পাতলা চুল ঘন ও স্বাস্থ্যোজ্জ্বল করার উপায়
চুল পাতলা হওয়া ঠেকাতে শুধু দামি শ্যাম্পু বদলালেই সমস্যার সমাধান হবে না।
চুলের ধরন যেমনই হোক না কেন- ঘন, মজবুত ও স্বাস্থ্যোজ্জ্বল চুলের আকাঙ্ক্ষা সবারই থাকে।
বয়স বৃদ্ধি, চুলে অতিরিক্ত রাসায়নিক রং ব্যবহার বা বিভিন্ন শারীরিক জটিলতার কারণে অনেকেরই চুল পাতলা হয়ে যায় বা ঝরতে শুরু করে।
তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, চুল পাতলা হওয়া স্বাভাবিক একটি বিষয়। আর সঠিক যত্ন ও খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে চুলকে পুনরায় ঘন ও প্রাণবন্ত করে তোলা সম্ভব।
স্বাস্থ্যবিষয়ক ওয়েবসাইট ‘প্রিভেনশন’-এ এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের কানসাস সিটির ‘কেএমসি হেয়ার সেন্টার’-এর বোর্ড-প্রত্যয়িত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. মিনা সিং বলেন, “চুলের গোড়া বা হেয়ার ফলিকলের আকারের ওপর নির্ভর করে চুল পাতলা হবে নাকি ঘন হবে। যেহেতু এই ফলিকলগুলো মাথার ত্বক বা স্ক্যাল্পের ‘ডার্মিস’ স্তরে থাকে, তাই ঘন চুলের জন্য সবার আগে মাথার ত্বকের যত্ন নেওয়া আবশ্যক।”
খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনা
যুক্তরাজ্যের লন্ডনভিত্তিক শীর্ষস্থানীয় কেশ পরিচর্যা প্রতিষ্ঠান ‘ফিলিপ কিংসলে’-এর ব্র্যান্ড সভাপতি, চুল ও মাথার ত্বক বিশেষজ্ঞ অ্যানাবেল কিংসলে বলেন, “শরীরের অন্যান্য অঙ্গের মতো চুল কোনও অত্যাবশ্যকীয় টিস্যু নয়। ফলে শরীরে সামান্য পুষ্টির ঘাটতি দেখা দিলেও সবার আগে চুলে পুষ্টি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়।”
ডা. মিনা সিংয়ের মতে, “আয়রন, জিঙ্ক, ভিটামিন ‘ডি’ এবং ভিটামিন ‘বি’-এর ঘাটতির কারণে চুল পাতলা হয়ে যায়।”
তাই দৈনিক খাদ্যতালিকায় বাদাম, গরু বা মুরগির মাংস, মিষ্টি আলু, কিনোয়া এবং ব্রকলির মতো পুষ্টিকর খাবার রাখা উচিত।
মৃদু ও সালফেট-মুক্ত শ্যাম্পু ব্যবহার
অ্যানাবেল কিংসলের পরামর্শ অনুযায়ী, সপ্তাহে অন্তত তিনবার শ্যাম্পু করা উচিত। এর চেয়ে কম শ্যাম্পু করলে মাথার ত্বকে মরা কোষ জমে খুশকি ও চুলকানি তৈরি হয়।
অন্যদিকে, ডা. মিনা সিং, সবসময় ‘সালফেট-মুক্ত’ শ্যাম্পু বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
কারণ অতিরিক্ত ফেনা সৃষ্টিকারী সালফেট চুলের প্রাকৃতিক তেল ও প্রোটিন শুষে নিয়ে চুলকে আরও পাতলা করে ফেলে। সাময়িকভাবে চুল ঘন দেখাতে ‘ভলিউমাইজিং’ ঘনত্ব তৈরির শ্যাম্পু এবং কন্ডিশনার ব্যবহার করা যেতে পারে।
হেয়ার স্টাইলিংয়ে তাপের ব্যবহার কমানো
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির ফোর্ট লি-তে অবস্থিত ‘ফাইভ স্যালন অ্যান্ড স্পা’-এর প্রধান নির্বাহী ও মার্কিন ‘সেলিব্রিটি কেশসজ্জাকর ওনা ডিয়াজ-স্যান্টিন বলেন, “অতিরিক্ত তাপ চুলের ভেতরের বন্ধন ভেঙে, চুলকে দুর্বল ও ভঙ্গুর করে তোলে। হেয়ার ড্রায়ার বা স্ট্রেইটনার ব্যবহার করতে হলে আগে অবশ্যই চুলে ‘হিট প্রোটেক্ট্যান্ট’ লাগিয়ে নিতে হবে এবং তাপ নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তিসম্পন্ন যন্ত্র ব্যবহার করা উচিত।”
