Published : 25 May 2026, 03:11 PM
বর্তমান পৃথিবী এক নতুন বৈশ্বিক রাজনৈতিক মেরুকরণের মুখে দাঁড়িয়ে। সম্প্রতি ট্রাম্প ও পুতিনের চীন সফরের মধ্যে তা ভালোভাবে প্রতিফলিত হয়েছে। ট্রাম্প-শি ও শি-পুতিন সভা দুটিতে শি জিনপিং কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। চীন ও তার প্রেসিডেন্ট শিকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে যেন আগামী পৃথিবীর রাজনৈতিক গতিপথ। শি কেবল কেন্দ্রবিন্দুতেই অবস্থান করছেন না, তাদের দুজনের চেয়ে অধিক উচ্চতায়ও আছেন। বলা যায়, ট্রাম্প-শি-পুতিন (টিএক্সপি) ক্ষমতার ত্রিভুজে ভূমির দুই প্রান্তের দুই বিন্দু ট্রাম্প ও পুতিন এবং শীর্ষ বিন্দু শি। ট্রাম্প ও পুতিন দুজনই যেন শির সঙ্গে ছবি তুলে বিশ্বে নিজেদের ইমেজ বা অবস্থান একটু বাড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন।
দ্য কনভারসেশনে ২১ মে প্রকাশিত ‘চায়না ইজ নাউ ইন দ্য ড্রাইভিং সিট’ শীর্ষক লেখায় বলা হয়েছে: “অনেক দশক ধরে ‘বৃহৎ ত্রিভুজে’র শীর্ষ বিন্দুতে বসে ছিল যুক্তরাষ্ট্র এবং সেখান থেকে চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়নের অর্থাৎ বর্তমান রাশিয়ার সঙ্গে তার ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখছিল। আজ সেই জ্যামিতি উল্টে গেছে। ট্রাম্প ও পুতিন উভয়কে বেইজিংয়ে আসতে হয়েছে স্থিতিশীলতা, আশ্বস্তকরণ ও কৌশলগত স্বার্থে— নানাক্ষেত্রে নানারকম বিরোধিতা থাকা সত্ত্বেও। চীন চিরাচরিত অর্থে ত্রিভুজ কূটনীতিকে ব্যবহার করছে না। ওয়াশিংটন ও মস্কোকে সে একে অপরের বিরুদ্ধে লাগাতে চায় না। তার বদলে বৈশ্বিক ব্যবস্থার কেন্দ্রে সে তার অবস্থানকে দৃঢ় করছে; ফলাফল যাই হোক, বৃহৎ ক্ষমতার রাজনীতিতে যাকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। চীন অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে সবচেয়ে শক্তিশালী বলে এই ব্যবস্থার শীর্ষে নয়, তবে সে তার আপন শর্তে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াকে আলোচনায় ডাকতে পারছে। এই নয়া জ্যামিতিতে বৃহৎ ক্ষমতার রাজনীতি আর ওয়াশিংটনকে ঘিরে চলছে না; বেশি বেশি করে এখন তা বেইজিংকে ঘিরে চলমান।”
কেননা যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া দুটি দেশের অবস্থাই বর্তমানে বিশ্বজনমতের কাছে নাজুক পর্যায়ে রয়েছে। দুই দেশই অপ্রয়োজনীয়, দীর্ঘমেয়াদি ও নিজ নিজ জনগণের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ যুদ্ধে জড়িয়ে রয়েছে। গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের দায় বর্তেছে ট্রাম্প ও পুতিন দুজনের ওপরেই। অন্যদিকে চীন পরদেশ লুণ্ঠনে বা আক্রমণে জড়িত নয়; বরং সে তার বাণিজ্যিক স্বার্থে একটি একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্বের প্রত্যাশী। নিজেদের জাতে তোলার জন্য এখন মনে হয় ট্রাম্প ও পুতিন দুজনেরই শির পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলার কোনো বিকল্প নেই। শি জিনপিং এ পরিস্থিতি সম্পর্কে পুরোপুরি ওয়াকিবহাল, আর তাই চীন সরকার তা কাজেও লাগিয়েছে অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে। তাছাড়া ট্রাম্পের চার দিন পরই পুতিনকে লালগালিচা সংবর্ধনা দিয়ে চীন বিশ্বকে একটি নীরব বার্তাও দিয়েছে। কী সেই বার্তা?
