Published : 02 Jan 2026, 07:05 PM
[‘ছড়াসম্রাট’ খ্যাতি অর্জন করা একুশে পদক পাওয়া কবি, ছড়াকার ও লেখক সুকুমার বড়ুয়া আর নেই। ২ জানুয়ারি ২০২৬, শুক্রবার সকালে চট্টগ্রামের রাউজানের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। আসছে ৫ জানুয়ারি তার ৮৮তম জন্মদিন উপলক্ষ্যে এই লেখাটি গত ২২ ডিসেম্বর লিখে পাঠিয়েছিলেন মাসুম মাহমুদ। তার মৃত্যুদিনেই লেখাটি অগ্রিম প্রকাশ করা হলো। -নির্বাহী সম্পাদক, কিডজ]
ছড়া লিখে খ্যাতি-যশ-পরিচিতি পাওয়া এবং রাষ্ট্রীয় সম্মানসহ অসংখ্য স্বীকৃতিতে ভূষিত হয়েও যিনি নিজের জীবনকে সাধারণ ও সার্থক মনে করতেন, তিনি আমাদের প্রিয় সুকুমার বড়ুয়া (৫ জানুয়ারি ১৯৩৮ – ২ জানুয়ারি ২০২৬)। সাধারণ মানুষ এবং পাঠকদের কাছ থেকে তিনি যে ভালোবাসা ও সম্মান পেয়েছেন, তা এক কথায় বিস্ময়কর।
অতুলনীয় এই মানুষটি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কোয়ার্টারে নিজের সংসারে থাকেন। নিয়মিত লিখছেন। আমি স্কুল পেরিয়ে সবে কলেজে উঠেছি। নিয়মিত পড়ার চেষ্টা করি দৈনিক পত্রিকাগুলোর শিশুতোষ পাতা আর নানারকম কিশোর সাময়িকী। আমার জন্মস্থান প্রিয় কুলিয়ারচরেই তখন নিয়মিত থাকা হয়।
মাঝেমধ্যে বেড়াতে যাই ঢাকায়। সে সময়ের কথা, হঠাৎ ইচ্ছে হলো একটি ‘ছোটকাগজ’ করার। লেখা চাইব বলে যাদের নামের তালিকা করলাম, সেখানে প্রথমেই ছিল সুকুমার বড়ুয়ার নাম। লেখা চাওয়ার উদ্দেশ্যে একদিন সরাসরি তার ঢাকার বাসায় চলে গেলাম। তিনি তখন সকালের নাস্তা করছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া একজন তরুণী এসে আমার সামনের আসনে বসলেন। বললেন, “বাবা নাস্তা করছেন।”
এই বলে প্রায় আধা ঘণ্টা আমার সঙ্গে গল্প করলেন মেয়েটি। আধা ঘণ্টা পর সুকুমার বড়ুয়া এলেন, মেয়েটি উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, “আপনারা কথা বলেন, আমি আসছি।”
পাশেই সুকুমার বড়ুয়া দাঁড়িয়ে। কিন্তু আমি যেন সেই মেয়েটির আচরণের মধ্যেই সুকুমার বড়ুয়াকে প্রত্যক্ষ করছিলাম। তিনি ছিলেন সুকুমার বড়ুয়ার বড় মেয়ে, অঞ্জনা বড়ুয়া। বাড়িতে অতিথি এসেছে বাবার কাছে, বাবা ব্যস্ত; তাই মেহমান যেন এক মুহূর্তের জন্যও একা বোধ না করেন, সেই শিক্ষাটি তো মেয়েটি তার বাবার কাছ থেকেই পেয়েছেন।
ড্রয়িংরুমে বসে আমি শুনতে পাচ্ছিলাম সুকুমার বড়ুয়া তার কন্যাকে বলছেন, “মেহমান এসেছে একা বসে থাকবে! যাও গিয়ে গল্প করো। আমি নাস্তা করে আসছি।” ভাবতে ভাবতে খেয়াল করি আমি দাঁড়িয়ে আছি। সুকুমার বড়ুয়া স্নিগ্ধ স্বরে বললেন, “বসো।”
আমি বসলাম। কেন এসেছি সব খুলে বললাম। শুনে আমাকে মোটেও হতাশ করেননি এই ছড়াকার। গ্রাম থেকে আসা একেবারে সাধারণ এক তরুণের হাতে সেদিন তিনি অসাধারণ একটি ছড়া তুলে দিয়েছিলেন।
দুই.
