সন্তানের বন্ধু হওয়া

সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক তৈরি করতে পারলে সন্তান লালন-পালন যেমন সহজ হয় তেমনি সন্তানও বেড়ে ওঠে একজন স্বয়ং সম্পূর্ণ মানুষ হিসেবে।

লাইফস্টাইল ডেস্কবিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম
Published : 14 August 2016, 11:42 AM
Updated : 14 August 2016, 11:45 AM

একটা শিশুর বেড়ে ওঠার জন্য তার বাবা মায়ের সহযোগিতা অপরিহার্য। অনেক বাবা মা শিশুকে বড় করেন এমন একটা মানসিকতা নিয়ে যে, শিশুরা কিছুই জানে না, তাকে শেখাতে হবে এবং প্রয়োজনে কড়া শাসন করতে হবে। তবে এমন অনেক বাবা-মা আছেন যারা শিশুকে একজন আলাদা মানুষ হিসেবে গুরুত্ব দেন এবং বন্ধুর মতো শিশুর কথাগুলো শোনেন ও ধৈর্য নিয়ে শিশুর বিষয়গুলো সমাধান করেন।

শিশুর লালনপালন-বিষয়ক একটি ওয়েবসাইট জানিয়েছে, যে যেভাবেই শিশুকে লালন-পালনে বিশ্বাস রাখুক না কেনো শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্ব করায় ক্ষতিকর কিছু নেই। বরং শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্ব করলে ভবিষ্যতে জীবনে তার কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়।

উদাহরণ স্থাপন করা: শিশুরা যত না শুনে শেখে তার চেয়ে অনেক বেশি দেখে শেখে। সঙ্গে তারা এটাও লক্ষ করে কোন কাজটা বাবা-মা নিজে করছে না কিন্তু ওকে করতে বলছে। তাই যখন আমরা এমন কোনো কাজ শিশুকে করতে বলি যেটা আমরা নিজেরা করি না সেটা শিশুরা ধরেই নেয় যে, না করলেও চলবে।

তাই যদি আমরা বলি, অনেকক্ষণ মোবাইল বা ট্যাব নিয়ে খেলা ঠিক না আমাদেরও সেটা থেকে নিজেদের দূরে রাখতে হবে। অথবা কার্বনেইটেড ড্রিংকস খাওয়া খারাপ সেটা নিজে না খেয়ে তার সামনে দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। অন্যথায় শিশুকে তা বোঝানো সম্ভব হবে না।

উৎসাহ দেওয়া: যখন শিশুদের কোনো ভুল কাজকে শোধরানোর চেষ্টা করা হয় তখন তাদের ভালো কোনো গুণকেও সামনে এনে আলোচনা করা উচিত। হয়ত শিশুটি কোনো একটা কাজে তেমন পটু নয় তবে কোনো না কোনো কাজে অবশ্যই সে খুব ভালো। তাই বাংলায় ভালো করা একটা শিশুকে অংকে কম পাওয়ার জন্য বকাবকি না করে তার স্বাভাবিক প্রতিভাটার যত্ন করতে হবে এবং অন্য বিষয়ে যেন একদম হেরে না যায় সেইটা লক্ষ রাখতে হবে।

প্রতিটা মানুষ একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্য জীবনে বেছে নেয়। সব কিছুতে তাকে প্রথম না হলেও চলে। বরং সব কিছুতে প্রথম হওয়ার চাপ দেওয়া বা প্রথম না হওয়ার তিরস্কার করা হলে শিশুটি তার স্বাভাবিক প্রতিভাটাও ঠিক মতো প্রকাশ করতে পারে না। তাই বাবা মায়ের দায়িত্ব হচ্ছে, অন্য দুর্বলতার বিষয়ে শিশুকে সাহায্য করা আর স্বাভাবিক বিষয়ে আরও উৎসাহ দিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া।

সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ দেওয়া: শিশুর সঙ্গে বন্ধুত্ব করার প্রথম শর্ত হচ্ছে তাকে সমান হিসেবে বিবেচনা করা। বাসার কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার মতামত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। সিদ্ধান্ত যেমনই হোক, সেটা কোন রংয়ের পর্দা দিয়ে ঘর সাজানো হবে থেকে শুরু করে বাড়ির জন্য নতুন কিছু কেনার মতো বড় সিদ্ধান্তেও শিশুর মতামত গ্রহণ করতে হবে।

সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় বিকল্প সিদ্ধান্ত চিন্তা করা এবং দুটো সিদ্ধান্তের মধ্যে ভালো খারাপ বিবেচনা শিক্ষাও সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভ্যাস থেকে আসবে। আর এর সবের জন্যই শিশুর মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে এভাবেই শিশুকে বুঝতে শিখবে যে তারও মতামত গ্রহণের ক্ষমতা আছে। 

অতিরিক্ত নজরদারি নয়:
সন্তানকে রক্ষা করা বাবা মায়ের দায়িত্ব। তবে সর্বক্ষণ শিশুর মঙ্গল-অমঙ্গল ভেবে শঙ্কায় থাকা আর বিপদ থেকে রক্ষার করতে চোখে চোখে রাখা কোনো ভালো অভ্যাস নয়। বিশেষজ্ঞরা বলেন সফল হতে হলে বিফল হওয়াও জরুরি। তাই সন্তানকে ভুল করতে দিতে হবে। বিপদে পড়ার ভয়ে কোনো কাজের ঝুঁকি নিতে পিছপা হতে দেওয়া যাবে না।

বিপদ দেখলে বড়জোর সন্তানকে সাবধান করা যাবে, জোর করলে কোনো পক্ষের জন্যই সেটা ভালো একটা অনুভূতি তৈরি করবে না। উল্টা সন্তান বিদ্রোহী হয়ে উঠতে পারে।  

পছন্দ-অপছন্দকে মূল্য দেওয়া: প্রত্যেকেরই তার সন্তানকে নিয়ে একটা পরিকল্পনা থাকে। কিন্তু আমাদের এটাও জানতে হবে প্রতিটা মানুষের একটা নিজস্ব আগ্রহের জায়গা থাকে। অনেক সময়ই বাবা-মা সন্তানের উপর তাদের পরিকল্পনা চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এটা সন্তানের বিকাশ এবং সন্তানের সঙ্গে বাবা মায়ের সম্পর্ক উভয়ের জন্যই খারাপ। হতে পারে সন্তান আবেগের বশে এমন কিছু করতে চাইছে যেটা আসলেও খারাপ অথবা আগামীতে গিয়ে তার জীবনে একটা খারাপ প্রভাব ফেলতে পারে। তবে সিদ্ধান্ত যতই খারাপ হোক সন্তানকে কিছুতেই এমনভাবে সেটা সম্পর্কে বলা যাবে না যাতে সে মনে করে তার চাওয়াটাই অপরাধ।

তাই বাবা-মায়ের ইচ্ছা যদি থাকে সন্তান বড় হয়ে প্রকৌশলী হবে আর সন্তানের যদি ইচ্ছা থাকে কবি হওয়ার তবে উভয় পেশার ভবিষ্যৎ সম্পর্কেই তাকে ভালোভাবে জানতে সুযোগ দেওয়া উচিত। প্রকৌশলী হওয়াও যে নেহায়েত কাঠখোট্টা একটা বিষয় নয় অথবা প্রকৌশলী হলেই তার কবি হওয়ার স্বপ্ন শেষ হয়ে যাবে না এটা সন্তানকে যত্ন সহকারে বোঝাতে হবে।

যেটা জরুরি তা হল সে কোন পেশাটা বেছে নেবে সেই স্বাধীনতাও তাকেই দিতে হবে। সমাজ যে পেশাকেই যেভাবে দেখুক না কেনো আর যে পেশা থেকে যেরকম অর্থ আসুক না কেনো, দিন শেষে একজন সফল কবি অবশ্যই একজন ব্যর্থ প্রকৌশলীর থেকে বেশি কাম্য। তাই সন্তানের মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া বেশ জরুরী।

ছবি: রয়টার্স।

তৌফিক ইমরোজ খালিদী
প্রধান সম্পাদক ও প্রকাশক