায়ি। ইরানে তো বটেই, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও তিনি ব্যাপক পরিচিত। ১৯৬৩ সালে তেহরানে জন্মগ্রহণ করা এই গুণী শিল্পী তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ থেকে চিত্রকলায় স্নাতক এবং পরে গ্রাফিক ডিজাইনে প্রথম শ্রেণিতে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। কর্মজীবনে তিনি ‘কায়হান ক্যারিকেচার’, ‘মাশরেগিয়েহ’ এবং ‘ইরান কার্টুন’ পত্রিকার প্রধান সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি ইরান কার্টুন হাউসের পরিচালক হিসেবে এই শিল্পের উন্নয়ন ও প্রসারে বৈপ্লবিক ভূমিকা রেখেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভানিয়াভিত্তিক এশিয়া-প্যাসিফিক অ্যানিমেশন অ্যান্ড কমিকস অ্যাসোসিয়েশন (APACA)-এর সদস্য হিসেবে তিনি তুরস্ক, সার্বিয়া, কিউবা, চীন, সিরিয়া, গ্রিস ও ব্রাজিলসহ বিশ্বের বিভিন্ন মর্যাদাপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বিচারকের দায়িত্ব পালন করেছেন। তেহরান আন্তর্জাতিক ক্যারিকেচার বিয়েনিয়াল এবং লাতিন আমেরিকা কার্টুন প্রদর্শনীর মতো বড় আয়োজনের কিউরেটর ও আয়োজক হিসেবে তার সাংগঠনিক দক্ষতা সর্বজনস্বীকৃত। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অসংখ্য পুরস্কার অর্জনের পাশাপাশি তার পাঁচটি নিজস্ব বই প্রকাশিত হয়েছে এবং তিনি ২০টিরও বেশি বইয়ের অলংকরণ করেছেন। প্রখ্যাত এই শিল্পীর বিশেষ সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন সুইডেন প্রবাসী বাংলাদেশি কার্টুনিস্ট আহমেদ কবির কিশোর, যিনি কার্টুনিস্ট কিশোর নামে সমধিক পরিচিত।

আহমেদ কবির কিশোর: আপনি কেন একজন কার্টুনিস্ট হলেন?
মাসউদ শোজায়ে তাবাতাবায়ি: আমার কার্টুন ও ক্যারিকেচারের কাজ শুরু হয় সাদ্দামের সঙ্গে আট বছরব্যাপী যুদ্ধ শুরুর সময় থেকে। তখন বিশ্বের বড় বড় শক্তিগুলোও আমাদের বিরুদ্ধে সাদ্দামকে সমর্থন দিচ্ছিল। আমি মনে করেছিলাম, এই শিল্পের মাধ্যমে পর্দার আড়ালে যা ঘটছে, তা তুলে ধরা সম্ভব। ওই সময়ে আমি বিমানবন্দরের আশপাশের দেয়ালে বড় বড় ম্যুরাল আঁকতাম এবং ‘এত্তেলাআত হাফতেগি’ নামে একটি পত্রিকায় কাজ করতাম, যেখানে আমার কাজ নিয়ে ‘দিদগাহ’ (দৃষ্টিভঙ্গি) সাপ্তাহিক একটি পাতা ছিল।
কিশোর: আপনি কখন রাজনৈতিক কার্টুন আঁকা শুরু করেন?
তাবাতাবায়ি: আমি ১৯৮০ সালে একটি ম্যাগাজিনে কাজ শুরু করি, যার প্রচারসংখ্যা ছিল আড়াই লাখের মতো। এটি খুব জনপ্রিয় ছিল যে প্রায় সবাই এটি দেখত—মানুষ একে অন্যের কাছ থেকে নিয়ে হাত বদল করে পড়ত এবং শহরের বহু পাবলিক প্লেসে এটি পাওয়া যেত।

কিশোর: আপনি সাধারণত কী বিষয় নিয়ে কার্টুন আঁকেন?
