ঠান্ডায় জমানো দই কি আইসক্রিমের চেয়ে স্বাস্থ্যকর?
ফ্রোজেন ইয়োগার্ট স্বাস্থ্যকর মনে হলেও সবার ক্ষেত্রে সহ্যকর নাও হতে পারে।
গরম বাড়লেই ঠান্ডা ও মিষ্টি খাবারের আগ্রহ বাড়ে। কারও পছন্দ আইসক্রিম, কেউ বেছে নেন ঠান্ডায় জমানো দই। কারণ ফ্রিজে জমানো ঠান্ডা দইকে অনেক সময় আইসক্রিমের তুলনায় স্বাস্থ্যকর খাবার হিসেবে ধরা হয়।
কম চর্বি এবং অন্ত্রের জন্য উপকারী জীবিত অণুজীব থাকার মতো নানান বৈশিষ্ট্যের কারণেই এটিকে তুলনামূলক ভালো খাবার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
তবে হিমায়িত দই কি আইসক্রিমের চেয়ে বেশি স্বাস্থ্যকর? পুষ্টিবিদদের মতে, দুটির মধ্যে কোনটি ভালো, তা নির্ভর করে- কী দিয়ে তৈরি, কতটা খাওয়া হচ্ছে এবং সঙ্গে কী যোগ করা হচ্ছে।
তাই শুধু দই দেখেই হিমায়িত দইকে স্বাস্থ্যকর ধরে নেওয়া পুরোপুরি ভাবে ঠিক বলা যাবে না।
দুটির তৈরির পদ্ধতিতে পার্থক্য কোথায়
মার্কিন পুষ্টিবিদ জোহান্না কাটজ রিয়েলসিম্পল ডটকম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলেন, “আইসক্রিম সাধারণত দুধ ও দুধের সরের মিশ্রণ থেকে তৈরি হয়। এরপর তা বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ঠান্ডা করে জমিয়ে নেওয়া হয়। তৈরির সময় মিশ্রণের মধ্যে বাতাসও প্রবেশ করানো হয়, যার কারণে আইসক্রিমের নরম ও মসৃণ গঠন তৈরি হয়।”
অন্যদিকে হিমায়িত দই তৈরির প্রক্রিয়া অনেকটাই একই রকম হলেও এতে গাঁজানো দই ব্যবহার করা হয়। দই গাঁজনের কারণে এতে থাকা দুধের শর্করার একটি অংশ ভেঙে যায়। ফলে কিছু ক্ষেত্রে হিমায়িত দই আইসক্রিমের তুলনায় সহজে সহ্য হতে পারে।
“তবে দই থেকে তৈরি বলেই এর মধ্যে চিনি বা ক্যালরি কম থাকবে এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই”, বলেন এই পুষ্টিবিদ।
তৈরির সময় কতটা চিনি, দুধের চর্বি এবং অন্যান্য উপাদান ব্যবহার করা হয়েছে, তার ওপর পুষ্টিগুণ অনেকটাই নির্ভর করে।
কোনটি বেশি স্বাস্থ্যকর
যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া পুষ্টিবিদ মেগান রো-এর মতে, “হিমায়িত দই এবং আইসক্রিমের কোনোটিকেই সকল বয়সি ও শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় বেশি পুষ্টিকর বলা যায় না। একজনে জন্য যে খাবার উপযোগী, অন্যজনের জন্য সেটি একইভাবে উপযোগী নাও হতে পারে।”
সাধারণভাবে দেখলে আইসক্রিমে হিমায়িত দইয়ের তুলনায় চর্বি, বিশেষ করে সম্পৃক্ত চর্বি এবং মোট ক্যালরির পরিমাণ বেশি হতে পারে।
অন্যদিকে হিমায়িত দইয়েও যে সব সময়ে কম চিনি ব্যবহার হয় এমন নয়। বরং দইয়ের স্বাভাবিক টক স্বাদ ঢাকতে অতিরিক্ত চিনিও যোগ করা হতে পারে।
অর্থাৎ, শুধু চর্বির পরিমাণ কম দেখেই হিমায়িত দইকে স্বাস্থ্যকর ধরে নেওয়া সঠিক না। একইভাবে আইসক্রিমে চর্বি বেশি বলে সেটি সবার জন্য খারাপ, এমন ধারণাও পুরোপুরি সঠিক নয়।
দইয়ের উপকারী অণুজীব যে কাজে আসে
হিমায়িত দইয়ের একটি উপকারী দিক হল, এতে দইয়ের মতো জীবিত ও সক্রিয় উপকারী অণুজীব থাকতে পারে। এসব অণুজীব পরিপাকতন্ত্রের জন্য ভালো।
