অনূদিত গল্প
Published : 16 Sep 2025, 12:37 AM
মাঙ্গোশি ভেবেছিল সে জঙ্গলের ভেতরে হাঁটছে। কিন্তু সে হাঁটছিল শুকনো, কুঁজো ডালপালাওয়ালা গাছের মধ্যে দিয়ে। চারপাশের জমি পোড়া, গাছ পড়ে আছে, আর বহুদূর পর্যন্ত কোথাও কোনো ঝোপঝাড় নেই।
প্রথমে সে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল, শুকনো জমি, লতাপাতার ছাই, ফাটা মাটি। অনেক গাছ উপড়ে গেছে, অনেক আবার কেটে ফেলা হয়েছে। তাদের ভাঙা গুঁড়ি ছড়িয়ে আছে ডালপালার জাঁকজমক নিয়ে, কিন্তু সবই ভাঙাচোরা, ফাটা মাটির ওপর।
এখানে কী হয়েছে? মাঙ্গোশি মনে মনে বললো। তার কাছে একেবারেই অবিশ্বাস্য লাগল, এটাই কি সেই জঙ্গল, যেখানে সে গত বছর ঘুরে বেড়িয়েছিল? চারপাশ দেখে তার মন ভার হয়ে গেল, কষ্ট আর দুঃখে ভরে উঠল। তারপর হঠাৎ ভয়ঙ্কর এক অনুভূতি তাকে গ্রাস করল।
সে কি দেরি করে ফেলেছে! বুঝতে পারল, বন যদি আর আগের মতো না থাকে, তবে তার মায়ের অসুখ সারানোর সেই জাদুকরী ফুল খুঁজে পাওয়া সহজ হবে না।
এখন তার সামনে দুটি পথ। সে যদি ফিরে যায়, তাহলে মা মারা যাবে। গ্রামবাসীরাও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাবে। আর তখন বনটাও ধ্বংস হয়ে যাবে। কিংবা সে এগিয়ে যাবে, যতক্ষণ না খুঁজে পায় সেই গাছগুলোকে, যাদের কাছে জন্মায় সেই বিশেষ ফুল।
মাঙ্গোশি দাঁড়িয়ে ছিল সেই ধ্বংসস্তূপভরা জমির ওপর, ভাঙা গাছের মাঝখানে। গাছগুলোর রস মাটিতে ঝরছিল। ভাঙা ডালপালা ছড়িয়ে ছিল চারদিকে। তখনই সে বুঝল, এখানে তার আর কোনো বিকল্প নেই। যা ঘটেছে বনের সঙ্গে, একদিন তা গ্রামেও ঘটবে।
তাই একটাই পথ বাকি, তাকে এগিয়ে যেতেই হবে, খুঁজে বের করতে হবে সেই ফুল। মাঙ্গোশি আকাশের দিকে তাকাল। আকাশ অন্ধকার হয়ে আসছিল। সে অনেকটা পথ হেঁটেছে। বনের ধ্বংস এত বিশাল যে, কেউ কখনো কল্পনাও করতে পারেনি।
সে হাঁটতে লাগল, হাঁটতেই থাকল, যতক্ষণ না তার শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ল। পথে সে কাউকে দেখেনি। যে বন সবসময় পাখির ডাক, পশুপাখির শব্দ আর পোকার ভনভনে ডাকে মুখরিত থাকে, আজ সেই বন ভীষণ নীরব।
হঠাৎ বাতাসে সে অনুভব করল এক বিশাল যন্ত্রণার স্রোত। প্রথমে সে শুনল ভয়ঙ্কর এক আর্তনাদ। সে থেমে চারদিকে তাকাল, কিন্তু কোথাও কাউকে দেখা গেল না। শব্দটা যেন এক নারীর কান্নার মতো শোনাল। সে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে অপেক্ষা করল, কিন্তু আর কোনো শব্দ ভেসে এলো না। তাই আবার হাঁটতে শুরু করল।
তবে বেশিদূর যায়নি। ক্ষুধা পেয়েছিলো। সে একটি ভাঙা গাছের গুঁড়িতে বসে পড়ল, আর মায়ের বানানো খাবার খেতে শুরু করল। খেতে খেতেই সে আবার শুনতে পেল, কেউ কাছেই কাঁদছে। কে ওখানে? একটু ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল মাঙ্গোশি। ধ্বংস হওয়া বন নীরব হয়ে ছিল।
কে ওখানে? লজ্জা করো না, বলো, ডেকে উঠল মাঙ্গোশি। আমি, একটি ভাঙাচোরা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো। শব্দটা আসছিল তার নিচ থেকে। সে তাড়াহুড়ো করে উঠে দাঁড়াল। যে ভাঙা গাছের গুঁড়িতে বসেছিল, সেটাই ছিল এক ইরোকো গাছ। তুমি এত দেরি করে আবার ফিরলে কেন? আমরা তোমাকে কত কিছু বলতে চেয়েছিলাম। মাঙ্গোশি প্রথমে বুঝতেই পারল না, কণ্ঠটা গাছ থেকেই আসছে।
তুমি! তুমি-ই কি আমার সঙ্গে কথা বলছ? যেই গাছের ওপর আমি বসে ছিলাম?
