Published : 28 Aug 2025, 02:52 AM
মিনারুল ও তার স্ত্রী, পুত্র-কন্যার নিথর দেহের পাশেই ছিল ভুল বানানে আঁকাবাঁকা অক্ষরে লেখা একখানা জবানবন্দি। ভুল বানান, আঁকাবাঁকা হাতের লেখা ক্ষুধার কারণে মৃত্যুর মর্মন্তুদ ঘটনাটিকে একটুও ম্লান করতে পারেনি। খুব বেশি দিন আগের কথা নয়, যদিও অনেক ঘটন-অঘটনের এই দেশে কোনো কিছু ভুলতে খুব বেশি সময় লাগে না আমাদের। এই সেদিন, গেল ১৫ অগাস্ট রাজশাহীর পবা উপজেলার পারিলা ইউনিয়নের বামনশিকড় গ্রামের এক গরিব কৃষক পরিবারের চারজনের লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তারা কৃষিমজুর মিনারুল ইসলাম (৩৫), তার স্ত্রী মনিরা বেগম (২৮) এবং তাদের ছেলে মাহিন (১৩) ও কন্যা মিথিলা (২)।
কৃষিমজুর মিনারুল নিজের হাতে জীবন শেষ করলেন। আত্মহত্যা করার আগে পরিবারের অন্য সদস্যদেরও হত্যা করে গেলেন। এটি কি শুধু একটি পরিবারের নিঃশেষ হওয়া, নাকি কাঠামোগত হত্যা, যা আমাদের সমাজের ন্যায্যতা এবং নিরাপত্তার প্রশ্নকে সামনে এনে দাঁড় করাচ্ছে।

পুলিশ মিনারুলের নিজের হাতে লিখে রেখে যাওয়া জবানবন্দি চিরকুটটি সংগ্রহ করেছে এবং সংবাদমাধ্যমে সেই জবানবন্দি প্রকাশিত হয়েছে। মিনারুল লিখেছেন তিনি তার স্ত্রী ও সন্তানদের হত্যা করেছেন। সংবাদমাধ্যম, স্থানীয় সরকার, পরিবার, পুলিশ ও স্থানীয় লোকজনের ধারণা অভাব ও ঋণের কারণেই স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যার পর নিজে আত্মহত্যা করেছেন মিনারুল। তিনি নিজেও লিখে গেছেন, সেই কথা–‘আমরা মরে গেলাম ঋণের দায়ে আর খাওয়ার অভাবে’।
ক্ষুধার কারণে আত্মহত্যার ঘটনা এটিই প্রথম নয়। এই এক বছরের মধ্যে এমন আরও কয়েকটি ঘটনার কথা জানতে পেরেছি আমরা। আমাদের অজানাও রয়ে যাচ্ছে কিছু। রাষ্ট্রসংষ্কার প্রশ্নে সরগরম কোনো রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ, মানবাধিকার সংগঠন কিংবা অন্তর্বর্তী সরকারের কোনো প্রতিনিধি এই সব পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর দায় বা দরদ অনুভব করেনি। চলতি লেখাটি এই বামনশিকড়ের মিনারুলদের নিদারুণ ঘটনার একটি সরেজমিন প্রতিবেদন। মিনারুলের পরিবার-স্বজন, গ্রামপ্রতিবেশী এবং মাহিনের স্কুলের শিক্ষক-সহপাঠীদের সঙ্গে আলাপচারিতার পাশাপাশি কৃষি ও খাদ্যউৎপাদনব্যবস্থা ঘিরে এলাকায় ঘটমান নানা প্রশ্নহীন ঘটনা কিংবা বৈশ্বিক নয়াউদারবাদী বাহাদুরি চলতি বিবরণের গতিপথ তৈরি করেছে।
