Published : 08 Oct 2025, 10:41 PM
জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রাথমিকভাবে বিএনপিকে নিয়ে গণমানুষের মাঝে একটা আশাবাদ তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ১৪ মাস পরে এসে বিএনপি সেই আশা ধরে রাখতে পারেনি। এর মূল কারণ হল বিএনপির মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের দখল-বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, দলীয় অন্তর্কোন্দল থেকে খুন, ধর্ষণসহ নানাবিধ অপরাধে সম্পৃক্ত হয়ে পড়া।
অপকর্মের জন্য কয়েক হাজার মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীকে বহিষ্কার করেও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এসব নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি। ফলে জনমানুষের উল্লেখযোগ্য অংশের মাঝে দলটির বিষয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তারা মনে করছেন, ক্ষমতায় না যেতেই যদি এ ধরনের অপরাধমূলক কার্যকলাপের সঙ্গে বিএনপি জড়িত হয়ে পড়ে, তাহলে ক্ষমতায় গেলে এর রূপ কী হতে পারে।
সমাজে বিদ্যমান এসব বিবেচনার প্রভাব ডাকসু এবং জাকসু নির্বাচনেও পড়ে থাকতে পারে। কেননা ছাত্ররা এ সমাজেরই অংশ। বিজয়ী হলে ছাত্রদল নিপীড়ক হয়ে উঠবে কিনা, এ ধরনের একটা ভাবনাও ছাত্রদের মাঝে ছিল।
জুলাই আন্দোলনে ভূমিকা রাখলেও ছাত্রদল বা বিএনপির নেতৃত্বে আন্দোলন গড়ে উঠেনি। পরবর্তী সময়েও রাজনীতির গতিপ্রকৃতির ওপর তারা নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। বরং জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী এবং ইসলামবাদীদের দেখানো পথেই বিএনপিকে হাঁটতে হচ্ছে।
৫ অগাস্ট পরবর্তী সময়ে ক্রিয়াশীল দলগুলোর মধ্যে বিএনপি সবচেয়ে বড় হলেও রাজনৈতিক ঘটনা প্রবাহের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারা, বিএনপির একটি বড় দুর্বলতা হিসেবে জনগণের চোখে ধরা পড়ছে।
মানুষের প্রবণতা হল শক্তিশালী নেতৃত্ব খোঁজা, তার পেছনে দাঁড়ানো। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের প্রায় ১৪ মাস পরেও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানের দেশে না ফেরাকে অনেকে নেতৃত্বের বড় দুর্বলতা হিসেবে দেখছেন। তাদের কাছে বিষয়টা এভাবে প্রতিভাত হচ্ছে যে, দলটির মূল নেতা মাঠে এসে রাজনৈতিক বাস্তবতা মোকাবেলা করতে ভয় পাচ্ছেন। দল হিসেবে বিএনপির ভাবমূর্তি গড়তে এটি ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে না।
ক্রমাগত মব সন্ত্রাস, মাজার ভাঙ্গা, নীতি পুলিশি ইত্যাদির বিরুদ্ধে বিএনপির কোন স্পষ্ট অবস্থান নিতে না পারা বা জোরালো বক্তব্য দিতে পারবার ব্যর্থতাও দলটিকে দুর্বল হিসেবে তুলে ধরছে। মানুষের একটা আশা ছিল যে, শক্তিশালী সরকারের অনুপস্থিতিতে, বড় দল হিসেবে বিএনপি এসব বিষয়ে শক্ত ভূমিকা পালন করবে।
তবে বিএনপির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে বর্তমান সময়ের উপযোগী রাজনৈতিক বয়ান বা ন্যারেটিভ নির্মাণ করতে না পারা। বিএনপির বয়ানের ওপর ভিত্তি করে জুলাই গণ আন্দোলন গড়ে উঠেনি। আন্দোলন পরবর্তী সময়েও উদ্ভূত রাজনৈতিক সমীকরণ এবং বাস্তবতা–ইসলামবাদীদের চেয়ে ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে থেকে ব্যাখ্যা করে, নতুন বয়ান দলটি বিনির্মাণ করতে পারেনি।
