Published : 11 May 2026, 10:57 AM
ভারতীয় উপমহাদেশে তিন বছরের মধ্যে তিনটি দেশে গণ-অভ্যুত্থান হয়েছে। অভ্যুত্থানের পথ ধরে হয়েছে নির্বাচন। ফল হয়েছে তিন দেশে তিন রকম। প্রবণতাও তা-ই বিভিন্ন এবং প্রবণতাগুলোকে উপমহাদেশীয় রাজনীতির খাতিরে বোঝাপড়া করা দরকার। চলমান লেখায় এই প্রবণতাগুলোকে কেন্দ্রে রেখে আমরা সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ভারতের পাঁচটি রাজ্য ও কেন্দ্র-শাসিত অঞ্চলের নির্বাচনি-রাজনীতি বিশ্লেষণ করব। বিশেষত, আমরা নজর দেব তামিলনাড়ুতে, যেখানে পুরাতনের জিঞ্জির ভেদ করে নতুনের কেতন উড়েছে।
তিন দেশের গণ-অভ্যুত্থান ও নির্বাচন
শ্রীলঙ্কায় গণ-অভ্যুত্থান হয় ২০২২ সালের ১৪ জুলাই। মাত্র এক সপ্তাহের ব্যবধানে সাংবিধানিক বিধি মেনে সংসদের পরোক্ষ ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করা হয়। এরপর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে দ্বিদলীয় বুর্জোয়া বৃত্ত ভেঙে জিতে যায় বামপন্থিরা, গণ-অভ্যুত্থানে যাদের বেশ বড় ভূমিকা ছিল।
বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্টের গণ-অভ্যুত্থানের পর আসে সুশীল সমাজের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার। শিক্ষাঙ্গন ও যততত্র মব উসকানো, অদূরদর্শী বৈদেশিক চুক্তি, স্বাস্থ্যখাতে অব্যবস্থাপনা, তথাকথিত সংস্কার ও নির্বাচন নিয়ে দীর্ঘসূত্রীসহ অধিকাংশ ইন্ডিকেটরে ব্যর্থতার পরিচয় দেওয়া এই সরকার দেশে ডানপন্থা ও মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তির উত্থানে ব্যাপক প্রশ্রয়দাতার ভূমিকা পালন করে। এই শঙ্কায় অভ্যুত্থানের মূল শিক্ষার্থী-নেতৃত্বের নতুন পার্টি ও তাদের জোটের পরিবর্তে জনগণ আবারও পুরনো রাজনৈতিক দলের কাছেই ফিরে গেছে ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে।
নেপালে বামপন্থি সরকারের বিরুদ্ধে গণ-অভ্যুত্থান সংঘটিত হয় ২০২৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর। তিনদিন পর একজন সাবেক প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত হয় অন্তর্বর্তী সরকার। ‘বাংলাদেশের মতো হবে না’ আশ্বাস দিয়ে নেপালের অন্তর্বর্তী সরকারটি মাত্র ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করে। ২০২৬ সালের মার্চের নির্বাচনে নেপালে এসেছে অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের দল। এই তরুণদের গণ-অভ্যুত্থান পরর্বর্তী ভূমিকা ছিল ঠিক বাংলাদেশিদের বিপরীত। তারা অন্তর্বর্তী সরকারেও যায়নি, মবও করেনি, পার্শ্ববর্তী দেশকে উসকে দিয়ে তাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে সুবিধাও করে দেয়নি। জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে বিগত সরকার পরিচালনা করা নেতৃত্বকে ধরাশায়ী করে নির্বাচিত সরকার গঠন করেছে।
ভারতের রাজ্যভিত্তিক নির্বাচন ও উপমহাদেশীয় প্রবণতা
ভারতে একই সময়ে চারটি রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, আসাম ও কেরালা এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল পদুচেরিতে নির্বাচন শেষ হলো। শুধু বাংলাদেশ-ভারত নয়, সমগ্র উপমহাদেশ জুড়েই আকর্ষণের কেন্দ্রে ছিল পশ্চিমবঙ্গ। এছাড়া, বাংলাদেশের জন্য অপর আকর্ষণটি ছিল আসামের নির্বাচন। উত্তর-পূর্ব ভারতের এই দুই রাজ্যেই জিতেছে কেন্দ্রীয় শাসকদল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)।
