০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩

‘ড্রাকুলা’ নামে কি সত্যি কেউ ছিলেন?

ভ্লাদ দ্য ইম্পেলার: ড্রাকুলা রূপকথার ইতিহাস

‘ড্রাকুলা’ নামে কি সত্যি কেউ ছিলেন?

ভ্লাদ দ্য ইম্পালের-এর একটি তৈলচিত্র, ১৬ শতকের একজন অজ্ঞাতনামা অস্ট্রিয়ান চিত্রশিল্পীর আঁকা। ছবি: হিস্ট্রি ডটকম।

কিডজ প্রতিবেদক

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম নিউজ সার্ভিস

Published : 05 Nov 2026, 01:54 PM

Updated : 05 Nov 2026, 01:54 PM

সময়টা ১৮৯৭। আইরিশ লেখক ব্র্যাম স্টোকার প্রকাশ করলেন তার কালজয়ী গথিক উপন্যাস ‘ড্রাকুলা’। প্রকাশের সাথে সাথেই বইটি সাহিত্যজগতে আলোড়ন সৃষ্টি করে।

গল্পটি শুধু একটি বইয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং এর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে ভ্যাম্পায়ারকেন্দ্রিক সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের আস্ত এক নতুন জগৎ। অন্ধকার রাতের রহস্যময় ভ্যাম্পায়ারদের গল্প কার না পছন্দ? লোককথার এমন সব অলৌকিক প্রাণী, যারা নিজেদের অপপ্রাকৃতিক ক্ষমতা দিয়ে মানুষকে শিকার করে এবং তাদের রক্ত চুষে খেয়ে বেঁচে থাকে, তাদের মধ্যমণি হয়ে ওঠে কাউন্ট ড্রাকুলা।

কিন্তু সাহিত্য ও রুপালি পর্দার এই অমর ভিলেন বা অ্যান্টিহিরো কাউন্ট ড্রাকুলা কি শুধুই একজন লেখকের কল্পনা? নাকি এর আড়ালে লুকিয়ে আছে রক্তমাংসের কোনো সত্য ঘটনা?

গবেষকদের মতে, ব্র্যাম স্টোকার তার এই চরিত্র সৃষ্টির সময় মধ্য ইউরোপের জনপ্রিয় ও বহুল প্রচলিত লোকগল্পের ওপর অনেকটাই নির্ভর করেছিলেন। বিশেষ করে সে অঞ্চলের প্রচলিত ‘নসফেরাতু’ বা অপমৃত্যুর শিকার ‘অরক্ষিত মৃতদেহ’ সম্পর্কিত ভয়াল সব বিশ্বাস তাকে প্রভাবিত করেছিল।

তবে রূপকথার এই অপপ্রাকৃতিক আবহের বাইরে গিয়েও একজন সত্যিকারের ঐতিহাসিক রক্তমাংসের মানুষ স্টোকারকে অনুপ্রাণিত করেছিল। সেই নিষ্ঠুর ঐতিহাসিক চরিত্রটি আর কেউ নন; পঞ্চদশ শতাব্দীর রোমানিয়ার দুর্ধর্ষ রাজকুমার ভ্লাদ টেপেস, যিনি ইতিহাসে ‘ভ্লাদ দ্য ইম্পেলার’ বা ‘শূলবিদ্ধকারী ভ্লাদ’ নামে পরিচিত।