তাবাতাবায়ি: আমার কাজ পুরোপুরি রাজনৈতিক এবং কখনো কখনো সামাজিক বিষয়ভিত্তিক। ইরানে আমি একজন রাজনৈতিক কার্টুনিস্ট হিসেবে পরিচিত। আমি মনে করি, এই শিল্প একটি সার্বজনীন ভাষা এবং এটি সারা বিশ্বেই খুব কার্যকর।
কিশোর: ইরানের জীবন কীভাবে আপনার কাজকে প্রভাবিত করে?
তাবাতাবায়ি: আমি আমার দেশকে খুব ভালোবাসি এবং মনে করি আমি বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ে এবং অসাধারণ স্থানে জন্মেছি। আমি অনেক ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছি—যেমন ইরানের ইসলামী বিপ্লব, তিনজন সর্বোচ্চ নেতা দেখেছি এবং আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের কষ্ট অনুভব করেছি। ইরানের মানুষ সত্যিই শান্তি ও বন্ধুত্বকে মূল্যায়ন করে, কিন্তু তারা স্বাধীন থাকতে চায়, যা অনেক সময় বিশ্ব শক্তি অনুমোদন পায় না। আমি এমন সাহসী মানুষের দেশে বসবাস করতে পেরে গর্বিত।

কিশোর: আপনি কি মনে করেন কার্টুন রাজনীতি বা সমাজকে প্রভাবিত করতে পারে? কেন?
তাবাতাবায়ি: হ্যাঁ, কার্টুন রাজনীতি বা সমাজকে প্রভাবিত করতে পারে, কারণ এগুলো জটিল ধারণাকে দ্রুত সরলীকরণ করে ও শক্তিশালীভাবে প্রকাশ করে। ভিজ্যুয়াল স্টোরিটেলিং মানুষকে মুহূর্তের মধ্যে কোনো সমস্যা বোঝাতে সাহায্য করে, যা প্রায়শই চিন্তা, আলোচনা বা বিতর্ককে উদ্দীপ্ত করে। কার্টুন সমস্যাগুলো তুলে ধরতে পারে, ধারণাগুলোকে প্রশ্ন করতে পারে, বা এমন বিষয়ের দিকে মনোযোগ আকর্ষণ করতে পারে যা অন্য অনেক মাধ্যমে উপেক্ষিত হয়। শিল্প ও ব্যঙ্গের মিশ্রণ এই শিল্প জনগণের সচেতনতা ও সামাজিক সংলাপ গঠনের জন্য সহজ ও মনে থাকার মতো একটি হাতিয়ার করে তোলে।
কিশোর: রুহুল্লাহ খোমেনি আপনার জন্য ব্যক্তিগতভাবে কী অর্থ রাখেন?
তাবাতাবায়ি: ইমাম রুহুল্লাহ খোমেনি একজন মহান ও বিনয়ী মানুষ ছিলেন, যিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের ওপর নির্ভরশীল, দমনশীল ও স্বৈরশাসক রাজাদের শাসন ব্যবস্থার সমাপ্তি ঘটিয়েছিলেন। তিনি মানুষের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত ছিলেন এবং আমরা সকলেই তাকে ভালোবাসতাম। তিনি এমন একটি বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন যা বিদেশী আগ্রাসন ও সাম্রাজ্যবাদ ও জায়োনিজমের প্রভাবের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল।
কিশোর: আপনি কেন খোমেনির ধারণাগুলো সমর্থন করেন?
