Published : 02 Oct 2025, 04:54 PM
দুর্গা পূজা এলেই নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা, সংকট ও তর্ক ওঠে। কিন্তু এই নিরাপত্তার তর্ক আজও প্রশ্নহীনভাবে অমীমাংসিত থেকে যায়। এক্ষেত্রে নিরাপত্তার প্রচলিত ডিসকোর্স একইসঙ্গে খণ্ডিত এবং স্টেরিওটাইপিক। দুর্গা পূজার কৃত্য-আয়োজন কৃষিজীবী সমাজের একটি নির্মাণ। তাহলে আজ এমন পরব-উৎসবের নিরাপত্তা-তর্ক কি কেবলমাত্র ‘মূর্তি ভাঙা’ বা ‘মণ্ডপ পাহারা’র ভেতর সীমাবদ্ধ থাকতে পারে?
দুনিয়ার সকল প্রার্থনা, কৃত্য ও পরব বিকশিত হয়েছে স্থানীয় বাস্তবতার বহুমাত্রিক সম্পর্কের মধ্যে— প্রকৃতি এবং সংস্কৃতির জটিল ব্যাকরণে। এই ব্যাকরণ নানা ভূগোলের নানাজীবনে নানা ভঙ্গি ও ব্যঞ্জনা নিয়ে বিকাশমান। যেমন, শারদীয় বা শরৎকালের দুর্গা পূজার আয়োজন আর বাসন্তী বা বসন্তকালের দুর্গা পূজার আয়োজন এক নয়। সাঁওতালসহ কিছু আদিবাসী জাতি হুদুড় দুর্গা পালন করে; মূলত মহিষাসুরের কৃত্য স্মরণ করে এবং দাসাই নৃত্যগীতি পরিবেশন করে।
বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, এমনকি ইন্দোনেশিয়ায় দুর্গা ছড়িয়ে আছে নানা রূপে, নানা ভূগোলে। কোন দুর্গা নিম্নবর্গের, কোন দুর্গা অধিপতির— কে কার দুর্গার ইতিহাস ছিনতাই করেছে—এমন বিতর্কও দীর্ঘদিন ধরে চলছে। আবহাওয়া, প্রাণ-প্রকৃতি, উৎপাদন সম্পর্ক এবং স্থানীয় জীবনধারার ভেতর দিয়ে একই পরব-কৃত্যের আয়োজনে ভিন্ন ভিন্ন বহুমুখী বৈচিত্র্য সৃষ্টি হয়। হাওরাঞ্চল বা বরেন্দ্রভূমির দুর্গা পূজার গ্রামীণ আয়োজন একরকম নয়; উপকূল বা চা-বাগানের কৃত্য-আচারে স্বতন্ত্রতা রয়েছে।
এই বৈচিত্র্য ও ভিন্নতা বিশ্বের সকল পরব-উৎসবেই বিদ্যমান। যেমন, পাঙাল, মণিপুরী, মাল মাঙতা বা বাঙালি মুসলিমদের ঈদ আয়োজনে বহু স্থানীয় বৈচিত্র্য গড়ে উঠেছে। যদিও চলতি আলাপে আমরা সেসব টানছি না।যদিও চলতি আলাপে আমরা সেসব টানছি না। দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে উৎপাদনব্যবস্থা, ক্ষমতা-সম্পর্ক এবং বৈশ্বিক রাজনৈতিক দরবারের ভেতর দিয়ে ‘নিরাপত্তার’ বিষয়টি কিছুটা বোঝার চেষ্টা করব। এক্ষেত্রে দুর্গা পূজার নিরাপত্তা-ডিসকোর্সে একটি জরুরি মৌলিক প্রশ্ন হাজির করতে চাই। আমরা কোনোভাবেই ভুলে যাইনি যে কোকা-কোলা, পেপসি, নেসলে, মনস্যান্টো, সিনজেনটা, রেথিয়ন, বোয়িং, ম্যাকডোনাল্ডস, ল্যাকমে, মাইক্রোসফট, ফেইসবুক, স্টারলিংক, শেভরন কিংবা এডিডাসের মতো বহুজাতিক মনিবেরা আজ দুনিয়াকে জিম্মি করেছে। কিংবা জাতিরাষ্ট্রের সকল সীমারেখা চুরমার করে দিয়ে নতুনভাবে তৈরি হচ্ছে ডিজিটাল বর্ডারের উপনিবেশ। দুর্গাপূজাকেও এই নয়াউদারবাদী খবরদারির ভেতরেই জারি থাকতে হয়। একইসঙ্গে জাতিরাষ্ট্রের বাইনারি, বলপ্রয়োগ, বর্ণবাদ কিংবা বৈষম্যের আঘাতকেও সামাল দিতে হয়।
