২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৯ কার্তিক ১৪৩৩

খাবার থেকে পুষ্টি পূর্ণ মাত্রায় গ্রহণ করতে চাই ‘ভিটামিন পি’ বা আনন্দের ভিটামিন

খেয়ে আনন্দের অনুভূতি না জাগলে, সেই খাবার থেকে সঠিক পুষ্টি নাও মিলতে পারে।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 24 Oct 2026, 06:30 PM

Updated : 24 Oct 2026, 06:30 PM

খাবার খাওয়ার সময় বেশির ভাগ মানুষই হয়ত ভাবেন ক্যালরি, প্রোটিন, ফ্যাট বা ওজন বেড়ে যাওয়ার কথা।

তবে খাবারের পুষ্টিগুণ ষোলোআনা কাজে লাগাতে, এর স্বাদ এবং তা থেকে পাওয়া আনন্দ ঠিক কতটা গুরুত্বপূর্ণ? একে বলা যেতে পারে ‘ভিটামিন পি’ বা ‘প্লেজার’ বা আনন্দ।

বিভিন্ন গবেষণার ফলাফল ও পুষ্টিবিজ্ঞানীদের মতে, শুধু পুষ্টিকর খাবার খেলেই হবে না, খাবারটি উপভোগ করাও সুস্থ থাকার জন্য সমানভাবে জরুরি।

মস্তিষ্কের রসায়ন ও হজম প্রক্রিয়ার গোপন সংযোগ

খাবার খাওয়ার পর যে আনন্দ হয়, তা কেবল মুখের স্বাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর গভীর সংযোগ রয়েছে মস্তিষ্কের সঙ্গে।

স্বাস্থ্য-বিষয়ক ওয়েবসাইটন ‘হেল্থলাইন’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে, মার্কিন থেরাপিস্ট ও পুষ্টিবিদ আলেটা স্টর্চ বলেন, খাবারসহ যে কোনও ধরনের আনন্দদায়ক অনুভূতি মস্তিষ্কে ‘ডোপামিন’ হরমোন নিঃসরণ করে। ডোপামিনকে বলা হয় ‘ভালো বোধের হরমোন’। এটি মস্তিষ্কের ‘রিওয়ার্ড পাথওয়ে’ বা পুরষ্কারের অনুভূতিকে সক্রিয় করে মনকে শান্ত, প্রফুল্ল ও মনোযোগী রাখে।”

তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, “যখন আমরা পছন্দের খাবার আনন্দের সঙ্গে উপভোগ করি, তখন আমাদের স্নায়ুতন্ত্র শিথিল বা রিল্যাক্সড হয়ে ‘রেস্ট অ্যান্ড ডাইজেস্ট’ মেজাজে চলে যায়। ফলে শরীর খাবারটিকে আরও কার্যকরভাবে ভাঙতে এবং তার ভেতরের পুষ্টি উপাদান সম্পূর্ণ শোষণ ও বিপাক করতে পারে।”

২০১১ সালে ‘ট্রেন্ডস ইন কগনিটিভিস সায়েন্স’-এ প্রকাশিত যুক্তরাষ্ট্রের ‘ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অন ড্রাগ অ্যাবইউজ’ এবং ‘ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ হেল্থ’-এর করা এক গবেষণার ফলাফলে উল্লেখ করা হয়, অতিরিক্ত ওজনের সমস্যায় ভোগা ব্যক্তিদের ডোপামিন সংবেদনশীলতায় ঘাটতি থাকতে পারে। ফলে খাবারের পূর্ণ তৃপ্তি পেতে তারা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খেয়ে ফেলেন।

সুস্থ খাদ্যাভ্যাসের জন্য ‘খাবারের আনন্দ’

খাবারের স্বাদ বা আনন্দ নিয়ে ২০২০ সালে ১১৯টি গবেষণার ওপর ভিত্তি করে করা একটি বড় সিস্টেমেটিক রিভিউ বা পদ্ধতিগত পর্যালোচনায় দেখা গেছে, খাবারের আনন্দ ও সুস্থ খাদ্যাভ্যাসের মধ্যে ইতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে।

২০১৫ সালের আরেকটি গবেষণায়ও দেখা গেছে, যারা খাবার উপভোগ করে খান, তাদের পুষ্টির অবস্থা অন্যদের চেয়ে অনেক উন্নত।

যুক্তরাষ্ট্রের ‘সার্টিফাইড ইনটুইটিভ ইটিং কাউন্সেলর’ ও পুষ্টিবিদ সারাহ গোল্ড আনজলোভার বলেন, “অনেকের মধ্যে ভুল ধারণা আছে যে সুস্থ থাকতে হলে স্বাদহীন ও একঘেয়ে খাবার খেতে হবে। তবে যখন আমরা পছন্দের খাবার তৃপ্তি নিয়ে খাই, তখন মানসিক সন্তুষ্টি বাড়ে। এটি খাদ্যের গুণগত মান বাড়াতে এবং অতিরিক্ত খাবার খাওয়া বা একবারে অনেক বেশি খেয়ে ফেলার প্রবণতা কমিয়ে দেয়।”

