Published : 08 Jan 2026, 02:12 PM
নভেম্বরের শেষ সপ্তাহে রাজশাহী থেকে লালমনিরহাটের পথে ভ্রমণ শুরু করি, যা শুধু আমার জীবনে সাদামাটা কোন ভ্রমণ নয়, উত্তরাঞ্চলের গ্রামীণ জীবনের গভীরতা অনুভব করার একটা সুবর্ণ সুযোগ ছিল। ছোটবেলার বন্ধু, রুয়েটের পদার্থ বিজ্ঞানের অধ্যাপক নুরুজ্জামান লেনিনের আমন্ত্রণে তার দেশের বাড়িতে পৌঁছে টানা তিন দিন ধরে পুরো লালমনিরহাট জেলা চষে বেড়িয়েছি।
শহরের ভিড় থেকে গ্রামের নির্জনতা, বাজারের হাঁকডাক থেকে নদীর তীরে শীতের পাখিদের কোলাহল সবকিছুতেই একটি সতেজতা অনুভব করি। এ যেন ইট পাথরের জঞ্জাল থেকে সাময়িক মুক্তি। কিন্তু এই তিন দিনের যাত্রায় মোগলহাট স্থলবন্দরের ধ্বংসাবশেষ মনে এমন দাগ কেটে দিয়েছে যে, রাজশাহী ফিরে এসেও সেই ছবি মুছে যায়নি।
এই বন্দরটি শুধু একটি পরিত্যক্ত স্থাপনা নয়, লালমনিরহাটের অর্থনীতির অপূর্ণ সম্ভাবনার প্রতীক। ধ্বংসস্তূপে পরিণত এই স্থানটি চালু করার প্রয়োজনীয়তা এখন আরও স্পষ্টভাবে অনুভব করছি, কারণ এটি হাজারো মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।
প্রথম দিন লেলিনের বাড়িতে পৌঁছে স্থানীয় বাজারে ঘুরে বেড়াই যেখানে কথায় কথায় মোগলহাটের গল্প ওঠে আসে। এক বয়স্ক মুরুব্বি-গোছের ব্যবসায়ী ধীর কণ্ঠে স্মৃতিচারণ করেন ১৯৮৮ সালের সেই ভয়াবহ বন্যার কথা, যখন ধরলা নদীর ওপর রেল সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। আসলে এই ঘটনা শুধু সেতু নয় যেন একটি অঞ্চলের অর্থনৈতিক প্রাণশক্তিকে থামিয়ে দিয়েছে। স্থানীয়দের কথায়, একসময় এখানে গম, ভুট্টা, পাথর ও কয়লার মতো পণ্য আমদানি-রপ্তানি হতো এই বন্দর দিয়ে, যা স্থানীয় অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি ছিল। উল্লেখযোগ্য হলো, ১১৭ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত এই বন্দরটি এখন ধ্বংসাবশেষে পরিণত হয়েছে, যা রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে মাটিতে মুখ থুবড়ে পড়ে আছে। গ্রামের টংঘরে চা খেতে খেতে শুনলাম, ২০২৫ সালে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দাবিতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে, কিন্তু এখনও কোনো অগ্রগতি নেই।
দ্বিতীয় দিন সকালে লালমনিরহাটের বিভিন্ন গ্রাম এবং নদীতীরে ঘুরে বেড়াই যেখানে স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে আলাপে জানা গেলো, মোগলহাট বন্দর চালু থাকলে তাদের উৎপাদিত পণ্য ভারতে রপ্তানি সহজ হতো। এই প্রেক্ষাপটে, বন্দরটি চালু হলে ২৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতে পারে, যা লালমনিরহাটের অর্থনীতিকে চাঙ্গা করে তুলবে। নিঃসন্দেহে বলা যায়, এই বন্দরটি পুনরায় চালু হলে পণ্য আমদানিতে খরচ কমবে এবং ব্যবসায়ীদের লাভ বাড়বে। প্রাক্কলন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে স্থানীয় অর্থনীতিতে এই বন্দরের অভাবে প্রতি বছর প্রায় ৫০০ কোটি টাকার লোকসান হতে পারে। স্থানীয় কুলি এবং দিনমজুরদের কথায়, একসময় এখানে যে হাজার হাজার মানুষের জীবিকা নির্ভর করত, এখন তারা মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