দুর্গা পূজার সঙ্গে সরাসরি মিশে আছে দুটি ঋতু—শরৎ ও বসন্ত, অর্থাৎ শারদীয় এবং বাসন্তী দুর্গা পূজা। এই যে আবহাওয়া, প্রতিবেশ, উৎপাদনব্যবস্থা, স্থানীয় প্রাণ-প্রকৃতির সঙ্গে জটিল সন্ধিতে গড়ে ওঠা দুর্গা পূজার নিরাপত্তার আলাপ কি কেবলমাত্র ‘প্রতিমা বা মন্দির’ ভাঙা বা পাহারার সঙ্গেই সম্পর্কিত? যখন শরৎ আর বসন্তই বদলে যাচ্ছে, তখন দুর্গা পূজার আদল, আবহ, আয়োজনও রূপান্তরিত হতে বাধ্য হচ্ছে। নিষ্ঠুরভাবে বদলে ফেলা আজকের কৃষিউৎপাদনব্যবস্থায় দুর্গাপূজার নিরাপত্তার মৌলিক জিজ্ঞাসা কী হবে? নিদারুণভাবে খুন হওয়া চারধারের প্রাণ-প্রকৃতির লাশের ওপর দাঁড়িয়ে দুর্গাপূজার নিরাপত্তা কি কোনো বাহিনী বা এজেন্সি দিতে পারে?
‘দুর্গাপূজায় মদ-গাজার আসর বসে’—স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার এমন একটি বর্ণবাদী বাইনারি উসকানি দুর্গাপূজার ইতিহাসে এক নতুন সংযোজন। এমন বক্তব্য জুলাই গণঅভ্যুত্থানের বহুত্ববাদী দ্রোহকে আঘাত করে এবং জনসংস্কৃতি বিষয়ে আমাদের প্রবল অনাগ্রহের সীমাকেও প্রকাশ করে। বাংলাদেশের দুর্গাপূজার মেলার ইতিহাস ঘাঁটাঘাঁটি করে কোথাও উপদেষ্টার বক্তব্যের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। যদিও দুর্গাপূজায় মেলা আয়োজন দেশের মেলার ইতিহাসে খুব বড় কোনো ঘটনা নয়।
যদিও দুর্গাপূজায় মেলা আয়োজন দেশের মেলার ইতিহাসে খুব বড়কিছু নয়। বারুণী, মহররম, ঈদ, রথযাত্রা, রাজপূণ্যাহ, কারাম, অষ্টমীস্নান ঘিরে এমন পরবমধর্মী মেলার আয়োজন হয়। যা পৌষ, চৈত্র বা বৈশাখের মেলার মতো বহুমাত্রিক নয়।
রংপুরের মাহিগঞ্জে পরেশনাথ মন্দিরের দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে শত বছর ধরে গ্রামীণ মেলার আয়োজন হয়। বগুড়ার মালতিনগর বারোয়ারি মন্দিরের দুর্গা পূজার মেলা বা নেত্রকোণার কেন্দুয়ার দুর্গা পূজার মেলাও প্রাচীন। কিন্তু কোনো দুর্গাপূজার মেলাতেই ‘মদ-গাঁজার’ আসরের কোনো হদিশ নেই। দেশব্যাপী বিতর্ক ওঠার পরেও রাষ্ট্রের তরফ থেকে এর কোনো প্রামাণ্য ব্যাখা হাজির করা হয়নি।