কাদা মাখা স্যান্ডেল ও মিথিলার চুলের ব্যান্ড
রাজশাহী আমচত্বর থেকে খড়খড়ির দিকে যাচ্ছি। চত্বরে এক বিতিকিচ্ছিরি ভাস্কর্য যেন আকাশ গুলিয়ে দিচ্ছিল। ছিরিছাঁদহীন আম। অথচ খুব কাছেই দুনিয়া কাঁপানো শিল্পী সুশান্ত ও মৃত্যুঞ্জয় পালরা ছিলেন। কিন্তু ওই যে পাতানো বাইনারি চাপানো আছে। মৃত্যুঞ্জয় পালেরা শিল্প নন, ‘হস্তশিল্পী’। যাবতীয় আর্ট-কালচার করেন শহুরে শিক্ষিত এলিট মহাজনেরা। এই ঔপনিবেশিকতা আর বর্ণবাদ কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থায় আরও ভয়াবহভাবে আছে। কৃষক হলো নাদান চাষাভুষা, আর দশ পাতা বই পড়ে কেউ কৃষি ও খাদ্যবিজ্ঞানী হয়ে যান। খাদ্যব্যবস্থার কোনো সিদ্ধান্তগ্রহণে কৃষককে রাখা হয়নি। খড়খড়ি থেকে পুবের রাস্তায় হাতের বামে ঢুকছি। চারদিকে কিছু শুকনো পেয়ারা, পাকা তাল, কাঁচা পেঁপে আর প্লাস্টিক প্যাকেটবন্দি খাবারের দোকান পেছনে ফেলে ঢুকি বামনশিকড় গ্রামে।

একটা বড় দীঘি পাড় হয়েই মিনারুলদের বাড়ি। প্লাস্টারবিহীন ইটের গাঁথুনি আর ভাঙা টিনের ছাউনি দেওয়া তিনখান ঘর। একটি ঘরে মিনারুলের বড় ভাই রুহুল আমিন পরিবার নিয়ে থাকেন। আরেক ঘরে তাদের মা আঞ্জুরা বেগম ও রুস্তম আলী থাকেন। তালাবন্ধ ঘরটিতে মিনারুলেরা থাকতেন। বিয়ের পর মিনারুলদের বোন নাজমা শ্বশুরবাড়িতে থাকেন। একটুখানি উঠানে মাটির চুলা, শিলপাটায় হলুদের বাসি দাগ।
সবকিছু ছাপিয়ে নজরে এল ছোট একটা মুরগির ঘরের চালে পুরনো এক প্লাস্টিকের গামলায় কাদামাখা কয়েকটি স্যান্ডেল ও একটি প্লাস্টিকের ব্যান্ড। স্বজনেরা বললেন, প্লাস্টিকের ব্যান্ডটা মিনারুলের মেয়ে মিথিলার। ওর জুতা কেনা হয়নি, জুতা পায়ে হাঁটার বয়স হওয়ার আগেই চলে গেল বাচ্চাটা। ঘটনার পর থেকে পুলিশ মিনারুলদের ঘরটি তালাবন্ধ করে রাখায় তাদের ব্যবহৃত আর কিছুই দেখা সম্ভব হলো না।

মাটির বারান্দায় মিনারুলের মা বিরক্তি নিয়ে বসেছিলেন। একে একে মিনারুলের ভাই, ভাবী, প্রতিবেশী, শিশুরা ভিড় জমায়। ঘেমে নেয়ে মিনারুলের বাবা আসেন। পরিবারটির ১৫ কাঠা জমি, ভাগ-বণ্টন হয়নি। এই জমিতে তারা কিছু সবজি চাষ করেন। মা-বাপ ভাইদের সংসার সব মিলিয়ে ১০ জন। দৈনিক তাদের প্রায় সাড়ে তিন কেজি চাল লাগত। কুরবানির ঈদ ছাড়া গরুর মাংস তাদের জুটেনি। সবাই দিনমজুর। মিনারুল ও তার ভাই ইটের ভাটাতেও কাজ করতেন।
