১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

রাতে দেরিতে খাওয়ার স্বাস্থ্য ঝুঁকি

রাত জেগে চিপস, নুডলস আর ভারী খাবার খেয়ে দেহের বারোটা বাজাচ্ছেন নাতো?

লাইফস্টাইল ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 02 Sep 2026, 05:21 PM

Updated : 17 Sep 2026, 02:53 AM

দিনের ব্যস্ততায় অনেকেরই রাতের খাবার খেতে দেরি হয়ে যায়। কারও কাজ শেষ হয় রাতে, কেউ আবার দিনের বেলায় ঠিকমতো খেতে পারেন না। ফলে ঘুমানোর কিছুক্ষণ আগে খাবার খাওয়ার অভ্যাস তৈরি হয়।

মাঝেমধ্যে এমন হলে বড় কোনো সমস্যা না হলেও প্রতিদিন রাতে দেরিতে বেশি খাওয়ার অভ্যাস শরীরের জন্য ক্ষতিকর।

বিশেষ করে পেট ফাঁপা, অম্লতা, বুকজ্বালা ও হজমের নানান সমস্যা তখন অল্পতেই দেখা দিতে পারে।

তবে বিষয়টি শুধু কখন খাবার খাওয়া হচ্ছে, তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দিনের বেলায় কম খাওয়া, মানসিক চাপ, একাকিত্ব, একঘেয়েমি কিংবা অভ্যাসের কারণেও রাতে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘এমপিএম নিউট্রিশন’-এর প্রতিষ্ঠাতা ও নিবন্ধিত মার্কিন পুষ্টিবিদ মারিসা কার্প, রিয়েলসিম্পল ডটকম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেন, “কোন সময়কে দেরিতে খাওয়া বলা হবে, তা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। তবে সাধারণভাবে রাতের খাবার সন্ধ্যা ৫টা থেকে ৭টার মধ্যে খাওয়া ভালো। অথবা ঘুমাতে যাওয়ার অন্তত তিন ঘণ্টা আগে রাতের খাবার শেষ করা যেতে পারে।”

ঘুমানোর কাছাকাছি সময়ে খেলে শরীর খাবার হজম করার জন্য পর্যাপ্ত সময় পায় না।

তবে রাতে খাওয়ার বিষয়টি বোঝার ক্ষেত্রে শুধু সময়ের দিকে তাকালে হবে না। কেন রাতে খাওয়ার প্রয়োজন হচ্ছে এবং খাওয়ার পর শরীরে কেমন লাগছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

মারিসা কার্পের মতে, রাতের খাবারের অভ্যাসের পেছনের কারণটি বোঝা গেলে দীর্ঘমেয়াদে এই অভ্যাস পরিবর্তনের সুযোগ তৈরি হয়।

দিনের বেলায় না খেয়ে রাতে বেশি খাওয়া

রাতে খাওয়ার একটি বড় কারণ হতে পারে দিনের বেলায় পর্যাপ্ত খাবার না খাওয়া।

অনেকেই সকালে নাশতা না করে শুধু কফির ওপর নির্ভর করেন। অফিসে তাড়াহুড়ো করে দুপুরের খাবার খাওয়া অথবা কখনও ঠিকমতো খাওয়ার সুযোগই না পাওয়া।

ফলে দিনের শেষে যখন রাতের খাবার খাওয়ার সময় আসে, তখন শরীর দিনের ঘাটতি পূরণ করার চেষ্টা করতে পারে।

এমনকি রাতের খাবার সুষম হলেও দিনের শুরুতে ও মাঝামাঝি সময়ে শরীর যে শক্তি ও পুষ্টি পায়নি, সেটি পূরণ করার তাগিদ থেকে পরে আবার খাওয়ার ইচ্ছা হতে পারে।

ফলে রাতে বেশি খাওয়ার বিষয়টিকে সব সময় ইচ্ছাশক্তির অভাব হিসেবে দেখা ঠিক নয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি শরীরের দিনের ঘাটতি পূরণের স্বাভাবিক চেষ্টাও হতে পারে।

একঘেয়েমি ও মানসিক চাপেও বাড়ে খাওয়ার ইচ্ছা

রাতে খাওয়ার আরেকটি কারণ হতে পারে অভ্যাস কিংবা আবেগ।

দিনের বেলায় কাজ, পড়াশোনা কিংবা অন্যান্য ব্যস্ততার মধ্যে নিজের অনুভূতির দিকে মন দেওয়ার সুযোগ কম থাকে।

তবে রাত হলে চারপাশ শান্ত হয়ে আসে এবং নিজের জন্য সময় পাওয়া যায়।

মারিসা কার্প বলেন, “একঘেয়েমি, মানসিক চাপ, একাকিত্ব কিংবা টেলিভিশন দেখার সময় খাবার খাওয়ার অভ্যাস থেকেও রাতে খাওয়ার ইচ্ছা বাড়তে পারে। এক্ষেত্রে শারীরিক ক্ষুধা সব সময় প্রধান কারণ নয়। অর্থাৎ ক্ষুধা না থাকলেও দীর্ঘদিনের অভ্যাস বা মনের অবস্থার কারণে খাবারের প্রতি আগ্রহ তৈরি হতে পারে।”

