ব্যায়ামের পর অতিরিক্ত ক্লান্তির কারণ
শরীরচর্চার পর ফুরেফুরে মেজাজের পরিবর্তে শ্রান্তি কাজ করলে বুঝতে হবে দেহ ঠিকমতো প্রস্তুত ছিল না।
ব্যায়াম শেষ করার পর নিজেকে কেমন লাগে— এই প্রশ্নের উত্তর অনেকের কাছেই একদম নির্দিষ্ট নয়।
কোনো কোনো দিন লাগে চনমনে, কথা বলতে ইচ্ছা করে, শরীর হালকা লাগে। আবার কোনো দিন মনে হয়, এখনই কোথাও শুয়ে না পড়লে চলবে না।
একই মানুষ, একই রুটিন— তবু অনুভূতি একেবারেই ভিন্ন কেন?
শুধু শরীরচর্চার ওপর নয় বরং দৈহিক প্রস্তুতি, বিশ্রাম, খাবার, পানি, মানসিক অবস্থা— সব কিছুর সম্মিলিত প্রভাবের ওপর ব্যায়ামের পরে অনুভূতি নির্ভর করে।
এই রহস্যের ব্যাখ্যা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক-এর ‘হসপিটাল ফর স্পেশাল সার্জারি’র শরীরচর্চা-বিষয়ক মনোবিদ কেইট বিয়ার্ড।
শরীর কতটা প্রস্তুত ছিল, সেটাই আসল
ব্যায়াম শুরুর আগ মুহূর্তে কেমন ছিলেন— ভালো ঘুম হল কিনা, শেষ কবে ব্যায়াম করেছেন, শরীরে কতটা শক্তি ছিল, শেষবার কবে খাবার খেয়েছেন এবং সেই খাবার আপনার শরীর কীভাবে গ্রহণ করেছে, পানি পানের মাত্রা ঠিক ছিল কিনা, তাপমাত্রা, মানসিক চাপ, অতীতের ব্যায়াম সহ্য করার ক্ষমতা— কিছুই প্রভাব ফেলে।
দ্য স্কিম ডটকম-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে কেইট ব্যাখ্যা করেন, “এসব মিলিয়ে শরীরের বর্তমান অবস্থা নির্ধারণ করে পরবর্তী ব্যায়াম কতটা ভালোভাবে সামলাতে পারবেন। শরীর যদি বিশ্রামপ্রাপ্ত আর প্রস্তুত থাকে এবং ব্যায়ামের তীব্রতা তার সঙ্গে মানানসই হয়, তবে ব্যায়াম শেষে আপনি ফুরফুরে অনুভব করবেন। তবে কাজের চাপ যদি শরীরের প্রস্তুতির থেকে বেশি হয়, তখন ক্লান্তি এসে ঘিরে ধরবে।"
ব্যায়ামের চাপ কতটা ছিল
এই বিশেষজ্ঞের মতে, শুধুমাত্র কতক্ষণ ব্যায়াম করলেন তা নয়, দিনের কোন সময়ে করলেন, কতটা তীব্রতায় করলেন, পেশির ওপর কতটা চাপ ছিল, স্নায়ু ও পেশির সমন্বয়ে কাজ জটিল হল কি-না ছিল এবং শরীরের শক্তির চাহিদা কেমন ছিল— সব মিলিয়েই বোঝা যায় শরীরের ওপর মোট কতটা চাপ পড়ল।
ব্যায়ামের চাহিদা যত ভারী হবে, পরিশ্রমও তত বেশি হবে। আর প্রস্তুতি কম হলে এই বাড়তি পরিশ্রম শরীরকে খুব দ্রুত নিঃশেষ করে ফেলতে পারে।
ঘুমঘুম ভাবের পেছনে মস্তিষ্কের ভূমিকা
শুধু পেশির ক্লান্তি আর ঘুমঘুম ভাব এক বিষয় নয়। শরীরের ওপর যে চাপ পড়ে তা মস্তিষ্ক অনুবাদ করে সামগ্রিক অনুভূতিতে রূপ দেয়।
তাই অনেক সময় দেখা যায়— পেশিতে তেমন ব্যথা না থাকলেও মাথা ঝিমিয়ে আসে, চোখ জড়িয়ে আসে। এটিই হল মস্তিষ্ক ও শরীরের সম্মিলিত প্রতিক্রিয়া।
পানিশূন্যতা ও ঘুমের ঘাটতি