তবে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার এই বক্তব্য স্পষ্ট করেছে জনইতিহাস এবং জনগণের যাপতিজীবনের প্রতি কোনো দায় বা দরদ রাষ্ট্রের নেই। যা হোক চলতি লেখাটি এসব বৈষম্যমূলক বাইনারি নিয়ে নয়। প্রতিনিয়ত জোরজবরদস্তি করে বদলে ফেলা কৃষি ও খাদ্য উৎপাদনব্যবস্থা, বিপর্যস্ত পরিবেশ এবং জলবায়ু সংকটের সময়ে দুর্গাপূজার নিরাপত্তা নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন হাজির করতে চায় আজকের আলাপ। দুর্গাপূজার সঙ্গে যেমন জড়িয়ে আছে প্রার্থনা, পরব, প্রাণ-প্রকৃতি, পুরাণ, প্রথা; তেমনি পুঁজি এবং পণ্যায়নের দস্যুতাও এর ময়দান দখল করে আছে।
লক্ষ্মী বা মনসার কৃত্য যেমন বাঙালি সনাতন হিন্দুর ঘরে ঘরে হয়, দুর্গাপূজা তেমন নয়। কিছু পারিবারিক, ‘বনেদী’ এবং সাবেকী বংশগত আয়োজন আছে। মূলত এই পরব সর্বজনীন এবং বারোয়ারি।
রামায়ণের বিবরণে রামচন্দ্র অকালে শরৎকালে দেবীর বোধন করেছিলেন বলে একে অকালবোধনও বলে। বাংলাদেশের রাজশাহীর রাজা কংস নারায়ণ ঘটা করে সর্বজনীন দুর্গাপূজার প্রচলন করেন। আবার ভারতের হুগলি জেলার বলাগড় থানার গুপ্তিপাড়ার আরেকটি ঘটনার কথাও জানা যায়।
১৭৯০ সালের দিকে বিত্তশালীদের প্রভাব কমে যাওয়ায় পূজা বড় আয়োজনগুলো প্রায় বন্ধ হওয়ার জোগার হয়েছিল। গুপ্তিপাড়ার বারোজন ইয়ার-বন্ধু মিলে নতুনভাবে বারোজনের পূজার আয়োজন করেছিলেন। ‘বারো ইয়ারের পূজা’ থেকেই ‘বারোয়ারি’ আয়োজনের চল হয়েছে।
দুর্গাপূজার প্রতিমা, প্যান্ডেল এবং বিলাসী জৌলুস নানাভাবেই নানাসময়ে নিয়ন্ত্রিত এবং প্রভাবিত হয়েছে। ব্রিটিশ উপনিবেশের সময় দুর্গাপূজাকে জমিদারশ্রেণি দখল করেছিল নিজেদের স্বার্থে। এমনকি নিপীড়ক ব্রিটিশ রানির মুখের আদলে দুর্গা প্রতিমা গড়তেও তারা বাধ্য করেছিল কারিগরদের।
দুর্গার আবহকে ব্যবহার করে নানামাত্রার রাজনীতি, শিল্পচর্চা কিংবা ক্ষমতার বাহাদুরি সবই চলমান। কিন্তু দুর্গাপূজার উপাচার এবং উপকরণের যে মহা সংকট এবং এই সংকটের জন্য দায়ী বৈশ্বিক নয়াউদারবাদী উৎপাদন বাণিজ্য ব্যবস্থার বাহাদুরি নিয়ে খুব একটা আলাপবাহাস নেই।
ষড়ঋতুর বাংলাদেশ আজ কত ঋতুর দেশ এটি এক দীর্ঘ তর্কের তল। অঞ্চল, ধর্মীয় গোষ্ঠী ও জাতিভেদে ঋতুভিত্তিক কৃত্য-উসবগুলো ভিন্ন ভিন্ন। প্রকৃতি জানান দেয় ঋতুর আর্বিভাব, প্রস্থান এবং সন্ধিক্ষণ।
প্রকৃতিতে তিতা জাতীয় শাকের উপস্থিতি জানান দেয় চৈত্র মাস শেষ হয়ে যাচ্ছে, বৈশাখ সমাগত। শাল-মহুয়া ফুটলে সাওঁতাল সমাজ বাহাপরব পালন করে। বিজু বা ভাতজরা ফুল চাকমা সমাজে বিজু উৎসবের নির্দেশনা। কাইকনো বা নাগেশ্বর ফুল ফুটলে চাকরা পাইংছোয়েত পালন করে। কোকিলের ডাক বসন্তের নির্দেশনা। তেমনি শরতের প্রতীক শিউলি ও কাশফুল।
