Published : 10 Apr 2026, 09:08 AM
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতির ঘোষণা স্বাভাবিকভাবেই স্বস্তি নিয়ে এসেছে। দীর্ঘ দিন ধরে যে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের আশঙ্কা বৃদ্ধি পাচ্ছিল, তা আপাতত পিছিয়ে গিয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে ইসলামাবাদে অনুষ্ঠিত আলোচনা বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তবে এটি যুদ্ধের চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে দেখা সমীচীন হবে না। বরং একে সাময়িক বিরতি বা কিছুটা শ্বাসফেলার সুযোগ হিসেবে গণ্য করাই যৌক্তিক। পথ নিঃসন্দেহে কঠিন, কিন্তু প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সমঝোতার দিকে অগ্রসর হওয়ার জন্য এটি একটি জরুরি ও পরীক্ষামূলক মুহূর্ত।
যদিও সব পক্ষই নিজেদের সফলতার দাবি তুলেছে, বাস্তবতা ততটা সরল নয়। কোনো পক্ষই এই সংঘাতে স্পষ্ট বিজয়ের অবস্থানে ছিল না। প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধকে সামরিক সাফল্য এবং ইরানের শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের একটি রাজনৈতিক আখ্যান হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করেছেন। তবে শুরু থেকেই সংঘাতটি ছিল অপরিকল্পিত এবং একটি ভ্রান্ত অনুমানের ভিত্তিতে ধরে নেওয়া হয়েছিল যে পরিস্থিতি দ্রুত নিষ্পত্তি করে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হবে।
বাস্তবে এই যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রের গ্রহণযোগ্যতা ও কূটনৈতিক অবস্থানের জন্য ব্যয়বহুল এবং ক্ষতিকর প্রমাণিত হয়েছে। এটি ইরানের শাসনব্যবস্থায় প্রত্যাশিত কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি; বরং বিদ্যমান রাজনৈতিক কাঠামোর ধারাবাহিকতাকেই আরও সুদৃঢ় করেছে। একই সঙ্গে এটি একবারে নতুন, আরও কঠোর এবং প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতৃত্বের উত্থানের পথও প্রশস্ত করেছে। বহিরাগত অভিঘাত শোষণ এবং কর্তৃত্ব পুনর্গঠনের সক্ষমতা প্রদর্শনের মাধ্যমে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রকাঠামো যে এখনো বহাল তবিয়তে রয়েছে, এই যুদ্ধ সেই বাস্তবতাকেই আরও স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে এসেছে। তবে সমানভাবে এটিও ভাবা বিভ্রান্তিকর হবে যে এই যুদ্ধে ইরান বিজয়ী হয়েছে। এ দেশটি এবং তার সামরিক সক্ষমতা মোটাদাগে উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু তেহরানের এই ক্ষতিকে সরলভাবে পরাজয় হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে না। ইরানের সামরিক সক্ষমতা যথেষ্ট রয়েছে এবং তারা এখনো উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে ধারাবাহিক হুমকি প্রদর্শনের সামর্থ্য রাখে। ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে ইরান শত্রু রাষ্ট্রগুলোর ক্ষয়ক্ষতি ঘটাতে সক্ষম এবং নিজস্ব সীমানার বাইরের ঘটনাপ্রবাহেও প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
তবে এই সক্ষমতা অনেক ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে। তেহরানকে এখন যুদ্ধবিধ্বস্ত জনগণের চাপের পাশাপাশি পাহাড়সম রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মুখোমুখি হতে হবে। তার সঙ্গে উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে আপেক্ষিক বিচ্ছিন্নতা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর জনগণের ক্ষোভও তাদের মোকাবিলা করতে হবে।
পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলজুড়ে এই যুদ্ধের প্রভাব ছিল তাৎক্ষণিক এবং সুদূরপ্রসারী। প্রতিদিন ইরানি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার আশঙ্কায় মধ্যপ্রাচ্যের রাষ্ট্রগুলো অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে ঝুঁকির মুখে পড়েছিল। ইসরায়েলকেও বিভিন্ন ফ্রন্টে বিস্তৃত সংঘাতের মুখোমুখি হতে হয়েছে। লেবানন ও ইরাক যুদ্ধঝুঁকির ভঙ্গুর অবস্থায় রয়ে গিয়েছিল। ফলে এই যুদ্ধ কোনো সীমিত পরিসরে আবদ্ধ থাকেনি, তা ধীরে ধীরে একটি আন্তঃসম্পর্কিত আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছিল।
যুদ্ধবিরতি না হলে ওয়াশিংটন ক্রমবর্ধিষ্ণুহারে বিপজ্জনক সংঘাত বৃদ্ধির সম্ভাব্য পথগুলোর ছক কষছিল। এসবের মধ্যে ছিল খার্ক দ্বীপকে লক্ষ্যবস্তু করা কিংবা হরমুজ প্রণালি পুনঃপুন সচল রাখতে সামরিক অভিযান পরিচালনা করা। এমনকি বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সম্ভাব্য হুমকির আশঙ্কাও ছিল। এ ধরনের পদক্ষেপ যুদ্ধাপরাধের শামিল হতে পারত।
একটি দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে মার্কিন সাম্রাজ্যকে টেনে আনার পাশাপাশি প্রত্যেক সম্ভাব্য পথই তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক ও কৌশলগত মূল্য বহন করছিল। এই প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটনের সঙ্গে উত্তেজনার পূর্ণ সমাধানের সুযোগ হিসেবে তেহরান নিজের অবস্থানকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করেছে।
এই মুহূর্তে যুদ্ধবিরতি কেন ঘটেছে, তা বোঝার জন্য সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক। তবে একই সঙ্গে এটি স্পষ্ট করে যে, এই যুদ্ধবিরতিকে একটি স্থায়ী চুক্তিতে রূপ দেওয়া যথেষ্ট কঠিন হবে। সবচেয়ে বিতর্কিত বিষয়গুলো এখন ইসলামাবাদের আলোচনায় চিহ্নিত করতে হবে। এই সমঝোতার টেবিলে কেবল দরকষাকষিই নয়, আস্থার প্রশ্নও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। যেমন, যুক্তরাষ্ট্র পুনরায় হামলা না করার গ্রহণযোগ্য আশ্বাস দিতে পারবে কি না এবং হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচলের জন্য হুমকি সৃষ্টির ওপর সীমাবদ্ধতা মেনে নিতে ইরান প্রস্তুত কি না, সেসব প্রশ্ন আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে।
একই সঙ্গে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করাও একটি কেন্দ্রীয় বিষয় হিসেবে গণ্য হবে। যেকোনো চুক্তিকেই এমনভাবে গড়ে তুলতে হবে, যাতে উভয় পক্ষের জন্য সংঘাত প্রশমন রাজনৈতিকভাবে কার্যকর ও গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রে চীন, ইউরোপ এবং যুক্তরাজ্যের মতো বহিরাগত শক্তিগুলোকে আস্থার জিম্মাদার হিসেবে প্রয়োজন হতে পারে।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এখনো আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। জেনিভায় ছয় সপ্তাহ আগে অনুষ্ঠিত আলোচনার পর পরিস্থিতি স্পষ্ট করে দিয়েছে, তেহরানকে আপসের ইচ্ছা প্রকাশ করতে হবে। এটি হতে পারে ইউরেনিয়ামকে মারণাস্ত্রের জন্য কম মাত্রায় সমৃদ্ধ করার মাধ্যমে বা আন্তর্জাতিক পরিদর্শকদের পরিদর্শনের সুযোগ দেওয়ার মাধ্যমে। একই সঙ্গে ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার স্বীকারের দাবি জানাবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করবে যুক্তরাষ্ট্র কতটা অর্থপূর্ণভাবে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে প্রস্তুত, যা চুক্তির স্থায়িত্ব এবং দেশের মধ্যে সমৃদ্ধকরণের মান বজায় রাখার সক্ষমতাকে নির্ধারণ করবে।
