Published : 12 Sep 2025, 12:20 AM
রাজনীতির প্রাণ হলো চিন্তা, কর্মসূচি আর জনগণের সঙ্গে অটুট সম্পর্ক। সমতা ও বহুত্বের পক্ষে যারা রাজনীতি করেছেন, তারা গত ১৫ বছরে এই মৌলিক কাজগুলো থেকে সরে গেছেন। যে মেধাবীরা জনগণের জন্য প্রতিযোগিতামূলক কৌশল দাঁড় করাতে পারতেন, তাদের পরিশ্রম ও চিন্তাকে কাজে লাগানো হয়নি। কারণ অনেকেরই ধারণা ছিল, ডানপন্থী ও সাম্প্রদায়িক শক্তিকে হাসিনা চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছেন। বিশেষত মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকার দায়ে যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হলো তখন এমনটাই ভাবা হয়েছিল। যদিও ওই বিচার প্রশ্নবিদ্ধ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পর মনে করা হলো পুরো ডানঅক্ষই হয়তো শেষ হয়ে গেছে। তাই আর কোনো চ্যালেঞ্জ নিয়ে ভাবা হয়নি। বরং ধারণা তৈরি হয়েছিল, হাসিনা তার কর্তৃত্ববাদী পদ্ধতিতে প্রগতিশীলদের কাজটিই করে দিচ্ছে, আর বাম-প্রগতিশীলরা শুধু ওই ফল ভোগ করবে। নিজেদের কষ্ট করতে হয়নি, ভাবা হয়েছিল এভাবেই চলবে। এই আত্মতুষ্টিই আজ তাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতার কারণ।
কিন্তু রাজনীতি কখনো শূন্যস্থান মেনে নেয় না। যে গণঅভ্যুত্থান হাসিনার পতন হয়েছে, সেটি দেখিয়েছে জনগণকে দমিয়ে রাখা যায় না। জুলাইয়ের রাস্তায় গুলিতে যখন তরুণ–তরুণীরা প্রাণ হারায়, শহীদদের লাশ যখন পড়ে থাকে, তখনো তাদের সঙ্গীরা স্লোগান দিয়ে এগিয়ে যায় “তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার” অথবা “কে বলেছে কে বলেছে, স্বৈরাচার স্বৈরাচার।” এই স্লোগান শুধু ব্যঙ্গ ছিল না, অনেকেই হয়তো তা গভীরভাবে ধারণ করেছিল, যা আজকের পরিস্থিতিতে স্পষ্ট। শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি কৃষক, শ্রমিক, নারীসহ সর্বস্তরের মানুষ নেমেছিল রাস্তায় একটি ন্যায়ভিত্তিক, বৈচিত্র্যময় ও ভয়ের বাইরে থাকা সমাজের স্বপ্নে। তারা চাইছিল সমান অধিকার, অন্যায়ের অবসান।
কিন্তু ওই উদ্দীপনাকে সংগঠিত করার মতো প্রস্তুত রাজনৈতিক শক্তি সমতা ও বহুত্বের পক্ষে যারা, তাদের মধ্যে ছিল না। আন্দোলনকারীরা আত্মত্যাগ করেছে, কিন্তু ওই ত্যাগকে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক ধারায় রূপ দেওয়ার মতো কাঠামো ছিল না। ফলে যে জায়গায় নতুন রাজনৈতিক দিগন্ত গড়ে উঠতে পারত, সেখানে জায়গা দখল করছে ডানপন্থী ও সাম্প্রদায়িক শক্তি, যারা জনপ্রিয় রাজনীতিকে ব্যবহার করে সমাজকে একরঙা ও বৈষম্যমূলক করে তুলতে চাইছে।
