ভ্রমণগদ্য
Published : 14 Nov 2025, 12:52 AM
আজ আমাদের নিয়ে আসা হলো মিনজু রোড। গতকাল গিয়েছিলাম ওয়ান্ডা প্লাজায়, হোটেলের কাছে। ওয়ান্ডা ছিল আমাদের যমুনা-বসুন্ধরার মতো। কিন্তু মিনজু ভিন্ন। মস্ত বড় জায়গা জুড়ে অবস্থান। চীনারা সম্ভবত খুব আশ্চর্যপ্রিয় জাতি। সবকিছুতেই সারপ্রাইজ। ঘুণাক্ষরেও ভাবিনি আজকের ফিল্ড ট্রিপে মিনজু রোডের মতো জায়গায় আসবো!
১৪ দিনের একটা প্রফেশনাল সেমিনারে চীনে এসেছি আমরা। যা কিছু হবে অর্থাৎ ক্লাস কিংবা ফিল্ড ভিজিট সবই সেমিনারের বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র করে হওয়ার কথা। সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু না। ভিজিটের নামে আমাদের নিয়ে যাওয়া হলো মিনজু রোড। অথচ সে কথা ওরা আগে স্পষ্ট করেনি। যখন শুনলাম মিনজু রোড, ভেবেছিলাম সেটা আবার কী? হবে হয়তো উচ্চ প্রযুক্তির কোনো লাইভস্টক ইন্ডাস্ট্রি। শহরের মাঝখানে তো আর বিরাট কোনো ফার্ম-টার্ম হবে না। যদিও আমাদের দেশে হয়, কিন্তু সেটা আদর্শ নয়।
তাই মিনজু রোডে পৌঁছে আমাদের চোখ ছানাবড়া। চৌরাস্তার মতো একটা জায়গা। চারদিকে সুউচ্চ ভবন। ভিড়ভাট্টাহীন। সুশৃঙ্খল ট্র্যাফিক। কিন্তু চক্ষু চড়কগাছ! যখন দেখলাম নামি-দামি সব ইলেকট্রনিক পণ্যের দোকান, চারদিক হাসছে তাদের বড় বড় বিলবোর্ড ।
আজ ছিল সেমিনারের তৃতীয় দিন। ক্লাস ছিল মাত্র একটি। তবে দীর্ঘ ৩ ঘণ্টার। দুপুর ১টায় লাঞ্চ। লাঞ্চের পর এক ঘণ্টার বিরতি শেষে আমরা সবাই হোটেলমুখে বাসে চড়ে বসলাম ফিল্ড ভিজিটের জন্য। নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছে প্রথমেই আমাদের একটা গ্রুপ ছবিতে বেঁধে ফেলা হলো।
তারপর ম্যানেজমেন্ট টিমের প্রধান এমি বলল, হ্যালো এভরিওয়ান! এটা হল মিনজু রোড। উরুমচির বিখ্যাত ইলেকট্রনিক মার্কেট। আপনারা এখানে ইচ্ছেমতো ঘুরতে পারেন। কেনাকাটা করতে পারেন। তবে ঠিক সাড়ে ছটায় মধ্যে ফেরত আসবেন। অপেক্ষায় থাকবে বাস। একদম দেরি করা যাবে না। এখানে বেশিক্ষণ বাস রাখা যায় না, পার্কিং নেই!
ঘোষণা শেষে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে আমরা এদিক ওদিকে ছড়িয়ে পড়লাম। প্রথমেই সামনের মোড় পার হয়ে একটা মার্কেটের নিচতলায় হুয়াওয়ে শোরুমে ঢুকে পড়লাম। চীনা মাল সস্তা। কথাটা যে ঠিক নয়, সেটা বোঝা গেল ওই শোরুমের পণ্যের আকাশচুম্বী দাম দেখে। এর আগে সেমিনারের প্রথম দিনই আমাদের প্রত্যেকের হাতে কর্তৃপক্ষ ১ হাজার ৫০ আরএমবি (বাংলাদেশি মুদ্রায় ১৮ হাজার ৭০০ টাকা) ধরিয়ে দিয়েছিল হাত খরচের জন্য। কিন্তু এখন তো দেখি ছোট একটা স্মার্ট ওয়াচেরই দাম এর চেয়ে বেশি!
