Published : 22 Jan 2026, 01:59 PM
‘সুলতানাস ড্রিম’ অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রটি দেখার অভিজ্ঞতা একধরনের বিস্ময় তৈরি করে। বিস্ময় শুধু এর নান্দনিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং এই উপলব্ধির জন্য যে, এক শতাব্দীরও বেশি সময় আগে লেখা একটি সাহিত্যকর্ম কীভাবে আজকের বাংলাদেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে এত গভীর ও তীব্র সংযোগ তৈরি করতে পারে! আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো, এই গল্পকে পর্দায় এনেছেন একজন বিদেশি নির্মাতা; অথচ এর শিকড় আমাদের জলমাটিতে, আমাদের চিন্তার ঐতিহ্যে এবং আমাদেরই নারীমুক্তির বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকারে। আমাদের নিজস্ব চিন্তা ও নারীমুক্তির যে বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকার আমরা অবহেলায় ধুলোয় মিশিয়েছি, সুদূর এক বিদেশি নির্মাতা সেই বিস্মৃত শিকড় খুঁজে তুলে এনেছেন রুপালি পর্দায়।
রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেনের ‘সুলতানাস ড্রিম’ মূলত ইংরেজিতে লেখা এবং প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯০৫ সালে, ব্রিটিশ ভারতের ‘দ্য ইন্ডিয়ান লেডিজ’ ম্যাগাজিনে। পরে ১৯২২ সালে রোকেয়া নিজ হাতে কিছু সংশোধন ও সংযোজন করে ‘সুলতানার স্বপ্ন’ নামে বাংলায় অনুবাদ করেন। শতবর্ষ আগে লেখা এই স্বপ্নকথা আজও এত জীবন্ত যে, এটাই রোকেয়ার বিশিষ্টতা।
নির্মাতা ইসাবেল হারগুয়েরা এই চলচ্চিত্রের গল্পের সঙ্গে নিজের আবিষ্কার ও আবেগের সম্পর্কও প্রকাশ করেছেন। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ২০১২ সালে দিল্লি সফরে হঠাৎ প্রবল বৃষ্টির কারণে একটি আর্ট গ্যালারিতে আশ্রয় নেওয়ার সময় তিনি ‘Sultana’s Dream’ নামে অত্যাশ্চর্য সাহিত্য সৃষ্টির সঙ্গে পরিচিত হন। বহু বছর আগে লেখা এই বইয়ে নারীদের জন্য এমন এক বিকল্প ও মুক্ত পৃথিবীর কল্পনা দেখে তিনি বিস্মিত হন এবং সিদ্ধান্ত নেন এই গল্পকে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে জীবন্ত করবেন। ইসাবেল আরও বলেন, রোকেয়া কীভাবে এমন এক দুনিয়া কল্পনা করেছিলেন যেখানে নারীরা নিরাপদ বোধ করবে—এ বিষয়টি নিয়ে ভাবতে গিয়ে তিনি বুঝেছেন, এই কাজের মূল নির্যাস মানুষের নিরাপত্তার অন্তহীন আকাঙ্ক্ষার ভেতরে লুকায়িত।
চলচ্চিত্রটি দেখার সময় বারবার মনে হয়েছে—রোকেয়া কীভাবে তার সময়ের এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এমন প্রখর কল্পনাশক্তি ব্যবহার করতে পেরেছিলেন! প্রাতিষ্ঠানিকভাবে বিজ্ঞান শিক্ষার সুযোগ না পেয়েও রোকেয়ার কল্পনাশক্তি ও বৌদ্ধিক অনুসন্ধান ছিল বিস্ময়কর। তিনি যে সমাজ, প্রযুক্তি ও নারী স্বাধীনতার কাহিনি কল্পনা করেছিলেন, তা আজও আমাদের ভাবনাকে নাড়া দেয়। যেন তিনি কেবল নিজের সময়কে অতিক্রম করেননি, শত বছর পরের পৃথিবীকেও চিন্তার ভেতর দিয়ে ছুঁয়ে ফেলেছিলেন। তার স্বপ্ন আজও যতটা প্রাসঙ্গিক এবং ততটা অস্বস্তিকর প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় আমাদের।

