তাঁতের অতীত-বর্তমানকে সামনে আনার এক বিশেষ আয়োজন
বেঙ্গল শিল্পালয়ে চলছে তাঁতশিল্প মেলা ও প্রদর্শনী।
বাংলার এ অঞ্চলে অনেক গল্পই লেখা হয়েছে সুতোয়। ঘরে বসে শত বছর ধরে শিল্পীরা কাপড়ে ফুটিয়ে তুলেছেন নকশা, রং আর ঐতিহ্য। তাঁতশিল্পই বাংলাকে পরিচিত করেছে তাঁতের আদি ঘর হিসেবে।
আধুনিকতা ও ফিউশনের ভিড়ে অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে গেলেও তাঁত শিল্পের গল্প এখনও কিছুটা বেঁচে আছে তাঁতিদের হাতে বোনা কাপড়ে।
দীর্ঘ ইতিহাস ও এখনও কিছুটা জীবন্ত থাকা তাঁত শিল্পকে তুলে ধরতেই রাজধানীতে আয়োজন করা হয়েছে ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পের একটি বিশেষ প্রদর্শনী ও মেলার।
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের উদ্যোগে এবং বেঙ্গল ফাউন্ডেশন সহযোগিতায় এই মেলা শুরু হয়েছে ৮ মার্চ। উদ্বোধন করেন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদির। সেদিনের আয়োজিত অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম। আর সভাপতিত্ব করেন বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিব বিলকিস জাহান রিমি।
ঢাকার ধানমণ্ডিতে বেঙ্গল ফাউন্ডেশন–এর শিল্পালয়ে দ্বিতীয় তলার গ্যালারি ও চতুর্থ তলার উন্মুক্ত স্থানে এই আয়োজন শুধু কাপড়ের প্রদর্শনী নয়, বরং হাজার বছরের বস্ত্র ঐতিহ্যের ইতিহাস, প্রযুক্তি ও সাংস্কৃতিক ধারাকে একসঙ্গে তুলে ধরার একটি প্রচেষ্টাই বলা চলে।
তাঁতশিল্পের ইতিহাসের সঙ্গে নাগরিকের পরিচয়
বাংলাদেশের তাঁতশিল্প শুধু পোশাক তৈরির একটি পেশা নয়, এর সঙ্গে যুক্ত আছে এই অঞ্চলের তাঁতিদের বিশ্বের বস্ত্রবাজারে রাখা ভূমিকাও। বিশেষ করে ঢাকাই মসলিনের সূক্ষ্মতা যার কদর এখনো কমেনি।
আয়োজিত এই প্রদর্শনীতে দর্শনার্থীরা সেই ইতিহাসের বিভিন্ন দিকই সরাসরি দেখতে পারবেন। প্রাচীন তাঁতযন্ত্র, সুতা তৈরির উপকরণ, প্রাকৃতিক রংয়ের নমুনা এবং বিভিন্ন নথিপত্রের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে বস্ত্রশিল্পের দীর্ঘ পথচলা।
এই আয়োজনে একই সঙ্গে দেখানো হচ্ছে কীভাবে তুলা থেকে সুতা তৈরি হয় এবং সেই সুতা দিয়ে কাপড় বোনা হয়।
শুধু তথ্য নয়, প্রদর্শনী দর্শনে এসে তাঁতশিল্পের অনেক প্রক্রিয়া সরাসরি দেখার সুযোগও মিলবে।
মসলিন থেকে জামদানি: ঐতিহ্যের বিস্তৃত ভুবন
প্রদর্শনীর একটি বড় আকর্ষণ হল- ঢাকাই মসলিনের ইতিহাস ও পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টা। মসলিনের কাঁচামাল ফুটি কার্পাস তুলা যা এ অঞ্চল থেকে বিলীন হয়ে গিয়েছিল, সুতা তৈরির প্রক্রিয়া এবং বুননের ধাপগুলো সবই এখানে তুলে ধরা হয়েছে।
পাশাপাশি রয়েছে প্রায় দেড়শ বছর পুরানো জামদানি ও টাঙ্গাইল শাড়ির আদি নমুনা। যা শুধু শাড়ি নয়, বরং বাঙালির নকশা সংস্কৃতিরও গুরুত্বপূর্ণ দলিল।