মাথার ত্বক বা স্ক্যাল্পের বিশেষ যত্ন
অ্যানাবেল কিংসলে, সপ্তাহে একবার মাথার ত্বকের নির্দিষ্ট সমস্যার সমাধান করে এমন ‘টার্গেটেড হেয়ার মাস্ক’ ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন।
তবে মাথার ত্বক পরিষ্কারের জন্য দানাদার স্ক্রাবের বদলে মৃদু কেমিক্যাল এক্সফোলিয়েন্ট ব্যবহার করা নিরাপদ। কারণ দানাদার স্ক্রাব মাথার ত্বকে ঘর্ষণ তৈরি করে ক্ষতি করতে পারে।
সঠিক সাপ্লিমেন্ট ও ওষুধ নির্বাচন
চুলের গোড়ায় ভেতর থেকে পুষ্টি জোগাতে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অ্যামিনো অ্যাসিড, কোলাজেন এবং প্রয়োজনীয় ভিটামিনযুক্ত সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করা যেতে পারে।
ডা. মিনা সিং বলেন, “চুলের বৃদ্ধির চক্রকে দীর্ঘায়িত করতে যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্য ও ওষুধ প্রশাসন অনুমোদিত ‘মিনোক্সিডিল’ উপাদানটি কার্যকর।”
তবে যেকোনও সাপ্লিমেন্ট বা ওষুধ সেবনের আগে ভালো করে যাচাই করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া আবশ্যক।
নিয়মিত চুলে তেল দেওয়া
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্ক সিটির ‘মাহোগানি গ্রেস স্যালন’-এর স্বত্বাধিকারী ও মার্কিন কেশসজ্জাকর মাহোগানি গ্রেস বলেন, “নিয়মিত তেল ব্যবহার করলে স্ক্যাল্পের আর্দ্রতা বজায় থাকে, চুলের রুক্ষতা কমে এবং এটি সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি থেকে প্রাকৃতিক সুরক্ষা দেয়।”
শ্যাম্পু করার আগে নারিকেল, আর্গান বা জোজোবা তেল মাথার ত্বকে ও চুলে মেখে নেওয়া উচিত।
স্ক্যাল্প ম্যাসাজের মাধ্যমে ফলিকল উদ্দীপ্ত করা
নিউ ইয়র্কের জোড়া বোর্ড-প্রত্যয়িত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ব্রেন্ডন ক্যাম্প পরামর্শ দেন, “আঙুলের ডগা দিয়ে বা স্ক্যাল্প ম্যাসাজারের সাহায্যে মাথায় ম্যাসাজ করলে রক্ত সঞ্চালন এবং অক্সিজেন সরবরাহ বৃদ্ধি পায়।”
জাপানের টোকিওর ‘নিপ্পন মেডিকেল স্কুল’ এবং ‘মেনস হেলথ ক্লিনিক টোকিও’-এর গবেষকদের পরিচালিত ও আন্তর্জাতিক সাময়িকী ‘ইপ্লাস্টি’-তে প্রকাশিত ২০১৬ সালের গবেষণায় দেখা গেছে, টানা ছয় মাস প্রতিদিন মাত্র চার মিনিট করে নিয়মিত ‘স্ক্যাল্প’ বা মাথার ত্বক ম্যাসাজ করলে চুলের পুরুত্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণ
অতিরিক্ত মানসিক চাপের কারণে সাময়িকভাবে প্রচুর চুল ঝরে যেতে পারে, যাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ‘টেলোজেন এফ্লুভিয়াম’ বলা হয়।
নিউ ইয়র্কের ‘আইকান স্কুল অব মেডিসিন অ্যাট মাউন্ট সিনাই’-এর চর্মরোগ বিভাগের সহকারী ক্লিনিকাল অধ্যাপক ডা. গ্যারি গোল্ডেনবার্গ বলেন, “তীব্র মানসিক চাপ শরীরকে, চুলের প্রয়োজনীয় যত্ন নিতে বাধা দেয়। তাই চুল পড়া রোধে নিয়মিত ব্যায়াম, ধ্যান, পর্যাপ্ত ঘুম এবং সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে দুশ্চিন্তা নিয়ন্ত্রণে রাখা জরুরি।
