Published : 22 Aug 2025, 06:28 AM
গত জুলাইয়ে বিশ্বজুড়ে মুক্তি পেয়েছে জেমস গান পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘সুপারম্যান’। ডিসি ইউনিভার্সের নতুন এই পর্বে সুপারম্যানের চরিত্রে এসেছেন ডেভিড কোরেনসোয়েট এবং লোইস লেনের ভূমিকায় রেচেল ব্রসনাহান। নীল পোশাক আর লাল কেইপ পরা এই নায়কের পর্দায় প্রত্যাবর্তন আবারও উসকে দিয়েছে এক পুরনো প্রশ্ন। কীভাবে দশকের পর দশক ধরে সুপারম্যান এতটা প্রাসঙ্গিক হয়ে রইল? কেন বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের কাছে ‘ম্যান অফ স্টিল’ আজও আশা ও ভরসার এক চিরন্তন প্রতীক?
এর উত্তর লুকিয়ে আছে সময়ের সাথে নিজেকে বদলে ফেলার আশ্চর্য ক্ষমতার মধ্যে। সুপারম্যান কেবল ভিনগ্রহ থেকে আসা এক অতিমানবীয় চরিত্র নয়; তার পরিচয়, মূল্যবোধ, এমনকি তার বিখ্যাত স্লোগান ‘সত্য, ন্যায় এবং আমেরিকান আদর্শ’, সবই যুগের প্রয়োজনে নতুন রূপ নিয়েছে।
স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিনের লেখক সামান্থা বাস্কিন্ডের মতে, সুপারম্যানের ব্যক্তিত্বকে কোনো নির্দিষ্ট গণ্ডিতে বাঁধা যায় না। তিনি কখনও আমেরিকান শক্তির প্রতীক, আবার কখনও সমাজের প্রান্তিক ও নিপীড়িত মানুষের কণ্ঠস্বর। এই দ্বৈত পরিচয়ই তাকে দিয়েছে কালজয়ী হওয়ার রসদ।
তবে আজ আমরা যে সুপারম্যানকে চিনি, তার প্রথম ধারণাটি ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত এবং চমকপ্রদ। ১৯৩৩ সাল, জেরি সিগেল ও জো শুস্টার ‘দ্য রেইন অফ দ্য সুপার-ম্যান’ নামে একটি ছোটগল্প প্রকাশ করেন। সেই গল্পের ‘সুপারম্যান’ কোনো নায়ক ছিল না, বরং ছিল এক টাক মাথার খলনায়ক, যে মানসিক শক্তি ব্যবহার করে বিশ্ব শাসনের স্বপ্ন দেখত।
সৌভাগ্যবশত, স্রষ্টারা এই নেতিবাচক ধারণাটি বাতিল করে চরিত্রটিকে নতুন করে ঢেলে সাজান। খলনায়কের ছায়া থেকে বেরিয়ে জন্ম নেয় এক ভিনগ্রহ থেকে আসা মহৎ নায়ক, যার মূল শক্তি শারীরিক হলেও তার সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়ে ওঠে তার অটুট মানবিকতা।
সময়টা ১৯৩৮ সাল। মহামন্দার ক্ষত যখন আমেরিকার বুকে দগদগে, সাধারণ মানুষের মনে গভীর হতাশা, ঠিক তখনই দুই তরুণ স্রষ্টা জেরি সিগেল ও জো শুস্টার এক নতুন নায়কের জন্ম দিলেন। সেই নায়ক কেবল দানব বা বিদেশি শত্রুদের সঙ্গেই লড়াই করত না, তার মূল লড়াই ছিল সমাজের ভেতরের শোষণের বিরুদ্ধে। দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনীতিবিদ, অসৎ ব্যবসায়ী আর সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে সে ছিল এক প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। তৎকালীন আমেরিকান সমাজের সততা ও দেশপ্রেমের মূর্ত প্রতীক হয়ে উঠেছিল ‘সুপারম্যান’। এটি ছিল ‘আমেরিকান ড্রিম’-এর প্রতিচ্ছবি, প্রমাণ করত সঠিক আদর্শ থাকলে সাধারণের মধ্য থেকেই অসাধারণ হয়ে ওঠা যায়।