উত্তর-পূর্ব ভারতে পারলেও, দক্ষিণ ভারতের তামিলনাড়ু, কেরালা ও পদুচেরিতে অবশ্য বিজেপি সুবিধা করতে পারেনি। যদিও, ৩০ আসন বিশিষ্ট কেন্দ্রশাসিত পদুচেরিতে তাদের জোট ন্যাশন্যাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (এনডিএ) ১৮ আসন পেয়ে পুনরায় জিতেছে মুখ্যমন্ত্রী এন রাঙাস্বামীর নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক পার্টি সর্বভারতীয় এন. আর. কংগ্রেসের (এআইএনআরসি) কল্যাণে (১২টি আসন), কিন্তু, বিজেপির সেখানে গতবারের ছয়টির চেয়ে দুটি আসন কমেছে।
১৪০ আসনের কেরালাতে লড়াই হয়েছে মূলত বাম-গণতান্ত্রিক দুটি জোটের মধ্যে। যার একটি লেফট ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (এলডিএফ) নেতৃত্ব দিয়েছে টানা দুই আমলের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (সিপিএম), অপরটি ইউনাইটেড ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউডিএফ) নেতৃত্ব দিয়েছে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস। বিজেপি নেতৃত্বাধীন এনডিএ কেরালায় অতি দুর্বল হলেও গতবারের শূন্য আসনের তুলনায় তাদের ৩টি আসন বেড়েছে। এই নির্বাচনে ১০২টি আসন পেয়ে ফের ক্ষমতায় ফিরল ইউডিএফ, যার মধ্যে কংগ্রেস পেয়েছে ৬৩টি আসন। গতবার ৯৯টি আসন পাওয়া এলডিএফ এবার পেয়েছে ৩৫টি। এর মধ্য দিয়ে ভারতে বামদুর্গের শেষ স্মারক হিসেবে টিকে থাকা কেরালাতেও পতন ঘটল কমিউনিস্ট সরকারের!
এই ফলাফলগুলো আমাদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে আদতে কোনো ‘ফিক্সড’ আদর্শিক প্রবণতা আপাতত দেখা যাচ্ছে না। কোথাও পুরোনো রাজনীতির আদর্শিক ধারার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। কোথাওবা নতুনের মোড়কে পুরোনো রাজনৈতিক আদর্শের প্রত্যাবর্তন ঘটেছে। কোথাও আবার এসেছে একদম নতুন মুখ। মোটাদাগে, এই আদর্শিক প্রবণতাকে আমরা চারটি ভাগে ভাগ করতে পারি: গণতান্ত্রিক-উদারপন্থি জাতীয়তাবাদী ধারা, নয়া গণতান্ত্রিক-উদারপন্থি ধারা, বাম-গণতান্ত্রিক ধারা এবং ডানপন্থি রক্ষণশীল ধারা।
এই আদর্শিক প্রবণতার ভিত্তিতে বলা যেতে পারে যে, উপমহাদেশের উত্তরে নেপালে বামপন্থিদের পতন ঘটেছে গণ-অভ্যুত্থানে, কিন্তু দক্ষিণে শ্রীলঙ্কায় বামপন্থিরা রাষ্ট্রক্ষমতায় এসেছে। কেরালায় বামপন্থিদের পরাজয় ঘটেছে, যাকে ১৫ বছর আগে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বামদের পতনের মতোই অশনি সংকেত হিসেবেও অনেকে পাঠ করতে শুরু করেছেন। কিন্তু, রাজনীতিতে পরাজয় হলেও, পশ্চিমবঙ্গ-কেরালায় বামসংস্কৃতি পুরোমাত্রায় নিমজ্জিত হয়নি বলে, এই রাজ্যগুলো ভবিষ্যতে নতুন শ্রীলঙ্কা হয়েও উঠতে পারে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে সবচেয়ে পুরোনো জাতীয়তাবাদী ধারার পতন ও কার্যক্রম নিষিদ্ধকরণের পর আরেকটি অন্যতম পুরোনো জাতীয়তাবাদী শক্তি ফিরে এসেছে, যেমনটা ফিরেছে কেরালায়। বিরোধী বেঞ্চে থাকলেও, বাংলাদেশে ডানপন্থি রক্ষণশীল ধারা আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, যেখানে যোগ দিয়েছে কোনো ধরনেরই স্বাতন্ত্র্য রাজনীতির আদর্শ প্রমাণ করতে না পারা অভ্যুত্থানোত্তর নতুন শক্তি। পশ্চিমবঙ্গে মাত্র ১০ বছর আগেও যে ডানপন্থিদের তেমন খোঁজ-খবর সে মাত্রায় ছিল না, তারা প্রথমবারের মতো ক্ষমতায় গেছে। আসামেও তাদেরই প্রত্যাবর্তন ঘটেছে। বাংলাদেশে যে ভবিষ্যতে পশ্চিমবঙ্গ-আসামের চিত্র ফুটে উঠবে না, সেটাও বলা যায় না। মজার বিষয় হলো, বাংলাদেশ বা পশ্চিমবঙ্গে ডানপন্থিরা একদা যাদের অভিন্নহৃদয় মিত্র ছিল, সেই ভূতপূর্ব মিত্রদেরই এখন তুমুলভাবে চ্যালেঞ্জ করে বসেছে ডানপন্থিরা!