এত সম্ভাবনা ও জনদাবি থাকা সত্ত্বেও কেন মোগলহাট স্থলবন্দর আজও অবহেলিত এই প্রশ্ন আমার মনকে বারবার কাঠগড়ায় দাঁড় করায়। বাস্তবতা হলো, এটি কেবল অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের অভাবে আটকে থাকা একটি প্রকল্প। সরকারের উন্নয়ন অগ্রাধিকারে উত্তরাঞ্চল দীর্ঘদিন ধরেই প্রান্তিক অবস্থানে রয়েছে। উপরন্তু, একই জেলায় অবস্থিত বুড়িমারী স্থলবন্দরকে কার্যকর বিকল্প ধরে নিয়ে মোগলহাটকে অপ্রয়োজনীয় মনে করার একটি প্রশাসনিক মনোভাব কাজ করছে। অন্যদিকে, ভারতের পক্ষ থেকেও গিতালদহ রুটে অবকাঠামো উন্নয়নে দৃশ্যমান আগ্রহ সীমিত, যা দ্বিপাক্ষিক বাস্তবায়ন প্রক্রিয়াকে শ্লথ করে রেখেছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সীমান্ত নিরাপত্তা, চোরাচালান ও অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্য নিয়ে রাষ্ট্রীয় উদ্বেগ। ফলে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, মোগলহাটের সমস্যা শুধু অর্থনৈতিক নয়। সমস্যার মূলে রয়েছে রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের সংকট, কূটনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতি এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে কার্যকর লবির দুর্বলতা। এই সবকিছুর যোগফলেই মোগলহাট আজ সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক অনীহার প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

যেহেতু বন্দরটি বন্ধ হয়েছে ১৯৮৮ সালের বন্যায়, সেহেতু এর পেছনে কারণ হলো ধরলা নদীর ওপরের সেতুর ক্ষয়ক্ষতি, যা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছে। ইটের রাস্তায় ভ্যানে করে গ্রামের মেঠো পথে যেতে যেতে স্থানীয়দের কথায় জানতে পারি একসময় এখানে ট্রেন চলত এবং পাসপোর্টধারী যাত্রীরা সহজে ভারতে যাতায়াত করতেন। এর পেছনে কারণ হলো, বন্দরটি চালু থাকলে ভারতের কোচবিহার জেলার গিতালদহের সঙ্গে মাত্র ৩ কিলোমিটার দূরত্বের সুবিধা কাজে লাগানো যেত। মোটাদাগে বলতে গেলে, এই বন্দরটি পুনরায় চালু হলে ভারতের সাতটি অঙ্গরাজ্যের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হবে। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, এই রুট চালু হলে পণ্য আমদানিতে খরচ কমবে এবং অর্থনীতি চাঙ্গা হবে। বিশ্বব্যাংকের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে লালমনিরহাটে বেকারত্বের হার প্রায় ১৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।
এই প্রেক্ষাপটে, দ্বিতীয় দিন বিকেলে মোগলহাট সাইটে পৌঁছে চোখে পড়ে জরাজীর্ণ অফিস ঘরগুলো, যা ভূতুড়ে বাড়ির মতো দাঁড়িয়ে আছে। স্থানীয় ভ্যান চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বন্দর চালু হলে গরিব মানুষের জীবন বদলে যাবে। উল্লেখযোগ্য হলো, স্থানীয় সংগঠনগুলোর দাবিতে আন্দোলন চলছে, যা ২০১৭ সাল থেকে মানববন্ধন এবং গোলটেবিল বৈঠকের মাধ্যমে অব্যাহত।
তৃতীয় দিন সকালে লালমনিরহাটের বিভিন্ন গ্রামে ঘুরে বেড়াই যেখানে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় যে, বন্দর চালু হলে তাদের উৎপাদিত পণ্য ভারতে রপ্তানি সহজ হবে। এর পেছনে কারণ হলো, বুড়িমারী স্থলবন্দরের দূরত্ব এবং অসুবিধা। বিভিন্ন মূল্যায়নে দেখা গেছে, এই বন্দর চালু হলে ভারতের সাতটি অঙ্গরাজ্যের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হবে। অভিজ্ঞতা দেখায়, স্থানীয়দের মতে, এই রুট চালু হলে পণ্য আমদানিতে খরচ কমবে।