হ্যাঁ, উত্তর দিল গাছটি, কিছুক্ষণ থেমে।
তুমি এত দেরি করলে কেন? আমরা তোমাকে ডেকেছিলাম, কিন্তু তুমি আমাদের কথা শোনোনি।
আমি দুঃখিত, মাঙ্গোশি বললো। আমি তখন প্রস্তুত ছিলাম না।
এখন অনেক দেরি হয়ে গেছে, ভাঙা গাছটি বললো।
না, একেবারেই দেরি হয়নি। তুমি এখনো তো কথা বলছো।
আমি শেষ হয়ে আসছি।
কিন্তু তুমি কথা বলছো কীভাবে? আমি তো ভেবেছিলাম, গাছ পড়ে গেলে তারা মারা যায়।
আমাদের মরতে অনেক সময় লাগে, ইরোকো বললো।
এখনও আমি দূরের বিশাল বনের সঙ্গে যুক্ত আছি। সব গাছ জানে আমি মরে যাচ্ছি। তাই তারা আমাকে শক্তি দিচ্ছে, খাদ্য পাঠাচ্ছে, সাহস যোগাচ্ছে।
কিন্তু তারা তো অনেক দূরে! এটা তারা কীভাবে করছে?
কারণ আমরা সবাই একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। সব গাছ একে অপরের সঙ্গে বাঁধা। একজন কষ্ট পেলে, সবাই কষ্ট পায়। আমরা সবাই একে অপরের অনুভূতি টের পাই।
কিন্তু কীভাবে? এটা কি জাদুর মতো কিছু?
তুমি যদি মাটির নিচটা দেখতে না পারো, তাহলে তাই বলবে।
মানে কী?
আমরা সবাই শিকড় দিয়ে একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। সব গাছ সবসময় একে অপরের সঙ্গে কথা বলে, একে অপরকে শোনে।
শিকড়ের মাধ্যমে?
হ্যাঁ।
কী অদ্ভুত ব্যাপার!
আসলে ব্যাপারটা তেমন অদ্ভুত নয়। আমাদের শিকড় খুব গভীর আর লম্বা। মাটির নিচে আছে এক বিশাল জগত, যেখানে সব শিকড় একে অপরের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। তুমি যদি বনকে বড় মনে করো, তবে জেনে রাখো, মাটির নিচের দুনিয়া আরও বিস্ময়কর।
তুমি তো মোটেও মরে যাচ্ছো বলে মনে হচ্ছে না, বললো মাঙ্গোশি।
ওটা সম্ভব হচ্ছে, কারণ আমি অন্য গাছদের কাছ থেকে শক্তি পাচ্ছি।
আর, যদিও আমি পড়ে গেছি, হয়তো এখনো আমার বেড়ে ওঠা সম্ভব।
আমি কি তোমাকে সাহায্য করতে পারি? মাঙ্গোশি জিজ্ঞেস করল।
হ্যাঁ, তুমি পারো। এই কারণেই আমরা তোমার অপেক্ষা করছিলাম।
কীভাবে আমি সাহায্য করব?
তুমি পরে আমাকে সাহায্য করবে। কিন্তু যদি সত্যিই এখনই সাহায্য করতে চাও, তবে তোমাকে এগিয়ে যেতে হবে। জঙ্গলের যে অংশ এখনও বেঁচে আছে, সেদিকে যেতে হবে। দেরি হয়ে যেতে পারে, তবে কে জানে।
এখনই কি আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারি না?
এখন পুরো বন আমার চেয়ে অনেক বেশি সাহায্যের প্রয়োজন। আমি টিকে থাকব। তুমি এগিয়ে যাও জঙ্গলের ভেতর। সেখানে অন্য গাছেরা তোমাকে বলে দেবে, কী করতে হবে।
ঠিক আছে, আমি তাই করব।
কিন্তু যাওয়ার আগে বলো তো, তুমি কেন ফিরে এলে? কেনো এসেছো এখানে?
আমার মা অসুস্থ। গ্রামও অসুস্থ হয়ে পড়ছে। আমাকে পাঠানো হয়েছে একটি বিশেষ ফুল আনার জন্য, যে ফুল আমাদের সবাইকে সুস্থ করবে।
আমি জানি তুমি কোন ফুল খুঁজছ। কিন্তু তোমাদের মানুষ এতটাই বন ধ্বংস করেছে যে, আমি নিশ্চিত নই তুমি সেই ফুল খুঁজে পাবে কিনা। সেই ফুল খুব বিশেষ জায়গায় জন্মায়, খুবই বিরল। বন যখন খুশি আর সুস্থ থাকে, তখনই তা জন্মায়। কোনো বিপদে থাকা বনে সে কখনো জন্মায় না।
তাহলে আমি কী করব?
জঙ্গলের ভেতর এগিয়ে যাও। সবচেয়ে পুরোনো আর জ্ঞানী গাছের কাছে যাও। সেটা হলো, বাওবাব।
যাওয়ার আগে একটা কথা বলো, মাঙ্গোশি জিজ্ঞেস করল, তুমি কেন পড়ে গেলে? কী হয়েছিল তোমার?
মানুষ এসে আমাকে কেটে ফেলেছে।
কিন্তু কেন?
তারা আমাকে বিক্রি করে টাকা আয় করতে চেয়েছিল।
কিন্তু তারা যদি এভাবে করে, তাহলে তো একদিন বনে আর কোনো গাছই থাকবে না!
জানি। কিন্তু তারা বোঝে না, কত ভয়ংকর বিপদ তারা ডেকে আনছে।
তোমার সঙ্গে এটা ঘটেছে বলে আমি ভীষণ দুঃখিত, বললো মাঙ্গোশি।
দুঃখ করো না। কিছু করো। বড়দের, পুরনো গাছেদের সঙ্গে কথা বলো। এগিয়ে যাও, জঙ্গলের ভেতর।
ধন্যবাদ। আমি তাই করব। মাঙ্গোশি তখন একটু অপ্রস্তুতভাবে ভাঙা গাছটিকে জড়িয়ে ধরল।
এটা খুবই ভালো কাজ করলে, বললো গাছটি। এতে আমি টিকে থাকার শক্তি পাবো।
চলবে...