সঠিক নিয়মে খেলে কাঁচা রসুন থেকে মিলবে নানান স্বাস্থ্যোপকারিতা
রসুনের থাকা উপকারী উপাদান সক্রিয় করতে, হয় থেঁতো নয়তো করতে হবে কুচি কুচি।
রান্নায় স্বাদ, সুগন্ধ ও ঝাঁঝ বাড়াতে রসুনের ব্যবহার যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। তবে কেবল মসলা হিসেবেই নয়, প্রাকৃতিকভাবে শরীরকে রোগমুক্ত রাখতে এবং ভেষজ ঔষধি গুণাগুণের কারণে রসুনের আলাদা পরিচিতি রয়েছে।
বিশেষ করে কাঁচা রসুন চিবিয়ে বা থেঁতলে খাওয়ার অভ্যাস শরীরের বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সুরক্ষায় সরাসরি ভূমিকা রাখে।
রসুনের অনন্য গুণের মূল চাবিকাঠি লুকিয়ে আছে এর ভেতরে থাকা বিশেষ কিছু যৌগের মধ্যে।
রসুনের পুষ্টি উপাদান ও রাসায়নিক গঠন
রসুনে শুধু সাধারণ ভিটামিনই থাকে না, বরং শক্তিশালী উদ্ভিজ্জ উপাদানের একটি প্রাকৃতিক ভাণ্ডার।
রসুনে রয়েছে ‘অ্যালিন’, ‘অ্যাজোয়িন’, ‘ডায়ালিল ডাইসালফাইড’, ‘ডায়ালিল ট্রাইসালফাইড’ এবং ‘এস-অ্যালাইল সিস্টেইন’-এর মতো সালফারযুক্ত যৌগ।
এছাড়া এতে অল্প পরিমাণে ভিটামিন সি, ভিটামিন বি৬, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস এবং হাড়ের গঠনে সহায়ক খনিজ উপাদান ‘ম্যাঙ্গানিজ’ পাওয়া যায়।
‘অ্যালিসিন’-এর উপকারিতা
আস্ত বা আস্ত রসুনের কোয়ার মধ্যে রসুনের প্রধান ঔষধি উপাদান ‘অ্যালিসিন’ সরাসরি বিদ্যমান থাকে না।
আস্ত অবস্থায় রসুনে ‘অ্যালিন’ নামক অ্যামিনো অ্যাসিড এবং ‘অ্যালিনেজ’ নামক বিশেষ এনজাইম সম্পূর্ণ আলাদা বা পৃথক অবস্থায় থাকে।
রসুন যখন বঁটি দিয়ে কুচি করা হয় বা ভালো করে থেঁতলে নেওয়া হয়, তখন কোষের প্রাচীর ভেঙে গিয়ে অ্যালিনেজ এনজাইমটি সক্রিয় হয়ে ওঠে।
এই সক্রিয় এনজাইমটি দ্রুত অ্যালিনকে ‘অ্যালিসিন’ নামক ঔষধি যৌগে রূপান্তর করে। এই রাসায়নিক বিক্রিয়ার কারণেই রসুন কাটার পর এর তীব্র ঝাঁঝালো গন্ধ ও ঔষধি গুণ বৃদ্ধি পায়।
রসুনের চিকিৎসাগত সুফল
নিমিত পরিমিত পরিমাণে রসুন গ্রহণ করলে শরীরের বিভিন্ন ক্রনিক বা দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব।
হৃদযন্ত্রের সুরক্ষা ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ: রসুনের সালফারযুক্ত যৌগগুলো রক্তনালীর স্বাভাবিক স্থিতিস্থাপকতা বজায় রাখতে এবং সংকুচিত ধমনী শিথিল করতে সাহায্য করে।
বিভিন্ন ‘মেটা-অ্যানালাইসিস’-এ দেখা গেছে, রসুনের নির্যাস নিয়মিত গ্রহণে উচ্চ রক্তচাপ এবং রক্তের ক্ষতিকর কোলেস্টেরল বা ও চর্বির মাত্রা সামান্য হ্রাস পায়।
তবে মনে রাখতে হবে, উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের ক্ষেত্রে চিকিৎসকের দেওয়া ওষুধের বিকল্প হিসেবে কখনই শুধু রসুন ব্যবহার করা যাবে না। এটি খাবারের অংশ হতে পারে, ওষুধের বিকল্প নয়।
হৃদযন্ত্র ভালো রাখতে কম লবণ খাওয়া, বেশি শাকসবজি ও পর্যাপ্ত ফলমূল গ্রহণ এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করা সমান গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাকৃতিক রোগ প্রতিরোধ ও সর্দি-কাশি উপশম: রসুনের সালফার যৌগগুলো প্রাকৃতিকভাবে ‘অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল’ বা জীবাণু-প্রতিরোধী হিসেবে কাজ করে।
