Published : 24 Sep 2025, 03:32 AM
আমি ছাত্রী হিসেবে খুব একটা ভালো নই। অঙ্কে ভালো হলে তো আজ বিজ্ঞান বিভাগ থেকেই মাধ্যমিক পরীক্ষা দিতাম। অকারণে ব্যবসায় শিক্ষা থেকে কেন বলো?
ক্লাস টেনের টেস্ট পরীক্ষা মোটামুটি দিয়েছি। মাধ্যমিক উতরে যাব সেই আত্মবিশ্বাস আমার আছে। কিন্তু বাবার বুকটা যতখানি ফুলবে বলে তিনি আশা করছেন, অতটা ফুলাতে পারব কিনা আমি নিজেও নিশ্চিত নই। এ-প্লাস পেতেই হবে; এটা আমার নয়, বাবার লক্ষ্য।
আমার লক্ষ্য স্পিরিটের মতো উবে গেছে দিনরাত ‘পড়ো পড়ো’ টাইপের কথার চাপে। পড়ে আছে শুধু স্পিরিটের কর্কখোলা খালি বোতলখানা। যতটা চাপ, অতটা পড়তে মন চায় না। ওদিকে বাবা বলেছেন, ১৬ ঘণ্টার নিচে পড়ে মাধ্যমিক পরীক্ষা দেওয়া যায় না নাকি। দ্রুত পড়া মুখস্থ হওয়ারও চাপ আছে বটে।
পড়া শেষ হলেও গণিত বই আর খাতা নিয়ে টেবিলে ঠায় বসে থাকা লাগে। ওই যে অঙ্কে কাঁচা, তাই বেশি বেশি প্র্যাকটিস করতে হবে! ঘড়িতে বাবার কাঙ্ক্ষিত ঘণ্টা বাজলেই আমার ছুটি মেলে। তাই আমি বুদ্ধি করে পড়াটা আগে সেরে নিই, এরপরের সময়টা একটু অঙ্ক করি আর বাকিটা সময় বইয়ের নিচে রেখে গল্পের বই পড়ি।
সুযোগ বেশি পেলে ছবি আঁকি। তবে পড়ার বইয়ের নিচে গল্পের বই রেখে দেওয়াটা যতটা সহজ; ছবি আঁকার কাজটা একটু রিস্কি। হুট মা চলে এলে স্কেচবুক লুকিয়ে ফেলা যায় না। এবার তো ধরা পড়ে গেলাম বাবার কাছেই। ফলাফল, বিকাশ ভাই।
আমার ভালো রেজাল্টের জন্য বাবার প্রথম ভরসা কবির স্যার। তিনি দীর্ঘদিন ধরে আমাকে পড়ান। আর আমি বিষয়ক যাবতীয় সমস্যা সমাধানের জন্য ভরসা হলেন বিকাশ ভাই। বিকাশ ভাই সারাদিন বইপত্র পড়া মানুষ। তাকে ‘বইপোকা’ না বলে ‘উইপোকা’ বলা যেতে পারে। বই পড়েন না খান, গড নৌজ।
বাবার ডাকে একদিন সক্কাল সক্কাল বাড়িতে হাজির বিকাশ ভাই। আমার বইপত্র আর গাইডগুলো ঘেঁটে বললেন, তোমার গণিতে সমস্যা তাইনা?
জি।
নাক কুঁচকে চোখে চশমা ঠেলে তিনি বললেন, ওহ্। আমি তো পড়াবো না। তোমাকে পড়াবে সুহাস। আমার ছোটোভাই। ও অঙ্ক ভালো পারে। ইংরেজিতে তো প্রবলেম নাই?
না।
সুন্দর। তুমি নিশ্চয়ই জানো, সুহাস আর আমি ইংরেজি পারি না!