অ্যানিমেশন চলচ্চিত্রটিতে রোকেয়ার ভাবনাকে খুবই সংবেদনশীল ও নান্দনিক ভাষায় তুলে ধরেছেন ইসাবেল হারগুয়েরা। গল্পের কেন্দ্রীয় চরিত্র ‘ইনেস’ ধীরে ধীরে দর্শকের সঙ্গে একধরনের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি করে। তার চোখ দিয়েই আমরা স্বপ্ন আর বাস্তবতার মাঝখানে চলতে থাকা এক নীরব লড়াইকে অনুভব করি। মৃদু রঙের ব্যবহার, ধীর ছন্দের গতি আর কল্পলোকের কোমল দৃশ্যভাষা মিলিয়ে চলচ্চিত্রটি উচ্চস্বরে প্রতিবাদ করে না। বরং এটি কথা বলে শান্তভাবে, যুক্তির সঙ্গে, দৃঢ় অথচ কোমল স্বরে। এই নীরবতাই আসলে চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে বড় শক্তি। এখানে নারীমুক্তি কোনো স্লোগান নয়, বরং স্বাভাবিক জীবনচর্চা; যেন এটাই সবচেয়ে সহজ ও মানবিক পথ। এই স্বাভাবিকতার মধ্য দিয়েই চলচ্চিত্রটি মনের গভীরে কিছু দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব রেখে যায়।
‘সুলতানাস ড্রিম’ কেবল একটি আদর্শ সমাজের কল্পচিত্র নয়; এটি পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকে উল্টে দিয়ে তৈরি করা এক গভীর ও বুদ্ধিদীপ্ত ভাবনা। রোকেয়ার কল্পিত ‘লেডিল্যান্ড’ যেখানে পুরুষরা অন্তঃপুরে আর নারীরা রাষ্ট্র ও জ্ঞানের কেন্দ্র দখল করে আছে, সেখানে এই উল্টো বিন্যাস আসলে সরল কল্পনা নয়; এটি ব্যঙ্গ, প্রশ্ন এবং নীরব প্রতিবাদের ভাষা। রোকেয়া খুব স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দেন, সমস্যা নারীর অক্ষমতায় নয়, সমস্যা ক্ষমতার কাঠামোতে। তার কল্পিত সমাজ দাঁড়িয়ে আছে বিজ্ঞানমনস্কতা, যুক্তিবোধ ও মানবিকতার ওপর। এই মূল্যবোধগুলোই আজকের বাস্তবতার সঙ্গে এক তীব্র বৈপরীত্য তৈরি করে এবং আমাদের ভাবতে বাধ্য করে—আমরা আসলে কোন পথে হাঁটছি।
এই চলচ্চিত্রে বাংলা, ইংরেজি, হিন্দি, ইতালিয়ান ও স্প্যানিশসহ একাধিক ভাষার ব্যবহার রয়েছে। যখন ভিনদেশি নির্মাতার কাজে হঠাৎ আমার দেশের বাংলা ভাষার সংলাপ শুনি, সংস্কৃতির আমেজ অনুভব করি, তখন সেটি গভীরভাবে আপন মনে হয়। অথচ চলচ্চিত্রটির এক অসহনীয় ও তাৎপর্যপূর্ণ অংশ হলো গল্পের মূল চরিত্র ইনেসের বাংলাদেশে আগমন। রোকেয়াকে বোঝার তাগিদে, তার চিন্তার শিকড়ের খোঁজে ইনেস যখন ভারতীয় সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে এবং রোকেয়ার গ্রামের বাড়ি পায়রাবন্দে পৌঁছায়, তখন দর্শক হিসেবে আমার মনেও একধরনের প্রত্যাশা তৈরি হয়। মনে হয়, হয়তো এখানে সে এমন কিছু আবিষ্কার করবে যা রোকেয়ার স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবের কোনো সেতুবন্ধ তৈরি করবে। কিন্তু বাস্তবতা নির্মমভাবে ভিন্ন।