ক্রমবর্ধমান শহরের কারণে প্রতিদিন গ্রামের মৃত্যু ঘটছিল আর কৃষিজমি নিখোঁজ হচ্ছিল। কাজের অভাবে প্রতিদিন টিকে থাকা খুব দুঃসহ হয়ে ওঠেছিল। প্রতিবেশীরা বললেন, গ্রামের সবাই অভাবী, কষ্ট করে দিন চলে সবার। মিনারুলের মা-বাবার বয়স ষাট পেরুলেও কেউ কোনো ভাতা পান না। পরিবার ও প্রতিবেশীরা বক্তব্য, মিনারুল খুব চাপা স্বভাবের ছেলে। সাতদিন অনাহারে থাকলেও কারো কাছে হাত পাতেননি। তার কত ঋণ ছিল এরা জানেন না। বেশ আগে জুয়ার নেশা থাকলেও বছর কয়েক আগে জুয়া খেলা ছাড়ান দিয়েছিলেন মিনারুল। বেগুন, মিষ্টিকুমড়া, পোল্ট্রি মুরগি খেত না। পছন্দ করতো রুই মাছ, রাজহাঁসের মাংস আর ডিম।
বাবার মতো ছেলে মাহিনও ছিল চাপা স্বভাবের। ফেলনা জিনিস দিয়ে নানারকম যন্ত্রপাতি বানাত। সারদিন মগ্ন থাকতো পুরনো ব্যাটারি আর ফেলনা কলকব্জা নিয়ে। মেয়ে মিথিলার বয়স দুই বছর হওয়ার আগেই চলে গেল। থপথপ পায়ে হাঁটত। মাহিন-মিথিলার মা মনিরার পছন্দ বিষয়ে জানতে পারিনি।

অভাব-অনটন নিয়ে কোনোদিন পরিবারটিতে কোনো দাম্পত্য কলহ বা বিবাদ দেখেননি স্বজন-প্রতিবেশীরা। ময়নাতদন্তের পর মনিরার মা তার মেয়ে ও নাতনির লাশ নিয়ে গেছেন তাদের বাড়িতে। মাহিন আর মিনারুলের দাফন হয়েছে বামনশিকড়ে। হয়তো এখন আর এই পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর কিছুই নেই। তবে অনাহারের যন্ত্রণাকে রাষ্ট্রের সামনে আবারও এক বিশাল বয়ান হিসেবে হাজির করে গেল পরিবারটি।
ঋণ ও অভাবের কারণে আত্মহত্যা কিন্তু বাংলাদেশে এই প্রথম না। রেজিম থেকে রেজিমে ক্ষুধা ও অনাহারের রাজনীতি বহুজনকেই নিহত ও নিখোঁজ করেছে। রেজিমগুলো সাংগঠনিক রাজনৈতিকতার মতাদর্শে ভিন্ন হলেও সকলেই নয়াউদারবাদী ব্যবস্থার সৈনিক। মিথিলার ছোট্ট জামায় কি চুলের ব্যান্ডে লেগে থাকা ক্ষুধার প্রশ্নহীন কাদা কোনোদিন তাদের স্পর্শ করেনি।
যেদিন মিনারুলরা মারা যান, সেদিনও ভাত জুটেনি কারো। চালের গুড়া দিয়ে চাপড়া রুটি বানিয়েছিলেন মনিরা। রাত থেকে দরজা বন্ধ ছিল, স্বজনেরা কেউ কোনো চিৎকার শোনেননি বা সন্দেহজনক কোনো আচরণ। পরের দিন অনেক বেলা হয়ে গেলেও দরজা না খোলাতে স্বজনেরা ডাকাডাকি করেন, দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। গ্রামের কেউ পুলিশে খবর দেন, পুলিশ দরজা খুলে চারটি লাশ সনাক্ত করে এবং টেবিলের ওপর হাইসা (দা) দিয়ে দাঁড় করানো ছিল সেই নিদারুণ সুইসাইড নোট বা অনাহারের জবানবন্দি।
টিফিন পিরিয়ডে মাহিনেরা কেন বেঞ্চের তলায় লুকায়?

