Published : 18 Jun 2026, 10:53 AM
জ্যামাইকান ‘রেগে গানের রাজা’ হিসেবে পরিচিত বব মার্লে। তার কথা ভাবলে আমাদের চোখে ভাসে সেই ঝাঁকড়া চুল, গিটার হাতে মঞ্চে গান গাইছেন আর শান্তির কথা বলছেন।
কিন্তু জাদুকরী এ গায়কটির জীবনের একটা বড় অংশ জুড়ে ছিল ফুটবল। গান গেয়ে তিনি যেমন বিশ্ব জয় করেছেন, তেমনি ফুটবল মাঠের ঘাস আর কাদা মেখে তিনি খুঁজে পেতেন জীবনের অন্য আনন্দ।
মার্লে একবার বলেছিলেন, “যদি আমাকে সত্যিই চিনতে চাও, তবে আমার আর আমার ব্যান্ডের বিপক্ষে একবার ফুটবল খেলে দেখো।” এই একটা কথা থেকেই বোঝা যায়, ফুটবল তার কাছে কেবল বিনোদন ছিল না, ছিল বেঁচে থাকার বড় শক্তি।
বব মার্লের জন্ম ১৯৪৫ সালে জ্যামাইকায়। ছোটবেলায় তাকে কষ্ট সইতে হয়েছে। তার বাবা ছিলেন শ্বেতাঙ্গ আর মা ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ। গায়ের রঙ একটু ফর্সা হওয়ার কারণে বন্ধুরা তাকে ‘সাদা ছেলে’ বলে খ্যাপাত।
এই একাকিত্ব থেকে মুক্তি পেতে তিনি বেছে নিয়েছিলেন ফুটবল আর গান। তিনি মনে করতেন, মাঠের লড়াইয়ে কে সাদা আর কে কালো- তা বড় কথা নয়; কে ভালো খেলছে সেটাই আসল। ফুটবল তাকে শিখিয়েছিল সবাইকে সমান চোখে দেখতে।
মাঠে বব মার্লে ছিলেন লড়াকু খেলোয়াড়। তাকে বলা হতো ‘মিডফিল্ড জেনারেল’। খুব বড়সড় শরীর না হলেও তিনি ছিলেন ক্ষিপ্র। কাছে বল থাকলে তাকে আটকানো ছিল কঠিন কাজ। পায়ে সবসময় থাকত পছন্দের ‘অ্যাডিডাস কোপা মুন্ডিয়াল’ বুট।
পায়ে মোজা গুঁজে যখন তিনি মাঠে দৌড়াতেন, তখন তাকে দেখে চেনার উপায় থাকত না যে তিনি বিশ্বের এত বড় একজন তারকা। তার বন্ধু ও আলোকচিত্রী ডেনিস মরিস একবার বলেছিলেন, মার্লে যখন ফুটবল খেলতেন, তখন তিনি ছবি তোলা বন্ধ রাখতেন। কারণ ফুটবল খেলার সময় মার্লের মুখে যে আনন্দ দেখা যেত, তা ক্যামেরায় বন্দি করার চেয়ে সরাসরি দেখা ছিল অনেক বেশি প্রশান্তির।
বব মার্লে ছিলেন ব্রাজিলের ফুটবলের মস্ত ভক্ত। প্রিয় ক্লাব ছিল সান্তোস আর আদর্শ ছিলেন ‘ফুটবল সম্রাট’ পেলে। পেলের খেলার শৈলী তাকে মুগ্ধ করত। তবে শুধু ব্রাজিল নয়, তিনি ইংলিশ ক্লাব টটেনহ্যাম হটস্পারেরও সমর্থক ছিলেন। বিশেষ করে দলটির আর্জেন্টাইন তারকা অসি আর্দিলসের খেলা তিনি পছন্দ করতেন।
তার দীর্ঘদিনের বন্ধু এবং ট্যুর ম্যানেজার অ্যালান স্কিল কোল ছিলেন জ্যামাইকার ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার। মার্লে মজা করে বলতেন, “স্কিল কোল যেভাবে ফুটবল খেলে, আমি যদি সেভাবে গান গাইতে পারতাম, তবে জীবন সার্থক হতো!”