ল্যাপটপ দেড়, দুই, আড়াই লাখ। কিংবা তারও বেশি। তাহলে উপায়? তবে একটা সুবিধা ছিল মিনজু রোডে। সব ব্র্যান্ডেরই গ্লোবাল ভার্সন পাওয়া যাচ্ছিলো সেখানে, যা আর আগের দিন ওয়ান্ডা প্লাজাতে ছিল না। ওয়ান্ডা প্লাজার সব ইলেকট্রনিক পণ্য ছিল ডমেস্টিক ব্যবহারের জন্য। তাহলে চীনের বাইরে থেকে আসা পর্যটকদের উপায়? তারা কেনাকাটা করবে কোথায়? অবশেষে আজ তার উত্তর পাওয়া গেল। মিনজু রোড বিদেশি পর্যটকদের জন্য ইলেকট্রনিক পণ্য কেনার যুতসই স্থান।
হাল আমলের প্রযুক্তি পণ্য দেখে দেখে একসময় ক্লান্ত বোধ করছিলাম। মনে হলো, এখন বাইরে দৃষ্টি দেওয়া দরকার। আর কত কেনাকাটা! চীনে এসে যদি দোকানে দোকানে সময় চলে যায়, তাহলে আশপাশটা দেখবো কখন? তাছাড়া যেসব ব্র্যান্ড দেখা যাচ্ছে সবই তো আমাদের চেনা। বাংলাদেশেই পাওয়া যায়। হুয়াওয়ে, অ্যাপল, ভিভো, লাভা, শাওমি ইত্যাদি। তাহলে আর এখানে কেন? বোঝা বয়ে দেশে নিয়ে গিয়ে লাভ কী?
কিন্তু অনেকে সে কথা মানতে নারাজ। এরা ঠিকই বলে, ওসব ব্র্যান্ড আমাদের দেশেও পাওয়া যায়। কিন্তু এগুলো জেনুইন। দেশেরগুলো অরিজিনাল না। লো-কোয়ালিটির। তাই দামও কম। এছাড়া বাংলাদেশ থেকেই অনেকে টার্গেট করে এসেছে যে চীন থেকে মোবাইল-ল্যাপটপ কিনে নিয়ে যাবে। তাই তাদের ছেড়ে দিতে হলো। আমি রাস্তা পেরিয়ে বিপরীত দিকে ফুটপাত ধরে সামনে এগিয়ে গেলাম।
উরুমচিতে আজ আমাদের চতুর্থ দিন। ফুটপাতের ধারে রাস্তা ঘেঁষে একটা বেঞ্চিতে বসে বসে ভাবছি। এর মধ্যে তিনটা মার্কেট ঘোরার সুযোগ হয়েছে। গ্র্যান্ডবাজার, ওয়ান্ডা প্লাজা আর আজ এই মিনজু রোড। কিন্তু আশ্চর্য! কোনোটার সঙ্গে কোনোটার মিল নেই। এই জায়গাটা অনেকটা আমাদের দেশের বেইলি রোডের মতো। শুধু ইলেকট্রনিকই নয়, অন্যান্য পণ্যও আছে। গার্মেন্টস, জুতো, জ্যাকেট ও ব্লেজার ইত্যাদি। সারিবদ্ধ দোকান। ক্রেতা অপ্রতুল। উন্মুক্ত ফুটপাতে ঢিমেতালে চলাফেরা। বিভিন্ন বয়সের মানুষজন আছে, কারও ভেতর কোনো তাড়া নেই, কৌতূহল নেই। মনে হয় রোজকার হাঁটাপথে তারা চলছে।

