Published : 15 Jan 2026, 10:20 AM
মরুভূমির তপ্ত বালু আর পাঞ্জাবের উর্বর মাটির বুক চিরে যে আধ্যাত্মিক সুবাস একদিন ভারতবর্ষকে আমোদিত করেছিল, তার অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন হযরত সখি সুলতান বাহু (১৬৩০–১৬৯১)। ১৭শ শতাব্দীর এই প্রখ্যাত সুফি সাধক, কালজয়ী কবি ও অতীন্দ্রিয়বাদী চিন্তাবিদকে সুফি জগতের আধ্যাত্মিক সম্রাট বা ‘সুলতানুল আরেফিন’ বলা হয়।
১৬৩০ সালের ১৭ জানুয়ারি, ১০৩৯ হিজরির ১ জমাদিউস সানি এক স্নিগ্ধ বৃহস্পতিবারের প্রভাতে মুঘল সম্রাট শাহজাহানের শাসনামলে বর্তমান পাকিস্তানের শোরকোটে তার জন্ম। সুলতান বাহুর ধমনীতে প্রবাহিত ছিল ইসলামের চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রা.)-এর রক্তধারা। তিনি ছিলেন ‘আওয়ান’ গোত্রের বংশধর। তার বাবা বায়েজিদ মোহাম্মদ ছিলেন শাহজাহানের সেনাবাহিনীর একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা।
তবে বাহুর জীবনের আধ্যাত্মিক ভিত্তিমূল রচিত হয়েছিল তার পুণ্যবতী মা বিবি রাস্তির পবিত্র কোলে। বলা হয়ে থাকে, বাহুর আগমনের বার্তা প্রকৃতি আগেই পেয়েছিল। তার মা জানতেন, এই সন্তান আল্লাহর সত্তায় এমনই বিলীন হবে যে জগতের মোহ তাকে স্পর্শ করবে না। তাই তিনি নাম রেখেছিলেন ‘বাহু’, যার আক্ষরিক অর্থ হলো ‘যিনি আল্লাহর সত্তার সঙ্গে একাকার’। বাহু নিজেই পরবর্তীকালে বলেছিলেন, “আমার মা আমার নাম রেখেছেন ‘বাহু’, কারণ আমি সর্বদা ‘হু’ বা পরমেশ্বরের ধ্যানে মগ্ন থাকি।”
সুফি দর্শনের এক চিরন্তন রহস্য এই যে, জ্ঞান অর্জনের জন্য সাধারণত একজন গুরুর বা মুর্শিদের প্রয়োজন হয়। কিন্তু বাহুর ক্ষেত্রে ইতিহাস এক ভিন্ন চমক দেখায়। প্রায় ৩০ বছর ধরে তিনি প্রকৃত গুরুর সন্ধানে ঘুরেছেন। কিন্তু তার আধ্যাত্মিক উচ্চতা এমনই শিখরে ছিল যে, সমসাময়িক কারো পক্ষেই তার হাত ধরা সম্ভবপর ছিল না।
এক অলৌকিক অনুভবের বর্ণনা দিতে গিয়ে বাহু জানিয়েছেন যে, একদিন শোরকোটের নির্জনে ধ্যানের মগ্ন থাকা অবস্থায় হযরত আলী (রা.) স্বয়ং তার সামনে উপস্থিত হন এবং তাকে ‘মজলিস-এ-নববী’ বা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পবিত্র দরবারে নিয়ে যান।
সেখানে আহলে বাইত ও বড় পীর আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর উপস্থিতিতে তিনি খোদ মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র হাতে বায়াত গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে জিলানী (রহ.)-এর আধ্যাত্মিক নির্দেশনায় তিনি পীর আব্দুর রহমান জিলানী দেহলভীর সান্নিধ্যে আসেন এবং এক নিমিষেই লাভ করেন ‘ফকরের ঐশ্বরিক আমানত’।
সুলতান বাহুর প্রচারিত আধ্যাত্মিক ধারাটি ‘সারওয়ারি কাদেরিয়া’ নামে সুপরিচিত। তিনি বিশ্বাস করতেন, প্রথাগত জাগতিক শিক্ষার চেয়েও বড় হলো ‘মারিফাত’ বা খোদা-পরিচিতি। আনুষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও তিনি বিস্ময়করভাবে প্রায় ১৪০টি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। এর মধ্যে তার পাঞ্জাবি শ্লোকের সংকলন ‘আবিয়াত-ই-বাহু’ সবচেয়ে জনপ্রিয়।
তার লেখায় কঠিন তাত্ত্বিক শব্দের বদলে পাওয়া যায় ‘ফকর’ বা দারিদ্র্যের সেই চরম উৎকর্ষ, যা মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে আল্লাহর সান্নিধ্যে পৌঁছে দেয়। তিনি ‘ইসম-এ-আল্লাহ জাত’ বা আল্লাহর নামের জিকিরকে আধ্যাত্মিক সাধনার চাবিকাঠি মনে করতেন। ১৬৯১ সালের ১ মার্চ এই মহান সাধক ইহলোক ত্যাগ করেন, কিন্তু তার আধ্যাত্মিক জ্যোতি আজও সারা বিশ্বের ভক্তদের হৃদয়ে অম্লান।
নির্বাচিত কবিতা ও ভাষ্য
বয়েত ১৩
প্রত্যেকেই একটা নিখুঁত বিশ্বাসের খোঁজ করে, কিন্তু বিরল যে করে একটা যথার্থ প্রেমের সন্ধান,
তারা চায় ঈমান কিন্তু প্রেম নয়, আর এ কারণেই ভারী হয়ে আছে আমার হৃদয় কী প্রচণ্ড বেদনায়!
