১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২ আশ্বিন ১৪৩৩

প্রক্রিয়াজাত খাবার যেভাবে স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলছে

খেতে মজা বলে বারবার আকর্ষণ জাগে, যে কারণে খাওয়া হয় বেশি। আর বাড়ে মেদ ও অসুস্থতার মাত্রা।

লাইফস্টাইল ডেস্ক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

Published : 30 Aug 2026, 04:58 PM

Updated : 11 Sep 2026, 03:55 PM

আধুনিক ব্যস্ত বিশ্বে সুপারমার্কেটের ঝকঝকে তাক থেকে শুরু করে, প্রতিদিনের ডাইনিং টেবিলে একচেটিয়া রাজত্ব গেঁড়ে বসেছে অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার বা ‘আল্ট্রা-প্রসেসড ফুড’।

চটজলদি তৈরি করা যায় এবং খেতে সুস্বাদু হওয়ায় এই সুবিধাজনক কৃত্রিম খাদ্যপণ্যগুলো অজান্তেই প্রতিদিনের পুষ্টির চাহিদা গ্রাস করছে।  

গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রতিদিন অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ করেন, তাদের সব কারণ মিলিয়ে অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি বা সম্ভাবনা সাধারণ মানুষের তুলনায় প্রায় ৬২ শতাংশ বেশি থাকে। এই পরিসংখ্যান নিয়মিত প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণের সঙ্গে জড়িত দীর্ঘমেয়াদী স্বাস্থ্য ঝুঁকির ভয়াবহতাক তুলে ধরে।

অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার এত আসক্তিকর কেন?

এই খাবারগুলো বিপজ্জনক হওয়ার প্রধান কারণ হল, এর তীব্র আসক্তিকর প্রকৃতি। ল্যাবরেটরিতে কৃত্রিম চর্বি, অতিরিক্ত চিনি এবং লবণের এক বিশেষ রাসায়নিক সংমিশ্রণ তৈরি করা হয়, যা খাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিস্কের ‘রিওয়ার্ড সেন্টার’-এ তীব্র উদ্দীপনা জাগায়। ফলে ‘ডোপামিন’ নামক এক বিশেষ ভালো লাগার নিউরোট্রান্সমিটার বা হরমোন অতিরিক্ত মাত্রায় নিঃসৃত হয়।

এই ডোপামিন মস্তিস্ককে অবচেতনে সংকেত পাঠায় খাবারগুলো বারবার খুঁজতে, এমনকি শরীরের জন্য ক্ষতিকর জানার পরও এই আসক্তি কাজ করতে থাকে। অস্বাস্থ্যকর খাবারের প্রতি এই আকর্ষণ সুষম খাদ্যতালিকা বজায় রাখতে বাধা দেয় এবং মানুষকে অতিরিক্ত খাওয়ার দিকে ঠেলে দেয়।

চিনে নিন অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার

সহজ কথায়, অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার হল এমন সব বাণিজ্যিক পণ্য— যা তৈরি করতে কৃত্রিম স্বাদ, কেমিক্যাল প্রিজারভেটিভ, ‘ইমালসিফায়ার’, কৃত্রিম রং, অতিরিক্ত পরিশোধিত চিনি এবং আংশিক হাইড্রোজেনেটেড ভোজ্য তেল ব্যবহার করা হয়। এর সাধারণ উদাহরণগুলোর মধ্যে রয়েছে:

  • প্যাকেজ করা চিপস, কুকিজ, পেস্ট্রি এবং চিনিযুক্ত সকালের নাস্তার সিরিয়াল।
  • ইনস্ট্যান্ট নুডলস, সফট ড্রিঙ্কস বা কোমল পানীয় এবং অতিরিক্ত ক্যাফিনযুক্ত এনার্জি ড্রিঙ্কস।
  • হট ডগ, নাগেটস, সসেজ এবং কিছু ‘ডেলি মিটে’র মতো প্রক্রিয়াজাত লাল মাংস।

পুষ্টিবিদের বিশেষ নোট: সব প্যাকেটজাত খাবারই কিন্তু ক্ষতিকর নয়। হিমায়িত বা ফ্রোজেন কাঁচা সবজি, সাধারণ টক দই, টিনজাত শিম এবং ফ্রোজেন ফল হল স্বল্প প্রক্রিয়াজাত বা ‘মিনিমালি প্রসেসড’ বিকল্প, যা একটি পুষ্টিকর খাদ্যতালিকার জন্য ভালো সংযোজন হতে পারে।

অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের স্বাস্থ্যঝুঁকি

পুষ্টির অভাব ও বাড়তে ক্যালরি: বাণিজ্যিক প্রক্রিয়াজাতকরণের সময় শস্যের বাইরের আঁশযুক্ত স্তর এবং ভ্রূণ অংশ পুরোপুরি ছেঁটে ফেলা হয়। ফলে এতে ভিটামিন, খনিজ এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট নষ্ট হয়ে যায়। এগুলো এমনই খাবার যা ক্যালরিতে পূর্ণ তবে পুষ্টিহীন, যা অলক্ষ্যেই অ্যানিমিয়া বা পুষ্টির দীর্ঘমেয়াদী ঘাটতি তৈরি করে।