তবে জোহান্না কাটজ মন্তব্য করেন, “হিমায়িত করার প্রক্রিয়ার কারণে খাওয়ার সময় জীবিত অণুজীবের সংখ্যা সাধারণ দই তৈরির সময়ের তুলনায় কমে যেতে পারে। অর্থাৎ হিমায়িত দইয়ে উপকারী অণুজীব থাকতেই পারে, তবে শুধু এই কারণেই একে আইসক্রিমের তুলনায় অনেক বেশি স্বাস্থ্যকর বলা যাবে না।”
আবার সব হিমায়িত দইয়ে একই পরিমাণ জীবিত অণুজীব থাকে না। তাই তথ্য না দেখে শুধু খাবারের নামের ওপর নির্ভর করাও ঠিক নয়।
দইয়ের সঙ্গে যা খাওয়া যায়
হিমায়িত দইয়ের সঙ্গে কী খাওয়া হচ্ছে সেটাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ পছন্দমতো ফল, বাদাম, চকলেট, বিস্কুট, কেকের টুকরা, মিষ্টি সিরাপ কিংবা বিভিন্ন ধরনের মিষ্টি উপকরণ যোগ করেই দইয়ের স্বাদ বাড়ান অনেকেই।
সাধারণত এক কাপ হিমায়িত দই খুব বেশি ক্যালরি যোগ করবে না, এমনই মনে করা হয়। তবে এই ধরনের মিষ্টি উপকরণ যোগ করলে পুরো খাবারটির ক্যালরি ও চিনির পরিমাণ দ্রুত বেড়ে যেতে পারে।
জোহান্না কাটজ বলেন, “সামান্য পরিমাণ হিমায়িত দইও অতিরিক্ত মিষ্টি উপকরণ, বিস্কুট, কেকের টুকরা, সিরাপ কিংবা বেশি পরিমাণ শস্যজাত খাবার ও বাদামের মিশ্রণ যোগ করলে বেশি ক্যালরি, বাড়তি চিনি ও সম্পৃক্ত চর্বি সবই এই খাবারে পাওয়া যাবে।”
ফল ও বাদাম হতে পারে ভালো সংযোজন
পুষ্টিবিদ মেগান রো- ফল, বাদাম বা অল্প পরিমাণ চকলেটের মতো এক বা দুটি উপকরণ বেছে নেওয়ার পরামর্শ দেন।
এতে একসঙ্গে অনেক ধরনের মিষ্টি উপকরণ খাওয়ার প্রবণতা কমে।
তাজা ফল যোগ করলে খাবারে আঁশ ও বিভিন্ন ভিটামিন পাওয়া যায়। বাদাম যোগ করলে কিছুটা স্বাস্থ্যকর চর্বি ও প্রোটিনও পাওয়া যেতে পারে।
তবে বাদামও ক্যালরিসমৃদ্ধ খাবার হওয়ায় পরিমাণের দিকে খেয়াল রাখা দরকার।
কার জন্য কোনটি তুলনামূলক ভালো?
যাদের রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা বেশি, তাদের ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম সম্পৃক্ত চর্বিযুক্ত খাবার বেছে নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে উপকরণ ও পরিমাণ বিবেচনা করে হিমায়িত দই বেছে নেওয়া যেতে পারে।
আবার যাদের দুধের শর্করা হজমে সমস্যা হয়, তাদের ক্ষেত্রেও গাঁজানো দই থেকে তৈরি খাবার কিছুটা সহজে সহ্য হতে পারে।
তবে হিমায়িত দই সম্পূর্ণ দুধের শর্করামুক্ত নয়। তাই এমন সমস্যা থাকলে নিজের সহনশীলতা অনুযায়ী খাবার নির্বাচন করাই উপযোগী।
অন্যদিকে খাবার খাওয়ার পর দীর্ঘ সময় পেট ভরা অনুভব করতে চাইলে তুলনামূলক বেশি চর্বিযুক্ত আইসক্রিম উপযোগী মনে হতে পারে। অর্থাৎ খাবার নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিভেদে প্রয়োজনও আলাদা।
পরিমাণের দিকেও নজর দিতে হবে
কোন খাবার বেশি স্বাস্থ্যক? এই প্রশ্নের পাশাপাশি কতটা খাওয়া হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। অল্প পরিমাণ আইসক্রিম অনেক সময় অতিরিক্ত মিষ্টি উপকরণ দেওয়া বড় এক বাটি হিমায়িত দইয়ের চেয়ে কম ক্যালরির হতে পারে।
তাই শুধু খাবারের নামের ওপর নির্ভর করেইও নয় বরং পরিবেশনের পরিমাণ, চিনি, সম্পৃক্ত চর্বি এবং প্রোটিনের পরিমাণ দেখা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
একই সঙ্গে দিনে বা সপ্তাহে কতবার মিষ্টি খাবার খাওয়া হচ্ছে, সেটিও বিবেচনায় রাখা দরকার।
আরও পড়ুন