আবেগীয় পুষ্টি ও সামাজিক বন্ধন

খাবার কেবল শরীরের জ্বালানি নয়, এটি মানসিক খোরাকও যোগায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাবার থেকে পাওয়া আনন্দ মানসিক স্বাস্থ্যকে চারভাবে সমৃদ্ধ করে।

সামাজিক সংযোগ: পরিবার বা বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা ও উৎসবের কেন্দ্রবিন্দুতেই থাকে খাবার।

২০১৫ সালে থাইল্যান্ডের একটি কমিউনিটি ভিত্তিক গবেষণায় দেখা গেছে, প্রিয়জনদের সঙ্গে একসঙ্গে বসে খাবার উপভোগ করলে মানুষের সুখের অনুভূতি বহুলাংশে বৃদ্ধি পায়।

শারীরিক ও মানসিক প্রশান্তি: অসুস্থতায় মায়ের হাতের গরম স্যুপ বা পছন্দের কোনও মিষ্টি মন ভালো করে দেয়। আনজলোভারের মতে, “কঠিন কোনও দিনের শেষে এই খাবারগুলো মানসিক আরাম দেয়, যা উপকারী।”

খাবারের সংস্কৃতির শৃঙ্খল ভাঙা: প্রচলিত খাদ্য সংস্কৃতিতে সবসময় পছন্দের ও ক্যালরিযুক্ত খাবারকে ‘খারাপ’ বা ‘নিষিদ্ধ’ বলে দূরে রাখতে শেখায়।

তবে আলেটা স্টর্চ বলেন, “কোনও নিয়ম ছাড়াই পছন্দের খাবার খাওয়ার অনুমতি দিলে শরীর তার প্রয়োজনীয় পুষ্টির ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠে। এটি খাদ্যের প্রতি ভয় ও অপরাধবোধ দূর করে মনে স্বাধীনতা এনে দেয়।”

সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের মেলবন্ধন: ঐতিহ্যবাহী খাবার খাওয়া সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত করে, যা মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য জরুরি। পছন্দের সাংস্কৃতিক খাবার বাদ দিলে মানুষ একা ও বিচ্ছিন্ন বোধ করতে পারে।

আবেগীয় খাওয়া বনাম আনন্দের খাওয়া

অনেকেই খাবারের আনন্দকে ‘ইমোশনাল ইটিং’ বা আবেগীয় খাওয়ার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলেন।

তবে পুষ্টিবিদ সারাহ গোল্ড আনজলোভার এর স্পষ্ট পার্থক্য তুলে ধরে বলেন, “ইমোশনাল ইটিং’ হল রাগ, ক্ষোভ বা দুঃখের মতো অনুভূতি থেকে বাঁচতে অবচেতনভাবে খাওয়া। আর আনন্দের জন্য খাওয়া হল, নির্দিষ্ট কোনও খাবারের স্বাদ ও গঠনকে সচেতনভাবে উপভোগ করা। যেমন তীব্র গরমে আইসক্রিম খাওয়া বা বাগান থেকে পেড়ে তাজা আপেল খাওয়া।”

তিনি আরও বলেন, “ইমোশনাল ইটিং’য়ের পর সাধারণত মানুষ অপরাধবোধ বা লজ্জায় ভোগে। তবে সচেতনভাবে আনন্দের সঙ্গে খেলে সেই গ্লানি থাকে না।”

খাবারকে ১০ শতাংশ বেশি আনন্দদায়ক করার কৌশল

প্রতিদিনের খাবারকে আরও একটু উপভোগ্য করতে আলেটা স্টর্চ একটি পরামর্শ দিয়েছেন।

তিনি বলেন, “খাবার বা নাস্তা তৈরির সময় ভাবুন কীভাবে এটিকে আরও মাত্র ১০ শতাংশ বেশি আনন্দদায়ক করা যায়। যেমন— হালকা গরম করে নেওয়া ব্রাউনি, সালাদের ওপর একটু চিজের কুচি বা ওটমিলের বাটিতে সামান্য বেশি দুধ যোগ করা। এই ছোট ছোট পরিবর্তনগুলোই সাধারণ খাওয়ার অভিজ্ঞতাকে অনন্য করে তুলতে পারে।”

তাই সুস্থ থাকতে প্লেটের খাবারের পাশাপাশিম, এর ভেতরের ‘ভিটামিন পি’ বা আনন্দের ঘাটতি যেন না হয়, সেদিকেও নজর দেওয়া জরুরি।

পুরনো খবর:

ভিটামিন ডি নিয়ে ৬টি ভুল ধারণা: জেনে নিন সঠিক তথ্য
ভিটামিন ট্যাবলেটের ক্ষতিকর দিক
‘ভিটামিন কে’ সমৃদ্ধ খাবার