জি। মাত্র জানলাম।
ঝড়ের গতিতে আরও যা যা বললেন, তাতে বুঝলাম আমার মতো হ্যারি পটার পড়া মেয়ের ভবিষ্যতে আলোর মুখ দেখার সম্ভাবনা খুবই কম। তার ওপর জ্ঞানবুদ্ধিও খুব একটা নেই, সেটাও বোঝানোর চেষ্টা করলেন তিনি।
রাতে সুহাস ভাই পড়ানোর জন্য হাজির। ভেবেছিলাম তিনি শুধু গণিতই শেখাবেন। কিন্তু প্রথম দিনেই নবম-দশম শ্রেণির বাংলা ব্যাকরণ বইয়ের সমাস অধ্যায় বাদে বাকি সবগুলো অধ্যায়ই পড়া দিয়ে দিলেন। এরপর গণিত, হিসাববিজ্ঞান আর বাদ বাকি সাবজেক্ট তো আছেই! একেবারে গিজগিজ অবস্থা!
দু’তিন দিনে খেয়াল করলাম, আমাকে পড়াতে আসার পর মা তাকে চা-কফি দিলে তিন খান না। ঠান্ডা পানি বানিয়ে ফেলেন। অনেকক্ষণ বাদে আমাকে কোনো একটা বই বা কিছু আনতে বলেন। ওসব নিয়ে এসে দেখি চায়ের কাপ খালি! সম্ভবত কারও সামনে খেতে তার লজ্জাবোধ হয়।
আরও অদ্ভুত বিষয় আছে। তিনি এসেই সিঙ্গেল সোফাটা তার জায়গা থেকে টেনে এনে ফ্যানের নিচে বসেন। বাড়ির বাইরে আমাকে দেখলে চিনবেন কিনা জানি না। জীবনে তাকাননি তো তাই বলছি! ওনার ধারণা আমি কিচ্ছুই পড়ি না। কিন্তু বলেন, আমার ব্রেইন পরিষ্কার।
এদিকে আমি সারা জনমের পড়াশোনা ওই সময়টাতেই করতে লাগলাম। পড়ি, ভুলি। লিখি, গুলিয়ে ফেলি। ওনার চিন্তা আমার চেয়ে বেশি বাবাকে নিয়ে। আমি এ-প্লাস না পেলে বাবা হতাশ হবেন। গণিত পরীক্ষার আগের দিন আমাকে নানাভাবে সাহস দেওয়ার চেষ্টা করলেন। আমিও খুব মাথা নেড়ে নেড়ে তার কথা শুনলাম। মনে হচ্ছিল, বেচারা নিজেই নার্ভাস, তারই বুঝি পরীক্ষা।
পরীক্ষা দিয়ে ঢিবঢিব বুকে হল থেকে বেরিয়ে এলাম। চোখ দিয়ে গলগল করে পানি নেমে এলো। বাবা ঝুঁটিতে হাত বুলিয়ে দিলেন। বাড়ি ফেরার সারাটা পথ বাবার দিকে তাকাতে পারিনি। তবে বাবা তাকিয়ে ছিলেন আমার দিকে। শুধু বললেন, বোকা, জীবনে আরও কত পরীক্ষা আছে! সেগুলো ভালো হবে।
রাতে সুহাস ভাই এসে হাজির। অবাক কাণ্ড, সেদিন আমার দিকে তাকালেন তিনি! এটাই প্রথম। বললেন, পরীক্ষা ভালো হয়নি জানি। সেটা বিষয় না। বিষয় হচ্ছে, আমি আমার লাল গ্রামার বইটা ফেলে গেছি তোমাদের বাসায়। দিয়ে দাও, চলে যাই।
আমার কী বলা উচিত ভুলে গেলাম। বই নিয়ে এসে দেখি মায়ের দেওয়া চা অমনই পড়ে আছে। তার মানে, তিনি রেগে আছেন আমার ওপর। খাবেন না। কিন্তু অবাক করে দিয়ে বললেন, আমি চা খাই, তুমি পাইনাপল বিস্কুট খাও। একথা বলে সবগুলো দাঁত বের করে হেসে দিলেন।