ডানপন্থী ও সাম্প্রদায়িক শক্তির এই উত্থান হঠাৎ নয়। তারা দীর্ঘদিন ধরে জনঅসন্তোষকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের রাজনীতি দাঁড় করিয়েছে। ডাকসু নির্বাচনে এর একটি ছোট উদাহরণ আমরা দেখেছি। শিক্ষার্থীদের দৈনন্দিন সমস্যা যেমন হলে সিট সংকট, নিম্নমানের খাবার, গেস্টরুম কালচারের বীভৎসতা, পরিবহন দুরবস্থা ইত্যাদি ইস্যু তারা নিয়মিতভাবে ব্যবহার করেছে। মাঠে যারা ছিল, তারাই ভোটে ফল পেয়েছে। অন্যদিকে বাম-প্রগতিশীলরা ন্যায় ও বহুত্বের ভাষায় কথা বললেও মাঠপর্যায়ে ওই ভাষার প্রতিফলন দুর্বল ছিল।
সমস্যাটা স্পষ্ট। সমতা ও বহুত্বের পক্ষে যারা, তারা ভেবেছিল হাসিনার দমননীতি প্রতিপক্ষকে দুর্বল করছে, সেটাই যথেষ্ট। অথচ প্রতিপক্ষকে মোকাবেলা মানে তাদের ধারণা, জনপ্রিয় ভাষা ও সংগঠনের শক্তির বিপরীতে কার্যকর বিকল্প দাঁড় করানো। সেটা না করায় আজ, কর্তৃত্ববাদী শাসন ভেঙে পড়ার পর, দেখা যাচ্ছে ডানপন্থী ও সাম্প্রদায়িক শক্তি আগের চেয়েও বেশি সংগঠিত এবং শক্তিশালী। তারা বহুত্বকে ধ্বংস করছে নানা গোপন কৌশলে, মব গড়ে। নারী, সংখ্যালঘু, ভিন্ন জাতিসত্তা ও প্রান্তিক জনগণের কণ্ঠকে স্তব্ধ করছে। সমাজকে ঠেলে দিচ্ছে আরও অসহিষ্ণুতা ও বৈষম্যের দিকে। গণঅভ্যুত্থান যেমন নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছিল, তেমনি আজ প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি ফ্যাসিবাদের শূন্যস্থান পূরণে ঝাঁপিয়ে পড়ছে।
তাহলে কী করা জরুরি? প্রথমত, জাতীয় পর্যায়ে বুদ্ধিবৃত্তিক কাজকে নতুন করে জাগাতে হবে। পরিবহন থেকে শিক্ষা, স্বাস্থ্য থেকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা—প্রতিটি খাত শ্রমজীবী মানুষের ঘামে দাঁড়িয়ে আছে, অথচ তারাই সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত। প্রতিদিন ঢাকাকে জাগায় পরিবহন শ্রমিক, মাঠে খাদ্য ফলায় কৃষক, শহরকে বাঁচায় বর্জ্যকর্মী, কিন্তু তাদের সন্তানরা ভালো স্কুলে পড়তে পারে না, সরকারি হাসপাতালে মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিতে হয়, নিরাপদ বাসস্থানের নিশ্চয়তা নেই। রাষ্ট্রের সমাধান বারবার সীমাবদ্ধ থেকেছে প্রশাসনিক ব্যবস্থায়; জরিমানা, নিয়ম চাপিয়ে দেওয়া, নতুন প্রযুক্তি আনা। এগুলো নিছক অরাজনৈতিক সমাধান, যা জীবিকার প্রশ্নকে উপেক্ষা করে। রাজনৈতিক সমাধান মানে হবে শ্রমজীবী ও প্রান্তিক মানুষের জীবিকার স্বীকৃতি দেওয়া, তাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। সমতা ও বহুত্বের রাজনীতির প্রথম দায়িত্ব হলো এই বাস্তবতাকে সামনে আনা এবং বিকল্প নীতি হাজির করা। জনগণকে বোঝাতে হবে যে বিকল্প কেবল স্বপ্ন নয়, বরং হাতের নাগালে।