Published : 12 Sep 2025, 01:01 AM
জুলাই ঘোষণাপত্রটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস গত ৫ অগাস্ট সংসদ ভবনে সবার সামনে পড়েছেন। এই অনুষ্ঠান নিয়ে অনেক আতশবাজি জ্বালানো হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে অনুষ্ঠানটি ছিল আলোবিহীন। যাদের অনুরোধে এই ঘোষণাপত্রটি লেখা হয়েছিল, জুলাই আন্দোলনের নেতারা অধিকাংশই ওই অনুষ্ঠান বয়কট করেছেন। দু-একজন যারা এসেছিলেন, তারা মুখ গোমড়া করে অনুষ্ঠানে দাঁড়িয়ে ছিলেন। অন্যরা, যাদের এই বিষয়ে তেমন উৎসাহ ছিল না, তারা মঞ্চে দাঁড়িয়ে শুধু সৌজন্য রক্ষা করেছেন।
জুলাই জাতীয় সনদের অবস্থা আরও ত্রাহি ত্রাহি। খসড়া তৈরি হলেও তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্য হয়নি এবং এর বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, তা নিয়েও রাজনৈতিক দলগুলো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। এই জট খোলার জন্য দলগুলোর সঙ্গে ঐকমত্য কমিশন আবার বৈঠকে বসছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, জট খোলার যত চেষ্টা হচ্ছে, ততই জট বাড়ছে।
২.
জুলাই ঘোষণাপত্রে কেমন যেন ফরমায়েশিভাবে ইতিহাস লেখা হয়েছে। রাজনীতিবিদরা এতে তাদের মতামত দিয়েছেন এবং নিজেদের ইতিহাস যোগ করেছেন। সবকিছু মিলিয়ে যে ইতিহাস তৈরি হয়েছে, তাতে কেউই খুশি নন—সবারই কিছু না কিছু অপ্রাপ্তি রয়ে গেছে। এই ইতিহাস কি ইতিহাসবিদদের যাচাই-বাছাইয়ে টিকবে?
জুলাই সনদের দুটি অধ্যায় রয়েছে। প্রথম অধ্যায়ে, অনেকগুলো ‘যেহেতু’ দিয়ে আমাদের জাতির ইতিহাসের একটি সংক্ষিপ্ত পাঠ দেওয়া হয়েছে। দ্বিতীয় অধ্যায়ে রয়েছে জুলাই ঘোষণার অঙ্গীকার। অঙ্গীকার নিয়ে কেউ তেমন বিরোধ বা বিরাগ জানায়নি। আমাদের রাজনীতিবিদরা অঙ্গীকারে অভ্যস্ত। তবে এই অঙ্গীকারের বাইরেও বিএনপি, এনসিপি, জামায়াত—সবারই নিজস্ব দলীয় অঙ্গীকার রয়েছে।
ঝামেলা হয়েছে ইতিহাসের পাঠ নিয়ে। সবাই চান ইতিহাসে নাম লেখাতে। কারও কারও কৃতিত্ব লেখা হয়েছে, কিছু কিছু বাদ পড়েছে। এখানেই হয়েছে সমস্যা। কিন্তু এভাবে তো ইতিহাস লেখার কথা নয়। যে ইতিহাস ঘটে গেছে, তার অনেক কিছু এ দেশের জনগণ স্বচক্ষে দেখেছে, অনেক কিছু ‘সত্যিকার ইতিহাস’ বইয়ে লেখা হয়ে গেছে। তাই আমি বলব, ইতিহাসের অংশটি না থাকলে প্রফেসর ইউনূস অনেক বিতর্ক থেকে রক্ষা পেতেন।
৩.
তবে তারও কোনো উপায় ছিল না। জুলাই আন্দোলনের নেতারা যেভাবে ইতিহাসকে চিন্তা করেন, তা যদি ঘোষণাপত্রে না থাকত, তাহলে ঘোষণাপত্র লেখা হতো না। ঘোষণাপত্র না লেখা হলে জুলাই সনদ লেখা যেত না। সনদ ছাড়া নির্বাচন দেওয়া যেত না। আর নির্বাচন না হলে বিকল্প কী ছিল?
