১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

বিশ্বশক্তির স্বার্থের দ্বন্দ্বে বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরীক্ষা

যদি পররাষ্ট্রনীতি দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্প্রসারণে পরিণত হয়, তাহলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ দুর্বল হয়, নীতির ধারাবাহিকতা নষ্ট হয় এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছেও রাষ্ট্রের অবস্থান অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।

বিশ্বশক্তির স্বার্থের দ্বন্দ্বে বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরীক্ষা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক বিশেষ দূত সার্জিও গোর।

শুভ কিবরিয়া শুভ কিবরিয়া

Published : 03 Aug 2026, 01:46 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:46 PM

ভূরাজনীতির মানচিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে। এক সময় দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতি বলতে মূলত দিল্লি, ইসলামাবাদ ও কাবুলকে ঘিরে পরাশক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতাকেই বোঝানো হতো। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে সেই বাস্তবতা পাল্টে গেছে। ইন্দো-প্যাসিফিককে কেন্দ্র করে নতুন কৌশলগত ভারসাম্য গড়ে উঠছে, আর সেই পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে ঢাকা আর কোনো প্রান্তিক রাজধানী নয়; রীতিমতন আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক কৌশলগত হিসাব-নিকাশের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

এই বাস্তবতায় মার্কিন প্রশাসনের প্রতিনিধি এবং প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী সার্জিও গোরের ঢাকা সফরকে কেবল নিয়মিত কূটনৈতিক কর্মসূচি হিসেবে দেখলে এর তাৎপর্য অনুধাবন করা যাবে না। সফরকালে তিনি বাংলাদেশের সরকারপ্রধান, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। একই সময়ে কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, তিনি ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনারের সঙ্গেও বৈঠক করেছেন। পরবর্তীকালে ভারতীয় কূটনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধির খবরও আলোচনায় এসেছে। যদিও এসব তথ্যের সব কয়টির স্বাধীন বা সরকারি নিশ্চিতকরণ এখনো প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি, তবু ঘটনাপ্রবাহটি কূটনৈতিক মহলে স্বাভাবিকভাবেই আগ্রহের সৃষ্টি করেছে।

প্রশ্ন হলো—এই আগ্রহের উৎস কোথায়?

এর উত্তর খুঁজতে হলে কোনো একটি বৈঠক বা সফরের দিকে নয়, পরিবর্তিত বৈশ্বিক ভূরাজনীতির দিকে তাকাতে হবে। গত এক দশকে বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। বঙ্গোপসাগর এখন ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশলের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু। ভারত মহাসাগরের গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের নিকটবর্তী অবস্থান, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থল হিসেবে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, উত্তর-পূর্ব ভারতের যোগাযোগ, মিয়ানমারের অস্থিতিশীলতা, রোহিঙ্গা সংকট, ব্লু-ইকোনমির সম্ভাবনা এবং আঞ্চলিক জ্বালানি সংযোগ—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের ভূরাজনৈতিক মূল্য বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই গুরুত্ব কেবল ভূগোলনির্ভর নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থনৈতিক বাস্তবতাও। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রধান তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশগুলোর একটি। বৈশ্বিক সরবরাহ চেইন পুনর্গঠনের প্রেক্ষাপটে বহুজাতিক কোম্পানিগুলো চীনের বাইরে বিকল্প উৎপাদনকেন্দ্র খুঁজছে, যেখানে বাংলাদেশকে একটি সম্ভাবনাময় গন্তব্য হিসেবে দেখা হচ্ছে। একই সঙ্গে অবকাঠামো উন্নয়ন, বন্দর, জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং আঞ্চলিক সংযোগের সম্ভাবনা বাংলাদেশের কৌশলগত গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।

ফলে ঢাকা এখন আর শুধু দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির একটি রাজধানী নয়; এটি ওয়াশিংটন, বেইজিং, নয়াদিল্লি, টোকিও এবং ইউরোপীয় শক্তিগুলোর বৃহত্তর আঞ্চলিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বাংলাদেশের প্রতি এই আগ্রহ কোনো আকস্মিক কূটনৈতিক তৎপরতার ফল নয়; পরিবর্তিত বৈশ্বিক শক্তির ভারসাম্যের একটি স্বাভাবিক প্রতিফলন।