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক কর্মসূচি হতে হবে স্পষ্ট ও ধারাবাহিক। গণঅভ্যুত্থানের সময় মানুষ জীবন বাজি রেখে রাস্তায় নেমেছিল, শহীদ হয়েছে। ওই ত্যাগকে সম্মান জানাতে হলে রাজনীতিকে কেবল ক্ষমতার পালাবদলে সীমাবদ্ধ রাখা যাবে না। বাস ভাড়া, নিত্যপণ্যের দাম, কৃষকের ফসলের ন্যায্যমূল্য, নারী ও সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয়ে দৃশ্যমান পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিতে হবে এবং বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। জনগণ দেখতে চায়, অভ্যুত্থানের চেতনা শুধু ইতিহাসের পাতায় নয়, বরং জীবনের প্রতিটি স্তরে বাস্তব হয়ে উঠছে।
তৃতীয়ত, জনসংযোগকে করতে হবে সর্বজনীন। শুধু শহরের শিক্ষিত শ্রেণির ভেতর সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। গ্রামীণ কৃষক, গার্মেন্টস শ্রমিক, পাহাড়–আদিবাসী, প্রবাসী পরিবার, নারী ও যৌন বৈচিত্র্যের মানুষ—সকলকে রাজনীতির ভেতরে আনতে হবে। গণঅভ্যুত্থান দেখিয়েছে, বহুবিধ শ্রেণি ও গোষ্ঠী একত্র হলে পরিবর্তনের দেয়াল ভেঙে যায়। তাই এই ঐক্যকে সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে হবে, যাতে প্রতিটি মানুষ মনে করে, এ রাজনীতি তারও রাজনীতি।
চতুর্থত, সংস্কৃতি ও প্রতীকের রাজনীতিকে দিতে হবে গুরুত্ব। গণঅভ্যুত্থানের দিনগুলোয় যেমন গান, কবিতা, দেয়াল লিখন, পোস্টার মানুষকে একত্র করেছিল, জাতীয় রাজনীতিতেও সংস্কৃতির ভূমিকা অপরিহার্য। রাজনীতি শুধু ভোট বা ক্ষমতার খেলা নয়, এটি মানুষের স্বপ্ন, আবেগ ও কল্পনারও যুদ্ধ। যখন ন্যায় ও সমতার কাহিনী গান, শিল্প ও সাহিত্যের ভাষায় প্রকাশ পায়, তখন রাজনীতির শেকড় গভীরে প্রবেশ করে। তাই নতুন শক্তিকে সংস্কৃতি, খেলাধুলা, পরিবেশ আন্দোলনসহ সব প্রতীকের ভেতরে নিজেদের উপস্থিতি তৈরি করতে হবে।
সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো, অন্য কেউ এসে সমতা ও বহুত্বের পক্ষের মানুষদের কাজ করে দেবে না। কর্তৃত্ববাদ সাময়িকভাবে প্রতিপক্ষকে দুর্বল করতে পারে, কিন্তু আসল রাজনৈতিক লড়াই নিজেদেরই করতে হবে। যদি সমতা ও বহুত্বের পক্ষের মানুষ আত্মত্যাগ না করে, চিন্তা না করে, সংগঠিত না হয়, তবে ডানপন্থী ও সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান ঠেকানো সম্ভব হবে না।
শহীদদের রক্ত, শ্রমিকদের ঘাম, সংখ্যালঘুদের কান্না—সব মিলিয়ে আজকের বাংলাদেশ এক নতুন ভবিষ্যতের দাবি তুলছে। সমতা ও বহুত্বের পক্ষে যারা, তাদের দায়িত্ব হলো ওই আকাঙ্ক্ষাকে সংগঠিত করে একটি ন্যায্য রাজনীতিতে রূপ দেয়া। নইলে সর্বগ্রাসী ডানপন্থার দাবানলে দেশ ডুবে যাবে ঘৃণা, প্রতিহিংসা আর বৈষম্যের অন্ধকারে।