ঠিক এ জায়গায় এসে, দ্বিদলীয় বৃত্তের মধ্যে ঘুরপাক খাওয়া বাংলাদেশের রাজনীতির চেয়ে আলাদা বৈশিষ্ট্য তৈরি হয়েছে শ্রীলঙ্কায়। আবার, শ্রীলঙ্কার চেয়ে আলাদা হয়েছে নেপাল। সেই সূত্রে ভারতের বাকি রাজ্যগুলোর বিপরীতে তামিলনাড়ুও।
তামিলনাড়ু এখন আরেক নেপাল (কিংবা শ্রীলঙ্কাও)
তামিলনাড়ু নিঃসন্দেহে নেপালের রূপ নিয়েছে। সেটা শুধু এই অর্থে নয় যে, নেপালের মতো সেখানেও একজন শিল্পীর নেতৃত্বে সরকার গঠিত হয়েছে। বরং সেটা আরও বড় আকারে বললে, নেপালের মতো তামিলনাড়ুতেও জনগণ নতুনদের রাজনীতিকে সমর্থন জানিয়েছে। তামিলনাড়ু অবশ্য শ্রীলঙ্কারও প্রতিমূর্তি হয়ে উঠেছে। শ্রীলঙ্কায় যেমন দ্বিদলীয় প্রধান বৃত্ত ভেঙে নতুন বলয় তৈরি হয়েছে, তামিলনাড়ুর নির্বাচনেও যুগান্তরের পুরোনো দ্বিদলীয় বৃত্ত ভেঙে নতুন ধারার রাজনীতির উদ্বোধন হয়েছে।
তামিলনাড়ুর এ নির্বাচন এ দফায় অপরাপর ভারতীয় রাজ্যগুলোর বিধানসভা নির্বাচনের মধ্যে নিঃসন্দেহে সবচেয়ে তুমুল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়েছে। শুধু নির্বাচনই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হয়নি, নির্বাচনোত্তর সরকার গঠন প্রক্রিয়াও হয়েছে চরম নাটকীয়। নির্বাচনের অনেক আগে থেকেই দক্ষিণ ভারতের এই বৃহত্তম বিধানসভায় ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস ছিল। দেখা গেল, আভাস সত্যে পরিণত হয়েছে এবং সেটা এতটাই যে, এই রাজ্যের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ঝুলন্ত বিধানসভা হতে চলেছে।
কোনো দল বা জোটই এখানে ২৩৪টির মধ্যে প্রয়োজনীয় ১১৮টি আসন পায়নি। তবে, তাক লাগিয়ে দিয়েছে তামিল অভিনেতা চন্দ্রশেখরান জোসেফ বিজয় তথা থালাপতি বিজয়ের নেতৃত্বাধীন নতুন দল তামিলাগা ভেট্টেরি কাজাগাম (টিভিকে)। প্রথমবারের মতো প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে তারা রাজ্যের সংখ্যাগরিষ্ঠ পার্টি হিসেবে ১০৮টি আসনই শুধু পায়নি, বিগত অর্ধশতকের মধ্যে (১৯৬৭ সালের পর) এই প্রথম দ্বিদলীয় দ্রাবিড়-দুর্গের রাজত্বে ছেদ ঘটাতেও সক্ষম হয়েছে তারা।
দুই দ্রাবিড়িয়ান পার্টি, সর্বশেষ ক্ষমতাসীন এম. কে. স্ট্যালিনের নেতৃত্বাধীন দ্রাবিড়া মুন্নেত্রা কাজাগাম (ডিএমকে) এবং তাদের চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী রাজ্য বিরোধীদল ই. কে. পলানিস্বামীর নেতৃত্বাধীন সর্বভারতীয় আন্না দ্রাবিড়া মুন্নেত্রা কাজাগাম (এইআইএডিএমকে) পেয়েছে যথাক্রমে ৫৯ ও ৪৭টি করে আসন। আর জোটগতভাবে তারা পেয়েছে যথাক্রমে ৭৩ ও ৫৪টি আসন। এর মধ্যে ডিএমকের সেক্যুলার প্রোগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স (এসপিএ) জোটসঙ্গী কংগ্রেস পেয়েছে ৫টি আসন। আর এইআইএডিএমকে+ জোটসঙ্গী বিজেপি পেয়েছে মাত্র ১টি আসন।