নামের পেছনের ইতিহাস ও ড্রাকুলার জন্ম

ভ্লাদ টেপেসের জন্ম মধ্য ইউরোপের ট্রানসিলভানিয়া অঞ্চলে। তিনি ছিলেন সে অঞ্চলের প্রভাবশালী অভিজাত শাসক দ্বিতীয় ভ্লাদ ড্রাকুলের দ্বিতীয় সন্তান। ভ্লাদের পিতা ভ্লাদ ড্রাকুল ছিলেন ‘অর্ডার অব দ্য ড্রাগন’ নামের একটি গোপন খ্রিস্টান নাইট সংঘের সদস্য। এই সংঘটি গঠিত হয়েছিল মূলত অটোমান সাম্রাজ্যের বিস্তার রোধ এবং খ্রিস্টধর্ম রক্ষা করার উদ্দেশ্যে। রোমানীয় ভাষায় ‘ড্রাকুল’ শব্দের অর্থ হলো ড্রাগন। সেখান থেকেই যখন ভ্লাদ টেপেস নাইটদের সংঘে নিজের অবস্থান তৈরি করেন, তখন তিনি নাম নেন ‘ড্রাকুলা’। যার সহজ বাংলা অর্থ দাঁড়ায় ‘ড্রাকুলের সন্তান’ বা ‘ড্রাগনের পুত্র’।

পরবর্তী সময়ে ভ্লাদ ওয়াল্যাচিয়া (যা বর্তমানে আধুনিক রোমানিয়ার অংশ) অঞ্চলের শাসক হিসেবে মসনদে বসেন। আর ক্ষমতার মসনদে বসে তিনি যা করেছিলেন, তা কেবল নিজ দেশের শত্রুদেরই নয়, বরং পুরো ইউরোপের মানুষকে আতঙ্কে শিউরে তুলেছিল।

শূলবিদ্ধ করার ভয়াল উৎসব ও নৃশংসতা

ওয়াল্যাচিয়ার শাসক হিসেবে ভ্লাদ টেপেস তার শত্রুদের দমনে যে চরম ও ভয়াবহ পন্থা অবলম্বন করতেন, তা ইতিহাসে নজিরবিহীন। শত্রু বা অপরাধীদের শাস্তির ক্ষেত্রে তার কোনো দয়ামায়া ছিল না। অঙ্গচ্ছেদ, জীবন্ত চামড়া ছিলে ফেলা, শিরশ্ছেদ করা, কিংবা ফুটন্ত পানিতে সেদ্ধ করে পৈশাচিক উপায়ে মানুষকে হত্যা করার মতো নৃশংস কৌশলে ভ্লাদ ছিলেন অভ্যস্ত। কিন্তু তার এই সব বীভৎস কৌশলকেও ছাপিয়ে গিয়েছিল একটি নির্দিষ্ট শাস্তির পদ্ধতি। সেটি হলো- ইম্পেলমেন্ট বা শূলবিদ্ধ করা।

শূলবিদ্ধ করার প্রক্রিয়াটি ছিল চরম যন্ত্রণাদায়ক। কোনো ধারালো বা ভোঁতা মোটা কাঠের খুঁটি বা শুঁড় ভিকটিমের শরীরের ভেতর দিয়ে ঢুকিয়ে খাড়া করে মাটিতে পুঁতে রাখা হতো। তারপর ঘণ্টার পর ঘণ্টা, এমনকি কখনো কখনো দিনের পর দিন ধরে সেই ভিকটিম চরম যন্ত্রণায় রক্তক্ষরণ ও শারীরিক তীব্র কষ্টে মারা যেত। ভ্লাদ এই পৈশাচিক পদ্ধতিটি এত বেশি প্রয়োগ করেছিলেন যে কালক্রমে তার নামের সাথেই জুড়ে যায় ‘দ্য ইম্পেলার’ বা শূলবিদ্ধকারী শব্দটি।

পনেরশ শতাব্দীতে ইউরোপে অটোমান বা উসমানীয় সাম্রাজ্যের ব্যাপক প্রভাব বিস্তার ঘটেছিল। ১৪৬২ সালে অটোমান বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর সময় ভ্লাদের নিষ্ঠুরতা সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছায়। ইতিহাসবিদদের বিবরণ অনুযায়ী, দানিয়ুব নদীর তীরে অটোমান তুর্কি সেনাদের ওপর আক্রমণ চালানোর পর ভ্লাদ প্রায় ২০ হাজার বন্দি মানুষকে সারি সারি কাঠের শূলে বিদ্ধ করেছিলেন। শত্রুপক্ষকে মানসিকভাবে গুঁড়িয়ে দিতে তিনি রক্তে ভেসে যাওয়া এই শূলবিদ্ধ লাশের বন বা সারি তৈরি করে রেখেছিলেন। যা দেখে স্বয়ং অটোমান সুলেমান ও তার বিশাল বাহিনী স্তম্ভিত ও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিল।

