Published : 07 Sep 2026, 06:53 PM
মুখের ধুলোবালি পরিষ্কার করা, তাৎক্ষণিক উজ্জ্বলতা বাড়ানো এবং সতেজভাব ধরে রাখতে আধুনিক রূপচর্চায় ‘টোনার’ ব্যবহারের চল রয়েছে।
নব্বইয়ের দশক বা তার আগের প্রজন্মের অনেকেরই টোনার বলতে মনে পড়ে নীল রংয়ের কড়া তরল প্রসাধনী, যা মুখে লাগালেই অ্যালকোহলের তীব্র গন্ধে চোখ জ্বালা করত এবং ত্বক অতিরিক্ত শুষ্ক ও খসখসে হয়ে যেত।
আধুনিক চর্মরোগ বিজ্ঞান ও কসমেটিক কেমিস্ট্রির কল্যাণে আজকের টোনারগুলো সম্পূর্ণ বদলে গেছে। তবে প্রসাধনীর চটকদার বিজ্ঞাপনী প্রচারণায় প্ররোচিত হয়ে ত্বকের নিজস্ব ধরন না বুঝে উল্টোপাল্টা টোনার মাখলে কোষের রক্ষাকবচ বা ‘স্কিন ব্যারিয়ার’ স্থায়ীভাবে ভেঙে যেতে পারে।
স্বাস্থ্য ও জীবনযাপন-বিষয়ক পোর্টাল ‘সেলফ’-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনে, যুক্তরাষ্ট্রের ইয়েল স্কুল অফ মেডিসিনের চর্মরোগ বিজ্ঞানের সহযোগী ক্লিনিক্যাল অধ্যাপক ডা. মোনা গোহারা বলেন, “টোনার আসলে কোনো পরম আবশ্যকীয় বা ম্যান্ডেটরি স্কিন কেয়ার পণ্য নয়।”
আধুনিক টোনার আসলে কী?
নিউ ইয়র্কের বোর্ড-প্রত্যয়িত ত্বক-বিশেষজ্ঞ ডা. ব্লেয়ার মারফি-রোজ একই প্রতিবেদনে বলেন, “ফেইশল টোনার হল, মূলত পানি-ভিত্তিক এক বিশেষ তরল দ্রবণ, যা ত্বকের সুনির্দিষ্ট কিছু সমস্যা দূর করতে সক্রিয় কেমিক্যাল উপাদান কোষে পৌঁছে দেয়।”
অতীতের টোনারগুলো ছিল মূলত ক্ষতিকর ‘অ্যাস্ট্রিনজেন্টস’, যা ত্বক থেকে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি হওয়া সমস্ত তেল শুষে নিয়ে ত্বকের রক্ষাকবচ অবশ করে দিত।
তবে বর্তমানে আধুনিক কসমেটিক বিজ্ঞানের তৈরি টোনারগুলো প্রায় শতভাগ অ্যালকোহল-মুক্ত। আর এগুলো ত্বকের আর্দ্রতা না কমিয়ে বরং কোষকে ভেতর থেকে সমৃদ্ধ করে।
টোনার কি সত্যিই প্রয়োজন?
এবার সেই বহুল প্রতীক্ষিত চিকিৎসাবিজ্ঞানের উত্তর হল— ‘না, টোনার কখনই সানস্ক্রিন বা সাধারণ ময়েশ্চারাইজারের মতো ত্বক পরিচর্যার কোনো মৌলিক বা অতি-প্রয়োজনীয় উপাদান নয়। এটি কোনো ময়েশ্চারাইজার বা সেরামের বিকল্পও হতে পারে না।
ডা. ব্লেয়ারের ভাষায়, “টোনার হল আইসক্রিমের ওপর থাকা চেরি ফলের মতো— যা রুটিনে বাড়তি পুষ্টি যোগ করে। তবে এটি ছাড়া রূপচর্চা অসম্পূর্ণ থাকে না।”
“যদি কেউ নিজের ত্বকের বর্তমান অবস্থা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকেন এবং সাধারণ পরিচর্যা চালিয়ে যান, তবে টোনার পুরোপুরি বর্জন করা নিরাপদ। আবার ত্বকে অতিরিক্ত শুষ্কতা বা ব্রণের মতো কোনো নির্দিষ্ট সমস্যা থাকে, তবে টোনার ব্যবহার চমৎকার ফলাফল দিতে পারে”, বলেন এই চিকিৎসক।