ব্যায়ামের পর অতিরিক্ত ক্লান্ত বোধ করার বড় কারণ পানিশূন্যতা। শরীরে পানি কম থাকলে রক্ত সঠিকভাবে সঞ্চালিত হতে পারে না, পেশিতে অক্সিজেন পৌঁছানো ধীর হয়ে যায়, ফলে শক্তি দ্রুত কমে যায়।
একই সঙ্গে ভালো ঘুম না হলে শরীর আগেই ক্লান্ত থাকে। সেই অবস্থায় ব্যায়াম করলে ঘুমের ঘাটতি আরও বেড়ে যায়, যা ব্যায়ামের পর মারাত্মক শ্রান্তিতে রূপ নেয়।
খাবারের অভাব বা ভুল পুষ্টি
কেইট জানান, শরীর সঞ্চিত শক্তির ফাঁকা করে ফেললে অথবা প্রয়োজনীয় খাবার না খেলে ব্যায়াম শেষে ক্লান্তি বাড়ে।
শুধু খেয়েছেন কি-না, সেটাই মুখ্য নয়, কী খেয়েছেন সেটাও গুরুত্বপূর্ণ।
পর্যাপ্ত শক্তিবর্ধক খাবার না থাকলে ব্যায়ামের সময়ে পেশির জ্বালানি শেষ হয়ে যায়, আর কাজ শেষে শরীর পড়ে থাকে শূন্যতায়।
মানসিক চাপের প্রভাব
শরীরের মতো মনও ক্লান্তি বহন করে। মানসিক চাপ, উৎকণ্ঠা বা দুশ্চিন্তা নিয়ে ব্যায়াম করলে সেটি যেমন ব্যায়ামের কার্যকারিতা কমায় তেমনি শেষে বাড়তি শান্তি এনে দেয়।
মন যখন বিশ্রাম পায় না, শরীরকেও আরাম দেয় না।
ক্লান্তি কমাতে পরিকল্পনার প্রয়োজন
ব্যায়ামের পর তন্দ্রা কমাতে প্রস্তুতি ও বিশ্রামের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কেইট বলেন, “সাপ্তাহিক, মাসিক এমনকি বার্ষিক ব্যায়াম পরিকল্পনা থাকা দরকার। কোন দিন ভারী ব্যায়াম, কোন দিন হালকা গতি— এই ভারসাম্য না থাকলে শরীর দ্রুত নিঃশেষ হয়ে পড়ে। প্রস্তুতির অবস্থা ও কাজের সামগ্রিক চাপ মিলিয়ে রুটিন সাজালে ব্যায়ামের পর অনুভূতিও ভালো থাকে।”
কঠিন ব্যায়ামের পর বিশ্রাম অপরিহার্য
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ, যেদিন ভারী ব্যায়াম করবেন সেদিন অবশ্যই অতিরিক্ত বিশ্রাম দিতে হবে। এতে পেশি ফিরে পায় শক্তি, ক্ষতিগ্রস্ত তন্তু মেরামত হয় এবং পরবর্তী ব্যায়ামে শরীর থাকে প্রস্তুত।
বিশ্রামের সুফল ব্যায়ামের মাঝেই টের পাওয়া যায়— শক্তি বেশি থাকে, কাজ করা সহজ লাগে। তেমনি শেষে আসে সতেজ অনুভূতি, ক্লান্তি নয়।
সঠিক সামঞ্জস্যে মিলবে আনন্দ
মানুষভেদে ফলাফলের তারতম্য থাকলেও মাঝামাঝি এক সঠিক সমন্বয়ে পৌঁছালে ব্যায়াম শরীরে প্রাকৃতিক আনন্দবর্ধক উপাদান নিঃসরণ ঘটাতে পারে, যা মেজাজ ভালো করে দেয়।
যখন প্রস্তুতি, বিশ্রাম, পুষ্টি আর ব্যায়ামের মাত্রা সঠিকভাবে সমন্বিত হয়, তখন ব্যায়াম শেষে নিজেকে চনমনে মনে হতে পারে।
হালকা দিনে শরীরকে নড়াচড়া দিতে হবে
সব দিন ভারী ব্যায়াম প্রয়োজন হয় না। যেদিন শরীর বিশ্রামে থাকে বা পুরো শক্তি দেওয়ার মতো অবস্থা নেই, সেদিন হালকা বা সহজ নড়াচড়ার মাধ্যমে শরীর সচল রাখা উপকারী।
এতে রক্তসঞ্চালন ঠিক থাকে, পেশি শক্ত হয়ে যায় না এবং ধীরে ধীরে শক্তি ফিরে আসে।
আরও পড়ুন