ওই সফরে ট্রাম্পকে খুশি করতে চীনারা সম্ভবপর সবরকম আয়োজন করেছে। শিকে ট্রাম্প ‘আমার বন্ধু’ বলে একাধিকবার সম্বোধন করেছেন। সেই তুলনায় শি ছিলেন নিরুত্তাপ; একজন জাত খেলোয়াড়ের মতো তার বক্তব্য ও আচরণ সবই ছিল নিরাসক্তভাবে পেশাদার। শি তার বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্রকে ঠিকই হুমকি দিয়ে বলেছেন তাইওয়ানের ব্যাপারে নাক না গলাতে, যেহেতু তা দুই দেশকে সংঘর্ষের দিকে ঠেলে দেবে। অন্যদিকে চীনকে হুমকি দেওয়ার মতো কিছু ট্রাম্পের ঝুলিতে নেই। সবাই বুঝতে পারছিল ইরানের কাছে নাকানিচুবানি খেয়ে তিনি শির কাছে গিয়েছেন সাহায্য ভিক্ষা করতে। সব মিলিয়ে দেখা যাচ্ছে ট্রাম্পের এই বিশাল চীন বিজয়ের ফল আসলে এক অশ্বডিম্ব, কেননা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের কোনো সর্বসম্মত উল্লেখযোগ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়নি। ইঁচড়ে পাকা বৃদ্ধ ট্রাম্পকে চীন রঙিন খেলনা ও কথার বেলুন ফুলিয়ে ভুলিয়ে রেখেছিল।
ট্রাম্পকে দেওয়া শির আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের সম্পর্ক যেন ‘থুসিডাইডিস ফাঁদে’ না পড়ে। বিদ্যমান শক্তি ও নবোদিত শক্তির মাঝে শুরু হওয়া সন্দেহ, ভয় ও অবিশ্বাস থেকে যে যুদ্ধপরিস্থিতির সৃষ্টি হয়— যা এথেন্স ও স্পার্টার মধ্যেকার সম্পর্ক ছাড়াও ইতিহাসে বিভিন্ন সময় ঘটেছে, সেটি খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকের ইতিহাসবিদ থুসিডাইডিসের নামে পরিচিতি পেয়েছে। ট্রাম্পের এই চীন ভ্রমণে শীতল কণ্ঠে শি তা যুক্তরাষ্ট্রকে স্মরণ করিয়ে দিলেন।
অন্যদিকে পুতিনের সঙ্গে শির সাক্ষাৎ ছিল দুই পরিণত বয়স্ক রাজনীতিকের ঠাণ্ডা মাথার আলোচনা। রঙিন খেলনা ও কথার বেলুন নয়, পুতিনের চীন ভ্রমণে দুই দেশের মধ্যে বিশটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। শি ও পুতিন উভয়েই যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যবাদী আচরণের সমালোচনা এবং একটি একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্ব প্রত্যাশা করেছেন, যেখানে শক্তির ন্যায্য ভারসাম্য বিদ্যমান থাকবে। শি প্রত্যাশা করেছেন ‘আরও ন্যায়সঙ্গত ও যুক্তিসঙ্গত’ একটি বৈশ্বিক ব্যবস্থা। দুটি দেশই ইরান আক্রমণের মধ্য দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল কর্তৃক আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছে। তারা একপাক্ষিক আধিপত্যকে যৌথভাবে বিরোধিতার উপর জোর দিয়েছে। তাদের যৌথ ঘোষণায় বলা হয়েছে: “আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভেঙে পড়া ও জঙ্গলের আইনের যুগে ফিরে যাওয়ার বিপদ ছাড়াও শান্তি ও উন্নয়নের এজেন্ডা নতুন ঝুঁকি ও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।” যে মহাবিপদের গোড়ায় আছে ট্রাম্পের নেতৃত্বাধীন যুক্তরাষ্ট্র।