হজমের সমস্যা বাড়তে পারে

যুক্তরাষ্ট্রের ‘জেএম নিউট্রিশন’-এর পুষ্টিবিদ নাদিয়া আবাদা বলেন, “দিনের শেষের দিকে শরীরের বিপাকীয় ও হজম-সংক্রান্ত কার্যক্রম ধীরে ধীরে কমে আসে। শরীরের নিজস্ব সময়চক্র এ ধরনের শারীরিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। ফলে রাতে খুব দেরিতে খাবার খেলে অন্ত্রের স্বাভাবিক চলাচল ধীর হয়ে যেতে পারে।”

ফলে পেটফাঁপা, অম্লতা, পেটে মোচড় বা মলত্যাগের স্বাভাবিক নিয়মে পরিবর্তনের মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।

বিশেষ করে রাতে যদি পরিমাণে বেশি খাবার খাওয়া হয়, তাহলে হজমতন্ত্রের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে।

মারিসা কার্প বলেন, “খাওয়ার পরপরই শুয়ে পড়লেও বুকজ্বালা বা অম্লতা বাড়তে পারে। কারণ শুয়ে পড়লে পাকস্থলীর অ্যাসিড বা অম্ল সহজে খাদ্যনালির দিকে ফিরে আসে। তাই খাবার খাওয়ার পর কিছু সময় সোজা হয়ে থাকা উপকারী।”

পুষ্টিকর খাবারের বদলে কম পুষ্টিকর খাবার

দিনের বেলায় পর্যাপ্ত খাবার না খেলে রাতে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। আবার শারীরিক ক্ষুধার পরিবর্তে মানসিক চাপ বা অভ্যাসের কারণে খেলে, পুষ্টিকর খাবারের বদলে কম পুষ্টিকর খাবার বেছে নেওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ে।

দীর্ঘদিন এমন চলতে থাকলে শরীরের প্রয়োজনের তুলনায় বেশি শক্তি গ্রহণ হতে পারে। ফলে ওজন বাড়ার পাশাপাশি দীর্ঘস্থায়ী নানান স্বাস্থ্য সমস্যার ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

অর্থাৎ সমস্যাটি শুধু খাবার খাওয়ার সময় নয়; সেই সময় কী খাওয়া হচ্ছে এবং কেন খাওয়া হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

ঘুমেও প্রভাব পড়ে

রাতে খুব দেরিতে খেলে ঘুমের মানও খারাপ হতে পারে।

নাদিয়া আবাদা বলেন, “রাতে খাবার খাওয়ার পর রক্তে শর্করার মাত্রা ধীরে ধীরে বাড়তে পারে। একই সময়ে হজমতন্ত্রকে খাবার হজমের কাজ চালিয়ে যেতে হয়। ফলে শরীর সহজে বিশ্রামের অবস্থায় যেতে পারে না।”

মারিসা কার্পও বলেন, “শরীর একই সময়ে ভারী খাবার হজম করা এবং ঘুমানোর কাজ সহজে সামলাতে পারে না। বিশেষ করে খাবারের পর পেট ফাঁপা, বুকজ্বালা বা অম্লতার মতো সমস্যা হলে শুয়ে পড়ার পর অস্বস্তি আরও বেড়ে যেতে পারে।”

রাতে ক্ষুধা লাগলে যা খাওয়া উপকারী

তবে রাতে ক্ষুধা লাগলে শুধু না খেয়ে থাকা সব সময় ঠিক নয়। এই সময় পরিমাণে অল্প এবং সহজে হজম হয় এমন খাবার বেছে নেওয়া যেতে পারে।

খুব বেশি পরিমাণে আমিষ, চর্বি বা শর্করাযুক্ত খাবার না খাওয়াই ভালো।

মারিসা কার্পের মতে, “আমিষ ও জটিল শর্করার সমন্বয়ে তৈরি হালকা খাবার ভালো বিকল্প হতে পারে। ফলের সঙ্গে টক দই, সম্পূর্ণ শস্যের তৈরি বিস্কুটের সঙ্গে পনির বা সম্পূর্ণ শস্যের পাউরুটির সঙ্গে বাদামের মাখন খাওয়া যেতে পারে।”

এসব খাবার তুলনামূলকভাবে পেট ভরা রাখতে পারে। তবে রাতের জন্য অতিরিক্ত ভারী মনে হয় না।

অন্যদিকে নাদিয়অ আবাদা রাতে প্রক্রিয়াজাত খাবার, মিষ্টিপানীয় এবং পরিশোধিত ময়দার তৈরি খাবার এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেন।

বেশি চিনি ও চর্বিযুক্ত এসব খাবার ঘুম ও হজমে অস্বস্তি তৈরি করতে পারে।

আরও পড়ুন

রাতের খাবার খাওয়ার সেরা সময়

রাতে বাইরে খাওয়া হতে পারে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক

রাতে যেসব খাবার খেলে ঘুমের বারোটা বাজতে পারে