Published : 03 Aug 2025, 12:27 AM
মানুষকে বিপদ-আপদে সাহায্য করা নিতান্তই মানবিক আচরণ। দেশ-বিদেশ—সব জায়গায়ই মানুষ বিপদে হাত বাড়িয়ে দেয়, দান করে থাকে। দান-খয়রাত করা শুধু বিত্তবানের একচেটিয়া বিষয় নয়। তবে দেখা যায়, বিত্তবানদের দান-খয়রাতের কার্যক্রম কেমন যেন প্রচারমুখী। অনেক ক্ষেত্রে, না চাইলেও তাদের দানের খবর জনসমক্ষে প্রকাশ হয়ে পড়ে।
পৃথিবীর সব দেশেই দানশীল মানুষ রয়েছেন। যে কোনো জায়গায় প্রাকৃতিক দুর্যোগ ঘটলে বিশ্বের সব কোণ থেকেই সব শ্রেণির মানুষ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেন। বর্তমান সময়ে সাহায্য মূলত উন্নত দেশ থেকে অনুন্নত দেশে যেতে দেখা যায়। তবে বছর কয়েক আগে আমেরিকার নিউ অরলিন্সে ভয়াবহ ঝড়ের পর বাংলাদেশ থেকেও বেশ কয়েক টন বিস্কুট পাঠানো হয়েছিল।
বাংলা থেকে ইউরোপ-আমেরিকায় দান-অনুদান পাঠানো নতুন কিছু নয়। ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুনের ‘হৃদয়নাথের ঢাকা শহর’ বইতে সন্নিবেশিত তথ্যে দেখা যায়, ঢাকার নবাব আবদুল গনি ফ্রান্স ও ইতালিতে ঊনিশ শতকে কলেরা আক্রান্তদের জন্য অর্থ ও সাহায্য পাঠিয়েছিলেন। আয়ারল্যান্ডে দুর্ভিক্ষের সময়েও অর্থ প্রেরণ করেছিলেন এই নবাব। এই তথ্য উল্লেখের কারণ হলো—দাতা ও দানগ্রহীতার মধ্যে কোনো সীমান্ত থাকে না; ভৌগোলিক কোনো পরিসরের প্রয়োজন হয় না।
তবে ওই যে বললাম, বড়লোকদের দানের সংবাদ চাপা থাকে না। এবার পত্রিকান্তরে প্রকাশিত বেশ পুরোনো এক দান-প্রতিদানের ঘটনা বর্ণিত হচ্ছে।
এক ভদ্রলোক আমেরিকার কোনো এক মহাসড়কে মার্সিডিজ বেঞ্জ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। গাড়িতে সমস্যা দেখা দেওয়ায় তিনি সেটি রাস্তার পাশে দাঁড় করিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। আরেকজন লোক দূর থেকে এত দামি গাড়ি নিয়ে ভদ্রলোকের বিপত্তি দেখে এগিয়ে এলেন। কাছে এসে গাড়িতে কী সমস্যা হয়েছে দেখতে চাইলে মার্সিডিজওয়ালা রাজি তো হলেনই না, উপরন্তু বললেন, “আমি মার্সিডিজের সার্টিফায়েড মেকানিকের জন্য অপেক্ষা করছি, শিগগিরই এসে যাবে।” সাহায্য করতে এগিয়ে আসা ভদ্রলোক তখন নিজের ভিজিটিং কার্ড বের করে দেখালেন যে তিনিও মার্সিডিজের সার্টিফায়েড মেকানিক। গাড়ির মালিক নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে গাড়িটি পরীক্ষা করার অনুমতি দিলেন। ভদ্রলোক সামান্য ত্রুটি সারিয়ে দিতেই গাড়ি চালু হয়ে গেল।
মার্সিডিজের মালিক ওয়ালেট বের করলেন পারিশ্রমিক দেওয়ার জন্য। কিন্তু মেকানিক ভদ্রলোক অর্থ নিতে রাজি হলেন না। গাড়ির মালিক দয়ালু মেকানিকের কার্ড নিয়ে পরস্পরের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। নিঃসন্দেহে এই মেকানিক ভদ্রলোক রাস্তায় বিপদে পড়া একজনকে সাহায্য করে মানবিকতা ও উদারতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