অনেকে বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘নতুন শীতল যুদ্ধ’ বলে ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু এই তুলনা পুরোপুরি যথার্থ নয়। বিংশ শতাব্দীর শীতল যুদ্ধ ছিল মূলত দুটি পরাশক্তির মধ্যে আদর্শিক, সামরিক ও রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, যেখানে অধিকাংশ রাষ্ট্রকে এক বা অন্য শিবিরে অবস্থান নিতে হতো। আজকের বিশ্ব সেই অর্থে দ্বিমেরুকেন্দ্রিক নয়; বরং বহুমেরুকেন্দ্রিক। এখানে প্রতিযোগিতা ও সহযোগিতা একই সঙ্গে বিদ্যমান।

যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে প্রতিযোগিতা নিঃসন্দেহে তীব্র হয়েছে, তবে তা কেবল সামরিক শক্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, ডিজিটাল অবকাঠামো, গুরুত্বপূর্ণ খনিজ, জ্বালানি নিরাপত্তা, সমুদ্রপথ, বিনিয়োগ এবং বৈশ্বিক সরবরাহ চেইনের ওপর প্রভাব বিস্তার—এসবই এখন ভূরাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। অর্থাৎ আজকের প্রতিযোগিতা শুধু অস্ত্রের নয়; প্রযুক্তি, তথ্য, পুঁজি, বন্দর ও বাণিজ্যপথেরও।

ভারতের অবস্থানও এই নতুন বাস্তবতার প্রতিফলন। একদিকে দেশটি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রতিরক্ষা, প্রযুক্তি ও ইন্দো-প্যাসিফিক সহযোগিতা গভীর করেছে; অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে দীর্ঘদিনের বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা সম্পর্ক বজায় রেখেছে। আবার সীমান্ত উত্তেজনা থাকা সত্ত্বেও চীনের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য বাণিজ্যিক সম্পর্ক অব্যাহত রেখেছে। অর্থাৎ বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থায় স্থায়ী জোটের চেয়ে স্থায়ী জাতীয় স্বার্থই অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের গুরুত্বও নতুন মাত্রা পেয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারত—তিন দেশই বাংলাদেশকে নিজেদের বৃহত্তর আঞ্চলিক কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হিসেবে দেখতে আগ্রহী। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য প্রশ্নটি কোনো একটি পক্ষকে বেছে নেওয়ার নয়; বরং কীভাবে এই বহুমাত্রিক আগ্রহকে জাতীয় উন্নয়ন, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে ব্যবহার করা যায়, সেটিই মূল চ্যালেঞ্জ।

এখানেই বাংলাদেশের সামনে বড় অভ্যন্তরীণ প্রশ্নটি আসে। পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে জনপরিসরের আলোচনা ক্রমেই দলীয় রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতিফলনে পরিণত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র, ভারত বা চীন—যে দেশকেই ঘিরে আলোচনা হোক না কেন, তা প্রায়ই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বিভাজনের রূপ নেয়। অথচ একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি কোনো রাজনৈতিক দলের নীতি নয়; এটি রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থ রক্ষার উপকরণ।

যদি পররাষ্ট্রনীতি দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্প্রসারণে পরিণত হয়, তাহলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ দুর্বল হয়, নীতির ধারাবাহিকতা নষ্ট হয় এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছেও রাষ্ট্রের অবস্থান অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। একটি পরিণত রাষ্ট্রে সরকার পরিবর্তন হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের মৌলিক কৌশলগত স্বার্থ পরিবর্তিত হয় না।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির ঐতিহ্য—‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়’—আজও প্রাসঙ্গিক। তবে বর্তমান বিশ্বে এর অর্থ নিষ্ক্রিয় নিরপেক্ষতা নয়; বরং সক্রিয় কৌশলগত ভারসাম্য। বাংলাদেশকে চীনের বিনিয়োগ, যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি ও বাজার, ভারতের আঞ্চলিক সংযোগ, জাপানের অবকাঠামো সহযোগিতা এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাণিজ্যিক সুযোগ—সবকিছুকেই জাতীয় স্বার্থের আলোকে মূল্যায়ন করতে হবে। লক্ষ্য হবে বহুমাত্রিক অংশীদারত্ব; একক নির্ভরতা নয়।

