রাতের খাবার আগে খাওয়া যে কারণে উপকারী
ঠিক ঘুমের আগে ভারি খাবার খেলে অ্যাসিডিটি-সহ নানান সমস্যা দেখা দিতে পারে।
অফিস, পরিবারের দায়িত্ব বা ক্লান্তি সব মিলিয়ে রাতের খাবারের সময় এক রকম নাও হতে পারে।
তবে খাবার খাওয়ার সময়টা শরীরের ওপর কিছুটা প্রভাব ফেলতে পারে বলে গবেষণায় বলা হচ্ছে। বিশেষ করে ঘুম, রক্তে শর্করার নিয়ন্ত্রণ এবং শরীরের চর্বি সঙ্গে রাতের খাবারের সময়ের সম্পর্ক রয়েছে।
মার্কিন পুষ্টিবিদ ওয়েন্ডি বাজিলিয়ান, রিয়েলসিম্পল ডটকম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেন, “খাবারের সময় শুধু ঘড়ির কাঁটার বিষয় নয়, শরীরের স্বাভাবিক প্রতিদিনের ছন্দের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।”
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ব্রুকলিন নিবাসী পুষ্টিবিদ মায়া ফেলর মনে করেন, “কাজের ধরন, ঘুমের সময় এবং জীবনযাত্রার মতো বিষয়গুলোও খাবারের উপযুক্ত সময় নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ।”
যে কারণে আগেভাগে রাতের খাবার খাওয়া উচিত
সন্ধ্যার দিকে রাতের খাবার খাওয়ার অভ্যাসকে বয়স্ক মানুষ বা ছোটদের ক্ষেত্রেই বেশি প্রয়োগ হয়। তবে আগেভাগে রাতের খাবার খাওয়া, স্বাস্থ্যকর অভ্যাসে প্রতিচ্ছবি হতে পারে বলে মনে করেন, এই পুষ্টিবিদরা।
জাপানের কিওটো প্রিফেকচুরাল ইউনিভার্সিটি অব মেডিসিনের, গ্র্যাজুয়েট স্কুল অব মেডিকেল সায়েন্সের এন্ডোক্রিনোলজি অ্যান্ড মেটাবলিজম বিভাগের করা গবেষণায়, রাত করে খাবার খাওয়ার সঙ্গে শরীরের বিপাকক্রিয়ার পরিবর্তনের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
ঘুমের কাছাকাছি সময়ে খাবার খেলে হজমের কাজ এবং ঘুম একই সময়ে চলতে থাকে। ফলে কিছু ক্ষেত্রে শর্করা ও চর্বি ব্যবহারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
যাদের জন্য আগেভাগে খাওয়া গুরুত্বপূর্ণ
বিশেষ কিছু শারীরিক অবস্থায় আগে রাতের খাবারের সময় উপকারী হতে পারে। টাইপ টু ডায়াবেটিস বা বহুমূত্র রোগে আক্রান্তদের ক্ষেত্রে রাত করে খাবার খাওয়ার সঙ্গে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণের সমস্যার সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
এন্ডোক্রাইন জার্নালে প্রকাশিত, ২০১৮ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, রাতে দেরিতে খাবার খাওয়া এই রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিদের রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণকে আরও দুর্বল করতে পারে।
“তবে শুধু খাবারের সময় দিয়েই এই রোগ নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। ওষুধ, খাবারের ধরন, শারীরিক পরিশ্রম এবং চিকিৎসকের পরামর্শ, সবকিছুর সমন্বয় প্রয়োজন”, বলেন ওয়েন্ডি বাজিলিয়ান।
শরীরের অতিরিক্ত ওজনের ক্ষেত্রেও খাবারের সময় নিয়ে গবেষণা হয়েছে।
বোস্টনের ব্রিগহাম অ্যান্ড উইমেনস হসপিটালের, ‘মেডিকেল ক্রোনোবায়োলজি প্রোগ্রাম, স্লিপ অ্যান্ড সার্কেডিয়ান ডিজঅর্ডারস বিভাগ’-এর করা ২০২২ সালের একটি ছোট গবেষণায় দেখা যায়, রাতে দেরিতে খাবার খাওয়ার ফলে শরীরে চর্বি জমা ও ভাঙার প্রক্রিয়ায় পরিবর্তন হতে পারে।