ঘোষণাপত্রের বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। আমরা শুধু দেখব স্টেকহোল্ডারদের মতামত ও প্রতিক্রিয়া। স্টেকহোল্ডার বলতে রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও জুলাই আন্দোলনের শরিকদের বোঝাচ্ছি। আসল স্টেকহোল্ডার যে জনগণ, তাদের কোনো মতামত নেওয়া হয়নি—গণভোটের মাধ্যমে বা অন্য কোনোভাবে। পুরো বিষয়টিতে তারা অনুপস্থিত বা নির্লিপ্ত। অবশ্য ঘোষণায় বলা হয়েছে, “৫ আগস্ট ২০২৪ সালে গণ-অভ্যুত্থানে বিজয়ী বাংলাদেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে এই ঘোষণাপত্র প্রণয়ন করা হলো।”
বিএনপি ঘোষণাপত্র নিয়ে মোটামুটি খুশি। তারা দীর্ঘদিন ক্ষমতায় ছিল এবং এ দেশের অনিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির দায়ভার তাদেরও কম নয়। তাদের বিরুদ্ধে ‘যেহেতু’ অংশে কোনো নেতিবাচক কথা নেই। তাদের একমাত্র অভিযোগ, এনসিপির বক্তব্যকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, এনসিপির চারজন নেতা অভিনবভাবে প্রতিবাদ করেছেন। ঘোষণাপত্র পড়ার দিন তারা কক্সবাজারে ‘সাগরের পাড়ে’ চলে গেছেন। তাদের একজন লিখেছেন, “এটি ছিল একটি অসম্পূর্ণ জুলাই ঘোষণাপত্রের প্রতি আমার নীরব প্রতিবাদ।” অন্য একজন বলেছেন, “জুলাই ঘোষণাপত্র পাঠের অনুষ্ঠানে ঐক্যের পরিবর্তে বিভাজন, শহীদ ও আহতদের পরিবর্তে কিছু মুষ্টিমেয় গোষ্ঠীর কথা বা মতামত প্রাধান্য পেয়েছে।” যেসব নেতা এবছরের ৫ অগাস্ট কক্সবাজারে চলে গিয়েছিলেন, এনসিপি তাদেরকে কারণ দর্শাতে বলেছে। এ নিয়ে এনসিপিতে কোনো টানাপোড়েন হবে কি না, তা এখনও বোঝা যায়নি।
জামায়াতে ইসলামীর সবচেয়ে খুশি হওয়ার কথা। ‘যেহেতু’-এর একাত্তরের অংশে তাদের বিরুদ্ধে কোনো আঁচড় পড়েনি বরং তাদের অতীতের দাগ সাদা করে দেওয়া হয়েছে। তারা শুধু মৃদু প্রতিবাদ করেছে যে, জুলাই আন্দোলনে ইসলামী রাজনীতিবিদদের অবদান তেমনভাবে তুলে ধরা হয়নি। হেফাজতে ইসলামও খুব খুশি নয়, কারণ তারা বলেছে, শাপলা চত্বরের কথা ঘোষণাপত্রে উল্লেখ নেই।
৪.
