১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

সমষ্টিগত শাস্তির দাবি: শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ভয়াবহতা

একসঙ্গে ২৩১ জন শিক্ষককে অভিযুক্ত করার নজিরবিহীন ঘটনা কি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবছরের ঐতিহ্যের সঙ্গে মানানসই, নাকি এটি মুক্তচিন্তা ও পরমতসহিষ্ণুতার কফিনে শেষ পেরেক ঠোকা?

সমষ্টিগত শাস্তির দাবি: শিক্ষাঙ্গনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ভয়াবহতা
মুক্তচিন্তা ও মুক্তবুদ্ধির চর্চার ঐতিহাসিক প্রাণকেন্দ্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়; কিন্তু রাজনৈতিক সমীকরণের রদবদলে বারবার কি ক্ষুণ্ন হচ্ছে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন?

ফজিলাতুন নেসা শাপলা ফজিলাতুন নেসা শাপলা

Published : 05 Aug 2026, 04:00 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:47 PM

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক সচেতনতা, অধিকার আদায় এবং মেধা চর্চার ঐতিহাসিক প্রাণকেন্দ্র। ১৯৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ কিংবা পরবর্তীতে ৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন এবং ২৪-এর জুলাই অভ্যুত্থান—প্রতিটি অর্জনে এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অবদান ও আত্মত্যাগ অবিস্মরণীয়। জাতির যে কোনো ক্রান্তিলগ্নে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মত প্রকাশে সোচ্চার থাকেন।

কিন্তু ২৪-এর আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ২৩১ জন (প্রায় ১১.৫৫ শতাংশ) শিক্ষককে ‘জুলাই আন্দোলন বিরোধী’ আখ্যা দিয়ে শাস্তির দাবি তোলা এবং নীল দলের ওই শিক্ষকদের ঢালাওভাবে নিষিদ্ধ করার আহ্বান শিক্ষাঙ্গনের ভবিষ্যৎকে গুরুতর প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষের ইতিহাসে প্রশাসনিক রদবদল ও রাজনৈতিক অস্থিরতায় নির্দিষ্ট কিছু শিক্ষকের ওপর নিপীড়ন বা বহিষ্কারের ঘটনা ঘটলেও, একসঙ্গে এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষককে ‘ফ্যাসিস্ট’ তকমা দিয়ে তালিকাভুক্ত করার ঘটনা নজিরবিহীন। অ্যাকাডেমিক স্বাধীনতা, বাকস্বাধীনতা এবং আইনি নীতির নিরিখে এই অভূতপূর্ব ঘটনাটি গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে।

গণতান্ত্রিক সমাজের প্রধান শর্ত হলো পরমতের প্রতি শ্রদ্ধা। একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শত শত শিক্ষকের চিন্তা বা রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি এক হবে না—এটাই স্বাভাবিক। আন্দোলনের বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া, রাজনৈতিকভাবে ভিন্নমত পোষণ করা বিপজ্জনক তো নয়ই, স্বয়ংক্রিয়ভাবে কোনো অপরাধ বলেও গণ্য হতে পারে না।

আমাদের সংবিধান প্রতিটি নাগরিককে চিন্তা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দিয়েছে। কোনো ব্যক্তির দৃষ্টিভঙ্গি ক্ষমতাসীনদের বিপরীত হলেই তাকে অপরাধী গণ্য করা যায় না। সংখ্যাগরিষ্ঠের বিপরীতে গিয়েও ভিন্নমত প্রকাশের পূর্ণ স্বাধীনতা রয়েছে একজন নাগরিকের।

কোনো শিক্ষক যদি সরাসরি সহিংসতায় উসকানি দিয়ে থাকেন, প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে শিক্ষার্থীদের নিপীড়ন করেন, তবে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে আইনি প্রক্রিয়ায় তার বিচার হবে—এটাই কাম্য। কিন্তু ব্যক্তিবিশেষের অপরাধের দায় ঢালাওভাবে ২৩১ জন শিক্ষকের ওপর চাপানো এবং শিক্ষকদের একটি পুরো দলকে নিষিদ্ধ করা আইনগতভাবে সমষ্টিগত শাস্তির শামিল, যা সম্পূর্ণ বেআইনি।

শিক্ষকদের এভাবে প্রাতিষ্ঠানিক ও সামাজিক হেনস্তার মুখোমুখি করলে তার নেতিবাচক প্রভাব কেবল ওই ব্যক্তিদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; তা পুরো সমাজমানসে মত প্রকাশে ভীতি সঞ্চার করে। ফলে বাকস্বাধীনতা ভয়ঙ্করভাবে প্রশ্নের সম্মুখীন হয়।