দ্রুত ওজন বৃদ্ধি ও স্থূলতা: এই খাবারগুলোর সুস্বাদু প্রকৃতির কারণে মানুষ নিজের অজান্তেই প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খেয়ে ফেলে। ঘন ঘন এই খাবার গ্রহণ শরীরের মেটাবলিজম বা বিপাক অবশ করে দ্রুত মেদ বৃদ্ধি ও স্থূলতার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

পরিপাকতন্ত্রের অবক্ষয় ও কোষ্ঠকাঠিন্য: আঁশ এবং জটিল কার্বোহাইড্রেইটের অভাবে আংশিকভাবে হজম হওয়া খাবারের বর্জ্য অন্ত্রের স্বাভাবিক চলন কমিয়ে দেয়। এটি অন্ত্রের সুস্থ মাইক্রোবায়োম বা উপকারী ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করে স্থায়ী কোষ্ঠকাঠিন্য, পেট ফাঁপা ও তীব্র অস্বস্তির সৃষ্টি করে।

ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স ও টাইপ-২ ডায়াবেটিস: নিয়মিত পরিশোধিত শর্করার এই উচ্চ ক্যালরির খাবার, রক্তে প্রতিনিয়ত গ্লুকোজের মাত্রা ক্ষতিকর হারে বাড়ায়। ফলে শরীরের কোষগুলোর ইনসুলিন সংবেদনশীলতা চিরতরে নষ্ট হয়ে ‘ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স’ দেখা দেয়, যা পরে টাইপ-২ ডায়াবেটিস ও ক্যানসারের ঝুঁকি ত্বরান্বিত করে।

দীর্ঘমেয়াদে শরীরের ওপর ক্ষতিকর প্রভাবসমূহ

মেডিকেল পরিসংখ্যানে প্রমাণিত যে, যারা অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার বেশি পরিমাণে গ্রহণ করেন, তাদের মধ্যে নিম্নলিখিত দীর্ঘমেয়াদি ব্যাধিগুলোর হার বেশি থাকে।

  • উচ্চ রক্তচাপ ও হৃদরোগ।
  • মস্তিস্কের স্মরণ শক্তির কোষ বা দ্রুত জ্ঞানীয় অবক্ষয়।
  • শরীরের অভ্যন্তরীণ দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ ও কিছু সুনির্দিষ্ট ক্যানসারের ঝুঁকি।

অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবার কমানোর নিয়ম

গোটা খাবারকে অগ্রাধিকার দিন: প্রতিদিনের খাবারের প্লেটে বৈচিত্র্যময় ফলমূল, শাকসবজি, পূর্ণশস্য বা লাল আটা, চর্বিহীন প্রোটিন (ডিম ও মাছ) এবং স্বাস্থ্যকর চর্বি (বাদাম) যুক্ত করতে হবে।

বাড়িতে রান্না করা: রান্নায় অপ্রয়োজনীয় ও ক্ষতিকর কেমিক্যাল উপাদান এড়াতে, ঘরে তৈরি তাজা খাবার খাওয়ার অভ্যাস গড়তে হবে।

পুষ্টি লেবেল পড়ার অভ্যাস: যেকোনো প্যাকেটজাত খাবার কেনার আগে বোতলের লেবেলে থাকা লুকানো চিনি, সোডিয়াম এবং অপরিচিত কেমিক্যালের নাম সতর্কতার সঙ্গে নজর দিতে হবে।

প্রাকৃতিক নাস্তা: চিপস, চানাচুর বা ওভেনের কুকিজের মতো প্রক্রিয়াজাত নাস্তার পরিবর্তে এক মুঠো কাঠবাদাম, তাজা ফল বা টক দই বেছে নেওয়া নিরাপদ।

বিশুদ্ধ পানি পান: কৃত্রিম চিনিযুক্ত কোমল পানীয় বা এনার্জি ড্রিঙ্কস পুরোপুরি বর্জন করে সাধারণ বিশুদ্ধ পানি বা ভেষজ চা পান করা উপকারী। যা বৃক্ক ও যকৃতের স্বাভাবিক ছাঁকন প্রক্রিয়া সচল রেখে শরীরকে প্রাকৃতিকভাবেই বিষমুক্ত রাখতে সাহায্য করে।

লেখক: পুষ্টিবিদ লিনা আকতার। রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর।

আরও পড়ুন

যত খান, ওজন বাড়েই না— সমস্যাটা আসলে কোথায়?

স্বাস্থ্যকর হলেও ওজনের বারোটা বাজায় যেসব খাবার

একসঙ্গে খেলে যে উপকার মেলে