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সরকারের ঐকমত্য কমিশনের পর্যায়ক্রমিক আলোচনার ভিত্তিতে নির্বাচন ব্যবস্থা, বিচার বিভাগ, দুর্নীতি দমন কমিশন, পুলিশ ও জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের ভিত্তিতে জুলাই সনদ তৈরি হয়েছে। এই সনদ জুলাইয়ে চূড়ান্ত হওয়ার কথা ছিল, কিন্তু একাধিক বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মতপার্থক্যের কারণে এটি এখনও চূড়ান্ত করা যায়নি।
দুটি সংস্কার নিয়ে এখনও গুরুতর প্রশ্ন রয়ে গেছে। এগুলো হলো, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন এবং দুই কক্ষবিশিষ্ট সংসদ। ঐকমত্য কমিশন নিরপেক্ষ নির্বাচনের একটি রূপরেখা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মোটামুটি সমঝোতায় পৌঁছেছে। কিন্তু নির্বাচনকালীন প্রধান উপদেষ্টা কীভাবে চূড়ান্তভাবে মনোনীত হবেন, তা নিয়ে মতভেদ রয়ে গেছে।
ঐকমত্য কমিশনের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে একটি বাছাই কমিটি গঠিত হবে, যারা ‘নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা’ বাছাই করবেন। এই কমিটিতে থাকবেন: ১. প্রধানমন্ত্রী, ২. বিরোধীদলীয় নেতা, ৩. স্পিকার, ৪. ডেপুটি স্পিকার (বিরোধী দলের) এবং ৫. সংসদের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিরোধী দলের একজন প্রতিনিধি। এই কমিটি যদি প্রধান উপদেষ্টা বাছাই করতে ব্যর্থ হয়, তবে পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে মতবিরোধ চলছে। বিএনপি চায় সংসদই প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করুক, কমিশন চায় দুজন বিচারক যোগ করে বাছাই কমিটিকে বর্ধিত করতে। এই টানাপোড়েন এখনও চলছে। তবে বাছাই কমিটির গঠন দেখেই বোঝা যায়, প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ মূলত রাজনীতিবিদদের হাতেই থাকবে। এই পদ্ধতিতে মনোনীত নির্বাচনকালীন সরকারপ্রধান কতটা নিরপেক্ষ হবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।
দুই কক্ষবিশিষ্ট সংসদ নিয়ে সব দল একমত হয়েছে। কিন্তু এগুলো কীভাবে গঠিত হবে, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। ঐকমত্য কমিশন চায় নিম্নকক্ষের সদস্যরা প্রচলিত আসনভিত্তিক ভোটে নির্বাচিত হোক এবং উচ্চকক্ষে প্রতিটি দলের জাতীয় ভিত্তিতে প্রাপ্ত ভোটের আনুপাতিক হারে (পিআর) আসন বণ্টন করা হোক। পিআর নিয়ে জামায়াত ও বিএনপির অবস্থান ভিন্ন। বিএনপি পিআর চায় না। জামায়াত চায় উভয় কক্ষেই পিআর। এ নিয়ে জটলা লেগেই আছে।
সনদ গৃহীত হলেও, তা কীভাবে বাস্তবায়িত হবে, তা নিয়েও মতভেদ রয়েছে। তবে বাস্তবায়ন পদ্ধতি জুলাই সনদের অংশ হবে না। ঐকমত্য কমিশন এ নিয়ে আলাদা সুপারিশ তৈরি করবে। সরকার চায়, সনদের প্রস্তাবগুলো নিয়ে বিশেষ সাংবিধানিক আদেশ জারি করতে, যাতে এগুলো সংবিধানের অংশ হয়ে যায় এবং এ নিয়ে কোর্টে কোনো চ্যালেঞ্জ করা না যায়। বিএনপি সনদকে সংবিধানের অন্তর্ভুক্ত করার বিপক্ষে। এসব আলোচনা এখনও চলছে।
শেষ পর্যন্ত, সনদ যেভাবে লেখা হবে এবং বাস্তবায়িত হবে, তাতে মনে হয় সবারই কিছু না কিছু অসন্তুষ্টি থেকে যাবে। জুলাই ঘোষণা ও সনদের বিভেদের সানাই স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। ভবিষ্যতের রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জগুলো এগুলো কতটা টিকবে, কী আকারে টিকবে, এবং পরবর্তী সরকার এই সংস্কারগুলোকে কীভাবে পরিবর্তন করবে—এসব প্রশ্ন রয়েই যাবে।