প্রভাবশালীদের মতের বাইরে কথা বললেই যদি কোনো শিক্ষককে পদ ও সম্মান হারাতে হয়, তাহলে এ দেশে গণতন্ত্রের চর্চা যে কেবলই এক অলীক স্বপ্ন, তা বলা বাহুল্য।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে অতীতেও বিরোধী মতকে দমনের অপচেষ্টা হয়েছে। কিন্তু অতীতের কোনো অন্যায়কে বর্তমানের অন্যায়ের অজুহাত হিসেবে দাঁড় করানো কোনো গণতান্ত্রিক ও সভ্য সমাজের কাজ নয়। অতীতে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও দমন-পীড়নের সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটানোই যদি জুলাই আন্দোলনের মূল লক্ষ্য হয়ে থাকে, তাহলে সেই একই আচরণের পুনরাবৃত্তি ঘটালে আর কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আশা করা যায় কি? বরং এই সব ঘটনা প্রমাণ করে যে, কোনো পরিবর্তন তো আসেইনি, শুধু নিপীড়কের চেহারার পরিবর্তন ঘটেছে।

বিশ্ববিদ্যালয় কোনো সামরিক ব্যারাক নয়, যেখানে কেউ নিজের মতাদর্শ প্রকাশ করবে না। এটি মুক্তবুদ্ধি, যুক্তি ও পরমতের সহাবস্থানের ক্ষেত্র। একটি বৈষম্যহীন ও গণতান্ত্রিক সমাজ গঠনের প্রধান শর্তই হলো বিচারহীনতা ও প্রতিহিংসার সংস্কৃতি চিরতরে বন্ধ করা।

১৯৭৩ সালের বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণের জন্য নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি এবং ক্ষেত্রবিশেষে ট্রাইব্যুনাল গঠনের মাধ্যমে পূর্ণ তদন্ত পরিচালনা করা বাধ্যতামূলক। প্রশ্ন হলো—উদ্দেশ্য যদি হয় রাজনৈতিক প্রতিহিংসা চরিতার্থ করা, তবে সেখানে কী করে সুষ্ঠু তদন্ত আশা করা যায়?

অন্যদিকে অভিযুক্ত শিক্ষককে আত্মপক্ষ সমর্থনের ও তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের ব্যাখ্যা দেওয়ার পূর্ণ সুযোগ দেওয়া হবে কি? অথচ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত ঢালাওভাবে কাউকেই অপরাধী সাব্যস্ত করা ও শাস্তি দেওয়া মোটেও আইনসম্মত নয়।

কেবল ভিন্ন মত পোষণের কারণে ঢালাও রাজনৈতিক অভিযোগ তুলে কাউকে শাস্তি দেওয়া বা একাডেমিক কার্যক্রম থেকে দূরে রাখা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বায়ত্তশাসন ও বিধির পরিপন্থি। তা জানা সত্ত্বেও কিছু শিক্ষকের অভিযোগের ভিত্তিতে এই ২৩১ জন শিক্ষককে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে।

উপযুক্ত প্রমাণ ছাড়া কোনো ব্যক্তির চরিত্রহনন ও মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা বাংলাদেশের দণ্ডবিধির ৪৯৯ ও ৫০০ ধারা অনুযায়ী মানহানি হিসেবে গণ্য হয়, যা ফৌজদারি অপরাধ।

এমনকি তথ্য-প্রমাণ ছাড়া কারও বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ উপস্থাপন করা খোদ অভিযোগকারীর বিরুদ্ধেও মিথ্যা অভিযোগ আনার দায়ে প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রাখে।

মোদ্দা কথা, প্রমাণ ছাড়া কেবল গণ-অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো শিক্ষকের অধিকার ক্ষুণ্ণ করা এবং সামাজিকভবে হেয় প্রতিপন্ন করা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও দেশের প্রচলিত বিচার ব্যবস্থার দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অবৈধ।

ঢালাওভাবে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলা প্রমাণ করে যে, আইনের বাঘের গর্জন কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ, বাস্তবে এর কোনো ভিত্তি নেই।

মতপ্রকাশের কারণে শত শত শিক্ষককে ঢালাওভাবে অভিযুক্ত করা ও হেনস্তা করা দ্রুত বন্ধ করা জরুরি। কারণ যখন আইন নিজেই অন্যায় হয়ে ওঠে, তখন তা প্রতিরোধ করাই সর্বজনীন দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়।

ফজিলাতুন নেসা শাপলা কাউন্সেলিং সাইকোলজিস্ট, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। ই-মেইল: nessa7421@gmail.com