Published : 07 Feb 2026, 06:06 PM
চলচ্চিত্রে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ অভিনেত্রী ফরিদা আক্তার ববিতার একুশে পদক প্রাপ্তি নিঃসন্দেহে আনন্দের সংবাদ। তবে এই আনন্দের গভীরে লুকিয়ে আছে একটি অস্বস্তিকর কিন্তু জরুরি প্রশ্ন। এতদিন পরে কেন?
বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে ববিতা সাধারণ কেউ নন। তার অভিনয় একাধিক প্রজন্মের নান্দনিক রুচি নির্মাণ করেছে, চলচ্চিত্রকে দিয়েছে নতুন ভাষা ও বিশ্বাস। তবু রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির জন্য তাকে প্রায় সারাজীবন অপেক্ষা করতে হলো কেন? এই প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
বাংলাদেশে গুণী শিল্পীদের প্রতি রাষ্ট্রের দৃষ্টি ধারাবাহিক নয়, বরং উপলক্ষনির্ভর। আমরা শিল্পীকে স্মরণ করি তখনই, যখন তিনি অসুস্থ, নিঃসঙ্গ অথবা প্রয়াত। রাষ্ট্রীয় বড় সাংস্কৃতিক আয়োজনগুলোতে যাদের দেখা যায়, তাদের তালিকা প্রায়ই পূর্বানুমেয়। সেখানে ববিতার মতো শিল্পীরা বছরের পর বছর নীরবে অনুপস্থিত থেকেছেন।

এই কারণেই প্রশ্ন ওঠে স্বাধীনতা পদক তো দূরের কথা, একুশে পদকের জন্যও তাকে এত বিলম্বে কেন বিবেচনা করা হলো? এই প্রশ্ন কেবল ববিতাকে ঘিরে নয়; এটি আমাদের রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক নীতির দীর্ঘদিনের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। দেরিতে হলেও রাষ্ট্র আজ স্বীকার করছে ববিতা কেবল একজন জনপ্রিয় অভিনেত্রী নন, তিনি আমাদের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
১৯৬৮ সালে ‘সংসার’ চলচ্চিত্রে শিশুশিল্পী হিসেবে তার অভিনয়জীবনের শুরু। জহির রায়হানের ‘জ্বলতে সুরুজ কি নিচে’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের মধ্য দিয়ে তার নাম হয় ‘ববিতা’। যে নামটি পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসে স্থায়ী হয়ে যায়। পাকিস্তান আমল থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরবর্তী রাষ্ট্রগঠনের সময় পর্যন্ত চলচ্চিত্রের রাজনৈতিক ও নান্দনিক রূপান্তরের প্রতিটি পর্যায়েই তার উপস্থিতি ছিল অর্থবহ।
তিনি বাংলা ছাড়াও হিন্দি ও উর্দু ভাষার চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। যা তাকে উপমহাদেশের বিরল দ্বিভাষিক অভিনেত্রীদের কাতারে নিয়ে যায়। কিন্তু রাষ্ট্র কখনোই এই বহুভাষিক ও বহুসাংস্কৃতিক অবদানকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি।

সত্তরের দশকে ববিতা নিজেকে অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। ‘টাকা আনা পাই’, ‘স্বরলিপি’, ‘আবার তোরা মানুষ হ’, ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’, ‘লাঠিয়াল’, ‘সূর্যগ্রহণ’, ‘গোলাপি এখন ট্রেনে’, ‘বসুন্ধরা’–এই চলচ্চিত্রগুলোতে তিনি নারী চরিত্রকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যান। তিনি টানা তিনবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেত্রী নির্বাচিত হন।
ববিতা হয়ে ওঠেছিলেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ‘পোস্টার গার্ল’। গ্ল্যামার, ব্যক্তিত্ব ও অভিনয়ক্ষমতার এমন সমন্বয় খুব কম অভিনেত্রীর মধ্যে দেখা গেছে। গ্রামীণ হোক বা শহুরে সব ধরনের চরিত্রেই তিনি ছিলেন সাবলীল। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে তার মতো গ্ল্যামার অভিনেত্রী এখন অবধি কেউ আসেনি। স্বাধীনতার পর বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ পড়ুয়া তরুণীদের কাছে তিনি ছিলেন আইকন। ফ্যাশন, রুচি ও শহুরে আধুনিকতার প্রতীক হিসেবেও তিনি একটি প্রজন্মকে প্রভাবিত করেছেন। সত্তরের দশকের প্রথমার্ধে রুচিশীল সামাজিক সিনেমা মানেই ছিলেন ববিতা।