মনে প্রশ্ন জাগে, তাহলে এই যে দোকানপাট, বিশাল বিশাল শো রুম, এতো স্বল্প ক্রেতায় ওদের ব্যবসা টেকে কী করে? এই প্রশ্নটা ওয়ান্ডা প্লাজাতেও মনে হয়েছিল। ছয়তলা ওয়ান্ডাতেও ক্রেতা ছিল হাতেগোনা। যার উপরের তিনটি ফ্লোরই শিশুদের বিভিন্ন ইনডোর গেম আর খাবারের দোকান। সেখানেও তেমন ভিড় চোখে পড়েনি। তাহলে এর রহস্যটা কী? পরে অবশ্য এই রহস্যের জট খুলেছিল, যখন সন্ধ্যায় ক্যাফেতে বসে আমাদের ম্যানেজমেন্ট টিমের মেম্বার উইঘুর যুবক সালাম বলেছিল, চীনে বেশিরভাগ কেনাকাটা চলে অনলাইনে। এসব দোকান মূলত ডিসপ্লে সেন্টার। সবার উইচ্যাট অ্যাপ আছে।
এসব কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ চোখে পড়ল সহকর্মী কামরুল হাসান ফুটপাত ধরে এদিকে এগিয়ে আসছেন। হঠাৎ ফুটপাতের ধারে বেঞ্চিতে আমাকে বসা দেখে সে প্রসন্ন হয়ে উঠেন, আরে লেনিন ভাই আপনি এখানে? একা একা কী করেন? আমি তাকে বেঞ্চির ফাঁকা অংশ ইশারা করে বলি, বসেন। কামরুল হাসান উত্তর দিল, এই একটা বিষয় ভাই আপনার সঙ্গে আমার মিলে গেল। সবসময় ভেড়ার পাল হয়ে থাকতে ভালো লাগে না। তাই দলছুট হয়ে হঠাৎ হারিয়ে যাই।
আমি মুচকি হাসলাম। তারপর বললাম, চলেন আশপাশটা ঘুরে দেখি। ‘চলেন...’ বলে কামরুল উঠে পড়লো। সামনে কিছুটা এগিয়ে হঠাৎ ডানদিকে বাঁক নেওয়া একটা গলিতে আমরা ঢুকে পড়লাম। আমাদের দেশে যেমন অনেক মার্কেটের পাশের গলিতে বিভিন্ন খাবারের ছোট দোকান থাকে, ক্লান্ত ক্রেতারা তুলনামূলক কম দামে চা-নাস্তা-খাবার খায়, চীনে দেখলাম একই ব্যবস্থা। নিরিবিলি শান্ত গলিতে বিভিন্ন খাবারের দোকান। উরুমচিতে ভেড়ার মাংস বেশ জনপ্রিয়। ভেড়ার শিক কাবাব, পুলি, নান ও বিরিয়ানি- অসাধারণ।
আমরা হাঁটছি আর রাস্তার দু’ধার থেকে মাংসের মৌ মৌ সুঘ্রাণ আসছিল। সেই ভোজন উত্তেজক টানা গলি পার হয়ে আমরা একসময় তিন রাস্তার মাথায় এসে দাঁড়ালাম। বামে বিপনি বিতান। বড়। ডানে সুপরিসর ফুটপাত। ঝিরঝির বাতাস। আমরা ফুটপাত ধরে হাঁটা শুরু করি, বাঁধানো হাঁটাপথ। পথ প্লাস পার্ক! জায়গায় জায়গায় কারুকার্যখচিত লোহার বেঞ্চ। মাঝারি উচ্চতার বৃক্ষ। ধিকিধিকি পত্রপল্লব, ঝরা পাতা, ছায়াময় পরিবেশ।
হাঁটতে হাঁটতে ভাবতে থাকি, পৃথিবীর কোথায় চলে এসেছি! অপরিচিত এক শহর! ফুটপাত! সুনসান। কোনোদিন কি ভেবেছিলাম এমন একটা ঘটনা ঘটবে? বিপুলা এই পৃথিবীর এমন অপরিচিত কোন এক শহরের বাঁধানো ফুটপাতে ঝিরঝির হিম বাতাসে এক বিকেলে আমরা হাঁটবো?