অনেক বছর পর সুকুমার বড়ুয়ার সঙ্গে আমার দ্বিতীয়বারের মতো দেখা হয় শিশুদের পত্রিকা ‘ইকরিমিকরি’র কল্যাণে। প্রিয় এই লেখকের একটি অসম্পূর্ণ সাক্ষাৎকার সম্পন্ন করতে আমি তার আজিমপুরের বাসায় যাই। সেখানে মেয়ের সংসারে থাকেন তিনি। ‘ইকরিমিকরি’ থেকে এসেছি পরিচয় দিতেই তার সে কী আনন্দ! জানালেন ইকরিমিকরির বই তিনি দেখেছেন এবং প্রশংসা করলেন।
সাক্ষাৎকারের ফাঁকে ফাঁকে দেশ, বিশ্বসাহিত্য, শিশুসাহিত্য এবং ব্যক্তিগত নানা বিষয় নিয়েও কথা হচ্ছিল। সেই সুবাদে বলেছিলাম আজ থেকে অনেক বছর আগে তার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ার্টারে গিয়েছিলাম। মনে করতে পারলেন না ঠিকই, কিন্তু স্মৃতির ঝাঁপি খুলে শৈশবের কথা, কৈশোরের দিনলিপি, জীবনের সংগ্রামের কথা আর ছড়াকার হয়ে ওঠার গল্প বলছিলেন।

আমি মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম শিশুর মতো সহজ, সরল, সুন্দর সেই মানুষটির কথা। মনেই হচ্ছিল না এত বিশাল একজন ব্যক্তির সান্নিধ্যে বসে আছি। তখনই ভাবছিলাম বয়সের কথা। আশি পার করা একজন মানুষ, যিনি এখন গল্প করার মতো মানুষ তেমন পান না, বেশিরভাগ সময় একাকী কাটে, তার জন্য কাউকে পেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করাটাই স্বাভাবিক।
কিন্তু পরক্ষণেই মনে হলো- নাহ্, এটি কেবল স্বাভাবিক নয়; এটি তার মহানুভবতা। জগতে অনেক প্রবীণ বিখ্যাত মানুষ রয়েছেন যারা সবাইকে এত সহজে আপন করে নেন না। সুকুমার বড়ুয়া ছিলেন চিরকালের শিশু। কেবল আশির্ধ্ব বয়সের সুকুমার বড়ুয়া নন, একদা পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সের যে মানুষটিকে দেখেছিলাম, তিনি আমায় ঠিক একইভাবে সময় দিয়েছিলেন।
সাক্ষাৎকার শেষ করে যখন চলে আসব, তিনি বাড়ির সদর দরজা পর্যন্ত আমাকে এগিয়ে দিলেন। হাসিমুখে বিদায় জানালেন এবং বললেন, “আবার এসো।”
তিন.
হ্যাঁ, আবারও গিয়েছিলাম প্রিয় এই শিশুসাহিত্যিকের কাছে। ওটা ছিল আমার তৃতীয়বারের মতো যাওয়া। গিয়েছিলাম ইকরিমিকরির প্রথম সংখ্যাটি নিয়ে। সুকুমার বড়ুয়ার লেখা ছড়াও ছিল সেই সংখ্যায়। পত্রিকা হাতে নিয়ে তিনি এক গাল হাসলেন। বললেন, “প্রচ্ছদটি খুব সুন্দর হয়েছে। তোমরা শিশুর আঁকা প্রচ্ছদ দিয়ে পত্রিকা বানিয়েছ, এটা দারুণ ব্যাপার।”
তারপর তিনি একেকটি পাতা উল্টাতে থাকলেন এবং প্রতি পাতায় উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছিলেন। ছড়ার দিকে তার বিশেষ নজর ছিল। ধরে ধরে ছড়াকারদের খোঁজ নিচ্ছিলেন। কোনো কোনো ছড়াকারের নাম বলে নিজের মধুর স্মৃতিচারণ করছিলেন। সবশেষে পত্রিকাটির প্রশংসা করে ইকরিমিকরি টিমকে অভিনন্দন জানালেন।
তারপর আরও অনেকবার গিয়েছি এই মানুষটির কাছে। কখনো লেখা চাইতে, কখনো শুধু গল্প করতে। প্রতিবারই পরম মমতায় বরণ করে নিয়েছেন। সর্বশেষ গিয়েছিলাম তার বাড্ডার বাসায়। সেখানে তিনি ছেলে অরূপ রতনের সংসারে থাকতেন। নিজেই ফোন করে আমাকে যেতে বলেছিলেন। যাওয়ার পর তিনি যা করলেন, তা আমার জীবনের এক বিস্ময়কর ঘটনা। নিজ হাতে লেখা একটি ছড়া আমার হাতে দিয়ে বললেন, “এটি তোমার জন্য।”
উল্লেখ করা প্রয়োজন, এর আগে তার জন্য আমার লেখা ‘মাকে আমার পড়ে মনে’ বইটি নিয়ে গিয়েছিলাম। ঠিক দিন-সাতেক পরই তিনি আমাকে দেখা করতে বলেন। সেই ছড়াটি আসলে ছিল আমার বইটির একটি কাব্যিক পাঠপ্রতিক্রিয়া। সামান্য লেখালেখি করে সুকুমার বড়ুয়ার কাছ থেকে এমন উপহার পাওয়া আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ অর্জন।
কখনো কেউ যদি জানতে চান, আপনার কাছে সুকুমার বড়ুয়া কেমন? আমি কেবল এই লেখাটি পড়তে দিয়ে বলব, এই হলেন আমার সুকুমার বড়ুয়া। সবশেষে খুদে পাঠকদের জন্য রইল আমার প্রিয় ক’টা লাইন: “শেয়াল নাকি লোভ করে না / পরের কোনো জিনিসটার; কী পরিচয় দিল আহা / কী সততা কী নিষ্ঠার... তাই তো শেয়াল বনের মাঝে / এডুকেশন মিনিস্টার!”