মার্লের গান আর ফুটবল ছিল যেন পিঠাপিঠি ভাই। ১৯৭৮ সালে যখন তার ‘কায়া’ অ্যালবামের প্রচারণা চলছিল, তখন তিনি শর্ত দিয়েছিলেন যে কনসার্টের সময় যেন বিশ্বকাপের কোনো খেলার সঙ্গে না মেলে। ট্যুর বাসে সব সময় একটা টিভি থাকত যাতে খেলা দেখা যায়।
তবে মার্লে একটা অদ্ভুত কাজ করতেন; খেলা দেখার সময় টিভির ভলিউম একদম কমিয়ে রাখতেন। ধারাভাষ্যকারদের চিৎকার তার একদম পছন্দ ছিল না। তিনি নিজের চোখে খেলার ছন্দটা উপভোগ করতে চাইতেন। এমনকি তারা যখন বড় বড় হোটেলে থাকতেন, তখন দামি স্যুইট ভাড়া নেওয়া হতো কেবল ঘরের ভেতর ফুটবল খেলার জন্য। এর নাম দিয়েছিলেন তারা ‘মানি বল’। খেলার সময় যদি ঘরের কোনো আসবাবপত্র ভেঙে যেত, তবে খেলোয়াড়দের পকেট থেকে তার জরিমানা দিতে হতো।
মার্লের একটি অজানা শখ ছিল বাঁশি বাজানো। তিনি সুন্দর বাঁশি বাজাতে পারতেন। বিশ্বাস করতেন, বাঁশি বাজালে ফুসফুস ভালো থাকে এবং মন পরিষ্কার হয়। তবে তিনি ছিলেন খুঁতখুঁতে মানুষ। নিখুঁত হবে না ভেবে নিজের গানে খুব একটা বাঁশি ব্যবহার করতে চাইতেন না। তার এই জেদ ফুটবল মাঠেও দেখা যেত।
একবার ইংল্যান্ডের গায়ক এডি গ্রান্টের দলের সঙ্গে ইনডোর ফুটবলে মার্লের দল ২-০ গোলে পিছিয়ে পড়ে। মার্লে তখন জেদ ধরে খেলা থামিয়ে দেন এবং ইনডোর ফুটবলের কৌশলগুলো বুঝে নেন। এরপর দেয়াল ব্যবহার করে খেলার নতুন বুদ্ধি বের করেন এবং শেষ পর্যন্ত তার দল ৫-২ গোলে জয়ী হয়ে মাঠ ছাড়ে। হার মানা বব মার্লের স্বভাবে ছিল না।
কিংসটনের রাস্তায় বব মার্লে একবার ফুটবলের মাধ্যমে বড় একটা বিপদ ঠেকিয়েছিলেন। দুই তরুণ যখন তুচ্ছ কারণে একে অপরকে মারতে উদ্যত, মার্লে তখন মাঝখানে একটা ফুটবল ছুঁড়ে দিয়ে বলেছিলেন, “মারামারি করে কী হবে? একজন জেলে যাবে আর একজন কবরে। তার চেয়ে এসো ফুটবল মাঠে শক্তির পরীক্ষা দিই।”
জ্যামাইকার রাজনীতিতেও ফুটবলের এই ঐক্যবদ্ধ করার শক্তি তিনি ব্যবহার করেছিলেন। তার দেশের দুই ঘোর রাজনৈতিক শত্রু এডওয়ার্ড সিগা আর মাইকেল ম্যানলিকে তিনি এক মঞ্চে হাত মিলিয়ে দিয়েছিলেন। বব মার্লের শেষকৃত্যেও তারা পাশাপাশি দাঁড়িয়ে তাকে সম্মান জানিয়েছিলেন।
কিন্তু এই ফুটবলই একদিন তার জীবনের করুণ সমাপ্তির কারণ হয়ে দাঁড়াল। ১৯৭৭ সালে প্যারিসে এক প্রীতি ম্যাচ খেলার সময় মার্লের পায়ের বুড়ো আঙুলের নখ উপড়ে যায়। সাধারণ চোট ভেবে তিনি পাত্তা দেননি। কিন্তু পরে দেখা যায় সেখানে ক্যানসার বাসা বেঁধেছে। ফুটবল খেলার সময় পাওয়া চোটের সূত্রে রোগটি শনাক্ত হয়।
চিকিৎসকরা যখন তার আঙুল বা পা কেটে ফেলার পরামর্শ দেন, মার্লে তখন সাফ মানা করে দিয়েছিলেন। এর পেছনে তার ধর্মীয় বিশ্বাস যেমন ছিল, তেমনি ছিল ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা। তিনি ভেবেছিলেন, পা কেটে ফেললে তিনি আর কোনোদিন ফুটবল মাঠে দৌড়াতে পারবেন না বা স্টেজে নাচতে পারবেন না। এ জেদটাই শেষ পর্যন্ত তাকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়।
১৯৮১ সালের ১১ মে। মাত্র ৩৬ বছর বয়সে এই কিংবদন্তি মারা যান। জ্যামাইকায় যখন তাকে সমাহিত করা হয়, তখন তার কফিনে কয়েকটি প্রিয় জিনিস রাখা হয়েছিল- তার প্রিয় লাল গিবসন গিটার, বাইবেল আর একটি ফুটবল। তার কাছের বন্ধু গায়িকা রবার্টা ফ্ল্যাক সেই ফুটবলটি নিয়ে এসেছিলেন মার্লের শেষ যাত্রার সঙ্গী হিসেবে।
বব মার্লে মরেও বেঁচে আছেন ফুটবল ভক্তদের মনে। আজও নেদারল্যান্ডসের ক্লাব আয়াক্সের গ্যালারিতে হাজার হাজার মানুষ গলা ছেড়ে গায় তার সেই গান, ‘থ্রি লিটল বার্ডস’। ২০০৮ সালে কার্ডিফ সিটির এক ম্যাচে যখন দর্শকদের মধ্যে দাঙ্গা বাধার উপক্রম হয়েছিল, তখন স্টেডিয়ামের ডিজে মার্লের এই গানটি বাজিয়ে দিয়েছিলেন। মুহূর্তের মধ্যে দর্শকদের রাগ কমে যায় এবং তারা নাচতে শুরু করে।
মার্লে বলতেন, “ফুটবল মানেই স্বাধীনতা।” তার কাছে গান ছিল সাধনা আর ফুটবল ছিল পরম শান্তি। আজ কয়েক দশক পরেও যখন কোনো কিশোর ফুটবল নিয়ে মেঠোপথে দৌড়ায় কিংবা স্টেডিয়ামে মার্লের গান বাজে, তখন মনে হয় বব মার্লে আসলে হারাননি। তিনি বেঁচে আছেন ফুটবলের প্রতি ইঞ্চি ঘাসে আর মানুষের মনের সেই ‘ওয়ান লাভ’ গানের মতোই দর্শনে।
সূত্র: বিবিসি স্পোর্ট, ট্রিবিউনা ডটকম ও ফক্স স্পোর্ট।