আওয়ামী লীগের রাজনীতির নিজস্ব একটি ন্যারেটিভ রয়েছে। বামপন্থী এবং ইসলামবাদীদের মোটা দাগে দুটো ভিন্ন ন্যারেটিভ রয়েছে। কিন্তু দেখা যাচ্ছে বিএনপির অনেকেই যখন রাজনীতির গতিপ্রকৃতি ব্যাখ্যা করছেন, ইসলামবাদীরা যে লেন্স দিয়ে রাজনীতি দেখেন, তাদেরকেও সে একই লেন্সের সাহায্য নিতে হচ্ছে। ফলে বিএনপির নেতাকর্মীদের জাতীয়, আঞ্চলিক এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির যে বিশ্লেষণ, সেটা ইসলামবাদীদের সঙ্গে মিলে যাচ্ছে। ইসলামবাদীদের সঙ্গে বিএনপির দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যটা ঠিক কোথায়, সেটা অনেক ক্ষেত্রেই বোঝা দুষ্কর হয়ে উঠছে।
বিএনপি বাংলাদেশে বসবাসকারী সকল নাগরিকের ধর্ম বিশ্বাস এবং জাতিসত্তাকে অন্তর্ভুক্ত করে সেক্যুলার বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ধারণার জন্ম দিয়েছে। আওয়ামী লীগের ভাষাভিত্তিক বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিপক্ষে মুসলিম এবং ইসলামী জাতীয়তাবাদীরা, বিএনপির বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদকেই নিজেদের জাতীয়তাবাদ মনে করেন।
এই মনে করাতে কোন সমস্যা নেই। কিন্তু বিএনপির রাজনীতির জন্য সমস্যা হয়ে দাঁড়াচ্ছে তখন, যখন অন্তর্ভুক্তিমূলক সেক্যুলার জাতীয়তাবাদকে ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদ হিসেবে তারা প্রচার এবং প্রতিষ্ঠা করছেন।
আওয়ামী লীগ এবং কিছু বামপন্থী দলও, ইসলামবাদীদের মত বিএনপির জাতীয়তাবাদকে, সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদ মনে করে। এ মনে করার পেছনে জাতীয়তাবাদী ডিসকোর্স বিশ্লেষণ করবার চেয়ে বেশি কাজ করে আবেগ এবং রাজনৈতিক কৌশল। অর্থাৎ, বিএনপির জাতীয়তাবাদ নিয়ে ইসলামবাদীদের যে ন্যারেটিভ, আওয়ামী লীগ এবং বামপন্থীরা সেটাকে ধারণ করে তাকে শক্তিশালী করেছেন।
প্রত্যেকটা রাজনৈতিক দলেরই একটি নিজস্ব পলিটিক্যাল ডোমেইন থাকে যেটি তারা তাদের স্বার্থে অক্ষত রাখতে চায়। আওয়ামী লীগ মনে করে সেক্যুলার জনগোষ্ঠী হচ্ছে তাদের নিজস্ব ডোমেইন, যদিও দলটি গত কয়েক দশক ধরে ধীরে ধীরে ধর্মভিত্তিক দক্ষিণপন্থার দিকে ধাবিত হয়ে সেমি-সেক্যুলার বা সিউডো-সেক্যুলার দলে পরিণত হয়েছে। দলটিকে তার অনুরাগীরা আংশিক ধর্মনিরপেক্ষ বলে ভাবলেও সমালোচনাকারীরা ধর্মনিরপেক্ষতার ছদ্মাবরণধারণকারী মনে করতে শুরু করেছে।
তাই বলে আওয়ামী লীগ কোন অবস্থাতেই চাইবে না যে, তার সেক্যুলার পলিটিক্যাল ডোমেইনে অন্য কেউ ভাগ বসাক। সে সবসময় চেষ্টা করবে অন্য রাজনৈতিক দলগুলোকে—এমনকি সেটা যদি বামপন্থীও হয়–মুসলিম জাতীয়তাবাদ বা ইসলামবাদের দিকে ঠেলে দিয়ে নিজেদের ডোমেইনকে নিরাপদ রাখতে।
বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ নিয়ে আওয়ামী লীগ, ইসলামবাদী এবং বামপন্থীদের বিনির্মিত বয়ানের বিরুদ্ধে বিএনপি কোন কার্যকর বুদ্ধিবৃত্তিক কাউন্টার ন্যারেটিভ গড়ে তুলতে পারেনি বা চায়নি। এই না চাওয়ার অন্যতম কারণ হল ইসলামবাদের রাজনীতির যে জনপরিসর, সে জনপরিসর থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবার শঙ্কা।
বিএনপির মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীরা যেসব ফেইসবুকার, ইউটিউবার বা সোশ্যাল ইনফ্লুয়েন্সার দ্বারা প্রভাবিত, তাদের প্রায় সবাই কম বেশি ইসলামবাদী ভাবাদর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত। কিছু ব্যতিক্রম বাদে বিএনপি যেমন প্রভাবশালী অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট তৈরি করতে পারেনি, তেমনি পারেনি সোশ্যাল বা পলিটিক্যাল ইনফ্লুয়েন্সার তৈরি করতে। একই সঙ্গে সাংস্কৃতিক অঙ্গনে রয়েছে দলটির বড় ধরনের দুর্বলতা।
