বয়স্কদের ক্ষুধা কমে গেলে অবহেলা নয়, জানুন কী করবেন
অসুস্থতা ছাড়াও নানান কারণে বয়স্কদের ক্ষুধা কমে যেতে পারে।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকের ক্ষুধা কিছুটা কমে যেতে পারে। তবে হঠাৎ করে বা দীর্ঘদিন ধরে খাওয়ার ইচ্ছা কমে গেলে সেটিকে শুধু বয়সের স্বাভাবিক পরিবর্তন বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
বাসার প্রবীণ মানুষটির এরকম হওয়ার পেছনে শারীরিক অসুস্থতা, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, দাঁত বা মুখের সমস্যা বা মানসিক চাপের মতো বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে।
বয়স্কদের ক্ষুধা কমে যাওয়ার কয়েকটি সাধারণ কারণ
শরীরের বিপাক ধীর হয়ে যায়, ফলে আগের তুলনায় শরীরের শক্তির চাহিদা কিছুটা কমে।
স্বাদ ও গন্ধের অনুভূতি কমে যেতে পারে। এতে খাবার আগের মতো সুস্বাদু বা আকর্ষণীয় মনে হয় না।
পেট দ্রুত ভরে যেতে পারে। হজমের পরিবর্তনের কারণে অল্প খাবারেই পেট ভরা মনে হতে পারে।
হরমোনের পরিবর্তন, ক্ষুধা ও খাবারের প্রতি আগ্রহের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে ক্ষুধা যদি হঠাৎ অনেক কমে যায় বা দীর্ঘদিন ধরে থাকে, তাহলে কারণ খুঁজে দেখা জরুরি।
এছাড়া আরও কিছু কারনে ক্ষুধা কমে যেতে পারে, যেমন:
শারীরিক অসুস্থতা: ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা, সংক্রমণ বা অন্য কোনও দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতার কারণে ক্ষুধা কমতে পারে।
ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া: কিছু ওষুধ মুখের স্বাদ পরিবর্তন করতে পারে, বমি বমি ভাব সৃষ্টি করতে পারে বা ক্ষুধা কমিয়ে দিতে পারে। একসঙ্গে অনেক ওষুধ সেবন করলে এই সমস্যা আরও বাড়তে পারে।
মানসিক চাপ ও একাকিত্ব: বিষণ্ণতা, উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা বা একাকিত্বের কারণে খাবারের প্রতি আগ্রহ কমে যেতে পারে। একা খাওয়ার কারণে অনেকের খাবারের আনন্দও কমে যায়।
দাঁত ও মুখের সমস্যা: দাঁতে ব্যথা, ঠিকমতো না বসা কৃত্রিম দাঁত, মুখ শুকিয়ে যাওয়া বা চিবাতে সমস্যা হলে বয়স্করা খাবার এড়িয়ে যেতে পারেন।
স্মৃতিশক্তির সমস্যা: ‘ডিমেনশা’ বা স্মৃতিভ্রংশের মতো সমস্যায় কেউ খাবারের সময় ভুলে যেতে পারেন বা খাবারের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন।
ক্ষুধা কমে গেলে কেন চিন্তার বিষয়?
দীর্ঘদিন কম খেলে শরীরে পর্যাপ্ত পুষ্টি না পৌঁছানোর কারণে অপুষ্টি হতে পারে। যে কারণে-
ওজন কমে যেতে পারে
পেশি ও শক্তি কমে যেতে পারে
দুর্বলতা বাড়তে পারে
পড়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে
রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যেতে পারে
অসুস্থতা থেকে সুস্থ হতে বেশি সময় লাগতে পারে
তাই বয়স্কদের খাবারের পরিমাণ ও ওজনের পরিবর্তনের দিকে নজর রাখা গুরুত্বপূর্ণ।
যে লক্ষণগুলো দেখলে সতর্ক হওয়া জরুরি
দ্রুত বা অস্বাভাবিক ওজন কমে যাওয়া
নিয়মিত খাবার বাদ দেওয়া
আগের তুলনায় খুব কম খাওয়া
পোশাক ঢিলেঢালা হয়ে যাওয়া
অতিরিক্ত দুর্বল বা ক্লান্ত লাগা
প্রিয় খাবারের প্রতিও আগ্রহ না থাকা
খাওয়ার সময় ব্যথা বা গিলতে সমস্যা হওয়া
বিভ্রান্তি বা আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন
ক্ষুধা বাড়াতে যা করা যায়
অল্প অল্প করে বারবার খাবার দিতে হবে। একবারে বেশি খাবার না দিয়ে দিনে কয়েকবার অল্প পরিমাণে খাবার দেওয়া যেতে পারে।
পুষ্টিকর খাবার বেছে নিতে হবে, যাতে অল্প পরিমাণ খাবারেও বেশি পুষ্টি পাওয়া যায়। ডিম, মাছ, দুধ, দই, ডাল, বাদাম, বীজ ও অন্যান্য পুষ্টিকর খাবার উপকারী হতে পারে।
খাবার আকর্ষণীয় করা যেতে পারে। স্বাভাবিক মসলা ও সুগন্ধি উপাদান ব্যবহার করলে খাবারের প্রতি আগ্রহ বাড়ে।
পরিবারের সদস্য বা বন্ধুদের সঙ্গে একসঙ্গে খেলে খাবারের প্রতি আগ্রহ বাড়তে পারে এবং একাকিত্বও কমে।
নির্দিষ্ট সময়ে খাবার দিতে হবে। প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে খাবার ও হালকা নাশতা দিলে একটি নিয়ম তৈরি হয়।
চিবাতে বা গিলতে সমস্যা হলে খাবার নরম করা উপকারী। নরম ভাত, খিচুড়ি, স্যুপ, নরম মাছ, ডিম বা প্রয়োজন অনুযায়ী সহজে খাওয়া যায় এমন খাবার দেওয়া যেতে পারে।
মূল কারণ খুঁজে বের করা
ক্ষুধা কমে যাওয়ার কারণ জানতে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। প্রয়োজনে ওষুধ, দাঁত-মুখের সমস্যা, শারীরিক অসুস্থতা বা মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়গুলো পরীক্ষা করা দরকার হতে পারে।
যখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি
ক্ষুধামন্দা যদি এক সপ্তাহের বেশি থাকে, ওজন কমতে থাকে, অথবা এর সঙ্গে দুর্বলতা, ব্যথা, বমি, গিলতে সমস্যা, বিভ্রান্তি বা অন্য কোনও নতুন উপসর্গ দেখা দেয়, তাহলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
বয়স্কদের ক্ষুধা কমে যাওয়াকে সবসময় বয়সের স্বাভাবিক পরিবর্তন হিসেবে দেখা ঠিক নয়। কারণ খুঁজে বের করে সময়মতো ব্যবস্থা নিলে অপুষ্টি ও দুর্বলতা অনেকটাই প্রতিরোধ করা সম্ভব।
লেখক: পুষ্টিবিদ লিনা আকতার। রাইয়ান হেলথ কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার, দিনাজপুর