দুর্গাপূজায় বহু শস্যফসলাদি লাগে, বহু স্থানের মাটি লাগে, প্রবহমান ধারার জল লাগে, পত্র-পুষ্পাদি লাগে। দুর্গাপূজায় ১০৮টি পদ্মফুল লাগে। আজ গ্রাম থেকে গ্রাম কোথাও পদ্মফুল মিলছে না আশ্বিন মাসে। কারণ বিগত কয়েকবছর ধরে ভাদ্র মাসে অসময়ে বৃষ্টির কারণে পদ্মফুলের কলি, ডাঁটা ও কন্দে পঁচন ধরছে। হাওরাঞ্চলে দেশি বোরো এবং অধিকাংশ অঞ্চলে আমনের দেশি জাতের ধান লাগে পূজায়। কৃষক পরিবারের নারীরা নিয়মকরে মওসুমের এই ধান পবিত্র শস্য হিসেবে সংরক্ষণ করেন। এমনকি বীজ ও জাত বাছাইয়ের ক্ষেত্রে এসব সংরক্ষিত ধানের ছড়া ব্যবহৃত হয়। দুর্গাভোগ, দুর্গামালতি, দুর্গা শাইল এমন ধানজাত গুলো বিশেষভাবে দুর্গাপূজার কৃত্যের জন্যই কৃষকেরা উদ্ভাবন করেছিলেন।
কিন্তু রাষ্ট্র দেশি ধান চাষ বন্ধ করেছে নানান আগ্রাসী বাণিজ্যের ভেতর দিয়ে। দেশি ধানের আকালের দুনিয়ায় তাহলে দুর্গাপূজার নিরাপত্তার মৌলিক জিজ্ঞাসাটি কোথায়? যখন গ্রামজনপদ এবং প্রকৃতি থেকে এসব প্রাণসত্তা হারিয়ে যাচ্ছে তখন দুর্গাপূজার নিরাপত্তা কেবল ‘মূর্তি আর মন্দির পাহারা দিয়ে’ কীভাবে সম্ভব? মেদবহুল এই নির্দয় পুঁজিঘন সময়ে অর্থ, ক্ষমতা আর বাহাদুরি দিয়ে সব কী এইসব উপাচার ও উপকরণের সুরক্ষা সম্ভব?
দুর্গাপূজার নবপত্রিকা আমার বহুল আগ্রহের জায়গা। অনেকে বলেন ‘কলাবউ’। দুর্গার ডানে শাড়ি পরানো এই কলাবউ অন্য প্রতিমার জৌলুসে অনেকটাই আড়াল হয়ে যান।
নবপত্রিকা কৃত্যের জন্য পত্র-বিটপ-মূলসহ দশটি উদ্ভিদ প্রজাতির দরকার। কলাগাছ, বনকচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মানকচু, আমন মওসুমের ধানগাছ ও সাদা অপরাজিতা। পূজার আয়োজনে আমন মওসুমের ধান, যব, মুগ, মাষকালাই, তিল বা সাদা-সরিষা এই পঞ্চশস্য দরকার হয়। দূর্বা, তুলসী, বেল, আম পাতা, হরিতকীসহ বহু ফুল প্রয়োজন হয়। এছাড়া মধু, ঘি, সরিষার তেল, গোমূত্র, দুধসহ বহু উপাচার উপকরণ দরকার হয়।
সকল পত্র-পুষ্প সংগ্রহের আবার দারুণসব আচার আছে। ফল ধরেছে এমন গাছ থেকেই আম্র্রপল্লব সংগ্রহ হয়। এমনকি দুর্গা প্রতিমা গড়তে রাজবাড়ি, চার রাস্তার মোড়, কৃষিজমি, বেশ্যালয়, নদীর তীর ও ইঁদুরের গর্তের মাটি একত্রে মেশানো হয়। অনেকে একে এক শ্রেণিগত ঐক্য হিসেবে বিবৃত করলেও, এটি বরং বাস্তুতন্ত্রের বৈচিত্র্য ও ভৌগোলিক প্রতিবেশ ভিন্নতাকে সম্মিলন করে।
সিংহবাহিনী হলেও দুর্গার বাহন হাতি, পালকি, ঘোড়া, নৌকা। কৈলাস থেকে মর্ত্যে আসা-যাওয়ার ক্ষেত্রে দুর্গার এই বাহনতথ্য মূলত একধরণের পূর্বাভাস পঞ্জিকা। হাতিতে আগমন ও ফেরা সুজলাসুফলা বসুন্ধরার নির্দেশনা। নৌকায় আগমন মানে শস্য ও ধনসম্পদ নিয়ে আসা কিন্তু নৌকায় গমন বন্যা ও ক্ষয়ক্ষতি নির্দেশ করে। ঘোড়া ও পালকিতে যাতায়াত মহামারী, ফসলের ক্ষয়ক্ষতি ও যুদ্ধ অস্থিরতার ইঙ্গিত জানান দেয়।
