Published : 24 Feb 2026, 04:07 PM
বাংলাদেশের ২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে যে উত্তেজনা, প্রত্যাশা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যে প্রচার-হাইপ তৈরি হয়েছিল, তার সঙ্গে বাস্তব ফলাফলের একটি স্পষ্ট অমিল দেখা যায়। নির্বাচনের আগে জামায়াত সমর্থিত ১১ দলীয় জোটকে ঘিরে এমন একটি ধারণা তৈরি করা হয়েছিল যে তারা বিপুল ভোটে বিজয়ী হতে যাচ্ছে। কিন্তু ফলাফল প্রত্যাশার সঙ্গে মেলেনি। ফলে জামায়াতের সমর্থকদের অনেকে অভিযোগ তুলেছেন যে তাদেরকে ইঞ্জিনিয়ারিং করে নির্বাচনে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে। অপরদিকে বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত অনেকেই যুক্তি দিয়ে দেখিয়েছেন যে ইঞ্জিনিয়ারিং না হলে জামায়াতের মতো তুলনামূলকভাবে ছোট একটি দলের পক্ষে এতগুলো আসন পাওয়া সম্ভব হতো না। এই দুই বিপরীত ব্যাখ্যার মাঝখানে দাঁড়িয়ে যে প্রশ্নটি দাঁড়ায়—জামায়াতের নির্বাচনি ফলাফল কি সত্যিই ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ফল, নাকি এর পেছনে আরও গভীর সামাজিক, রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক কাঠামো সক্রিয় ছিল?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে ১৯৯১ থেকে ২০২৬ পর্যন্ত জামায়াতের নির্বাচনি ফলাফল, ভোট-আচরণ, সামাজিক কল্পনা, ভয়ের সংস্কৃতি, নেতৃত্ব সংকট, ধর্মীয় পরিচয়ের রাজনীতি, সংগঠনগত দুর্বলতা, ডিজিটাল বিভ্রম, আন্তর্জাতিক প্রভাব, তরুণ ভোটারদের মনস্তত্ত্ব এবং জোট-রাজনীতির জটিলতা—সবকিছুকে একত্রে বিশ্লেষণ করতে হবে। কেননা নির্বাচনের ফলাফল কখনোই কেবল ভোটের সংখ্যার হিসাব নয়; এটি সমাজের গভীর মনস্তত্ত্ব, রাজনৈতিক স্মৃতি, সাংস্কৃতিক ভীতি এবং ক্ষমতার কাঠামোর প্রতিফলন।
নারী ভোটারদের ভীতি, শরীর-রাজনীতি ও প্রতীকী ক্ষমতার সংঘর্ষ
এবারের নির্বাচনে নারী প্রশ্ন এমনভাবে কেন্দ্রীয় হয়ে ওঠে, যা বাংলাদেশের নির্বাচনি ইতিহাসে নজিরবিহীন। জামায়াত তাদের নির্বাচনি প্রচারে নারীর বিষয়টিকে বারবার সামনে আনে, কিন্তু এই প্রচার উল্টো নারীদের একটি বড় অংশের মধ্যে ভীতি তৈরি করে। রাজনৈতিক সমাজতত্ত্বে এটিকে বলা হয় শরীর-রাজনীতি—যেখানে নারীর দেহ, পোশাক, চলাফেরা, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক অবস্থানকে রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রে আনা হয়। ফরাসি সমাজতাত্ত্বিক পিয়ের বুর্দিয়ের ‘প্রতীকী ক্ষমতার’ ধারণা এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। তার মতে, ক্ষমতা কেবল রাষ্ট্র বা অর্থনীতির মাধ্যমে নয়, বরং ভাষা, আচরণ, সাংস্কৃতিক সংকেত এবং সামাজিক কল্পনার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়।
জামায়াতের সমর্থকদের সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারীদের প্রতি আক্রমণাত্মক ভাষা, নেতিবাচক মন্তব্য এবং নারীর স্বাধীনতা নিয়ে কটাক্ষ—এসবই নারীদের মধ্যে একটি প্রতীকী ভীতি তৈরি করে। এই ভীতি বাস্তব নীতির ওপর ভিত্তি করে নয়; বরং ভবিষ্যতে কী হতে পারে তার কল্পনার ওপর ভিত্তি করে। নারীদের একটি বড় অংশ মনে করে যে জামায়াত ক্ষমতায় এলে বাধ্যতামূলকভাবে মুখ ঢেকে বোরকা পরতে হবে, কর্মক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আসবে এবং রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীদের অংশগ্রহণ কমে যাবে। আল-জাজিরায় জামায়াতের আমিরের সাক্ষাৎকারে নারীদের সম্পর্কে মন্তব্য, এক্স হ্যান্ডেলে জামায়াত নেতার নারীবিরোধী বক্তব্য—এসবই নারীদের ভীতি আরও বাড়ায়—তাদের মধ্যে ধারণা তৈরি হয় যে গত ৫৪ বছরে ধাপে ধাপে তারা যতটুকু সামাজিক স্বাধীনতা অর্জন করতে পেরেছে জামায়াত ক্ষমতায় এলে সেটা সংকুচিত হয়ে যাবে।