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের আগে এই রাজ্যে বিজেপি নেতৃত্বধীন এনডিএ জোট ভেঙে যায়, উভয় পার্টিই পৃথক জোট হিসেবে লড়াই করে কোনো আসন জিততে পারেনি। বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক এক বছর আগে তারা আরও কয়েকটি দলকে সঙ্গে নিয়ে স্ট্যালিন সরকারবিরোধী এইআইএডিএমকে+ জোট গঠন করলেও, ‘আম্মা’ খ্যাত প্রয়াত নেত্রী কুমারী জয়ললিতার দলটির ২০১৬ সালের পর আবার ক্ষমতায় ফেরার স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেল! উল্টো দ্বিদলীয় পুরোনো বৃত্ত ভেঙে নতুন দল হিসেবে সরকার গঠন করল সামাজিক সাম্য ও ন্যায়বিচার এবং ধর্মনিরপেক্ষতাকে আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা টিভিকে।
তবে, টিভিকের এই ক্ষমতায় আরোহন খুব সহজসাধ্য পথে এলো না। যেহেতু, একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা তারা পায়নি, ফলে, ঝুলন্ত বিধানসভায় সরকার গঠনের উদ্দেশ্যে মাত্র ১০টি প্রয়োজনীয় আসনের জন্য তাদের অন্যদের মুখাপেক্ষী হতে হয়েছে। কম আসন পাওয়া কয়েকটি দলের মৌখিক সম্মতি আদায়ের পর বিজয় রাজ্যপালের সঙ্গে দেখা করেছেন পরপর চারদিনে চারবার। প্রতিবারই রাজ্যপাল তাকে ফিরিয়ে দিয়েছেন এই বলে যে, সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণিত হয়নি।
পূর্বপ্রথা অনুযায়ী, সাধারণত রাজ্যপালেরা সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতাকে আমন্ত্রণ জানান সরকার গঠনের এবং অ্যাসেমব্লিতে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণের জন্য সময় দেন। অভিযোগ উঠেছে, তামিলনাড়ুর রাজ্যপাল সে সুযোগও বিজয়কে দেননি, কারণ কেন্দ্রীয় সরকার ভিন্ন কৌশলে বিজয়ের দলকে ক্ষমতার বাইরে রাখতে চাইছিল এবং রাজ্যপাল যেহেতু কেন্দ্রীয় সরকারের দ্বারা নিয়োগকৃত ফলে তিনি সেই কৌশল বাস্তবায়নে ভূমিকা পালন করছিলেন। একটা পর্যায়ে তো এমন আশঙ্কাও তৈরি হয়ে যাচ্ছিল যে, হয়তো এই রাজ্যে কোনো দলই প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে না পারলে ভারতীয় সংবিবান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির শাসন জারি হয়ে যাবে!