পুতিন ও শি দুজনই আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানসমূহ রক্ষা করতে ও তাদের সর্বজনীন নীতিমালাসমূহ মেনে চলতে বদ্ধপরিকর। চীনের বার্তা অনুযায়ী: “জাতিসংঘকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা সমুন্নত রেখে ও জাতিসংঘের সনদসমূহের উদ্দেশ্য ও নীতিমালার প্রতি আস্থা বজায় রেখে চীন ও রাশিয়া এ আধিপত্যবাদকে মোকাবিলা করবে, বহুত্ববাদকে এগিয়ে নেবে ও বৈশ্বিক পরিস্থিতিকে স্থিতিশীল করতে ভূমিকা রাখবে।”
যুক্তরাষ্ট্রের এককেন্দ্রিক আধিপত্যকে খর্ব করার চেষ্টা জরুরি হলেও সহজ নয়। চীন রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠলেও বহুকেন্দ্রিক বিশ্ব গড়ে তোলায় তার ভূমিকা কতখানি কার্যকর হবে, তা এখনই বলা মুশকিল। পণ্য উৎপাদনে—বিশেষ করে সস্তা পণ্যে বাজার দখলে চীন বৈশ্বিক প্রাধান্য লাভ করলেও সামরিকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে এখনও পিছিয়ে রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাকনেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপক মাতিয়াস ভারনেনগো লিখেছেন (আ লেফট মোরাল ভিশন নিডস আ পলিটিক্যাল ইকোনোমি টু ম্যাচ, জ্যাকোবিন সাময়িকী, ১৭ মে ২০২৬), “চীনের উত্থান বৈশ্বিক পণ্য উৎপাদনের ভূগোলকে বদলে দিয়েছে, কিন্তু তা যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক ও সামরিক ক্ষমতার স্থাপত্যের অবসান ঘটায়নি। এছাড়া আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, উৎপাদনক্ষেত্রে এই রূপান্তর একইসঙ্গে আর্থিক শক্তির সামঞ্জস্যপূর্ণ রূপান্তর ঘটায়নি। ডলারের আধিপত্য অক্ষুণ্ণ রয়েছে। ... এটি আমেরিকান থেকে চৈনিক আধিপত্যের সোজাসাপ্টা রূপান্তর নয়। এটি অনেক বেশি দ্বন্দ্বময় যেখানে উৎপাদনী ক্ষমতা বৃদ্ধি চীনের দিকে গড়ালেও আর্থিক ও সামরিক ক্ষমতা যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে আবর্তিত হচ্ছে।”
চীনের সুবিধা হলো, চীনা নেতৃত্ব চিন্তাচেতনায় কোনো বাস্তবতাবর্জিত মেকি জগতে বাস করে না। তারা তাদের শক্তি ও দুর্বলতা— দুই সম্পর্কেই ওয়াকিবহাল। চীন তার উত্থানকে অপ্রয়োজনে সঙ্কটাপূর্ণ করতে চায় না। সাময়িক আত্মতৃপ্তির বদলে তারা দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যের প্রতি মনোযোগী। একটি দায়িত্বশীল গণতান্ত্রিক বহুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা কেবল বৈশ্বিক জনগণের জন্যই প্রয়োজন নয়, নিজ সম্ভাবনাময় উত্থানকে নিশ্চিত করতে এবং ক্ষমতা-ত্রিভুজের শীর্ষে তার অবস্থানকে দীর্ঘস্থায়ী করতে চীনের নিজেরও তা প্রয়োজন। ট্রাম্প ও পুতিনের এই সাম্প্রতিক চীন ভ্রমণকালে শি এই বার্তাই সম্প্রচার করেছেন অত্যন্ত সফলভাবে।