এ নির্বাচনে আরেকটি নতুন ঘটনা দেখা গেছে—জামায়াতের নারী কর্মীদের বিপুল উপস্থিতিতে র্যালি। এটি জামায়াতের কাছে ইতিবাচক মনে হলেও নারীদের একটি বড় অংশের কাছে এটি ছিল সাংস্কৃতিক অস্বস্তির কারণ। তারা মনে করেছেন, এই নারীরা জামায়াতের আদর্শিক কাঠামোর অংশ এবং তারা জামায়াতের সংস্কৃতিক রাজনীতিকে তুলে ধরছে। তাদের কাছে বিষয়টি এভাবে প্রতিভাত হয়েছে যে জামায়াত নারীদের যে সামাজিক ভূমিকায় কল্পনা করে—এই র্যালিগুলো যেন তারই একটি প্রতীকী উপস্থাপন। ফলে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারী মনে করেছেন, জামায়াত ক্ষমতায় গেলে নারীদের স্বাধীনতা সীমিত হয়ে যাবে। নারী ভোটারদের একটি বড় অংশের জামায়াত থেকে দূরে সরে যাবার অন্যতম মূল কারণ এটি।
এই ভীতি নতুন নয়। ১৯৯১ সালে জামায়াত যখন ১২.১৩ শতাংশ ভোট পেয়ে ১৮টি আসন পেয়েছিল, তখনো নারীদের একটি অংশ জামায়াতকে সন্দেহের চোখে দেখেছিল। ১৯৯৬ সালে ভোট কমে ৮.৬১ শতাংশে নেমে আসা এবং আসন কমে ৩-এ নেমে যাওয়ার পেছনেও নারী ভোটের অনুপস্থিতি ছিল একটি কারণ। ২০০১ সালে জোটের কারণে আসন বাড়লেও নারীদের সমর্থন বাড়েনি। ২০০৮ সালে ভোট ৪.৬৭ শতাংশে নেমে আসা এবং ২টি আসনে সীমাবদ্ধ থাকা—এটিও নারী ভোটের সংকোচনেরই প্রতিফলন।
২০২৬ সালে ৩১.৭৬ শতাংশ ভোট পাওয়া সত্ত্বেও নারী ভোটের একটি বড় অংশ জামায়াতের বিরুদ্ধে গেছে—যা আসনসংখ্যা বাড়ালেও প্রত্যাশিত বিজয় নিশ্চিত করতে পারেনি।
সংখ্যালঘু ভোট, নেতৃত্ব সংকট এবং ভোটারদের অনিশ্চয়তা
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মীয়ভাবে সংখ্যালঘু ভোট সবসময়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। দীর্ঘদিন ধরে এই ভোটের বড় অংশ আওয়ামী লীগের দিকে ঝুঁকে থাকলেও ২০২৬ সালের নির্বাচনে এর বেশিরভাগই বিএনপির দিকে গেছে। ফলে জামায়াত শুরু থেকেই এক ধরনের অস্বস্তিকর অবস্থায় পড়ে। কারণ সংখ্যালঘুদের মধ্যে জামায়াতকে নিয়ে যে অবিশ্বাস ও শঙ্কা আছে, তা নতুন কিছু নয়। ধর্মভিত্তিক দলের প্রতি সাধারণত সংখ্যালঘুরা আস্থা রাখে না—এটি বাংলাদেশের মতো সমাজে বহুদিনের বাস্তবতা; কারণ বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে ধর্মভিত্তিক দল সাধারণত সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। তাই এই ভোটব্যাংক জামায়াতের নাগালের বাইরে থাকাই স্বাভাবিক।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় নেতৃত্ব সংকট। জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত, গ্রহণযোগ্য এবং রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্যতা রাখেন—এমন নেতৃত্ব জামায়াত এখনো গড়ে তুলতে পারেনি। বিএনপির মতো বড় দলের ক্ষেত্রে মানুষ জানে কে প্রধানমন্ত্রী হবেন, কে অর্থনীতি বা পররাষ্ট্রনীতি সামলাবেন। কিন্তু জামায়াতের ক্ষেত্রে ভোটারদের মনে প্রশ্ন ছিল—ক্ষমতায় গেলে দেশ চালাবেন কে? অর্থমন্ত্রী বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে কাকে দেখা যাবে? এই অনিশ্চয়তা ভোটারদের বড় অংশকে দ্বিধায় ফেলে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভ্রম। অনলাইনে নিজেদের সমর্থকদের উচ্ছ্বাস দেখে অনেকেই মনে করেছিলেন জামায়াত ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু বাস্তবে মাঠপর্যায়ের সংগঠন দুর্বল থাকায় সেই জনপ্রিয়তা ভোটে রূপ নিতে পারেনি। বরং যারা আওয়ামী লীগ বনাম বিএনপির ভোটে নিষ্ক্রিয় থাকেন, ইচ্ছে হলে ভোট দিতে যান, না হলে যান না, তারা এবার জামায়াত ঠেকাবার জন্য ভোট দিতে গিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে ডিজিটাল বুদবুদ বাস্তবতার সঙ্গে একটি দূরত্ব তৈরি করে, যা নির্বাচনের আগে ভুল প্রত্যাশা তৈরি করে।