আজ জলবায়ু-দুর্গত সময়ে কতভাবে আমরা দুর্যোগের পূর্বাভাস জানতে চাই। বহুভাবে প্রমাণিত হচ্ছে লোকায়ত পূর্বাভাস পঞ্জিকা ও প্রকৃতির নির্দেশনা দুর্যোগ ঝুঁকি মোকাবেলা ও সংকট সামালে অধিক উপযোগী।
কোনো দশাসই প্যান্ডেল বা প্রতিমার বিলাসী প্রতিযোগিতা নয়; দুর্গা পূজায় মূলত স্থানীয় প্রাণপ্রকৃতি থেকে আহরিত উপকরণ, দেশি শস্যফসল এবং স্থানীয় পেশাজীবী সমাজের উৎপাদন লাগে। কামার, কুমার, কৃষক, জেলে, তাঁতি, কারিগর, বাদক, ময়রা প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল সব শ্রেণিপেশার সম্মিলন। দুর্গাপূজার নানা কৃত্য ও আচার সম্পর্কিত সকল প্রাণপ্রজাতি, মাটি, জল, শস্যফসল, বাহন সহজভাবে প্রাণ-প্রকৃতির এক জটিল সম্পর্ককে হাজির করে।
কিন্তু এই প্রাণপ্রজাতি, প্রতিবেশ এবং কৃষিউৎপাদন ব্যবস্থা আজ দুনিয়াব্যাপী বিপন্ন ও বিষণ্ন। দুর্গাপূজা আয়োজনের জন্য মাটি, পুষ্পপল্লব, দেশি ধান, শস্যদানা আজ নিদারুণভাবে বিরল। কিন্তু কেন?
এই প্রশ্নটি খোদ রাষ্ট্রের উৎপাদনসম্পর্ক বিষয়ক মৌলিক সিদ্ধান্ত এবং উন্নয়নচিন্তার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। বরাবরই রাষ্ট্র ও এজেন্সি উৎপাদনসম্পর্কের এই মৌলিক প্রশ্নকে সমসময় আড়াল করে রাখে এবং পাশ কাটিয়ে যায় এবং আমাদের সামনে নানাবিধ বাইনারি আর প্রতারণামূলক উসকানি হাজির করে। কারণ বাংলাদেশের কৃষিউৎপাদনব্যবস্থা বদলে ফেলার সঙ্গে দেশীয় ক্ষমতাবলয়, মুনাফাখোর ও সুবিধাভোগী লুটেরা শ্রেণি জড়িত।
দুর্গা প্রতিমার কাঠামোতে কৃষিজমির মাটি লাগে। প্রতিদিন খুন হচ্ছে কৃষিজমি। কৃষিজমিনে বহুজাতিক বিষ ও সিনথেটিক সার ব্যবহারের কারণে মাটির গঠন ও শ্রেণিতে ভয়াবহ পরিবর্তন এসেছে।
ভিয়েতনামের বিপ্লবীদের হত্যার জন্য এজেন্টঅরেঞ্জ ব্যবহারের জন্য দায়ী মনস্যান্টো কোম্পানির রাউন্ডআপ কিংবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে গণহত্যায় অভিযুক্ত বায়ার কোম্পানির এন্ট্রাকল বিষে আজ দেশ সয়লাব।
বহুজাতিক কোম্পানির বিষে নিহত ও দূষিত মাটি দিয়ে কী দুর্গা প্রতিমা গড়া সম্ভব? দুর্গা পূজায় দূর্বা ঘাস, জয়ন্তী ও বনকচু লাগে। কিন্তু তথাকথিত চলমান আধুনিক রাষ্ট্রীয় কৃষিউন্নয়ন প্রকল্প এমন খাদ্য ও ওষুধি প্রজাতিদের ‘আগাছা’ নাম দিয়ে মেরে ফেলার বৈধতা দিয়েছে। বহুজাতিক কোম্পানির হার্বিসাইড দিয়ে এমন প্রাণপ্রজাতির বিনাশ করা হয়।