একই সঙ্গে ক্ষুধা ও শরীরের চর্বি নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখা হরমোনের মাত্রাতেও পরিবর্তন দেখা যায়।
ওয়েন্ডি বাজিলিয়ানের মতে, “দেরিতে খাওয়ার সম্ভাব্য ঝুঁকি শুধু একটি কারণের ওপর নির্ভর করে না। বরং খাবারের সময়, শরীরের স্বাভাবিক ছন্দ এবং অন্যান্য শারীরিক প্রক্রিয়া একসঙ্গে কাজ করে এর প্রভাব তৈরি করতে পারে।”
ঘুমের সঙ্গে রাতের খাবারের সম্পর্ক
রাতের খাবার এবং ঘুমের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। ঘুমানোর একেবারে আগে খেলে, ঘুম আসতে দেরি হতে পারে বা ঘুম বারবার ভেঙেও যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয়ের করা ২০২১ সালের একটি গবেষণায়, ঘুমের কয়েক ঘণ্টা আগে খাবার ও পানীয় গ্রহণের সঙ্গে ভালো ঘুমের সম্পর্কের ইঙ্গিত পাওয়া যায়।
বিশেষ করে যাদের রাতে বুকজ্বালা, বদহজম বা অম্লতা বাড়ে, তাদের ক্ষেত্রে ঘুমের খুব কাছাকাছি সময়ে ভারী খাবার খাওয়া অস্বস্তি বাড়াতে পারে।
মায়া ফেলর বলেন, “খাওয়ার পরপরই শুয়ে পড়লে পাকস্থলীর খাবার ও অ্যাসিড ওপরের দিকে ফিরে আসার সমস্যা হতে পারে। অতিরিক্ত চিনি, লবণ ও কৃত্রিম চর্বিযুক্ত খাবার ঘুমের ঠিক আগে বেশি পরিমাণে খেলে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে সেটা সহ্য করা কঠিন হতে পারে।”
তাহলে রাতের খাবারের আদর্শ সময় কখন?
গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, সবার জন্য একটি নির্দিষ্ট আদর্শ সময় নেই। কারণ কারও কর্মঘণ্টা সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত, আবার কেউ রাতে কাজ করেন।
কারও ঘুমের সময় রাত ১০টা, কারও আবার রাত ১২টা বা তারও পরে। তাই শুধু ঘড়ির সময় দেখে খাবারের উপযুক্ত সময় নির্ধারণ করা বাস্তবসম্মত নয়।
তবে সুস্থ একজন মানুষের ক্ষেত্রে নিয়মিত সময়ে খাবার খাওয়া এবং নিজের জীবনযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
অর্থাৎ প্রতিদিন ঠিক সন্ধ্যা ৬টায় খেতে না পারলে দুশ্চিন্তার কারণ নেই। কাজ শেষে যদি রাত ৮টায় খাবার খেতে হয়, তাহলে খাবারের পর পর্যাপ্ত সময় রেখে ঘুমানোর চেষ্টা করা যেতে পারে।
ঘুমানোর আগে কতক্ষণ বিরতি?
রাতের খাবারের সময় ঠিক করার সহজ পদ্ধতি হতে পারে, নিজের ঘুমের সময় থেকে পেছনের দিকে হিসাব করা।
যদি রাত ১১টায় ঘুমানোর অভ্যাস থাকে, তাহলে রাতের খাবার অন্তত দুই থেকে তিন ঘণ্টা আগে শেষ করার চেষ্টা করা যেতে পারে।
ওয়েন্ডি বলেন, “এর ফলে ঘুমানোর আগেই খাবার হজমের গুরুত্বপূর্ণ অংশটি সম্পন্ন করার জন্য শরীর কিছুটা সময় পায়। খাওয়ার পরপরই ঘুমিয়ে পড়লে হজমের প্রক্রিয়া চলার পাশাপাশি শরীর বিশ্রাম ও পুনর্গঠনের কাজও করে। ফলে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এতে ঘুমের স্বাভাবিকতা নষ্ট হতে পারে।”
তবে ঘুমানোর আগে ক্ষুধা লাগলে একেবারেই না খেয়ে থাকার প্রয়োজন নেই। পরিমাণে হালকা ও সহজপাচ্য খাবার বেছে নেওয়া যেতে পারে।
বিশেষ করে যাদের রাতে দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকলে অস্বস্তি হয়, তাদের ক্ষেত্রে নিজের শরীরের সংকেতকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