নির্বাচনি ভূগোলও জামায়াতের সীমাবদ্ধতা তৈরি করে। জামায়াত ঐতিহাসিকভাবে উত্তরবঙ্গ ও দক্ষিণ-পশ্চিমে শক্তিশালী হলেও ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেটের মতো বড় শহরে দলটির অবস্থান দুর্বল। শহুরে ভোটারদের বিরূপতা ২০২৬ সালে আরও বেড়েছে। ভোটের ভৌগোলিক বৈষম্যের কারণে জামায়াতের কাঙ্ক্ষিত আসনসংখ্যায় পৌঁছাতে পারেনি।
এখানে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্থানীয় রাজনীতিতে জামায়াতের পরিচিত বা প্রভাবশালী মুখের অভাব। বাংলাদেশের ভোট-সংস্কৃতিতে স্থানীয়ভাবে পরিচিত, সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য এবং প্রভাবশালী ব্যক্তিরা ভোটের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করেন। অনেক এলাকায় জামায়াতের প্রার্থীরা ছিলেন তুলনামূলকভাবে অচেনা, কম পরিচিত বা সামাজিকভাবে কম প্রভাবশালী। ফলে ভোটাররা তাদের প্রতি আস্থা রাখতে পারেননি। স্থানীয় পর্যায়ে পরিচিত মুখ না থাকা নির্বাচনি রাজনীতিতে বড় দুর্বলতা—এটি জামায়াতের ভোটকে সরাসরি প্রভাবিত করেছে
ভোট-আচরণ তত্ত্ব বলে, মানুষ সাধারণত সেই দলকেই ভোট দেয় যাদের ওপর তারা নিজেদের নিরাপত্তা, ভবিষ্যৎ এবং স্থিতিশীলতার দায়িত্ব দিতে পারে। জামায়াতের ক্ষেত্রে এই আস্থা তৈরি হয়নি। সংখ্যালঘুদের অবিশ্বাস, নারীদের ভীতি, রক্ষণশীল ধারার বিরূপতা—সব মিলিয়ে দলটি একটি বড় অংশের কাছে ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প হিসেবে দেখা দেয়। তার ওপর নেতৃত্বের অস্পষ্টতা ভোটারদের মনে আরও সন্দেহ তৈরি করে।
রক্ষণশীল ধারার বিরূপতা এবং মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্ন
জামায়াতের প্রতি রক্ষণশীল ধারার মুসলমানদের বিরূপতাও এবারের নির্বাচনে স্পষ্টভাবে প্রভাব ফেলেছে। হেফাজতে ইসলামসহ কওমি মাদ্রাসা ঘরানার অনেকেই মওদূদীর চিন্তাধারাকে ইসলামের মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত মনে করে এবং এই মতাদর্শগত দূরত্ব রক্ষণশীল ধর্মীয় পরিমণ্ডলের একটি বড় অংশকে জামায়াতের রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরিয়ে দিয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সারা দেশে মাজার ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, বাউলদের হেনস্তা—এসব ঘটনাকে জনগণ জামায়াতের সঙ্গে যুক্ত করেছে। যদিও জামায়াত সরাসরি এসব ঘটনার সঙ্গে যুক্ত ছিল না, কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জামায়াত সমর্থকদের অনেককে এসব ঘটনার সমর্থন দিতে দেখা গেছে। দল থেকেও এসবের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিতে দেখা যায়নি। ফলে জনগণের মধ্যে একটি ধারণা তৈরি হয়—জামায়াত ক্ষমতায় গেলে বাংলাদেশ আফগানিস্তানের মতো হয়ে যেতে পারে।
মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নেও জামায়াত এখনো নিজেদের গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারেনি। বরং গত দেড় বছরে দেখা গেছে, জামায়াত সমর্থকদের একটি বড় অংশ মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে গৌণ করে দেখছে, কেউ কেউ অস্বীকার করছে, কেউ কেউ ভিন্ন ব্যাখ্যা দিচ্ছে। ফলে অধিকাংশ জনগণের কাছে জামায়াত এখনো মুক্তিযুদ্ধবিরোধী দল হিসেবে চিহ্নিত।
