গর্ভকালীন ডায়াবেটিস: মা ও নবজাতকের স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং প্রতিরোধে করণীয়
গর্ভাবস্থায় মায়ের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকলে নবজাতকের দীর্ঘস্থায়ী মস্তিষ্কের ক্ষতি হতে পারে।
গর্ভাবস্থায় মায়েরা সাধারণত যে সকল শারীরিক সমস্যার সম্মুখীন হন, সেসবের মধ্যে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস অন্যতম।
গর্ভাবস্থায় রক্তে শর্করার মাত্রা বা গ্লুকোজ নিয়ন্ত্রণে না থাকলে মায়েরা নানান ধরনের দীর্ঘস্থায়ী জটিলতার সম্মুখীন হতে পারেন; যেমন— উচ্চ রক্তচাপ, হৃদযন্ত্রের সমস্যা এবং কিডনির জটিলতা।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মায়েদের প্রায় ৫০ শতাংশ পরবর্তী জীবনে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হন।
শুধু মা-ই নন, ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মায়ের নবজাতকের শরীরেও বিশেষ কিছু শারীরিক লক্ষণ এবং মারাত্মক চিকিৎসাগত জটিলতা দেখতে পাওয়া যায়, যা সময়মতো চিহ্নিত করে দ্রুত সঠিক চিকিৎসা প্রদান করা জরুরি।
ডায়াবেটিক মায়ের নবজাতকের দৃশ্যমান লক্ষণসমূহ
গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মায়ের শরীরে অতিরিক্ত গ্লুকোজ থাকার কারণে, তা প্লাসেন্টা বা অমরার মাধ্যমে শিশুর শরীরে প্রবেশ করে। ফলে নবজাতকের শরীরে নিচে উল্লেখিত বাহ্যিক লক্ষণগুলো দেখা যায়।
ম্যাক্রোসোমিয়া বা অতিরিক্ত ওজন: নবজাতক প্রাকৃতিকভাবেই অনেক বড়, নাদুস-নুদুস এবং গোল চেহারার হয়। সাধারণ শিশুর তুলনায় এদের জন্মের ওজন বেশি হয়ে থাকে।
রক্তের আধিক্য ও লালচে বর্ণ: রক্তে লোহিত রক্তকণিকার আধিক্য বা পলিমেদ থাকার কারণে নবজাতকের গায়ের রং অতিরিক্ত লাল বর্ণ দেখায়।
কানে অতিরিক্ত লোম: এই ধরনের নবজাতকের কানে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি লোম দেখতে পাওয়া যায়, যা অন্যান্য সাধারণ নবজাতকের ক্ষেত্রে সচরাচর দেখা যায় না।
জটিলতা প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট চিকিৎসাগত করণীয়
নবজাতকের জীবন বাঁচাতে এবং দীর্ঘস্থায়ী প্রতিবন্ধকতা থেকে শিশুকে রক্ষা করতে বিশেষজ্ঞরা ৩টি পরামর্শ দিয়ে থাকে।
নিবিড় পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রে প্রসব: গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মায়েদের প্রসব বা ডেলিভারি অবশ্যই এমন হাসপাতাল বা ‘টারশিয়ারি কেয়ার সেন্টার’-এ করাতে হবে, যেখানে দক্ষ শিশু বিশেষজ্ঞ এবং উন্নত নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র বা ‘এনআইসিইউ’ সুবিধার পাশাপাশি, সার্বক্ষণিক নিবিড় পর্যবেক্ষণের সুযোগ রয়েছে।
দ্রুত পুষ্টি ও গ্লুকোজ সরবরাহ: শিশু ভূমিষ্ঠ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা স্ট্রিপের মাধ্যমে মেপে দেখতে হবে এবং জন্মের পর পরই যত দ্রুত সম্ভব মায়ের বুকের দুধ পান করাতে হবে।
যদি পরীক্ষা করে দেখা যায় যে রক্তের গ্লুকোজের মাত্রা মারাত্মকভাবে কমে গেছে, তবে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী অবিলম্বে ইঞ্জেকশন স্যালাইনের মাধ্যমে গ্লুকোজ সরবরাহ করতে হবে; অন্যথায় গ্লুকোজের ঘাটতিতে শিশুর মস্তিষ্কে স্থায়ী ক্ষত বা ‘পার্মানেন্ট ব্রেইন ড্যামেজ’ হতে পারে।
মায়ের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ: নবজাতকের এই সকল ভয়াবহ জটিলতা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শতভাগ প্রতিরোধ করা সম্ভব, যদি গর্ভকালীন অবস্থায় মায়ের রক্তের গ্লুকোজ সঠিক নিয়ম, সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ইনসুলিন বা চিকিৎসার মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
লেখক: ডা. মৌসুমি আহমেদ মৌরী। শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ। আলোক মাদার এন্ড চাইল্ড কেয়ার, মিরপুর-৬।