মোগলহাট সাইটে ফিরে গিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সাথে আলাপকালে জানতে পারি বন্দর চালু হলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটবে। স্থানীয় সংগঠনগুলোর আহ্বায়কদের মতে, ২০১৭ সাল থেকে আন্দোলন চলছে। সামগ্রিকভাবে বিবেচনায় বলা যায়, এই বন্দর চালু হলে ২৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে।
ভ্রমণের তৃতীয় দিনে লেলিনের সঙ্গে স্থানীয় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে গিয়ে জানা যায় যে, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। উল্লেখযোগ্য হলো, ২০২৫ সালে স্থানীয় চেম্বার অব কমার্সের দাবিতে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
যদিও বন্দরটি চালুর দাবি দীর্ঘদিনের, তবু সত্য হলো যে, আগামী রাজনৈতিক সরকার এটি চালু করে শুভ সূচনা করতে পারে। অন্যদিকে, স্থানীয়দের অভিযোগ, আন্দোলন এবং আলোচনা সত্ত্বেও বন্দরটি অবহেলিত। তবে মনে রাখা দরকার, ২০১৬ সালে বিবিআইএন সভায় এই রুট চালুর গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। অথচ, ২০২৫ সালে স্থানীয় চেম্বার অব কমার্সের দাবিতে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে, কিন্তু ফলাফল শূন্য। বিপরীতে দেখা যায়, স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, এই রুট চালু হলে ভারতের কলকাতায় যাতায়াত সহজ হবে। এক্ষেত্রে প্রশ্ন উঠতে পারে যে, আগামী সরকার এটি চালু করে কীভাবে অর্থনৈতিক সূচনা করতে পারে।
ভ্রমণ শেষে রাজশাহী ফেরার পরেও মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে পুরো লালমনিরহাট জেলা ঘুরে বেড়ানোর পরও মোগলহাটের ছাপ সবচেয়ে গভীর। তবে স্বস্তির কথা স্থানীয় সংগঠনগুলোর দাবিতে আন্দোলন চলছে। এখানে সন্দেহ করার সুযোগ নেই এই বন্দর চালু হলে অর্থনৈতিক চিত্র বদলে যাবে। জাতিসংঘের সাম্প্রতিক মূল্যায়নের আলোকে করা প্রাক্কলনে দেখা যায়, ২০২৫ সালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪ শতাংশের কাছাকাছি থাকতে পারে।
স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় যে, বন্দর চালু হলে তাদের উৎপাদিত পণ্য ভারতে রপ্তানি সহজ হবে। আরো ভালোভাবে বলতে গেলে, এই বন্দর চালু হলে ভারতের সাতটি অঙ্গরাজ্যের সঙ্গে যোগাযোগ সহজ হবে। অভিজ্ঞতা দেখায়, স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মতে, এই রুট চালু হলে পণ্য আমদানিতে খরচ কমবে। লালমনিরহাট এমনিতেই একটি অনুন্নত জেলা। এখানে দারিদ্র্যের হার তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি, আর তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বেকারত্ব। এই বাস্তব চিত্রে দাঁড়িয়ে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মোগলহাট স্থলবন্দরটি অর্থনীতির পালস হতে পারে।
সবশেষে বলা যায়, রাজশাহী ফিরে আসার পরও সেই দুপুরের দৃশ্য মনে গেথে যায়–ভাঙা দালানের ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া রোদ, আগাছার ভেতর হারিয়ে যাওয়া রেললাইন, আর স্থানীয় মানুষের চোখে জমে থাকা অপেক্ষা। মোগলহাট আজও দাঁড়িয়ে আছে, ধ্বংসস্তূপে ঢাকা হলেও সম্ভাবনায় ভরা। প্রয়োজন শুধু সিদ্ধান্তের। সেই সিদ্ধান্ত গৃহীত হলেই, তিন যুগ ধরে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা এই অর্থনৈতিক অধ্যায়টি নতুন করে লেখা শুরু হতে পারে।