এর মধ্যে সময় বদলে যায়, ‘সুপারম্যান’-এরও তৈরি হয় নতুন পরিচয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপট বদলে যায়, আর সময়ের সাথেই বদলায় নায়কের ভূমিকাও। শীতল যুদ্ধের যুগে সুপারম্যান আর শুধু আমেরিকার নায়ক রইল না, বরং বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার প্রতীকে পরিণত হলো। ১৯৫০ ও ৬০-এর দশকে যখন আমেরিকায় নাগরিক অধিকার আন্দোলন তুঙ্গে, তখন সুপারম্যানের গল্পেও বর্ণবাদ ও সামাজিক অবিচারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের বার্তা দেওয়া হয়। ধীরে ধীরে তার ‘আমেরিকান’ পরিচয়টি আরও বড় ও মানবিক হয়ে ওঠে এবং সে পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের জন্য আশার আলো হয়ে ওঠে।
তবে প্রশ্ন উঠলো, ‘সুপারম্যান’ কি কেবলই ক্ষমতার প্রতীক, নাকি নিপীড়িতের কণ্ঠস্বর? বিশ্বজুড়ে রাজনৈতিক অস্থিরতা বাড়লে সত্তরের দশকে সুপারম্যানের চরিত্রও আগের মতো সরলরৈখিক থাকেনি। কমিকসের পাতায় তাকে আরও জটিল ও আত্ম-জিজ্ঞাসামূলক চরিত্রে দেখা যায়। সে একদিকে যেমন ছিল রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা এক শক্তিধর সত্তা, তেমনই সমাজের দুর্বল, ক্ষমতাহীন মানুষের পাশে দাঁড়ানো এক পরম বন্ধু।
এই দ্বিবিধ পরিচয় তাকে এক জটিল এবং বহুমাত্রিক আইকনে পরিণত করে। সে কি তবে ক্ষমতার হাতিয়ার, নাকি ক্ষমতাহীনদের শেষ আশ্রয়? এই প্রশ্নই সুপারম্যানকে অন্য সব সুপারহিরোর থেকে আলাদা করে তুলেছে।
নতুন শতাব্দীতে এসে সুপারম্যানের আবেদন আরও বিশ্বজনীন হয়েছে। তার বিখ্যাত স্লোগান থেকে ‘আমেরিকান আদর্শ’ শব্দটি প্রায় মুছেই গেছে। এখন তার মূলমন্ত্র হলো ‘সত্য, ন্যায় ও এক উন্নত ভবিষ্যৎ’। এর কারণ স্পষ্ট, সুপারম্যান এখন আর কোনো নির্দিষ্ট দেশের নয়, সে সমগ্র মানবজাতির নায়ক। বিভেদ ও সংঘাতে জর্জরিত পৃথিবীতে তার মতো এক চরিত্র, যে নিঃস্বার্থভাবে নিজের শক্তিকে মানবকল্যাণে ব্যবহার করে, তার প্রয়োজনীয়তা আরও বেশি।
সুপারম্যানের দীর্ঘ ইতিহাস প্রমাণ করে যে সে শুধু একটি কমিক চরিত্র নয়, বরং একটি সাংস্কৃতিক আয়না, যা প্রতিটি যুগের পরিবর্তনশীল মূল্যবোধকে ধারণ করে। তবে তার এই কালজয়ী যাত্রাপথ একেবারেই নিষ্কণ্টক নয়। অনেকেই মনে করেন, সুপারম্যানের মতো চরিত্র, যারা আইন নিজের হাতে তুলে নেয়, তারা সমাজে এক বিপজ্জনক মানসিকতার জন্ম দেয়। যেখানে বিচার ব্যবস্থার ঊর্ধ্বে উঠে সমস্যার সমাধান করা হয়, সেখানে ন্যায়-নীতির ভারসাম্য থাকে না।
কিন্তু এই বিতর্ক সত্ত্বেও, প্রজন্মের পর প্রজন্ম তার মধ্যে নিজেদের স্বপ্ন, উদ্বেগ ও আকাঙ্ক্ষার প্রতিচ্ছবি খুঁজে নেয়। সে আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সত্যিকারের শক্তি পেশিতে নয়, বরং মানবতা ও নৈতিকতার প্রতি অবিচল থাকায় প্রকাশ পায়। ধ্বংস হতে বসা ক্রিপ্টন গ্রহে তার নাম ছিল ‘কাল-এল’, আর পৃথিবীতে মানবসমাজে সে বেড়ে উঠেছে সাধারণ সাংবাদিক ‘ক্লার্ক কেন্ট’ হিসেবে। কিন্তু সুপারম্যানের আসল পরিচয় এই দুটি নামের ঊর্ধ্বে। সে আমাদের সম্মিলিত আশা আর উন্নত ভবিষ্যতের এক জীবন্ত কিংবদন্তি।
সূত্র: স্মিথসোনিয়ান ম্যাগাজিন ডটকম