নিহত পরিবারটির কোনো ছবি নেই। স্বজনেরা জানান জাতীয় পরিচয়পত্র থেকে শুরু করে কিস্তির বই সবকিছু মিনারুল নষ্ট করেছিল। যাতে তাদের কোনো চিহ্ন না থাকে কোথাও। যাতে এই দাগ পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, ব্যবস্থার মনে কোনো অস্বস্তি বা যন্ত্রণা তৈরি না করে। রাষ্ট্র সদয় হলে তাদের ছবি এবং পরিচয়পত্র পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে পারে। জন্মনিবন্ধন সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র, স্কুলের আইডি কার্ড কতকিছু থাকার কথা।
মাহিন পড়ত খড়খড়ি উচ্চ বিদ্যালয়ে অষ্টম শ্রেণি ‘গ’ শাখায়। ১৯ অগাস্ট যখন বিদ্যালয়টিতে যাই, শিক্ষার্থীরা শোক পালন করছিল। স্কুলের গেইটে মাহিনের ছবিসহ একটি ব্যানার টানানো হয়েছে। একই গ্রামের সম্রাট একই ক্লাসের শিক্ষার্থী। বলছিল, মাহিন কোনোদিন টিফিন পিরিয়ডে নাস্তা করত না। উস্কোখুস্কোভাবে স্কুলে আসত। প্রায় দিনই বাড়ি থেকে না খেয়ে স্কুলে আসত।

কথা হলো বাংলা শিক্ষক আয়নাল হক ও শিল্প-সংস্কৃতি শিক্ষক আবদুস সালামের সঙ্গে। তারা বলেন, পরিবারটি নিরীহ গরিব ছিল, কারো কাছে হাত পাতেনি। টিফিন পিরিয়ডে মাহিনকে টাকা দিতে চাইলেও নিত না, তাদের চক্ষুলজ্জা বেশি ছিল। অভাবের কারণে নিয়মিত স্কুলে আসতে পারত না মাহিন। টিফিন পিরিয়ডে শিশুরা মাঠে খেলা করে, হৈহল্লা করে। কিন্তু মাহিনের জন্য টিফিন পিরিয়ডটি ছিল এক দীর্ঘ অস্বস্তিকর দমবন্ধ ক্লান্ত সময়। মাঠে বা খেলায় তাকে দেখা যেত না, বেঞ্চের তলায় লুকিয়ে থাকত। রাষ্ট্র কী কখনো জানতে চেয়েছে কেন মাহিনরা টিফিন পিরিয়ডে বেঞ্চের তলায় লুকায়? মাহিনেরা মূলত কাকে লুকায়? নিজেকে নাকি নয়াউদারবাদী ব্যবস্থার নির্লজ্জ খুন খারাবিকে?
শৈশবে ‘গণি মিয়া’ নামের এক গরিব কৃষকের কথা পড়তে হতো। আমাদের মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল, ‘গণি মিয়া একজন গরিব চাষি, তাহার নিজের জমি ছিল না বলিয়া অন্যের জমিতে চাষ করিত’। বড় হতে হতে গণি মিয়ার নাতি-পুতি-থুতিদের সাক্ষাৎ পেয়েছি দেশজুড়ে। এখনো যাদের একখণ্ড জমি নেই। জেনেছি দেশের আহার জোগাতে এই অনাহারীরাই প্রতিদিন রক্তঘাম ঝরান। নির্লজ্জের মতো প্রতিনিয়ত আমাদের সামনে হাজির হয় ক্ষুধা ও অনাহারের নিদারুণসব খতিয়ান।
‘বিশ্ব ক্ষুধা সূচক (২০১৬)’ প্রতিবেদন বলছে, পৃথিবীতে প্রতিদিন প্রায় ৭৯ কোটি মানুষ ক্ষুধা নিয়ে বিছানায় যায় এবং প্রায় ২১,০০০ মানুষ প্রতিবছর অনাহারে মারা যায়। ‘অ্যাকশন এগেইনস্ট হাঙ্গারের (২০২৫)’ প্রতিবেদন অনুযায়ী, পৃথিবীতে ১১ জনের ভেতর একজন না খেয়ে রাতে ঘুমাতে যায়। ওয়ার্ল্ড ভিশনের (২০২৩) একটি গবেষণা জানাচ্ছে, বাংলাদেশের ২৪ ভাগ অভিভাবক বলেছেন তাদের সন্তানেরা না খেয়ে ঘুমাতে যায়। ইউনিসেফের (২০২৪) প্রতিবেদন বলে, বাংলাদেশের ৫ বছরের নিচের প্রতি ৩ জন শিশুর ভেতর ২ জনই শৈশবে খাদ্য-দারিদ্র্য পাড়ি দেয়।