কিছুদিন কেটে গেল। একদিন গাড়ির সেই মেকানিক তার ব্যাংক থেকে এক রহস্যময় চিঠি পেলেন। চিঠির বিষয়বস্তু পড়ে তিনি তাজ্জব! চিঠিটি নিয়ে এসেছে এক বিরাট সুসংবাদ—তার বাড়ি এখন সম্পূর্ণ মর্টগেজ-ফ্রি। কিন্তু কীভাবে এই অলৌকিক ঘটনা ঘটল? কে তার ঋণ শোধ করল? ভদ্রলোক ভেবে ভেবে এই রহস্যের কূলকিনারা পেলেন না।
শেষে ব্যাংকে গিয়ে খোঁজ করলেন, কে তার দেনা শোধ করেছে, নাম কী? নাম শুনে বিস্ময়ে ভাবলেন—ওই লোকের সঙ্গে তার আগে কখনো দেখা হয়েছিল কি না! তবে মেকানিক তার মুখ মনে না করতে পারলেও, পৃথিবীর সচেতন মানুষ মাত্রই মাইক্রোসফটের বিল গেটসকে চেনেন। ওই দিন রাস্তায় মার্সিডিজ বিকল হয়ে বিপদে পড়েছিলেন পৃথিবীর বিপুল সম্পদের মালিক ও সেরা দাতাদের একজন বিল গেটস।
বিল গেটস গ্রহীতার অজান্তে প্রতিদান দিতে চাইলেও, তা শেষ পর্যন্ত পত্রিকায় প্রকাশ হয়ে বলার মতো এক গল্পে পরিণত হয়। বিত্তবানেরা চাইলেও তাদের মহৎ কীর্তি লুকাতে পারেন না। তাদের কুকীর্তিও অবশ্য গোপন থাকে না। যেমন আমেরিকার কুখ্যাত জেফ্রি অ্যাপস্টিন, যার একটি দ্বীপ ছিল। সেই দ্বীপে একসময় যত ধনকুবের তার সঙ্গে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক রেখে ‘প্রমোদের মন’ ঢেলে দিয়েছিলেন, তাদের নামও ধীরে ধীরে জনসমক্ষে বেরিয়ে আসছে।
এবার পৃথিবীর সাধারণ মানুষের অসাধারণ দানের গল্প বলি। এক মহিলা, বয়স ছিয়াত্তর–সাতাত্তর। ঝামেলামুক্ত, দায়-দায়িত্বহীন বিধবা। ধনী তো বটেই। বড় বাড়ি বিক্রি করে ছোট্ট একটি ইউনিট কিনে বসবাস করেন। সপ্তাহে একদিন হেয়ার ড্রেসারের কাছে যান, সঙ্গে ম্যানিকিউর–প্যাডিকিউর করান। কোনো দিন বান্ধবীদের সঙ্গে কফিশপ বা রেস্টুরেন্টে সময় কাটান। একদিন ছেলের বাড়ি গিয়ে নাতনির সঙ্গে হুটোপুটি করে আনন্দে ভেসে যান।
আরেকদিন কী করেন? সেই দিনের পুরো সময়টুকু তিনি দান করেন। হ্যাঁ, কোনো এক দাতব্য সংস্থার দোকানে স্বেচ্ছাশ্রম দেন। নব্বই হাজার ডলারের হীরার আংটি হাতে, বিশ সেন্ট থেকে দুই ডলারের পুরোনো বই, জুতা–জামা মানুষের কাছে বিক্রি করেন।
সেই ভদ্রমহিলার কাছেই প্রতি পনেরো দিন পরপর এলোমেলো কাপড় পরা, মুখে রাতে পান করা বিয়ারের বোঁটকা গন্ধ নিয়ে ষাট–পঁয়ষট্টি বছর বয়সী এক লোক বিশ ডলার করে ওই সংস্থাকে দান করে যায়। এমনকি সে কখনো রসিদও নেয় না। এই ধরনের দাতার কথা জানা যেত না, যদি ছিয়াত্তর বছরের ওই মহিলার সঙ্গে আমার পরিচয় না হতো।
পুরোনো বই দেখলে আমি নেড়েচেড়ে দেখি। রবীন্দ্রনাথ তার ‘সোনারতরী; কাব্যগ্রন্থের ‘দুই পাখি’ কবিতায় লিখেছিলেন, “যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই,/পেলেও পাইতে পারো অমূল্য রতন।” ছাই না হলেও বইপত্র দেখলেই দেখার ইচ্ছে দমন করতে পারি না। একদিন ওই দোকানে একটি তিয়াত্তর বছরের পুরোনো জার্নাল পেয়ে যাই। দাম দিতে কাউন্টারে আসতেই শুনে অবাক হলাম—বিশ সেন্ট মাত্র! আমার সংকোচ লাগল বিশ সেন্ট দিতে। বর্তমানে ওই জার্নাল বিক্রি হয় ছয় ডলারে। তাই আমি মহিলাকে পাঁচ ডলারই দিলাম। তিনি রসিদ দিতে চাইলে নিলাম না।
মহিলা কিছুটা অবাক হলেন। তবে সঙ্গে সঙ্গে বললেন, “আগামী সপ্তাহে যদি বই খুঁজতে আসো, তবে একজনকে দেখাবো।”