বাংলাদেশের কৃষকেরা এই বিষের নাম দিয়েছেন ‘ঘাসমারা বিষ’। রাষ্ট্র একইসঙ্গে ঘাসমারা বিষের অনুমোদন দিয়ে আবার দুর্গাপূজার নিরাপত্তা কীভাবে প্রত্যাশা করে? স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা কিন্তু একইসঙ্গে কৃষি উপদেষ্টাও, দেশের কৃষিজমি এবং প্রাণবৈচিত্র্য সুরক্ষায় তার দায় ও দরদ থাকা জরুরি। বরং জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র বিদেশ থেকে আরা বেশি রাসায়নিক বিষ আনার জন্য আমদানি শুল্ক কমিয়ে দিয়েছে। এখনো পর্যন্ত কার্যকর হয়নি কৃষিজমি সুরক্ষা আইন।
পূজার আয়োজনে আমন মওসুমের ধান, যব, মুগ, মাষকালাই, তিল বা সাদা-সরিষা এই পঞ্চশস্য দরকার হয়। কিন্তু রাষ্ট্র এসব শস্যবৈচিত্র্য সুরক্ষায় কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। দেশি ধানের আবাদে নির্দয়ভাবে অমনোযোগী থেকেছে। কেবলমাত্র উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড ধানকে উৎসাহিত করার ভেতর দিয়ে দেশের শস্যফসলের বৈচিত্র্যকে নিশ্চিহ্ন করেছে। আর এসব কিছুই ঘটেছে বিষ-সার-কৃত্রিম সেচ ও কোম্পানির বীজ নির্ভর বৈশ্বিক ‘সবুজবিপ্লব প্রকল্প’ বাস্তবায়নের জন্য। যে প্রকল্পকে মদদ দিয়েছে বহুপাক্ষিক ব্যাংক, আন্তজার্তিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বহুজাতিক কোম্পানি এবং জাতিরাষ্ট্রসমূহের ক্ষমতাকাঠামো।
সবুজ বিপ্লবের নামে এই প্রকল্প গ্রামীণ কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা চুরমার করে দিয়ে কৃষকের কাছ থেকে কৃষিকে ছিনতাই করে বহুজাতিক কোম্পানির জিম্মায় বন্দি করেছে। দুর্গা পূজায় প্রবাহমান জলধারার পানি লাগে। কিন্তু নদী, হাওর, বাওড়, খাল, খাঁড়ি, ঝিরি, ছড়া দেশের সকল প্রবাহই আজ প্রাণবিনাশী উন্নয়নের দখল ও দূষণে আক্রান্ত। একইসঙ্গে উজানের বাঁধ-বাহাদুরি এবং ট্রান্সবাউন্ডারি রিভার ডিকটেটরশিপ দেশের পানিপ্রবাহ প্রণালীকে রক্তাক্ত করে রেখেছে।
পূজায় বহু দেশি ফলফলাদি ও পত্রপল্লব লাগে, কিন্তু বিগত সময়ে রাষ্ট্র দেশে একাশিয়া-ইউক্যালিপটাসের মতো আগ্রাসী গাছের বৈধতা দিয়ে দেশীয় বৃক্ষপ্রজাতির বিকাশে বিঘ্ন ঘটিয়েছে। যদিও ইন্টেরিম সরকার এসব আগ্রাসি গাছ নিষিদ্ধ করেছে। দেশে রাষ্টীয় বৈধতায় প্লাস্টিক বাণিজ্য দশাসই হয়েছে, যার একটা বড় ভোগান্তি সামাল দিতে হচ্ছে কুমার বা মাটির কারিগরদের। অথচ পূজায় কুমারদের তৈরি মাটির তৈজস এক জরুরি উপকরণ।
দেশব্যাপী বাণিজ্যিক কলাবাগান বিস্তৃত হলেও, পূজায় দেশীয় জাতের কলাগাছই নবপত্রিকা বানাতে ব্যবহৃত হয়। দশমীর দিনে যাত্রাকৃত্যে ‘যাত্রা পুঁটি মাছ’ লাগে। আমিষ উৎপাদনের নামে তেলাপিয়া-পাঙ্গাস-সিলভারকার্পের উৎপাদন যেভাবে বেড়েছে, বিপরীতে নিখোঁজ হয়েছে যাত্রাপুঁটিসহ দেশীয় মাছের বৈচিত্র্য।