বিএনপির রাজনৈতিক ঘরানাকে কেন্দ্র করে শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনও গড়ে উঠেনি। ফলে আওয়ামী লীগ এবং বামপন্থী ঘরানার বিপরীতে সাংস্কৃতিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক জগতে প্রভাব বিস্তার করছে ইসলামবাদী ঘরানা।
বিএনপির নিজস্ব ঘরানার আন্দোলন এক্ষেত্রে দুর্বল হওয়ার ফলে, মাঠ পর্যায়ের নেতাকর্মীদের আওয়ামী লীগ বা বামপন্থী মতাদর্শের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ইসলামবাদী ভাবাদর্শের প্রতি নির্ভর করতে হচ্ছে। আর এটাই হচ্ছে বিএনপির সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।
ইসলামবাদী রাজনীতির বিকাশ ঘটাতে হলে আওয়ামী লীগ বা বিএনপির, অথবা উভয়ের জনপরিসরে এ মতাদর্শের প্রভাব বাড়াতে হবে। আওয়ামী জনপরিসরে বিষয়টা যেহেতু অনেকটাই অসম্ভব, সে ক্ষেত্রে ইসলামবাদীদের মূল লক্ষ্য হল বিএনপির জনপরিসরে নিজেদের প্রভাব বলয় বৃদ্ধি করে সে পরিসরকে সংকুচিত করে ফেলা। ইসলামবাদী রাজনীতির ভবিষ্যৎ বিকাশ নির্ভর করছে, এ জনপরিসরকে তারা কতটা সংকুচিত করতে পারবে তার ওপর।
ইসলামবাদীদের মত বিএনপিও অন্তর্বর্তী সরকারকে সহযোগিতার নীতি নিয়েছে। পাবলিক পারসেপশন হচ্ছে দুটো ইসলামবাদী দল এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গে সরকারের বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। সরকারও এনসিপিসহ ইসলামবাদীদের তাদের মূল সমর্থন ভিত্তি বলে মনে করে।
বিশ্বে যেসব দেশে বহুদলীয় ব্যবস্থা প্রচলিত সেখানে দুটো স্পেস থাকে। এর একটি হল সরকারি স্পেস, অপরটি হলো সরকার বিরোধী স্পেস। সরকারি স্পেসে একটি দল থাকে প্রধানতম, তেমনি বিরোধী স্পেসেও থাকে আরেকটি প্রধানতম দল।
বাংলাদেশে দেখা যাচ্ছে এনসিপি, ইসলামবাদী এবং বিএনপি, সবাই অধ্যাপক ইউনূসের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সময়ে সরকারি স্পেসে থাকতে চাচ্ছে। কিন্তু এতে বিএনপির জন্য যে সমস্যা তৈরি করেছে সেটি হল, বিএনপি এখানে প্রধানতম দল হিসেবে ভূমিকা পালন করতে পারছে না। বিএনপিকে থাকতে হচ্ছে সেকেন্ডারি ভূমিকায়।
সরকারি স্পেসে প্রধানতম ভূমিকা পালন না করতে পারবার ফলে এটি একদিকে যেমন ইসলামবাদী রাজনীতিকে সামনে এগোবার সম্ভাবনা তৈরি করছে, তেমনি অপরদিকে বিএনপির রাজনীতিকে জটিল করে তুলছে।
বিরোধী স্পেসটি সম্পূর্ণ শূন্য থাকবার ফলে এটি অন্য রাজনৈতিক দল দ্বারা পূর্ণ হবার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছে। আবার কোন কারণে বিএনপি যদি এখন বিরোধী স্পেসে ভূমিকা পালন করবার সিদ্ধান্ত নেয়, সেটি আওয়ামী লীগের ফিরে আসার যে রাজনীতি, সে রাজনীতিকে বিশেষ সুবিধা দেবে।
মতাদর্শগত এবং রাজনৈতিক ভূমিকা পালন, দুটি দিক থেকেই বর্তমানে বিএনপি একটি জটিলতম অবস্থায় রয়েছে। এমতাবস্থায় বিএনপি যদি সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়ে সামনে এগুতে না পারে, তাহলে সেটি আগামী দিনে ইসলামবাদীদের জনপরিসরকে আরো প্রসারিত করবে বলে ধারণা করা যায়।
প্রথমপর্ব
ডাকসু—জাকসু নির্বাচন, ইসলামবাদী জনপরিসর এবং বিএনপির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