ফুটপাত ধরে সামনে এগিয়ে যাচ্ছি আর চোখে পড়ছে পাশে সারিবাঁধা দোকান। ছোট ছোট, নিরিবিলি। তিন চার ধাপ সিঁড়ির উপর। বাঁ পাশে নির্লিপ্ত রাস্তা। রাস্তায় ধীর যানবাহন। তারপর গুরুগম্ভীর ভবনের সারি ওপারে, নির্বিকার।
হঠাৎ কামরুল দাঁড়িয়ে পড়লেন। আমি চমকে জিজ্ঞেস করলাম, কী হলো? ভাই চলেন ওই দোকানটায় ঢুকি। আম্মার জন্য একটা শীতের কাপড় কিনতে হবে। তারপর অপরিসর কিন্তু ট্র্যাডিশনাল ওসব দোকানগুলো থেকে কিছু কেনাকাটা হলো। সোয়েটার, হ্যান্ডব্যাগ, মানিব্যাগ, লোশন ও ফেসওয়াশ ইত্যাদি। কিছুটা দামাদামি করা গেল। কেনাকাটার ভাষাটা অবশ্য আমরা রপ্ত করেছিলাম আগেই, ওই গ্র্যান্ডবাজার থেকে। ক্যালকুলেটর ভাষা! ক্যালকুলেটরের ডিজিট চেপে চেপে দামাদামি।
কেনাকাটা শেষে ফের ফুটপাত ধরে হেঁটে ডানে সামনের বাঁকে আসতেই ডিসকাউন্টের একটা বড়সড় দোকান চোখে পড়লো। আহ! এতক্ষণ তো এরকম একটা দোকানই খুঁজছিলাম। কিছু ডিসকাউন্ট পাওয়া যাবে। যদিও টিম লিডার মুকুল স্যার আমাদের সাবধান করে বলেছিলেন, সস্তা জিনিস খুঁজবেন না। পরে সস্তার তিন অবস্থা হবে। তাই কেনাকাটা না করলেও কৌতূহলবশত ওই দোকানে আমরা ঢুঁ দিলাম। দেখলাম হ্যান্ডব্যাগ, ট্রলি, জুতো, জ্যাকেট, ব্যাকপ্যাক ও কসমেটিকসের পসরা। ডিসকাউন্টে দামও কম। কিন্তু সময় নেই, ঘড়িতে বাজে সাড়ে ছয়টা। তাই কামরুলকে টেনে দ্রুত পা চালিয়ে মিনজু রোডে পৌঁছে অপেক্ষমাণ বাসে চড়ে বসতেই সেটা ছুট দিল হোটেল অভিমুখে।
দুই একটা এভিন্যু-রাস্তা পার হয়ে বাসটা একসময় এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়েতে উঠলো। শোঁ শোঁ শব্দে ৭০-৮০ ফুট উপর দিয়ে শহরের বুক চিরে আমরা ছুটছি। সবার দৃষ্টি বাইরে। ঘড়িতে ৭টা কি সাড়ে সাতটা। পড়ন্ত বিকেলের ম্লান আলো। একটু পরই সন্ধ্যা। বাংলাদেশে এখন কী? সহস্র মাইল দূরে, ওই নীল আকাশের নিচে। একে একে দৃশ্যরা আসছে, হারিয়ে যাচ্ছে। অদ্ভুত এক খেলা। সেই খেলায় নিমগ্ন আমরা সবাই। নির্বাক ঘোর। স্বপ্ন নাকি! নাকি ফ্লাইং সসার! ঘুরতে এসেছি দূর কোনো গ্রহ থেকে।
পাশ থেকে কেউ ‘হায়’ বললে চোখ ফিরিয়ে দেখি সালাম। সব তদারকি করে কখন যে পেছনে এসে বসেছে! তাকে ইশারা করে আমার পাশের সিটে বসার আমন্ত্রণ জানালাম। স্মিতমুখে সে এসে বসলে আমি প্রশ্ন করলাম, আচ্ছা সালাম, চীনের এই পরিবর্তনের মূল কারণ কী? হা হা করে সালাম হাসলো। বাইদো অ্যাপে সে বললো, আরে এতো প্রশ্ন কেন? বিদেশ এসেছো, দেখো, মজা করো।
আমি বললাম, শোনো আমাদের দেশে একটা কথা আছে, জ্ঞান অর্জনের জন্য সুদূর চীনে যাও। সুতরাং জ্ঞান তো কিছু ঝোলাতে ভরতেই হবে। আবার সালাম হাসে। তবে এবার নিঃশব্দ। তারপর একটা লিংক শেয়ার করে বলে, নাও পড়ো। চৈনিক জ্ঞান! হা হা হা..
চলবে...