ভদ্রমহিলা যাকে দেখিয়েছিলেন, তিনিই ওই পরিচয়হীন দাতা। বৃদ্ধার সম্ভবত একে দেখানোর পেছনে উদ্দেশ্য ছিল বোঝানো যে—এখানেও এমন মানুষ আছেন, যারা দান করেন অথচ রসিদ নেন না।
বাংলাদেশের ঘটনায় আসি এবার। সত্তরের দশকে এক ভয়াবহ বন্যা হয়েছিল। শহর থেকে নানা ধরনের ত্রাণ সংগ্রহ করা হচ্ছিল। সে সময়ে আটা–রুটি হেলিকপ্টারে করে পানিবন্দী মানুষের মাঝে বিতরণ করা হতো। সামাজিক সংগঠনগুলোর লোকজন সম্মতি দেওয়া বাড়িগুলোতে সকালে আটা পৌঁছে দিতেন, বিকেলে এসে স্বেচ্ছাসেবীরা—অন্য কথায় ভলান্টিয়াররা—তৈরি রুটি নিয়ে যেতেন।
তেমনই মগবাজার–ইস্কাটনের সমাজকর্মে উৎসাহী এক গৃহবধূ রুটি তৈরি করে দেওয়ার দায়িত্ব নিলেন। তখন প্রচণ্ড গরমও ছিল। গৃহিণী তাড়াতাড়ি নিজের সংসারের কাজ গুছিয়ে রুটির সরঞ্জাম নিয়ে বারান্দায় বসলেন। বাড়ির ফুটফরমাশ খাটা ছোট্ট মেয়ে এবং নিজের স্কুল–কলেজপড়ুয়া মেয়েদের সাহায্যে রুটি বানানোর আয়োজন শুরু হলো।
বয়স্ক গৃহকর্মী নারীটির নৈমিত্তিক সব কাজ সারা। এখন বাকি গোসল, খাওয়া ও বিকেল পর্যন্ত পাড়া বেড়ানো। অতিরিক্ত কোনো কাজ করতে সে সময়ে তার প্রবল অনীহা। এত আটা–ছানা দেখে বিরক্তি নিয়ে জানতে চাইলেন, “এত্তো রুটি কিয়ার লাই, মেমান আইবুনি, তয় গোশততো রান্ধেন নাই?”
যখন জানলেন চার সের আটার রুটি, তাও গরমে ঘেমে–নেয়ে, তার বিবি সাহেবা পানিবন্দী মানুষের জন্য বানাচ্ছেন—তখন আরও বিরক্ত হলেন। বিবি সাহেবার ‘নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো’ ধরনের কাণ্ড তার একেবারেই অপছন্দ। গোসল সেরে খেতে বসে দেখলেন, বিবি সাহেবার ঘাম ঝরছে, তবু তিনি রান্নাঘরে রুটি সেঁকছেন; মেয়েরা খোলা বারান্দায় বসে জোরসে রুটি বেলছে।
পেট ভরে আসার পর তার মনে মায়া জাগল। খাওয়া শেষে হাত ধুয়ে এসে দাঁড়ালেন। বিবি সাহেবাকে উঠিয়ে দিয়ে নিজেই রুটি সেঁকতে বসে গেলেন। গুণী, করিৎকর্মা, তবে কিছুটা রাগী ধরনের বুয়ার মন বুঝতেন বলেই গৃহকর্ত্রী আগে কিছু বলেননি। তাছাড়া রুটি বানানো ঘরের কাজের অংশও নয়, বললে হয়তো উল্টাপাল্টা মেজাজ করতেন। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে বাকি ছয়–সাত দিন বুয়া আটা–ছানা ও রুটি সেঁকার কাজ প্রসন্ন মুখেই করে গেছেন। রুটি বেলার কাজ করেছেন গৃহকর্ত্রী ও তার মেয়েরা।
সে সময়ে—শুধু সে সময় নয়, পরবর্তী অনেক বন্যাতেও—ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ছাত্রছাত্রীরাও স্বেচ্ছাশ্রম দিয়ে হাজার হাজার রুটি তৈরি করেছেন। তার খবর কাগজে বেরিয়েছে, ছবিও ছাপা হয়েছে। তবে ইস্কাটন দিলুরোড সংলগ্ন এলাকার ‘মুন্সীর মা বুয়া’ নামে পরিচিত এক সামান্য গৃহকর্মীও বন্যার্তদের জন্য স্বেচ্ছায় রুটি বানিয়েছিলেন—তাও কি মনে রাখার মতো ঘটনা নয়?
নবাব আবদুল গনি ও বিল গেটসের মতো, এমনি মুন্সীর মা কিংবা বিয়ার খেয়ে মাতাল হয়ে দান করা সেই মানুষটিও আছেন দেশে–দেশে, সমাজে–সমাজে। তাদের তথ্য বইয়ে লিখে সংরক্ষিত হয় না, পত্রিকাতেও প্রকাশ পায় না।