রক্তে রুটি ভিজিয়ে খাওয়ার গল্প এবং ব্র্যাম স্টোকারের অনুপ্রেরণা

ভ্লাদ দ্য ইম্পেলারকে ঘিরে সেই আমলে ছড়িয়ে পড়া লোকগাথা ও ঐতিহাসিক নথিপত্রগুলোতে এমন কিছু ভয়ানক বিবরণ পাওয়া যায়, যা শুনলে গায়ে কাঁটা দেয়। তৎকালীন বেশ কিছু জার্মান ও স্লাভিক পাণ্ডুলিপির বিবরণ দাবি করে যে, ভ্লাদ কেবল মানুষকে শূলবিদ্ধ করেই ক্ষান্ত হতেন না, বরং তিনি নাকি শূলবিদ্ধ হয়ে ঝুলতে থাকা শত শত লাশের সারির মাঝখানে নিজের খাওয়ার টেবিল সাজাতেন! সেখানে বসে তিনি পরম তৃপ্তিতে সান্ধ্যভোজ সারতেন এবং অনেক সময় শত্রুর শরীর থেকে গড়িয়ে পড়া তরতাজা রক্তে রুটি ভিজিয়ে খেতেন।

এই পৈশাচিক ও গা শিউরে ওঠা গল্পগুলো, ভ্লাদের আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করা নাম ‘ড্রাকুলা’ এবং তার জন্মস্থান সেই রহস্যময় ‘ট্রানসিলভানিয়া’ অঞ্চল; সবকিছু মিলে আধুনিক গবেষক ও ঐতিহাসিকদের বিশ্বাস করতে বাধ্য করেছে যে, ব্র্যাম স্টোকার তার কাল্পনিক ভ্যাম্পায়ার কাউন্ট ড্রাকুলার প্রাথমিক রূপরেখা বা অনুপ্রেরণা এই ভ্লাদ দ্য ইম্পেলারের জীবন ও কর্মকাণ্ড থেকেই সংগ্রহ করেছিলেন।

পতন ও মৃত্যুর পর অমরত্ব

যুদ্ধ আর পৈশাচিকতার ছায়ায় থাকা ভ্লাদের জীবন শেষ পর্যন্ত শান্তিতে কাটেনি। ১৪৬২ সালে ভয়াবহ অভিযানের পর তিনি হাঙ্গেরিয়ান বাহিনীর হাতে বন্দি হন। বেশ কয়েক বছর কারাগারে বন্দিজীবন কাটানোর পর, বিভিন্ন রাজনৈতিক সমীকরণে ১৪৭৬ সালে তিনি পুনরায় নিজের হারানো সিংহাসন বা রাজকীয় আসন পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হন। তবে তার এই প্রত্যাবর্তন স্থায়ী হয়নি। সিংহাসনে বসার মাত্র কয়েক মাসের মাথায়, ১৪৭৬ সালেই অটোমানদের বিরুদ্ধে এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে তিনি নিহত হন।

ভ্লাদ টেপেসের শারীরিক মৃত্যু হলেও ইতিহাসের পাতা থেকে তার নাম মুছে যায়নি। বাস্তবে ভ্লাদ ছিলেন একজন নৃশংস মধ্যযুগীয় শাসক, যিনি নিজের ভূখণ্ড বাঁচাতে এবং ক্ষমতা ধরে রাখতে বর্বরতার পথ বেছে নিয়েছিলেন। অন্যদিকে, ব্র্যাম স্টোকারের মেধা সেই রক্তচোষা রাজকুমারকে রূপ দিয়েছে সাহিত্যের অন্যতম রহস্যময় ও জনপ্রিয় কাল্পনিক চরিত্রে।

সূত্র: হিস্ট্রি ডটকম।