আধ্যাত্মিকতার যে স্তরে প্রেম দিয়ে পৌঁছে যাওয়া যায়, সে সম্পর্কে একটুও ধারণা নেই ঈমানের,
ও বাহু! প্রেমকে আমার জীবন্ত রেখো, ঈমানের দোহাই দিয়ে তোমার কাছে এই তো আমার প্রার্থনা।
তত্ত্বকথা: এখানে ‘বয়েত’ বলতে সুলতান বাহুর সেই বিখ্যাত পাঞ্জাবি চার লাইনের ছন্দময় শ্লোককে বোঝানো হয়েছে। এই কবিতায় বাহু প্রথাগত ধর্মীয় বিশ্বাস (ঈমান) এবং স্রষ্টার প্রতি গভীর ভালোবাসার (ইশক) মধ্যে এক সূক্ষ্ম পার্থক্যের ইঙ্গিত দিয়েছেন। তার মতে, শুধু নিয়মমাফিক বিশ্বাস আত্মাকে তৃপ্তি দিতে পারে না যদি না তাতে প্রেমের পরশ থাকে। আধ্যাত্মিকতার যে সুউচ্চ মার্গে প্রেম পৌঁছাতে পারে, সাধারণ বিশ্বাসের সেখানে গতি নেই।
ওহদাত (একত্ববাদ)
ওহদাতের স্তরে সর্বত্র শুধু বিরাজ করছে আল্লাহর সত্তার একত্ব
যদি পরম একত্বের বাইরে তুমি অন্যকিছু দেখো তবে সেটাই হলো আমিত্বের পূজা।
তত্ত্বকথা: সুফি দর্শনে ‘ওহদাত’ হলো স্রষ্টার অদ্বৈত সত্তার উপলব্ধি। বাহুর মতে, যদি কেউ মহাবিশ্বের প্রতিটি কণা আর নিজের সত্তার ভেতরে স্রষ্টা ছাড়া অন্য কিছুর অস্তিত্ব অনুভব করে, তবে তা এক ধরণের ‘আমিত্বের আরাধনা’ বা শিরক। নিজের অহংবোধ, লোভ বা জগতের প্রতি আসক্তিই হলো সেই আধুনিক যুগের মূর্তি, যা মানুষকে প্রকৃত সত্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখে।
অনুরাগের এক বিন্দু
যারা গাউসুল আজমের শিষ্য, সংশয় তাদেরকে গ্রাস করে না—হু
যার অন্তরে আছে অনুরাগের এক বিন্দু, আর্তনাদ ও বিরহে কাটে তার দিন—হু
মিলনের ব্যাকুলতা যার হৃদয়ে, পার্থিব সুখকে ছেড়ে চিনে নেয় সে আধ্যাত্মিক আনন্দ—হু
ইহকাল ও পরকাল দুই-ই হবে তোমার ও বাহু! যদি বিলীন করো নিজেকে আল্লাহর সত্তার খোঁজে—হু
তত্ত্বকথা: সুলতান বাহু এখানে বড় পীর আব্দুল কাদের জিলানী (রহ.)-এর প্রতি তার অগাধ ভক্তির প্রকাশ ঘটিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করেন, একজন কামেল মুর্শিদের ছায়ায় থাকলে সংশয়ের অন্ধকার কেটে যায়। স্রষ্টার প্রতি প্রেমের এক বিন্দু অনুরাগ জাগলে পার্থিব সুখ তখন ম্লান হয়ে যায়। তখনই শুরু হয় ‘ফানা’ বা বিলীন হওয়ার প্রক্রিয়া, যা সাধককে ইহকাল ও পরকাল, উভয় জগতেই রাজকীয় সফলতা দান করে।
যদি চর্চা রাখো পরম নাম
শিষ্য যখন হয়েছোই, হও এক সত্যের অন্বেষী আর গান গাইতে থাকো সেই—হু
ধরো শক্ত করে তোমার মুর্শিদের আঁচল আর তুমি নিজেই হবে তেমন মুর্শিদ—হু
মগ্ন হও কালিমার জিকিরে সবসময় আর করো গোসল সে পবিত্র সুধার পানিতে—হু
আল্লাহ অবশ্যই করবেন শোধন তোমাকে ও বাহু! যদি সত্যিই চর্চা রাখো পরম নাম—হু
তত্ত্বকথা: এই শ্লোকটি একজন সাধকের আধ্যাত্মিক উত্তরণের চারধাপ বিশিষ্ট একটি রূপরেখা। প্রথমত, সত্যান্বেষণের তীব্র তৃষ্ণা; দ্বিতীয়ত, গুরুর পূর্ণ অনুকরণ ও আনুগত্য; তৃতীয়ত, কালিমার নূরে অন্তরের কালিমা মোচন; এবং সবশেষে, ‘ইসম-এ-আল্লাহ জাত’ বা আল্লাহর নামের ধ্যানে নিমগ্ন হওয়া। এই সাধনা সম্পন্ন হলে খোদ স্রষ্টাই বান্দার আত্মাকে সমস্ত জাগতিক কলুষতা থেকে মুক্ত করে নিজের নূরে আলোকিত করে দেন।
তথ্যসূত্র ও উপকরণ সংগৃহ: রিসালা রুহী শরীফ, রেখটা ডটকম, সুলতান বাহু ডটনেট ও সংগৃহীত সুফি পাণ্ডুলিপি।