ফলে দেখা যায়, জামায়াতের ভোট বাড়লেও রাজনৈতিক আস্থার ঘাটতি কাটেনি। ভোটাররা মনে করেছেন—দলটি হয়তো আন্দোলন বা জোটের রাজনীতিতে শক্তিশালী, কিন্তু এককভাবে রাষ্ট্র পরিচালনার মতো প্রস্তুতি বা নেতৃত্ব এখনো তাদের নেই। এই অনিশ্চয়তাই শেষ পর্যন্ত ভোটের ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলেছে।
আন্তর্জাতিক প্রভাব, তরুণ ভোটারদের মনোভাব এবং জোট-রাজনীতির জটিলতা
বাংলাদেশের নির্বাচনে আন্তর্জাতিক প্রভাবও একটি বাস্তব বিষয়। বিশেষ করে ভারতের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত উদ্বেগ জামায়াতকে ঘিরে সবসময়ই তীব্র। সীমান্ত নিরাপত্তা, উগ্রবাদী নেটওয়ার্ক এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা—এসব কারণে ভারত জামায়াতকে সন্দেহের চোখে দেখে। এই সন্দেহ বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবেশেও প্রভাব ফেলে।
তরুণ ভোটারদের মনোভাবও জামায়াতের পক্ষে যায়নি। তরুণরা কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা—এসবকে গুরুত্ব দেয়। জামায়াতের নীতি এসব প্রশ্নে অস্পষ্ট হওয়ায় তরুণদের একটি বড় অংশ তাদের থেকে দূরে থাকে।
জোট-রাজনীতির জটিলতাও ভোটারদের মনে সন্দেহ তৈরি করে। এগার দলীয় জোটের ভেতরে নেতৃত্ব, আসন বণ্টন এবং নীতিগত অবস্থান নিয়ে অস্পষ্টতা এমন এক অনিশ্চয়তা তৈরি করে, যার পরিণতিতে ইসলামী আন্দোলনের মতো দল জোট থেকে সরে দাঁড়ায়। অর্থনৈতিক নীতিতেও জামায়াত স্পষ্ট বার্তা দিতে পারেনি—যা বাংলাদেশের ভোটারদের কাছে বড় দুর্বলতা, কারণ তারা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। ফলে নীতিগত অস্পষ্টতা ও অর্থনৈতিক প্রশ্নে অনিশ্চয়তা মিলিয়ে ভোটারদের জামায়াতের প্রতি আস্থা কমে যায়।
জামায়াতের রাজনৈতিক সংকটের মূল প্রশ্ন
সব মিলিয়ে দেখা যায়, জামায়াতের নির্বাচনি ফলাফলকে শুধু ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ করলে বাস্তবতার বড় অংশ অনুধাবন করা যায় না। নারী ভোটারদের ভীতি, সংখ্যালঘুদের অবিশ্বাস, নেতৃত্বের অনিশ্চয়তা, স্থানীয় পর্যায়ে পরিচিত মুখের অভাব, সংগঠনগত দুর্বলতা, ডিজিটাল বিভ্রম, মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে অস্বস্তি, আন্তর্জাতিক প্রভাব এবং তরুণদের মনোভাব—এসবই মিলিতভাবে জামায়াতের রাজনৈতিক সম্ভাবনাকে সীমিত করেছে।
জামায়াতের রাজনীতির মূল সংকট হলো—দলটি এখনো বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতা, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং জাতীয় স্মৃতির সঙ্গে নিজের অবস্থানকে সামঞ্জস্য করতে পারেনি। তারা ভোট পেতে পারে, কিন্তু আস্থা পায় না; তারা সমর্থক জোগাড় করতে পারে, কিন্তু গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে পারে না; তারা আন্দোলনে ভূমিকা রাখতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে সক্ষমতার বার্তা দিতে পারে না। এই ব্যবধানই তাদের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দুর্বলতা।
ভবিষ্যতে রাজনৈতিক অগ্রগতি চাইলে জামায়াতকে শুধু নির্বাচনি কৌশল নয়, নিজেদের ভাবমূর্তি, নেতৃত্ব, নীতি, সামাজিক সম্পর্ক এবং জাতীয় ইতিহাসের প্রতি অবস্থান—সবকিছু নতুনভাবে পুনর্গঠন করতে হবে। বাংলাদেশের সমাজ কাঠামো, ভোট-আচরণ এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির সঙ্গে নিজেদের সম্পর্ক পুনর্গঠন করতে না পারলে জামায়াতের জন্য বড় ধরনের রাজনৈতিক অগ্রগতি অর্জন কঠিনই থাকবে।