সেটি নিঃসন্দেহে জনপ্রত্যাশার বিপরীত ফল বয়ে আনত। তবে, সেই চেষ্টা চলেছে বৈকি! নতুন দল টিভিকের এই আসন্ন স্বল্পতার দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে তাদের ব্রাত্য করে দেওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছিল তামিলনাড়ুর দুই পুরোনো দল। আশ্চর্যজনকভাবে সেটা এতটাই রাজনৈতিক কদর্যরূপে যে, পুরোনো দুই দল একজোট হয়ে সরকার গঠন করে ফেলতে পারে বলেও বাতাসে গুঞ্জন ছিল! কিন্তু, মুশকিল হলো, তাদের নেতৃত্বাধীন দুই জোটের মোট প্রাপ্ত আসন ১১৭, যা ম্যাজিক নম্বর থেকে মাত্র এক কম।
অবশ্য সেই গুঞ্জন আরও ভেস্তে গেছে কংগ্রেস ও বামপন্থি কয়েকটি পার্টির অবস্থানের কারণে। দুই প্রাদেশিক দলের কাছাকাছি আসার গুঞ্জন থাকলেও, জাতীয় পর্যায়ের এই পার্টিগুলো বিজেপি নেতৃত্বাধীন এইআইএডিএমকে+ জোটের সঙ্গে সরকারে যেতে রাজি হয়নি বলেই খবর। বরং, তারা নতুনের আহবানকে স্বাগত জানিয়েছে, সমর্থন জানিয়েছে বিজয়ের ওড়ানো নতুনের কেতনকে।
তামিলনাড়ুতে ডিএমকের জোটসঙ্গী কংগ্রেসের পাঁচটির পাশাপাশি দুটি করে আসন পাওয়া ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিআই), ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি-মার্কিস্ট (সিপিএম), দলিতদের দল বিদুথালাই চিরুথাইগাল কাচি (ভিসিকে) এবং ভারতীয় ইউনিয়ন মুসলিম লীগ (আইইউএমএল) থালাপতি বিজয়কে সমর্থন দেওয়ায় সরকার গঠনের জন্য ১২০টি আসন পক্ষে পেয়ে যান তিনি। অবশেষে এই দলগুলোর লিখিত ও শর্তহীন সম্মতি নিয়ে বিজয় যখন রাজ্যপালের কাছে গেছেন, তখনই কেবল নিশ্চিত হয়েছে যে তামিলনাড়ুতে অবশেষে দ্বিদলীয় বৃত্তের বাইরে নতুন রাজনৈতিক শক্তির সরকার গঠিত হতে যাচ্ছে।
শেষকথা
ভারতের আগামী লোকসভা নির্বাচন আড়াই বছর পরে, ২০২৯ সালে। সকলে যখন পশ্চিমবঙ্গে গেরুয়া উত্থান নিয়ে মগ্ন, তামিলনাড়ুতে তখন নিশ্চিতভাবেই নতুন মেরুকরণ হলো ভারতীয় রাজনীতির। ‘ইন্ডিয়া’ জোটের নেতা কংগ্রেস ভারতীয় রাজনীতির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য তামিলনাড়ুতে কার্যত দুটি ফ্রন্ট খুলে বসল। একদিকে রাজ্যের জোটসঙ্গী ডিএমকে প্রধান বিরোধীদলের ভূমিকা নেবে, অপরদিকে কয়েকটি সর্বভারতীয় মিত্রসহ তাদের সমর্থন গিয়েছে নতুন সরকারি দলের পক্ষে।
সন্দেহাতীতভাবেই কংগ্রেস বর্তমান জনসমর্থনের দিকে ঝুঁকেছে। কিন্তু, দীর্ঘদিনের মিত্র ডিএমকে চাপাচাপি করলে কংগ্রেস মহাগুরুত্বপূর্ণ জাতীয় নির্বাচনের আগের এই সময়টিতে কী পদক্ষেপ নেয় সেটি আকর্ষণীয়ভাবে দেখার বিষয় হবে। অনেকের আশঙ্কা, থালাপতি বিজয়ের এই সরকারের মেয়াদ হতে পারে ছয় মাস! তবে, কাণ্ডজ্ঞান বলে, কংগ্রেস অন্তত আড়াই বছর সমর্থন রেখে বিজয়ের জনপ্রিয়তাকে লোকসভা নির্বাচনে কাজে লাগাবে।
সত্য যে, উপমহাদেশের জটিল রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন ‘বিজয়’ কেতন উড়ালেন থালাপতি। নেপালের মতো, শ্রীলঙ্কারও মতো। এই নতুনের উদ্বোধনকে আগলে রাখল উদারপন্থি কয়েকটি গণতান্ত্রিক দল। কিন্তু, শঙ্কাটাও থেকে গেল। কতদিন উড়বে এই ‘বিজয়’ কেতন? বহু বছর? নাকি বরাবরের মতোই উপমহাদেশের পঙ্কিল রাজনীতির কবলে স্বল্পসময়েই পতিত হবে নব-নবীনের এই উত্থান?