চলমান এইসব কৃষি ও খাদ্য উৎপাদন ব্যবস্থা এবং উন্নয়ন বাহাদুরি গ্রামীণ সমাজের ব্যাকরণ যেমন ভাঙছে এবং একইসঙ্গে আঘাত করছে প্রাণ-প্রকৃতি ও পরিবেশব্যবস্থাকেও। নয়াউদারবাদী ক্ষমতার এই উৎপাদনব্যবস্থায় দুর্গাপূজার নিরাপত্তাকে জনগণের উৎপাদনসম্পর্ক এবং উন্নয়নযন্ত্রণার ময়দান থেকেই প্রশ্ন করতে হবে। একইসঙ্গে এই পরবে দেশের নানা শ্রেণি-পেশা-ধর্ম-বর্গের মানুষের নানামুখী অংশগ্রহণ, সম্পর্ক এবং ঐতিহাসিকতাকে দেশের জনইতিহাসের পাটাতন থেকেই পাঠ করতে হবে। কোনো বাইনারি, বৈষম্য বা বর্ণবাদ উসকে দিয়ে দুর্গাপূজা আয়োজনের কৃষি ও পরিবেশ ইতিহাসকে গায়েব করা যাবে না।
এই অসম উৎপাদনব্যবস্থার ভোগান্তি এবং বিচ্ছিন্নতা কেবলমাত্র হিন্দু বা কোনো একক বর্গের নয়, মুসলিমসহ দেশের আপামর বাঙালি কী আদিবাসী সকল জনগণেরই। দেশের গ্রামীণ কৃষক নিম্নবর্গের। দুর্গাপূজার প্রতিমা বা প্যান্ডেল বা মন্দির সুরক্ষা একপাক্ষিক দৃশ্যমান নিরাপত্তাকে হাজির করলেও, এই আয়োজনের কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা নিহিত আছে জনগণের সার্বভৌম কৃষিব্যবস্থা এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনায়। রাষ্ট্রকে জনগণর বয়ান ও বিবরণ থেকেই এই নিরাপত্তা বলয়ের প্রতি সতর্ক হতে হবে, স্বীকৃতিসহ সামগ্রিক সুরক্ষার দায়িত্ব প্রমাণ করতে হবে।
দুর্গাপূজাকে ঘিরে, মূলত শহরে, বিশাল প্যান্ডেল ও ব্যববহুল আয়োজন নিয়ে তর্ক আছে। শব্দদূষণ এবং কার্বন পদচ্ছাপ নিয়ে তর্ক আছে। সিসামিশ্রিত রংয়ের ব্যবহার এবং পানিদূষণ নিয়ে তর্ক আছে। কিন্তু এসব বিলাসী আয়োজনের সঙ্গে দুর্গাপূজার কৃষিজীবনের সম্পর্ক নেই। বরং বিশ্বব্যাপী সম্প্রসারিত পুঁজির ক্ষমতা এবং বেহিসাবি ভোগবাদ আজ কৃত্য কী পরবও এভাবে দখল করে রাখছে। এসব বিষয়ও গভীরভাবে আজ রাজনৈতিক ও পরিবেশগত অনুধাবনের বিষয়।
নিদারুণভাবে ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততা বাড়ছে দেশের উপকূলে। নোনা মাটির কারণে উপকূলের কারিগরদের প্রতিমা গড়তে নানাবিধ সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। জলবায়ু দুর্গতির কারণেও আজ দুর্গাপূজার উপকরণ প্রাপ্তিতে নয়াসংকট তৈরি হচ্ছে। যে জলবায়ু সংকটের সঙ্গেও জড়িয়ে আছে বৈশ্বিক ভোগবাদ এবং নয়াউদারবাদী ক্ষমতাব্যবস্থা। দুর্গাপূজার নিরাপত্তা আজ তাই বহুমুখী জিজ্ঞাসা এবং আঘাতের মুখোমুখি। রাষ্ট্রকে এসব জিজ্ঞাসা এবং আঘাতকে জনগণের ভাষ্য ও ঐতিহাসিকতা থেকেই পাঠ করতে হবে।