এই কৌশল বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী কূটনৈতিক প্রতিষ্ঠান, দক্ষ আলোচক, তথ্যভিত্তিক নীতিনির্ধারণ, স্বচ্ছ প্রকল্প মূল্যায়ন, ঋণ ব্যবস্থাপনায় জবাবদিহি এবং পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে ন্যূনতম রাজনৈতিক ঐকমত্য। একই সঙ্গে বাংলাদেশের নিজস্ব জাতীয় অগ্রাধিকারও স্পষ্ট হতে হবে—অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, রপ্তানি বাজার সম্প্রসারণ, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তি স্থানান্তর, জলবায়ু সহনশীলতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা। যে অংশীদারই এই লক্ষ্য অর্জনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তার সঙ্গে সহযোগিতা হওয়া উচিত বাস্তববাদী ও স্বার্থভিত্তিক।

সার্জিও গোরের সফরের প্রকৃত তাৎপর্য কোনো একক বৈঠকে নয়; বরং এই বার্তায় যে, বাংলাদেশকে ঘিরে আন্তর্জাতিক কৌশলগত আগ্রহ এখন আর সাময়িক নয়, বরং কাঠামোগত। ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের পরিবর্তিত শক্তির ভারসাম্যে বাংলাদেশ এমন এক অবস্থানে পৌঁছেছে, যেখানে ওয়াশিংটন, বেইজিং, নয়াদিল্লি, টোকিও কিংবা ব্রাসেলস—সবারই কোনো না কোনো কৌশলগত স্বার্থ জড়িত।

কিন্তু ভূরাজনৈতিক গুরুত্ব নিজে নিজে কোনো অর্জন নয়; এটি একটি দায়িত্বও। ইতিহাস দেখায়, কৌশলগত অবস্থান কোনো দেশকে সমৃদ্ধও করতে পারে, আবার প্রতিদ্বন্দ্বিতার ক্ষেত্রেও পরিণত করতে পারে। পার্থক্য গড়ে দেয় রাষ্ট্রের নীতিগত প্রজ্ঞা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত দৃষ্টিভঙ্গি।

বাংলাদেশের সামনে তাই প্রকৃত প্রশ্ন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত বা চীনের মধ্যে কাকে বেছে নেওয়া নয়। প্রশ্ন হলো—রাষ্ট্র হিসেবে আমরা কি এমন একটি আত্মবিশ্বাসী, তথ্যভিত্তিক ও বাস্তববাদী পররাষ্ট্রনীতি গড়ে তুলতে পারব, যা পরিবর্তিত বৈশ্বিক বাস্তবতাকে জাতীয় উন্নয়নের সুযোগে পরিণত করবে?

ভূরাজনীতির এই নতুন অধ্যায়ে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অন্যের কৌশলের অংশ হয়ে থাকা নয়; বরং নিজের কৌশল নিজেই নির্ধারণ করা। সার্জিও গোরের সফরকে ঘিরে আলোচনা শেষ পর্যন্ত সেই প্রশ্নটিকেই সামনে নিয়ে আসে—বাংলাদেশ কি এই পরিবর্তিত বিশ্বে কেবল ভূরাজনৈতিক গুরুত্বের অধিকারী একটি রাষ্ট্র হয়ে থাকবে, নাকি সেই গুরুত্বকে অর্থনৈতিক শক্তি, কূটনৈতিক প্রভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় স্বার্থে রূপান্তর করার সক্ষমতাও অর্জন করবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী দশকে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অবস্থান।

শুভ কিবরিয়া সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক। ই-মেইল: kibria34@gmail.com