পায়রাবন্দে রোকেয়া যেন আর জীবন্ত কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক উত্তরাধিকার নন; তিনি সেখানে মূলত একটি ভাস্কর্য—ইতিহাসের স্মারক হিসেবে উপস্থিত, কিন্তু চিন্তার শক্তি হিসেবে অনুপস্থিত। ইনেস যে ভালোবাসা ও বুদ্ধিবৃত্তিক আলো বহন করে সেখানে পৌঁছায়, তার প্রতিফলন সে পায় না। বরং তার চোখে ধরা পড়ে গ্রামবাংলার পরিচিত এক চিত্র—নারীর প্রতি হেনস্তা এবং নারীর চোখে চিরচেনা আতঙ্কের ছায়া। রোকেয়ার স্বপ্নের নিরাপদ পৃথিবী সেখানে নেই; আছে সেই পুরোনো বাস্তবতা, যা শত বছর পেরিয়েও খুব একটা বদলায়নি।
এই অংশ চলচ্চিত্রটিকে শুধু শ্রদ্ধা জানানোর গণ্ডিতে আটকে রাখে না, বরং আমাদের সামনে এক কঠিন আত্মসমালোচনার বোধ তৈরি করে। রোকেয়ার জন্মভূমিতেই যদি তার চিন্তার বাস্তব প্রতিফলন না থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—আমরা আসলে কাকে উদযাপন করছি? মানুষ রোকেয়াকে, নাকি কেবল তার নামকে? এই প্রশ্নটাই চলচ্চিত্রটির সবচেয়ে তীক্ষ্ণ ও অস্বস্তিকর সত্য।
এই জায়গা থেকেই চলচ্চিত্রটির সঙ্গে বর্তমান বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতার সংযোগ আরও ভয়াবহভাবে স্পষ্ট হয়। আজকের বাংলাদেশে আমরা এমন এক সময় অতিক্রম করছি, যেখানে রাজনৈতিক স্বার্থে নারীদেরকেই নারীদের প্রতিপক্ষ করে তোলা হচ্ছে। মোল্লাতন্ত্রের টুপির নিচে দাঁড়িয়ে একধরনের প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতি সংগঠিত হচ্ছে, যা ধর্মীয় সংকীর্ণতা ও অজ্ঞতাকে পুঁজি করে সমাজকে মানবিকতা, যুক্তিবোধ ও সহাবস্থানের পথ থেকে সরিয়ে নিচ্ছে। রোকেয়ার অনেক পরে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ যেমন দেখিয়েছেন তার ‘লালসালু’ উপন্যাসে—‘শস্যের চেয়ে টুপি বেশী, ধর্মের চেয়ে আগাছা বেশি।’ এখনও অবস্থা ও অবস্থানের পরিবর্তন হয়নি। ‘লালসালু’র ভণ্ড পীর মজিদ যেমন গ্রামবাসীর মনে গজবের ভয় ঢুকিয়ে নিজের আধিপত্য বজায় রাখত, আজও সমাজের অনেক স্তরে ভয় আর কুসংস্কারকে পুঁজি করে একদল মানুষ ফায়দা লুটছে। এর ফল ভোগ করছে পুরো সমাজ, তবে সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী নারী।
এর সাম্প্রতিক ও বেদনাদায়ক উদাহরণ হচ্ছে, ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যাওয়া ঘটনা। একজন প্রগতিশীল নারী শিক্ষককে ধর্ম অবমাননার মিথ্যা অপবাদে বরখাস্ত করা। ওই নারী শিক্ষকের নিপীড়ন ও সামাজিক হেনস্তার মুখে পড়া কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি আমাদের সমাজে চলমান রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবক্ষয়েরই ফল। একই ধারাবাহিকতায় আমরা দেখছি—বিশ্ববিদ্যালয়ের মাঠে ছাত্রীদের প্রবেশে অলিখিত নিষেধাজ্ঞা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারীর চলাচল এবং ঘরের বাইরে নারীদের অংশগ্রহণ সীমিত করার চেষ্টা। এসবই সেই একই মানসিকতার প্রকাশ, যা নারীকে নাগরিক নয়, নিয়ন্ত্রণযোগ্য বস্তু হিসেবে দেখতে চায়।