তাবাতাবায়ি: আমি তার ধারণাগুলোর প্রতি আকৃষ্ট হয়েছি কারণ তার কাছে গভীর আধ্যাত্মিকতা, সততা এবং খাঁটি ভক্তির একটি চিত্র দেখেছি। আমি মনে করি, মানুষের মর্যাদা ও নৈতিক মূল্যের প্রতি তার গভীর মনোযোগ ছিল এবং এসব কিছু তিনি বিশেষ গুরুত্ব দিতেন। তিনি বিনয়ী মনোভাব ও বিশ্বাস নিয়ে জীবনকে দেখতেন। বিশ্বাস করতেন যে সমস্ত সাফল্য শেষ পর্যন্ত একটি উচ্চতর উদ্দেশ্য থেকে আসে। তার এই আন্তরিকতা ও মানুষের সঙ্গে সংযোগের অনুভূতি তাকে মানুষের হৃদয়ে শক্তভাবে পৌঁছতে সাহায্য করেছিল। তিনি মানুষকে নিজেকে ছাড়িয়ে ভাবতে, অর্থবহভাবে কাজ করতে, এবং নীতি ও মূল্যের প্রতি সত্য থাকতে উৎসাহিত করতেন।
কিশোর: কেউ বলেন খোমেনি একজন বিপ্লবী নেতা ছিলেন, আবার কেউ বলেন তিনি স্বৈরশাসক ছিলেন। আপনার মত কী?
তাবাতাবায়ি: আমার মতে, তিনি একজন বিপ্লবী ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যিনি তার কাজকে অবতারণা ও কোরানের বার্তার ভিত্তিতে পরিচালনা করেছিলেন। এজন্য তার কথা ও কাজগুলো আল্লাহর প্রতি ভক্তি ও ভালোবাসার প্রেক্ষাপটে বোঝা যায়।
কিশোর: ইরানি বিপ্লবের ধারণাগুলো কি আজও আপনার কার্টুনকে প্রভাবিত করে?
তাবাতাবায়ি: হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। আমরা কোরানে বিশ্বাস করি এবং আমাদের ইমামও এটি গুরুত্ব দিয়ে উল্লেখ করেছিলেন। আল্লাহ স্পষ্টভাবে ভালো ও মন্দের পার্থক্য ব্যাখ্যা করেছেন এবং আমার দৃষ্টিতে, কোরানের শিক্ষাগুলো এবং ইসলামের মহৎ ধর্ম অনুসরণ করা খুবই নির্দেশক ও প্রজ্জ্বলনমূলক।
কিশোর: একজন কার্টুনিস্ট হিসেবে, আপনি কি ইরানে কোনো রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে কার্টুন আঁকতে সম্পূর্ণ স্বাধীন বোধ করেন?
তাবাতাবায়ি: হ্যাঁ, আমি সত্যিই কখনো কোনো সমস্যা অনুভব করিনি। যখন কোনো কাজের ভিত্তি ভালো উদ্দেশ্য ও মানবিক মূল্যের ওপর স্থাপিত থাকে, তখন আমি নিশ্চিত যে আল্লাহ সহায়তা দেন। আমি দায়বদ্ধতার লালরেখাগুলো জানি: আমি কখনো নবী বা অন্য ধর্মের ধর্মীয় প্রতীকগুলোর প্রতি অবমাননা দেখাই না। আমি অশ্লীল চিত্র যেমন নগ্নতা বা যৌন বিষয়বস্তু এড়াই এবং গভীর রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার দিকে মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করি। আমাদের কাজ ঠিক সেই সার্জনের মতো, যিনি সংক্রমিত ক্ষত দূর করার চেষ্টা করেন যাতে রোগী আবার সুস্থ হতে পারে।

কিশোর: আপনি কি কখনো আপনার কার্টুনের কারণে চাপ বা সেন্সরশিপের মুখোমুখি হয়েছেন?
তাবাতাবায়ি: সত্যি বলতে, একেবারেই নয়। আমি আগের প্রশ্নের উত্তরেই এটি উল্লেখ করেছি।
কিশোর: আপনি কিভাবে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেন?