সাধারণ সর্দি-কাশি, নাক বন্ধ হওয়া বা ইনফ্লুয়েঞ্জার মতো হালকা সংক্রমণে কাঁচা রসুন শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে উদ্দীপিত করতে পারে।
তবে তীব্র জ্বর, শ্বাসকষ্ট বা দীর্ঘস্থায়ী কাশি থাকলে রসুনকে একমাত্র নিশ্চিত চিকিৎসা না ভেবে অবিলম্বে একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
হাড়ের স্বাস্থ্য ও ক্যানসার প্রতিরোধ: রসুনে থাকা ম্যাঙ্গানিজ হাড়ের স্বাভাবিক বিপাকক্রিয়া ও হাড় মজবুত রাখতে ভূমিকা রাখে। তবে হাড়ের সুরক্ষায় ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ডি, পর্যাপ্ত প্রোটিন ও নিয়মিত ব্যায়ামই বেশি কার্যকর।
এছাড়া রসুনের শক্তিশালী অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের কোষগুলোর ক্ষতিকর অক্সিডেটিভ চাপ কমিয়ে ক্যানসার প্রতিরোধী সুস্থ খাদ্যাভ্যাসের একটি অংশ হিসেবে কাজ করে।
কাঁচা রসুন খাওয়ার সঠিক নিয়ম
রসুনের অ্যালিসিন যৌগের ঔষধি সুফল পেতে হলে তিন নিয়ম অবলম্বন করা যেতে পারে।
সরাসরি গিলে না খাওয়া: রসুনের কোয়া ক্যাপসুলের মতো সরাসরি চিবানো ছাড়া গিলে খেলে অ্যালিসিন তৈরি হওয়ার সুযোগ পায় না। তাই রসুন খাওয়ার আগে অবশ্যই সেটিকে কুচি কুচি করে কেটে বা ভালোভাবে থেঁতলে নিতে হবে।
১০ মিনিটের বিশেষ বিরতি: রসুন থেঁতলে বা কুচি করার পর অন্তত ১০ মিনিট ঘরের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় বাতাসে রেখে দিতে হবে। এই সময়টুকুর মধ্যে অ্যালিনেজ এনজাইমটি সক্রিয় হয়ে সর্বোচ্চ পরিমাণ অ্যালিসিন তৈরি সম্পন্ন করে। এরপর এটি সরাসরি কাঁচা খাওয়া বা রান্নায় মেশানো উচিত।
ঘরোয়া খাবারে সংযোজন: প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রসুনের সুফল পেতে বিভিন্ন পুষ্টিকর দেশি ভর্তা, সালাদ, ডাল বা তরকারির সঙ্গে সহনীয় ও পরিমিত পরিমাণে কাঁচা রসুন যোগ করা উপকারী।
যেসব ক্ষেত্রে কাঁচা রসুনে খেতে সতর্কতা প্রয়োজন
কাঁচা রসুন উপকারী হলেও এর কিছু তীব্র পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে।
পাকস্থলীর অস্বস্তি ও অ্যাসিডিটি: খালি পেটে কাঁচা রসুন অতিরিক্ত খেলে অনেকের বুকজ্বালা, পেটব্যথা, বমি বমি ভাব, গ্যাস বা পেটের সংবেদনশীল অস্বস্তি হতে পারে।
যাদের গ্যাস্ট্রিক বা আলসারের সমস্যা রয়েছে, তাদের কাঁচা রসুন এড়িয়ে হালকা সেঁকে বা রান্না করে খেতে হবে।
রক্ত পাতলা করার ওষুধের সঙ্গে ক্ষতিকর বিক্রিয়া: রসুন রক্ত জমাট বাঁধার প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে ধীর বা ব্যাহত করতে পারে।
তাই হৃদরোগের কারণে রক্ত পাতলা করার ওষুধ (যেমন— অ্যাসপিরিন বা ওয়ারফারিন) নিয়মিত খাওয়া হলে বা যাদের কোনও বড় সার্জারি বা অপারেশন হওয়ার কথা রয়েছে, তাদের নিয়মিত কাঁচা রসুন খাওয়ার আগে অবশ্যই একজন রেজিস্টার্ড চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদের পরামর্শ নিতে হবে।
লেখক: পুষ্টিবিদ লিনা আকতার। রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর
