Published : 22 Aug 2026, 01:47 PM
স্থায়ীভাবে ওজন কমানো বা মেদ ঝরানোর জন্য ‘ইন্টারমিটেন্ট ফাস্টিং’, খাবারের গ্রহণের পরিমাণ নজরে রাখা বা আধুনিক কোনো ওজন কমানোর ওষুধ— যাই ব্যবহার করা হোক না কেন, সবকিছুর মূলেই কাজ করে পুষ্টিবিজ্ঞানের বহু পুরানো এবং পরীক্ষিত একটি সাধারণ নীতি।
সেটা হচ্ছে ‘ক্যালরি ডেফিসিট’ বা ‘ক্যালরির ঘাটতি’।
সহজ কথায়, শরীর প্রতিদিন যতটা ক্যালরি বা শক্তি খরচ করে, তার চেয়ে কিছুটা কম ক্যালরি খাবার থেকে গ্রহণ করাই হল ‘ক্যালরি ডেফিসিট’।
হার্ভার্ভ মেডিকেল স্কুলের ওয়েট সেন্টারের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, দ্রুত ওজন কমানোর আশায় হঠাৎ করে খাওয়া দাওয়া একদম বন্ধ করে দিলে, উপকারের চেয়ে শরীরে স্থায়ী ক্ষতি বেশি হয়।
হার্ভার্ড অধিভুক্ত ম্যাসাচুসেটস জেনারেল হসপিটালের নিবন্ধিত পুষ্টিবিদ এবং ওয়েট সেন্টার-এর বিশেষজ্ঞ মেগান সালামন এবং হার্ভার্ডের স্বাস্থ্য কলাম লেখক জয়েস হেন্ডলি, সুস্থ উপায়ে ক্যালরির ঘাটতি নিয়ন্ত্রণ করার সঠিক নিয়ম এবং ৪টি সাধারণ ভুল নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।
শরীর যেভাবে প্রতিদিন ক্যালরি খরচ করে
পুষ্টিবিদ মেগান সালামন ব্যাখ্যা করেন, “বেঁচে থাকা, ফুসফুসের শ্বাস-প্রশ্বাস সচল রাখা, রক্ত সঞ্চালন এবং শরীরের তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখার জন্য অবচেতনেই প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন হয়, যাকে ‘রেস্টিং মেটাবলিক রেট’ বলা হয়। একজন সুস্থ মানুষের সারাদিনের মোট ক্যালরি খরচের প্রায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশই ব্যয় হয় এই মৌলিক শারীরিক প্রক্রিয়াগুলো সচল রাখতে। বাকি ৩০ শতাংশ ক্যালরি খরচ হয় খাবার হজম করতে এবং প্রতিদিনের সাধারণ হাঁটাচলা ও শরীরচর্চার মাধ্যমে।”
যখন খাবার থেকে এই শক্তির জোগান কম মেলে, তখন বাধ্য হয়ে শরীর জমানো চর্বি বা ফ্যাট ভেঙে শক্তি উৎপাদন শুরু করে এবং ওজন কমে।
ক্যালরি ডেফিসিট হিসাব করার ৩টি পদ্ধতি
নিজের জন্য দৈনিক ক্যালরির সঠিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করতে হার্ভার্ডের বিশেষজ্ঞরা ৩টি নিরাপদ উপায়ের কথা জানিয়েছেন।
ইনডাইরেক্ট ক্যালোরিমেট্রি: এটি বেশ নিখুঁত ও আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি। এতে একটি বিশেষ ‘ব্রিদলাইজার ডিভাইস’-এর মাধ্যমে প্রশ্বাসের গ্যাস পরীক্ষা করে রেস্টিং মেটাবলিজমের আসল ক্ষমতা বের করা হয়। এরপর সেই লক্ষ্য থেকে ৫০০ ক্যালরি বাদ দিয়ে দৈনিক ঘাটতির তালিকা সাজানো হয়।