ত্বকের ধরন বুঝে টোনার বাছাই
ত্বকের প্রকৃতি ও হরমোনের ভারসাম্য অনুযায়ী সঠিক উপাদান বেছে নিতে হয়।
শুষ্ক ত্বকের জন্য হিউমেক্ট্যান্ট টোনার: যাদের চামড়া খসখসে, তাদের গ্লিসারিন বা হায়ালুরোনিক অ্যাসিড সমৃদ্ধ আর্দ্রতা রক্ষাকারী টোনার উপকারী।
ডা. মোনা গোহারা বলেন, “এটি ত্বকের ওপর একটি সুরক্ষামূলক পানির কম্বল বা ‘ওয়াটার ব্ল্যাঙ্কেটের’ মতো কাজ করে, যা ময়েশ্চারাইজারের কার্যক্ষমতা দ্বিগুণ বাড়িয়ে দেয়।”
তৈলাক্ত ও ব্রণ-প্রবণ ত্বকে স্যালিসিলিক অ্যাসিড: কড়া চর্বি বা সেবাম গ্রন্থির অতিরিক্ত তেল গলিয়ে দিতে এবং ব্ল্যাকহেডস ও হোয়াইটহেডস পুরোপুরি দূর করতে স্যালিসিলিক অ্যাসিড সমৃদ্ধ টোনার ব্যবহার করা উপকারী।
এগুলো নন-অক্লুসিভ হওয়ায় লোমকূপ বা ‘পোরস’ বন্ধ করে না।
রুক্ষ ও অসমান ত্বকের জন্য এএইচএ: ত্বকের উপরিভাগের মৃত কোষ প্রাকৃতিকভাবে ঝরিয়ে, মসৃণ করতে ল্যাকটিক অ্যাসিড বা গ্লাইকোলিক অ্যাসিডের মতো আলফা হাইড্রক্সি অ্যাসিড সমৃদ্ধ টোনার ভালো কাজ করে।
সংবেদনশীল ত্বকে সিটা বা অ্যালোভেরা: যাদের ত্বক খুব সংবেদনশীল এবং অল্পতেই লালচে হয়ে যায়, তারা প্রশান্তি পেতে সেন্টেলা এশিয়াটিকা (সিকা) বা অ্যালোভেরার মতো প্রদাহরোধী উপাদান যুক্ত টোনার মাখতে হবে।
উজ্জ্বলতা বাড়াতে ভিটামিন সি: পরিবেশের ক্ষতিকর ধকল ও ফ্রি র্যাডিকেলের দহন থেকে কোষ বাঁচাতে ভিটামিন-সি বা অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট যুক্ত টোনার ত্বককে বুড়ো হতে দেয় না।
টোনার ব্যবহারের নিয়ম
ডা. ব্লেয়ার মারফি-রোজ পরামর্শ দেন যে, “টোনার সবসময় মুখ ধোয়ার ঠিক পরপরই প্রথম প্রসাধনী হিসেবে মাখতে হবে। রূপচর্চার প্রধান নিয়ম হল— সবচেয়ে পাতলা তরলটি আগে মাখতে হবে। আর ক্রমান্বয়ে ঘন ক্রিমের দিকে যেতে হবে।”
টোনার মাখার দুই সপ্তাহের মধ্যে এটি কোষের পিএইচ ভারসাম্য ফিরিয়ে আনে।
টোনার মাখার দুটি পদ্ধতি রয়েছে। একটি হল কটন বা তুলার প্যাডে নিয়ে মুখমণ্ডলের কেন্দ্র বা মাঝখান থেকে শুরু করে বৃত্তাকারে বাইরের দিকে আলতো করে মুছতে হবে। কারণ মুখের কেন্দ্রে তেল গ্রন্থি বেশি থাকে।
আরেকটি হল, পরিষ্কার আঙুলের ডগা দিয়ে আলতো করে চেপে চেপে বসানো। হাইড্রেইটিং বা আর্দ্রতা রক্ষাকারী টোনার মাখার পরপরই ভেজা ত্বকের ওপর সেরাম বা ময়েশ্চারাইজার মেখে ‘লক’ করে দেওয়া বাধ্যতামূলক।
পাশাপাশি কড়া কেমিক্যালের অভ্যন্তরীণ ধকল থেকে কোষগুলোকে সতেজ রাখতে সারাদিনে পর্যাপ্ত পরিমাণ বিশুদ্ধ পানি পান করা আবশ্যক।
আরও পড়ুন
ত্বকের যত্নে রেটিনয়েড ব্যবহারের নিয়ম