তাবাতাবায়ি: যুক্তরাষ্ট্রে আমার অনেক ভালো বন্ধু আছে, এবং আমি প্রকৃতপক্ষে ‘ওয়ার্ল্ড কমিকস কোয়ার্টারলি’ পত্রিকার প্রধান সম্পাদক হিসেবে কাজ করি, যা পেনসিলভানিয়ার অধ্যাপক জন লেন্ট পরিচালনা করেন। আমি বহু দশক ধরে এই অসাধারণ ব্যক্তির সঙ্গে কাজ করছি এবং যুক্তরাষ্ট্রে চমৎকার বন্ধুত্ব গড়ে তুলেছি। তবে, ইসরায়েলের সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই আমার, কারণ তারা ফিলিস্তিনের ভূমি দখল করেছে এবং আমি এই শাসন ব্যবস্থা স্বীকৃতি দিই না। তারা সর্বদা ফিলিস্তিনের মানুষের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত থাকে, যারা এই জমির আসল অধিবাসী। গাজায় ইসরেলের গণহত্যার ঘটনা কখনো ভুলে যাওয়া যায় না।
কিশোর: আপনি কেন মনে করেন আজকাল বিশ্বের কিছু মুসলিম ইরানকে সমর্থন করে?
তাবাতাবায়ি: শুধু ইসলামিক দেশ নয়, অনেক অমুসলিম দেশও আমাদের প্রতি সহানুভূতিশীল ও সমর্থক—বিশেষ করে লাতিন আমেরিকার দেশগুলো যেমন ব্রাজিল, কিউবা, পেরু ও কলম্বিয়া এবং ইউরোপীয় দেশগুলো যেমন গ্রিস, ফ্রান্স ও পোল্যান্ড। আসলে, আমরা পাঁচটি মহাদেশে বন্ধু তৈরি করেছি। এটি আমাদের চার দশকেরও বেশি সময় ধরে কার্টুন ও ক্যারিকেচার খাতে তৈরি করা বিস্তৃত সংযোগের ফল। আমরা বড় আন্তর্জাতিক ইভেন্ট আয়োজন করি এবং আমি নিজেও ব্যাপকভাবে ভ্রমণ করেছি—চারবার ব্রাজিল, পাঁচবার চীন এবং গ্রিস, সার্বিয়াসহ বিশ্বের অনেক অন্যান্য দেশে ভ্রমণ করেছি। আমাদের সম্পর্ক মূলত পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সংহতির ওপর ভিত্তি করে, আলহামদুলিল্লাহ।
কিশোর: আপনি চাইবেন বিশ্বের মানুষ আপনার কার্টুনের মাধ্যমে কী বার্তা পৌছাক?
তাবাতাবায়ি: আমার কার্টুনের মাধ্যমে, আমি আশা করি বিশ্বের মানুষ শান্তি, বন্ধুত্ব এবং মানব মর্যাদার গুরুত্ব বুঝবে। কার্টুন একটি সার্বজনীন ভিজ্যুয়াল ভাষা, যা সীমান্ত, সংস্কৃতি ও ভাষার বাইরে মানুষকে সংযুক্ত করতে পারে। আমার উদ্দেশ্য হলো জাতি ও সমাজের মধ্যে সংলাপ, সহানুভূতি এবং পারস্পরিক বোঝাপড়া উৎসাহিত করা। আমি বিশ্বাস করি, শিল্প আমাদের মনে করিয়ে দিতে পারে যে, আমাদের ভিন্নতা সত্ত্বেও, আমরা সকলেই ন্যায়, সম্মান এবং মানবতার জন্য শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যতের একই আশা ভাগাভাগি করি।

কিশোর: যদি আপনি একটি কার্টুন আঁকতেন যা ইরানকে বিশ্বের কাছে বোঝাতে পারে, তা কী দেখাত?
তাবাতাবায়ি: হ্যাঁ। আমার একটি ধারনায়, আমি একটি কম্পাস কল্পনা করি: কম্পাসের একটি পা ইরানে স্থাপিত, আর অন্যটি সারা পৃথিবী ঘুরে একটি হৃদয় আকৃতি আঁকছে। এটি দেখায় যে, যদিও আমি আমার নিজের দেশেই দাঁড়িয়ে আছি, আমার হৃদয় এবং বার্তা সারা বিশ্বের মানুষদের কাছে পৌঁছায়। আমার কার্টুনের মাধ্যমে আমি শান্তি, বন্ধুত্ব, এবং সেই মানবিক বন্ধনের বার্তা প্রকাশ করতে চাই, যা প্রতিটি সীমান্ত পার হয়ে মানুষদের সংযুক্ত করে।