Published : 21 Jun 2025, 08:20 PM
আমি তখন ফটোসাংবাদিক হওয়ার নেশায় ঢাকার বিভিন্ন রাস্তায় এলোমেলো ঘুরে বেড়াই।সেটা ১৯৯৯ সালের কথা। কিন্তু কোথায় ফটোগ্রাফি শেখানো হয় জানি না।
একদিন রিকশা করে সায়েন্স ল্যাবরেটরির পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ একটি সাইন বোর্ডের দিকে চোখ আটকে যায়। সাইন বোর্ডে লেখা ‘প্রমোটার্স: স্কুল অফ ফটোগ্রাফি, কোর্স ডিরেক্টর: চঞ্চল মাহমুদ।’
রিকশা থেকে নেমে ভবনটির সামনে গিয়ে দাঁড়াই। সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠতেই বুলেট নামে একজনের সঙ্গে দেখা। জানলাম, তিনি চঞ্চল মাহমুদের সহকারী। তাকে বললাম, ‘চঞ্চল মাহমুদ স্যার কি আছেন? আমি তার কাছে ফটোগ্রাফি শিখতে চাই।’
বুলেট ভাই আমাকে রিসিপশনে বসিয়ে ভেতরে গেলেন। মিনিট দুয়েকের মধ্যেই তিনি ফিরে এসে আমাকে নিয়ে গেলেন ভেতরে।
বিশাল বড় একটা স্টুডিও। এর মধ্যেই ক্লাস রুম। ভেতরের দেয়াল, চেয়ার-টেবিল, আসবাবপত্র সবই কালো রঙের। ভেতটায় ঢুকে ডার্করুমের একটা ফিল পেলাম। আমাকে দেখেই চঞ্চল মাহমুদ বললেন, ‘কী ব্যাটা, ফটোগ্রাফি শিখতে চাও? আজই ভর্তি হয়ে যাও।’
প্রথম সাক্ষাতেই এমন আন্তরিকতা দেখালেন, যেন আমাকে অনেক দিন ধরে চেনেন। তখন তার কাছে এক মাসের বেসিক ফটোগ্রাফি কোর্স করতে দেড় হাজার টাকা লাগত। আমি ইতস্তত হয়ে বললাম, ‘আমার কাছে এত টাকা নাই। পাঁচশ আছে।’

চঞ্চল মাহমুদ আমাকে ভর্তির ব্যবস্থা করে দিলেন। সপ্তাহে দুই দিন ক্লাস। একদিন ক্লাস হতো শুক্রবারে। বাকি ক্লাসটা কবে হতো মনে নেই।
স্কুল-কলেজে আমি বরাবরই ভালো ছাত্র ছিলাম। কিন্তু ক্লাসের পড়ায় মনোযোগ ছিল না। তবে চঞ্চল মাহমুদের ক্লাস আমার মনোযোগ ধরে রাখতে পেরেছিল। তার পড়ানোর কৌশলটা এতই দুর্দান্ত ছিল যে, সকালে দরজা খোলার আগেই আমি সিঁড়িতে গিয়ে বসে থাকতাম।
এক মাস প্রশিক্ষণের পর লিখিত পরীক্ষা হলো। পরীক্ষায় দ্বিতীয় হয়েছিলাম। পরীক্ষায় তো পাস করলাম। কিন্তু আমার নিজের কোনো ক্যামেরা নেই। আব্বাকে যে ক্যামেরা কিনে দিতে বলব, সেই সাহস পাচ্ছি না। আম্মাকে বললাম। আম্মা আব্বাকে রাজি করাতে পারছিলেন না। আব্বা তখন আমাদের দোতলা বাড়ির ফাউন্ডেশনের কাজ ধরছিলেন। ক্যামেরা কিনে দেওয়ার মতো বাড়তি টাকা তখন তার হাতে ছিল না।
আম্মা আর আমি মিলে আব্বাকে বললাম, ‘চলো, তোমাকে চঞ্চল মাহমুদের কাছে নিয়ে যাই।’ আব্বা রাজি হলেন।
একদিন আব্বাকে নিয়ে চঞ্চল মাহমুদের স্টুডিওতে এলাম। চঞ্চল ভাই আব্বাকে বললেন, ‘আপনার ছেলে তো অনেক শার্প। ওকে একটা ক্যামেরা কিনে দেন। ও ফটোগ্রাফিতে অনেক ভালো করবে।’
আব্বা তার কথায় ভরসা রাখলেন; রাজি হলেন ক্যামেরা কিনে দিতে। বাড়িতে গিয়ে আব্বা তার প্রভিডেন্ট ফান্ড থেকে সত্তর হাজার টাকা তুললেন। সেই টাকায় আমার নাইকন এফএম-টু ক্যামেরা ও লেন্স কেনা হলো। এভাবেই শুরু হয় আলোকচিত্রশিল্পে আমার পেশাদার যাত্রা। আমার মতো অনেক তরুণের ফটোগ্রাফির শুরুটা হয়েছিল চঞ্চল মাহমুদের হাত ধরে।