বর্তমান ধর্মীয় রাজনৈতিক বাস্তবতায় আমরা একধরনের পশ্চাৎগমন প্রত্যক্ষ করছি। যে দেশে রোকেয়ার মতো একজন নারী শিক্ষা, যুক্তি ও মানবিক সমতার কথা বলেছিলেন, সেই দেশেই আজ তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ করা হয়, তার ছবিতে অশ্লীল শব্দ লেখা হয়, এমনকি রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম পরিবর্তনের চেষ্টাও দেখা যায়। এটি কেবল একজন মনীষীর অবমাননা নয়, এটি আমাদের বুদ্ধিবৃত্তিক পরাজয়ের প্রতীক। ধর্মের নামে যে প্রতিক্রিয়াশীলতা, তা নারীর ‘শরীর ও চিন্তা’ উভয়কেই নিয়ন্ত্রণের বস্তু হিসেবে দেখে। রোকেয়া ঠিক এই দৃষ্টিভঙ্গির বিপরীত মেরুতে অবস্থান করেন বলেই তিনি তাদের কাছে ভয়ংকর।
এই কারণেই রোকেয়ার কল্পিত নিরাপদ ও স্বাধীন পৃথিবী আজকের বাস্তবতায় আরও গভীর অর্থ বহন করে। চলচ্চিত্রটি সেই স্বপ্নকে নতুন করে জীবন্ত করে তোলে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, নারীর স্বাধীনতা কোনো অতীতের ভাবনা নয়; এটি এখনো চলমান প্রতিদিনের এক সংগ্রাম। ঠিক এখানেই ‘সুলতানাস ড্রিম’-এর স্বপ্ন আর আমাদের বর্তমান বাস্তবতার পার্থক্য সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
এই চলচ্চিত্রে পরিচালক যেভাবে রোকেয়াকে আবিষ্কার করেছেন এবং তার চিন্তাকে সম্মানের সঙ্গে পুনর্নির্মাণ করেছেন, তা সত্যিই অনবদ্য। এটি শুধু মুসলিম সমাজের ভেতরের বিভ্রান্তিই তুলে ধরে না, বরং পুরো উপমহাদেশ তথা অখণ্ড ভারতবর্ষের ধর্মীয় কুসংস্কার, ধর্মের নামে নারীর ওপর অবিচার ও তাদের দমিয়ে রাখার দীর্ঘ ইতিহাসকে স্পর্শ করে। এই গল্প কোনো নির্দিষ্ট ভূগোলের নয়; এটি পৃথিবীর আবহমান নারীদের গল্প।
এই প্রেক্ষাপটে ‘সুলতানাস ড্রিম’ চলচ্চিত্রটি একধরনের আয়না। এটি দেখায়—একজন মুসলিম বাঙালি নারী ধর্মীয় অনুশাসনের ভেতর থেকেও কতটা প্রগতিশীল, বিজ্ঞানমনস্ক ও মুক্তচিন্তার স্বপ্ন দেখতে পেরেছিলেন! আর আমরা স্বাধীনতার পাঁচ দশক পরেও সেই স্বপ্নকে কতটা রক্ষা করতে পেরেছি? এই প্রশ্নটিই চলচ্চিত্রটি নীরবে সামনে এনে দাঁড় করায়।
তবু আশা আছে। কারণ, ‘সুলতানাস ড্রিম’ চলচ্চিত্রের অস্তিত্ব প্রমাণ করে রোকেয়ার চিন্তা মৃত নয়। বিশ্ব তাকে পড়ছে, ব্যাখ্যা করছে এবং নতুন মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে। হয়তো আমাদের সমাজের একাংশ তাকে অস্বীকার করে, কিন্তু ইতিহাস শেষ পর্যন্ত সিদ্ধান্ত নেয় যুক্তি ও মানবতার পক্ষেই।
আর সেই ইতিহাস আমাদের সামনে আজও একই প্রশ্ন ছুড়ে দেয়—আমরা কি রোকেয়ার উত্তরাধিকার বহন করছি, নাকি তাকে ভাস্কর্যে পরিণত করেই নিজেদের দায় শেষ করছি? প্রশ্নটি সহজ, কিন্তু উত্তরটি কঠিন। কারণ, রোকেয়ার স্বপ্নের বাংলাদেশ আজও যদি কেবল স্বপ্নই থেকে যায়, তবে সেই দায় এড়ানোর কোনো পথ আমাদের জানা নেই।