অনলাইন মেটাবলিক ক্যালকুলেটর: সাধারণ মানুষের ঘরে বসে হিসাব করার জন্য, যুক্তরাষ্ট্রের ‘এনআইডিকে’-এর দাপ্তরিক ‘বডি ওয়েট প্ল্যানার’ ব্যবহার করা নিরাপদ। এটি মানুষের উচ্চতা, বয়স, লিঙ্গ এবং দৈনন্দিন পরিশ্রমের হার মেপে একটি গড় ক্যালরির ঘাটতি হিসাব প্রদান করে।
বুড়া আঙ্গুলের সাধারণ নিয়ম: এটি সহজ, তবে কিছুটা কম নিখুঁত নিয়ম।
হার্ভার্ডের সাধারণ গাইডলাইন অনুযায়ী, গুরুতর স্থূলতা না থাকলে একজন নারীর জন্য দৈনিক ১,২০০ থেকে ১,৫০০ ক্যালরি এবং একজন পুরুষের জন্য ১,৫০০ থেকে ১,৮০০ ক্যালরির খাবার গ্রহণই ওজন কমানোর জন্য যথেষ্ট।
ক্যালরি কমানোর সময় ৪টি ভুল অভ্যাস
ক্যালরির মাত্রা অতিরিক্ত কমানো: দৈনিক ৫০০ ক্যালরির বেশি ঘাটতি তৈরি করলে শরীর প্রাকৃতিকভাবেই ক্ষুধার হরমোন ‘গ্রেলেন’ এর উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়। ফলে সারাক্ষণ তীব্র ক্লান্তি, মেজাজ খিটখিটে হওয়া এবং খাবারের প্রতি অতিরিক্ত আসক্তি তৈরি হয়।
স্ট্রেংথ ট্রেইনিং বা পেশির কসরত না করা: কড়া ডায়েট করলে শরীর চর্বির সঙ্গে সঙ্গে পেশি বা ‘লিন মাসল মাস’ ভেঙে ফেলে। পেশি কমে গেলে শরীরের ‘মেটাবলিক পাওয়ার’ বা হজম ক্ষমতা স্তব্ধ হয়ে যায়।
হার্ভার্ডের গবেষণায় প্রমাণিত যে, সপ্তাহে অন্তত দুদিন হালকা ওজন নিয়ে ‘রেজিস্ট্যান্স’ বা ‘স্ট্রেংথ ট্রেইনিং’ করলে কম ঘুমের বা কম ক্যালরি গ্রহণেও পেশি সুরক্ষিত থাকে।
ব্যায়ামের ক্যালরিকে খাবারের ‘ব্যাংক অ্যাকাউন্ট’ ভাবা: অনেকেই ভাবেন ১ ঘণ্টা কড়া ওয়ার্কআউট বা ব্যায়াম করে ৫০০ ক্যালরি পুড়িয়েছেন, তাই এখন অতিরিক্ত একটি বার্গার বা চিপস খাওয়া যাবে।
মেগান সালামন সতর্ক করে বলেন, “ব্যায়ামের ফলে পোড়ানো ক্যালরিকে খাবারের সঙ্গে ১:১ অনুপাতে কখনই কাটাকাটি করা যায় না।”
ব্যায়ামের পর অন্য সাধারণ জায়গা থেকে শক্তি খরচ বাঁচিয়ে, প্রাকৃতিকভাবেই ক্ষতিপূরণ করার চেষ্টা করে দেহ।
পুষ্টির মান অবহেলা করা: ক্যালরি কম গ্রহণের অর্থ এই নয় যে ফাস্টফুড অল্প করে খাওয়া যাবে। যেহেতু খাবার কম খাওয়া হচ্ছে, তাই প্রতিটি কামড়ে যেন পর্যাপ্ত প্রোটিন, আঁশ, ভালো ফ্যাট বা চর্বি এবং অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট সমৃদ্ধ ফলমূল ও শাকসবজি থাকে, সেটা নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক।
পরামর্শ
হার্ভার্ডের ওয়েট সেন্টারের চিকিৎসাগত পরামর্শ অনুযায়ী, প্রতি সপ্তাহে সর্বোচ্চ ১ থেকে ২ পাউন্ড বা আধা থেকে এক কেজির বেশি ওজন কমানোর লক্ষ্যমাত্রা রাখা মোটেও বৈজ্ঞানিক ও টেকসই নয়। ধীর ও স্থির গতিই মেটাবলিজমকে তরুণ ও সচল রাখে।
পাশাপাশি কম খাওয়ার ফলে কোষ্ঠকাঠিন্যের অস্বস্তি এড়াতে এবং কোষের আর্দ্রতা ধরে রাখতে সারাদিনে পর্যাপ্ত পানি পান করা আবশ্যক।
আরও পড়ুন
জোরে না আস্তে দৌড়ালে ওজন কমবে?