তার অভিনয়জীবনের সবচেয়ে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অধ্যায় সত্যজিৎ রায়ের চলচ্চিত্র ‘অশনি সংকেত’। ভারতের অসংখ্য খ্যাতিমান অভিনেত্রী থাকার পর সত্যজিতের ববিতাকে বেছে নেওয়ার কারণ ছিল তার অভিনয়ের সংযম ও স্বাভাবিকতা। ‘অশনি সংকেত’ সিনেমার অনঙ্গ বউ চরিত্রে তার অভিনয় বিশ্ব চলচ্চিত্রে বাংলাদেশের শিল্পীর মর্যাদাপূর্ণ স্বাক্ষর। তবু সেই গর্ব রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারে আগে কেন আসেনি, সেটিই বড় প্রশ্ন।
বাংলাদেশের হয়ে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে জুরি বোর্ডের সদস্য হিসেবে সবচেয়ে বেশি অংশগ্রহণকারী অভিনয়শিল্পীদের একজন ববিতা। বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত ‘আন্তর্জাতিক স্বল্প ও মুক্ত চলচ্চিত্র উৎসব’ এবং ‘ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে’র প্রারম্ভিক পর্বে তার সক্রিয় ও মর্যাদাপূর্ণ উপস্থিতির ইতিহাস রয়েছে। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক প্রতিনিধিত্ব রাষ্ট্রীয় স্মৃতিতে প্রায় কোনো গুরুত্বই পায়নি!
এখানেই প্রশ্নটি ব্যক্তিগত থাকে না, তা হয়ে ওঠে রাজনৈতিক। কেন ববিতার মতো শিল্পীরা রাষ্ট্রীয় বড় সাংস্কৃতিক আয়োজন, চলচ্চিত্র শিক্ষা, আর্কাইভ কিংবা সাংস্কৃতিক কূটনীতির পরিসরে ক্রমশ অনুপস্থিত?
উত্তরটি নির্মম কিন্তু স্পষ্ট। আমাদের রাষ্ট্র শিল্পকে দেখে উৎসবের সাময়িক সাজসজ্জা হিসেবে, দীর্ঘমেয়াদি সাংস্কৃতিক পুঁজি হিসেবে নয়। যারা নীরবে, মর্যাদার সঙ্গে কাজ করে যান, ক্ষমতার কাছাকাছি যান না তাদের নাম রাষ্ট্রীয় তালিকার নিচে পড়ে থাকে। রাষ্ট্র যদি শিল্পীকে কেবল পুরস্কারপ্রাপ্তির তালিকায় সীমাবদ্ধ রাখে, কিন্তু জীবিত অবস্থায় তাদের অভিজ্ঞতা, ইতিহাস ও স্মৃতিকে প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব না নেয় তবে সেই রাষ্ট্র সাংস্কৃতিকভাবে দরিদ্রই থেকে যায়। ববিতার মতো শিল্পীরা কেবল সম্মানের দাবিদার নন; তারা আমাদের চলচ্চিত্র শিক্ষার জীবন্ত পাঠ্যপুস্তক।
রাষ্ট্র বরাবরই শিল্পীকে বেশি গুরুত্ব দেয় তখনই, যখন তিনি ক্ষমতার সঙ্গে সখ্য গড়ে তোলেন। এ বাস্তবতা অস্বীকারের সুযোগ নেই। কিন্তু ববিতা কখনো তারকা ইমেজকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করেননি। তিনি সচেতনভাবেই নিজেকে চরিত্রনির্ভর অভিনেত্রী হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছেন।
এই প্রেক্ষাপটে একুশে পদক অবশ্যই ইতিবাচক। তবে একই সঙ্গে আত্মসমালোচনাও জরুরি। এটিকে যদি ‘দায় শেষ’ বলে ধরে নেওয়া হয় তবে তা হবে আরেকটি রাষ্ট্রীয় ভণ্ডামি। কারণ, একটি রাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক পরিপক্বতা কেবল তার স্মৃতিসৌধ, উৎসব কিংবা পুরস্কারের জাঁকজমকে ধরা পড়ে না; তা গভীরভাবে প্রতিফলিত হয় এই প্রশ্নে সে তার শিল্পীদের জীবদ্দশায় কতটা সম্মান দেয়, কতটা যত্নে তাদের সৃজনশীল উত্তরাধিকার সংরক্ষণ করে। শিল্পীকে মৃত্যুর পর স্মরণ করা সহজ। কিন্তু জীবিত অবস্থায় তার অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া, তার অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিকে রাষ্ট্রীয় সংস্কৃতির অংশ করে তোলাই একটি সভ্য রাষ্ট্রের প্রকৃত সাংস্কৃতিক দায়িত্ব।
একুশে পদক ববিতার প্রাপ্য ছিল বহু আগেই। এই দেরিতে আসা স্বীকৃতি অন্তত আমাদের মনে করিয়ে দিক গুণী মানুষের খোঁজ মৃত্যুর পরে নয়, জীবনের মধ্যেই নেওয়া উচিত। নচেৎ আমাদের রাষ্ট্রীয় পুরস্কারের ইতিহাস বারবারই লিখবে, দেরিতে জাগা বিবেকের গল্প।