বাংলাদেশের অসংখ্য আলোকচিত্রীর কাছে তিনি ছিলেন বটবৃক্ষের মতো। ২০ জুন, শুক্রবার রাত সাড়ে ৯টায় তিনি চলে গেলেন অনন্তলোকে; যেখান থেকে মানুষ আর কখনও ফিরে আসে না। তার চলে যাওয়ার মধ্য দিয়ে আমাদের আলোকচিত্র অঙ্গনে যে শূন্যতা তৈরি হলো, তা আক্ষরিক অর্থেই কখনো পূরণ হবার নয়।
চঞ্চল মাহমুদ একজন বরেণ্য আলোকচিত্রী এ কথা সবার জানা। তাকে বাংলাদেশের মডেল ও ফ্যাশন ফটোগ্রাফির পুরোধা বলা হয়ে থাকে। তার আগে যে এ দেশে এই শিল্প নিয়ে একেবারেই কাজ হয়নি, তা নয়। তবে আমাদের মডেল, ফ্যাশন ও গ্ল্যামার ফটোগ্রাফিকে সন্তানের মতো আগলে ধরে একটা পরিণত পর্যায়ে নিয়ে গেছেন চঞ্চল মাহমুদ। আর এ কারণেই তিনি অনন্য।
এই সময়ে এ দেশের এমন কোনো জনপ্রিয় মডেল, অভিনেতা-অভিনেত্রী নেই, যারা চঞ্চল মাহমুদের লেন্সের সামনে দাঁড় হননি। অনেক প্রতিষ্ঠিত শিল্পীর পেশাগত জীবন শুরু তার তোলা ছবির মধ্য দিয়ে। এর পাশাপাশি তিনি সারা জীবন ফটোগ্রাফির শিক্ষাটা সর্বত্র বিলিয়ে দিতে চেয়েছেন।

এই গুণী আলোকচিত্রীর জন্ম ১৯৫৯ সালের ১২ মার্চ পাকিস্তানের করাচিতে। তার বাবা ছিলেন তৎকালীন সরকারের যুগ্ম সচিব। বাবা চাননি ছেলে ফটোগ্রাফার হোক। ফটোগ্রাফি করার কারণে কীভাবে পরিবার থেকে থেকে বিছিন্ন হলেন, পিতার আদর থেকে বঞ্চিত হলেন–সে কথা তিনি আমাকে মাঝেমধ্যেই বলতেন। বলার সময় তার চোখ সজল হয়ে উঠত। ফটোগ্রাফি নিয়ে জীবন উৎসর্গী এই মানুষটির প্রতি রাষ্ট্রের যে অবহেলা, তা নিয়েও কম অভিমান ছিল না তার। জীবনের শেষ দিনগুলোতে তিনি প্রায় খুব দুঃখ করে বলতেন, ‘কোনো সরকারই ফটোগ্রাফির জন্য কোনো কিছু করল না।’
ছাত্র হিসেবে আমি চঞ্চল মাহমুদের জন্য খুব বেশি কিছু করতে পারিনি। এই অক্ষমতা আমাকে প্রায়ই ব্যথা দেয়। তবে এ কথা বলতে ভালো লাগছে যে, বেঁচে থাকতেই আমি তাকে নিয়ে একটি বই সম্পাদনা করতে পেরেছিলাম।

২০১২ সালের ১২ মার্চ তার ৫৩তম জন্মদিনে বইটি প্রকাশিত হয়েছিল। বইটির নাম ‘ক্যামেরার জাদুকর: চঞ্চল মাহমুদ’। সোনারং প্রকাশনীর কাজী হাসানের প্রাণান্ত প্রচেষ্টায় বের হয়েছিল বইটি। বইটির প্রকাশনা উৎসব হয়েছিল ধানমন্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে। বইটি এখন বাজারে পাওয়া যায় না। বহু আগে এর মুদ্রণ শেষ হয়ে গেছে। এখন একটিমাত্র কপি আছে আমার কাছে। এই বইয়ে চঞ্চল মাহমুদ তার নিজের কথা লিখে গেছেন। কেমন করে আলোকচিত্রী হলেন তার বয়ান আছে। তাকে বিস্তারিত জানতে চাইলে এই বইয়ের বিকল্প নেই–এই ভেবে আজ কিছুটা স্বস্তি হচ্ছে।
চঞ্চল মাহমুদ দীর্ঘ সময় ধরে অসুস্থ্ ছিলেন। তার স্ত্রী রায়না মাহমুদও অনেক বছর ধরে দুরারোগ্য ক্যান্সারে আক্রান্ত। হাসপাতালের খরচ বহন করতে করতে তারা সর্বস্বান্ত হয়ে গিয়েছিলেন। রায়না ভাবী, প্রায় আমাকে ফোন করে কাঁদতেন। বলতেন, ‘বিপদের দিনে কাছের মানুষদেরও কাছে পাই না।’ তার কথা শুনে মনটা ভারী হয়ে উঠত।
২০২৩ সালে পঞ্চম বারের মতো হার্ট অ্যাটাকে আক্রান্ত হলেন চঞ্চল মাহমুদ। ল্যাব এইড হাসপাতালে তাকে ভর্তি করা হলো। রায়না ভাবী কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানালেন, ‘তাকে লাইফ সাপোর্টে নিয়ে যাওয়া হবে। তুমি আসো।’