মিনারুলদের পরিবার এইসব অভাগা পরিসংখ্যানের অংশ। মিনারুলের মেয়ে, মিথিলার বয়স মাত্র দুই বছর। একটা দুই বছরের মানুষ কতটুকু খাবার খায়? এই একরত্তি খাবারও স্বাধীনতার পঞ্চাশ বছরে মাহিন-মিথিলার জন্য নিশ্চিত করতে পারেনি রাষ্ট্র। অথচ পৃথিবীব্যাপী প্রতিদিন সহস্র টন খাদ্য বিনষ্ট হয়।
জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদন জানায়, বাংলাদেশ বছরে গৃহভিত্তিক প্রায় ৮২ কেজি করে খাবার নষ্ট হয়। এই নিষ্ঠুর নিওলিবারেল পৃথিবীতেই আমরা বসবাস করছি, যেখানে কেবলমাত্র পুঁজি ও মুনাফার মনোপলি নিয়ন্ত্রণ হয়েছে এবং তথাকথিত মুক্তবাজারের নামে জনগণকে কর্পোরেট ক্ষমতাবলয়ে জিম্মি করা হয়েছে। ভাবা যায়, এই পৃথিবীতে ‘অ্যাকুয়া ডি ক্রিস্টালো মডিগ্লিয়ানি’ নামের এক বোতল পানি বিক্রি হয় পঞ্চাশ লাখ টাকায়। আর এক কলস পানির জন্য বাংলাদেশের উপকূল, বরেন্দ্র কী বস্তিতে অপেক্ষা করতে হয় কয়েক ঘণ্টা। ক্যাভিয়ার বা বার্ড নেস্ট স্যুপের মতো অতি বিলাসী খাবারও বিক্রি হয় এই গ্রহে, আবার এই গ্রহেই ক্ষুধার জ্বালা সইতে না পেরে সুইসাইড নোট লিখে কেউ। আম্বানি পরিবারের বিয়ের খাওয়াদাওয়া নিয়ে মিডিয়া আমাদের অতি ব্যস্ত ও উদভ্রান্ত করে রাখে। অনাহারিবর্গের ধারে হীরক রাজারা ছবক দেন, ‘অনাহারে নাকি খেদ, বেশি খেলে বাড়ে মেদ’।
ছিনতাই কৃষি, নিখোঁজ জমিন, জলবায়ু সংকট এবং একটি সুইসাইড নোট
মিনারুলের বাবা বলেন, তার বাবা রসুল মন্ডলও একজন গরিব কৃষক ছিলেন। দাদা গমীর মন্ডলও তাই, তবে এখনকার মতো এমন নিদান অভাব ছিল না আগে। বিল-খাঁড়িতে মাছ ধরে, শাকলতা কুড়িয়ে জান বাঁচানো যেত। অভাব থাকলেও অনাহার ছিল না। নিম্ন বরেন্দ্রভূমির এই গ্রামে নদী না থাকলেও বিল-খাঁড়ি আছে। নিজেদের অল্পবিস্তর জমি আর অন্যের জমিনে মজুর খেটে একরকম চলত কৃষকের দিন। চাষ হতো ঝিঙ্গাশাইল, রঘুশাইল, বাঁশমতি, হিজা, আউশ, দাদ্খানি, কদমশাল জাতের নানান ধান। শুনশুনিয়া, দুঃখরা, কাটাখুড়া, ভুরফা, গাইখুড়া, ছাঁচি, বথুয়্যা, শাপলা, ঢ্যাপের মতো শাকলতা মিলতো চারধারে।
কিন্তু বৈশ্বিক সবুজবিপ্লব প্রকল্পের মাধ্যমে বদলে গেল গ্রামের কৃষিচিত্র। সিনথেটিক সার, যন্ত্রচালিত সেচ, উফশী আর হাইব্রিড প্যাকেটজাত বীজ আর কীটনাশকের মাধ্যমে বন্দি হয়ে পড়ল খাদ্যউৎপাদন ব্যবস্থা। কৃষিকাজে প্রতিনিয়ত খরচ বাড়ল, আর প্রতিদিন কৃষি থেকে ছিটকে পড়ল গরিব কৃষিমজুরেরা।

বামনশিকড় গ্রামের কৃষকেরা ৪০০ বিঘার পুবেরবিলের ওপর নির্ভরশীল ছিলেন। ধানের বিল হিসেবে পরিচিত এই বিশাল কৃষিজমিন এখন কিনে নিয়েছে নাবিল কোম্পানি। তারা গরুর ঘাস আবাদ করছে। আগে মিনারুলদের পরিবার এই বিলের ৭ বিঘা জমি ১০ হাজার টাকায় টেন্ডার (বর্গা) নিয়ে চাষ করত। ধান-সবজি বাদেও বছরে কেবল আউড়ই (ধানের খড়) পাওয়া যেত ৭০ হাজার টাকার।
