Published : 22 Jun 2026, 01:07 PM
ফুটবল মাঠে হলুদ জার্সি, সবুজ বর্ডার, নীল হাফপ্যান্ট আর সাদা মোজা- এই পোশাকটির দিকে তাকালেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে পেলের পায়ের জাদু, সাম্বা নাচ আর মন মাতানো সুন্দর ফুটবল। বিশ্বজুড়ে এই হলুদ জার্সি শুধু ব্রাজিলের পোশাক নয়, যেন হয়ে উঠেছে ফুটবল খেলার আনন্দ ও সৌন্দর্যের প্রতীক।
১৯৭০ সালের বিশ্বকাপজয়ী ক্যাপ্টেন কার্লোস আলবার্তো একবার বলেছিলেন, “আমাদের কাছে এই হলুদ জার্সিটা পবিত্র। এটা গায়ে দিলে যেমন বুকটা গর্বে ভরে ওঠে, তেমনি মাঠে ভালো খেলার এক বিশাল দায়িত্বও চেপে বসে।”
কিন্তু আজ যে জার্সি খেলাধুলার দুনিয়ায় জনপ্রিয়, তার পেছনে লুকিয়ে আছে এক কান্নার ইতিহাস আর এক ১৮ বছরের কিশোরের গল্প। ১৯৫০ সালের বিশ্বকাপ হয়েছিল ব্রাজিলের মাটিতে। ফাইনাল ম্যাচে নতুন তৈরি হওয়া মারাকানা স্টেডিয়ামে প্রায় দুই লাখ দর্শকের সামনে উরুগুয়ের কাছে ২-১ গোলে হেরে যায় ব্রাজিল। চোখের সামনে বিশ্বকাপ হাতছাড়া হওয়ায় পুরো ব্রাজিল যেন স্তব্ধ হয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েছিল।
এই হারের দুঃখ ব্রাজিলিয়ানরা সহজে ভুলতে পারেনি। তখন ব্রাজিল দল খেলত নীল কলার দেওয়া সাদা শার্ট পরে। উরুগুয়ের কাছে হারের পর সবাই বলতে শুরু করল, এই সাদা জার্সিটাই ‘অভিশপ্ত’। সিদ্ধান্ত হলো, এই জার্সি আর কোনোদিন পরা হবে না। দেশের পতাকার চার রঙ- সবুজ, হলুদ, নীল আর সাদা দিয়ে নতুন জার্সি বানাতে হবে, যা খেলোয়াড়দের মনে দেশপ্রেম জাগিয়ে তুলবে।
১৯৫৩ সালে ব্রাজিলের একটি খবরের কাগজ নতুন জার্সির ডিজাইনের জন্য এক প্রতিযোগিতার আয়োজন করে। উরুগুয়ে সীমান্তের এক ছোট শহরের বাসিন্দা, ১৮ বছরের কিশোর আলদির গার্সিয়া শ্লি এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেন।\

নিজের পড়ার টেবিলে বসে তিনি প্রায় ১০০টি আলাদা আলাদা নকশা তৈরি করেন। কখনো শার্টে সবুজ-হলুদ ডোরাকাটা দাগ দেন, কখনো বা অন্য কিছু চেষ্টা করেন। শেষে শ্লি ভাবলেন, মূল শার্টটা পুরোপুরি হলুদ হওয়াই সবচেয়ে ভালো। তার সঙ্গে নীল হাফপ্যান্ট আর সাদা মোজা দারুণ মানাবে, আর শার্টের গলায় থাকবে সামান্য সবুজ রঙ।
৪০০টিরও বেশি ডিজাইনের মধ্যে এই সাধারণ ও সুন্দর নকশাটিই বিচারকদের মন কেড়ে নেয়। ১৯৫৪ সালে এই নতুন হলুদ জার্সি পরে প্রথম মাঠে নেমে জয় পায় ব্রাজিল।
মজার ব্যাপার হলো, এই হলুদ জার্সি পরে ব্রাজিল প্রথমবার বিশ্বকাপ জেতে ১৯৬২ সালে। কিন্তু তখন সারা বিশ্বে সাদা-কালো টেলিভিশনের যুগ থাকায় মানুষ এর আসল রূপ দেখতে পায়নি।
অবশেষে ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপ প্রথমবার রঙিন টিভিতে দেখানো হয়। দুনিয়ার কোটি কোটি মানুষ দেখল, কড়া রোদের মধ্যে হলুদের আভা ছড়িয়ে পেলে আর তার দল কীভাবে প্রতিপক্ষকে উড়িয়ে দিচ্ছে। সেই থেকে এই হলুদ জার্সিটি ফুটবল দুনিয়ার অন্যতম প্রিয় পোশাকে পরিণত হয়।
যে জার্সি ব্রাজিলকে এনে দিয়েছে রেকর্ড পাঁচটি বিশ্বকাপ, তার রূপকার আলদির গার্সিয়া শ্লি কিন্তু সারাজীবন খুব সাধারণভাবেই বেঁচে ছিলেন। পরবর্তীতে ‘নাইকি’ কোম্পানির মতো ব্র্যান্ড এই জার্সির স্বত্ব কিনে কোটি কোটি টাকার ব্যবসা শুরু করে।
পুরো বিষয়টি শ্লিকে কিছুটা কষ্ট দিত। জীবনের শেষ সময়ে এসে তিনি বলেছিলেন, “আমার এখন কিছুটা অপরাধবোধ হয়। আমি এমন একটা জিনিস তৈরি করেছিলাম যা আজ শুধু টাকার খেলায় পরিণত হয়েছে, আগের সেই আবেগ আর নেই।”
তিনি আক্ষেপ করলেও ব্রাজিলের মানুষ এবং পৃথিবীর কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমী এই তরুণের উপহারের কথা কোনোদিন ভুলবে না। তার হাতের ছোঁয়াতেই তো ফুটবল দুনিয়া পেয়েছে তাদের প্রিয় ও অনেকের কাছে ‘পবিত্র’ হলুদ জার্সি।
সূত্র: বিবিসি স্পোর্ট।