আইসিইউতে গিয়ে দেখি, প্রিয় শিক্ষকের নাকে-মুখে নল লাগানো। চোখ বন্ধ। শ্বাস-প্রশ্বাস চলছে। তার বাম হাতটা স্পর্শ করলাম। একেবারে শীতল হাত। তার হাতের স্পর্শে চোখটা ভিজে উঠল। পাশে দাঁড়ানো ডাক্তার জানতে চাইলেন, আমি তার কি হই? বললাম, ‘ছাত্র’। ডাক্তার বললেন, ‘লাইফ সাপোর্টে নেওয়ার আগে পরিবারের কারো সিগনেচার লাগবে।’ রায়না ভাবী বললেন, ‘ও ছাত্র না। ও আমাদের পরিবারের একজন।’ ডাক্তার বললেন, ‘রোগীর ফিরে আসার সম্ভাবনা নাই। তবু চেষ্টা করা যেতে পারে।’
সেই যাত্রায় লাইফ সাপোর্ট থেকে ফিরে এসেছিলেন চঞ্চল মাহমুদ। ডাক্তার বলেছিলেন, কথা কম বলতে। কিন্তু চঞ্চল মাহমুদ ছিলেন আলাপী মানুষ। প্রিয়জনদের সঙ্গে কথা না বলে থাকতে পারতেন না। চঞ্চল মাহমুদের সবচেয়ে ভালো দিকটা হলো, তিনি কাউকে নিয়ে বদনাম করতেন না। মানুষের প্রশংসা করতেন। নতুনদের উৎসাহ দিতেন।
একদিন চঞ্চল মাহমুদকে বললাম, আপনার আশা তো ছেড়েই দিয়েছিলাম। আপনার ফেরাটা মিরাক্যাল। আমি আপনার একটা সাক্ষাৎকার রেকর্ড করে রাখতে চাই।
এক বিকেলে তার বাসায় যেতেই আমাকে পেয়ে কী যে কান্না! জড়িয়ে ধরে শিশুর মতো কাঁদছিলেন তিনি। জীবনের কত না বলা কথা যে বললেন! মাঝে মাঝে আমার চোখও ঝাপসা হয়ে উঠছিল।
বললেন, ‘তোমাকে বলে যাই, মৃত্যুর পর রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আমাকে সম্মান জানানোর দরকার নাই। আমার মরদেহ যেন শহীদ মিনারে না নেওয়া হয়।’ বাষ্পরুদ্ধ কণ্ঠে কথাগুলো যখন বলছিলেন, রায়না ভাবী আমার পাশেই ছিলেন।
মৃত্যুর আগের সময়গুলোতে একটু সাহায্যের আশায় কত মানুষের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছেন চঞ্চল মাহমুদ–তার নীরব সাক্ষী আমি আর আলোকচিত্রী কবির হোসেন। বার বার ফোন করেও অনেকের সাক্ষাৎ পাননি। তাই অনেক অভিমান আর ব্যথা নিয়ে চলে গেলেন আমাদের সময়ের আলোকচিত্রের তারকা চঞ্চল মাহমুদ। জীবনের একেবারে অন্তিম সময়ে নিজে চলতে পারতেন না। তাকে খাইয়ে দিতেন রায়না ভাবী।
গতকাল আমি বেশ অসুস্থ ছিলাম। জ্বর আর গা ব্যথায় বিছানা থেকে উঠতে পারছিলাম না। বিকেলে রায়না ভাবীর ফোন। বললেন, ‘তোমার স্যারের অবস্থা খারাপ। তোমাকে ও কবীরকে ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না। কবীর আসতেছে। তুমি আসো।’
কী করে যেন গায়ে শক্তি এল। ঘণ্টা দেড়েকের মধ্যে গিয়ে পৌঁছলাম ল্যাব এইড হাসপাতালে। শুনলাম, ডায়ালাইসিস করা যাচ্ছে না। এরমধ্যে আরেক বার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে।
এ অবস্থায়ও চঞ্চল মাহমুদের নিকটাত্মীয়, কয়েকজন ছাত্র আর রায়না ভাবী মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম, যতক্ষণ নিঃশ্বাস আছে ততক্ষণ নাক থেকে নল খোলা হবে না। রাত তখন ৯টা ২০ মিনিট। তিন তলার সিসিইউ থেকে খবর এল। আমরা সিসিইউর ভেতরে ঢুকেই বুঝতে পারলাম, চঞ্চল মাহমুদ আর নেই। আমাদের রেখে তিনি একা চলে গেছেন বকুল বিছানো পথে...।