প্রতিদিন কৃষিজমি লুট হচ্ছে বামনশিকড় গ্রামে। তাহলে গ্রামের গরিব কৃষকেরা কী করে খাবে? আয়-রোজগারের আর কোনো দিশা নেই। এর ওপর শুরু হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের অচেনা আঘাত। মিনারুলেরা তাদের ১৫ কাঠা জমিতে ১৪৩২ বাংলায় পুইঁশাক, লাউ, শষা, করলা, মরিচ নানা সবজি আবাদ করেছিলেন। কিন্তু জ্যৈষ্ঠ থেকে শ্রাবণ একটানা বৃষ্টি হয়েছে এবং সব ফসল নষ্ট হয়েছে। বৃষ্টির কারণে শ্রমিকেরা কৃষিতে কাজও করতে পারেননি। আবাদ নষ্ট না হলে লাখ টাকার মতো আয় হতো। নিজেদের জমিনে কোনো আবাদ নেই, আবার বাজারে শাকসবজির চড়া দাম। উদয়াস্ত খেটেও কোনো কূলকিনারা না করতে পেরে, অভাবি ঋণগ্রস্থ বহু কৃষক ও কৃষক পরিবার বঞ্চনার দাগ নিয়ে মিনারুলদের মতোই মরে বাধ্য হয়েছেন।
সুইসাইড নোটে মিনারুল কোনো ব্যক্তিকে তাদের মৃত্যুর জন্য দায়ী করেননি, করেছেন টিকে থাকা বৈষম্যমূলক অন্যায্য ব্যবস্থাকে। যে ব্যবস্থায় মানুষকে ঋণ আর খাদ্যের অভাবে মরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিতে হয়।
এর আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জের কুড়েরপাড় এলাকার আল আমিন ও তার স্ত্রী জরিনা খাতুন কীটনাশক পান করে আত্মহত্যা করেন এই বছরেরই ২৬ মে। নাটোরের লালপুরের আড়বাব ইউনিয়নের কচুয়া গ্রামের গরিব কৃষক রইজুল ইসলাম ও তার স্ত্রী ফাতেমা খাতুন তামাক আবাদ করে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে আত্মহত্যা করেন ২ জুন। ২৫ মার্চ মেহেরপুরের ভবরপাড়া গ্রামের কৃষক সাইফুল শেখ পেয়াঁজ চাষ করে ক্ষতিগ্রস্থ হয়ে আত্মহত্যা করেন। একই কারণে রাজশাহীর বাঘার আড়ানী রেলস্টেশনের রেললাইনে শুয়ে পড়েছিলেন বাউসা ইউনিয়নের মাঝপাড়া গ্রামের কৃষক মীর রুহুল আমিন।
অভাব, ঋণ, ক্ষয়ক্ষতি এবং বঞ্চনার কারণে একের পর এক কৃষকের নির্মম মৃত্যু ঘটলেও এটি রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় বয়ান হয়ে ওঠেনি। ‘খাওয়ার অভাবকে’ কারণ হিসেবে ঘোষণা করে একটি পরিবার নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার পর সরকারের উচিত ছিল সেই গ্রামে যাওয়া। মিনারুলের সুইসাড নোটকে গ্রামীণ গরীব কৃষকের একটি গুরুত্বপূর্ণ জবানবন্দি ধরে উৎপাদনব্যবস্থা থেকে শ্রেণিকাঠামো এবং গ্রামীণ অর্থনীতি এবং খাদ্যব্যবস্থাকে গভীর থেকে অনুধাবন করা জরুরি। মেহেরপুর থেকে ফেরার পথে চারঘাটের আরেক কৃষকের আত্মহত্যার খবর পেয়েছিলাম, চারঘাট থেকে ফেরার পথে রাজশাহী মেডিকেলে বিষপান করা আরেক কৃষককে দেখতে যাই। বামনশিকড় থেকে ফেরার পথে পানের দাম না থাকায় আরেক ক্ষতিগ্রস্থ কৃষকের আত্মহত্যার খবর আসে। এভাবে কৃষকের আত্মহত্যা কী নয়াউদারবাদী ব্যবস্থার অনিবার্য সিক্যুয়াল হয়ে দাঁড়াবে?
ছবি: পাভেল পার্থ