এছাড়াও প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে বিভিন্ন নকশার ঐতিহ্যবাহী শাড়ি, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাঁতিরা তৈরি করে আসছেন।
তাঁতির হাতের শিল্প থেকে বাজার পর্যন্ত
প্রদর্শনীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল- প্রান্তিক তাঁতিদের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা। এতে তাঁতিরা যেমন তাদের কাজ প্রদর্শনের সুযোগ পাচ্ছেন, তেমনি ক্রেতারাও স্থানীয় শিল্পের সঙ্গে সরাসরি সংযোগ স্থাপন করতে পারছেন।
মেলায় মোট ১৫টি স্টল ঘুরে ক্রেতারা দেশীয় পোশাকও কিনতে পারছেন।
ঘুরতে আসা দর্শনার্থী মেহরিম বলেন, “ঈদের জন্য প্রথম পছন্দ শাড়ি। আবার এখানে জামদানি, সিল্ক, কাতান, সুতি, মনিপুরি সব ধরনের শাড়িরই সংগ্রহ থেকে বাছাই করতে পারছি। সব মিলিয়ে এই ধরনের আয়োজন তাঁতশিল্পের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকেও সামনে আনে।”
প্রথমবারের মতো এই মেলায় অংশ নিয়েছেন জামদানি শাড়ির উদ্যোগ টানাপোড়েন। সেবা’র পরিবেশ বান্ধব প্রকল্প ‘সাসটেইনবল ইন্টারপ্রেইজ প্রজেক্ট’-এর অন্তর্ভক্ত জামদানি বুটিক তারা।
মেলা উপলক্ষ্যে ৬ হাজার টাকা থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকার শাড়ি রেখেছেন। মেলায় শুধুমাত্র জামদানি শাড়ির স্টল আছে পাঁচটি।
সেবা নারী শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা আফরোজা বিনতে ইলিয়াস বলেন, “শুরু থেকেই জামদানি খুব এক্সক্লুসিভ ও ডেলিকেট কাপড়। এই কাপড় বুননে ও নকশা তুললে অনেক সময় ছয় মাস থেকে বছরও লেগে যায়। তাই দামের দিক থেকে জামদানি সহজলভ্য করা উচিত নয়। এতে জামদানির জামিন ও আদি নকশার শুদ্ধতা নষ্ট হয়।”
তিনি আরও বলেন “তাঁতিরাও এই এক্সক্লুসিভ কাপড় বোনার মূল্য পাচ্ছেন না। এছাড়া ফিউশনের নামে নানান নকশার কারণে জামদানির আদি আবেদন হারিয়ে যাচ্ছে অনেকটাই। ফিউশন করা শাড়িকে কোন ভাবেই জামদানি বলা উচিত নয়, সেটিকে অন্য কোনও নাম দেওয়া যেতে পারে।”
“জামদানি ছাড়াও মেলায় সুতি বিশেষ করে ভেজিটাবল ডাই করা শাড়ির কদর বেশি”- মন্তব্য করেন ‘হ্যান্ড টাচ’য়ের প্রধান মোহাম্মদ আলী খান।
ক্রেতারা কেমিকেল করা ভেজিটাবল ডাই শাড়ির বদলে এখানে পাচ্ছে প্রাকৃতিক ভেজিটাবল ডাই শাড়ি। প্রায় একশ ধরনের নকশার ভেজিটাবল ডাই শাড়ি রয়েছে এই স্টলে।
এখানে পাটের সুতি শাড়ি, বিশেষ ভাবে বোনা খাদির হোমডেকর পণ্যও পাওয়া যাচ্ছে।
তাঁত বোর্ডের স্টলে রয়েছে মিরপুরের কাতান, রাজশাহী সিল্ক, টাঙ্গাইল শাড়ি, খাদি পাঞ্জাবি, নকশী কাঁথা, সিরাজগঞ্জের লুঙ্গি, জামদানি, মনিপুরি পাটের কাপড়।
মেলাটি ১৭ মার্চ পর্যন্ত প্রতিদিন দুপুর ১২টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকবে।