তবে আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, এখানে বৃহত্তর আঞ্চলিক বাস্তবতা উপেক্ষিত হওয়ার একটি স্পষ্ট ঝুঁকি রয়েছে। ইরান এই একই সংঘাতের অংশ হিসেবে যুদ্ধবিরতিকে লেবানন পর্যন্ত সম্প্রসারণের জন্য চাপ সৃষ্টি করেছে। কিন্তু ইসরায়েল পরিষ্কার বার্তা দিয়েছে যে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে তাদের অভিযান এই যুদ্ধবিরতির আওতায় পড়ে না, তাই তারা নিজেদের সামরিক অভিযান অব্যাহত রেখেছে। অন্যদিকে, উপসাগরীয় দেশগুলো এমন নিশ্চয়তা চাইছে যে তাদের অবকাঠামো ও নৌপথের ওপর বারবার চাপ সৃষ্টি করা হবে না। তারা ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছে এবং নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য স্পষ্ট নিশ্চয়তা চেয়েছে।
এদিকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা, পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক সামরিক প্রভাব অক্ষুণ্ণ রাখে, এমন যেকোনো ব্যবস্থাপনার প্রতি ইসরায়েল গভীরভাবে সন্দিহান। ফলে ইসলামাবাদের আলোচনা যদি কেবল আমেরিকা ও ইরানের অগ্রাধিকারের সংকীর্ণ পরিসরে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা হয়তো তাৎক্ষণিক সংকটের সাময়িক প্রশমন ঘটালেও বৃহত্তর আঞ্চলিক ব্যবস্থাকে আবারও নৈরাজ্য ও অস্থিতিশীলতার ঝুঁকিতে ঠেলে দিতে পারে।
এই অঞ্চলে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো এখনো বহাল রয়েছে এবং আলোচনার ওপর নতুন করে সংঘাত বৃদ্ধির ঝুঁকি থাকায় যুদ্ধবিরতি ভেঙে পড়ার একটি বাস্তব আশঙ্কা রয়ে গিয়েছে। নতুন হুমকি, হরমুজ প্রণালির ওপর পুনরায় চাপ সৃষ্টি, পর্যায়ক্রমিক হামলা কিংবা নির্ধারিত সময়সীমার বাইরে সমঝোতা আলোচনার মেয়াদ দীর্ঘায়িত হওয়া, সবই ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলতে পারে।
এই যুদ্ধবিরতিকে সংকটের সমাপ্তি হিসেবে নয় বরং একটি নতুন যাত্রার সূচনা এবং অনিশ্চিত এক অন্তর্বর্তী ধাপ হিসেবে বোঝা উচিত। ইসলামাবাদ থেকে যে সিদ্ধান্তই আসুক না কেন, তা হয়তো একটি টেকসই শান্তির চেয়ে কমকিছু হবে। কিন্তু এর বিকল্প পথ, সংঘাতে পুনরায় ফেরা হবে আরও অনেক বেশি আত্মঘাতী।
সুযোগ খুবই সীমিত, এখন মূল প্রশ্ন হলো সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো সেই সুযোগটিকে খোলা রাখতে সত্যিই ইচ্ছুক কি না।
লেখাটি গার্ডিয়ান থেকে অনূদিত; এর লেখক সানাম ভাকীল একজন ইরানি বংশোদ্ভূত আমেরিকান। তবে লন্ডনভিত্তিক স্বাধীন থিঙ্ক ট্যাঙ্ক চ্যাথাম হাউসে কর্মসূত্রে যুক্তরাজ্যে বাস করছেন দীর্ঘদিন ধরে। তিনি বর্তমানে চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা কর্মসূচির পরিচালক। জনস হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষকও। ইরান, উপসাগরীয় ভূরাজনীতি এবং মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা-প্রশ্ন তার গবেষণা ও বিশ্লেষণের প্রধান ক্ষেত্র।