Published : 07 Jul 2025, 02:06 PM
রবার্ট ক্লাইভ, ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অন্যতম আলোচিত চরিত্র, ইতিহাসের মঞ্চে এক দ্বৈত সত্তার প্রতীক। কখনও তিনি লোভী লুটেরা, সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্রী, আবার কখনও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার সাহসী সংস্কারক। তাহলে আমরা কার কথা বিশ্বাস করব? কেননা তাকে নিয়ে লেখা ইতিহাস এতই পরস্পরবিরোধী।
এই দ্বৈত চিত্রের আলোচিত ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন ঐতিহাসিক ও ঔপনিবেশিক রাজনীতিক থমাস ম্যাকাওলে, ১৮৫১ সালে তার একটি দীর্ঘ প্রবন্ধে। তিনি লিখেছিলেন, “ক্লাইভ, যার ভেতরে প্রবল আবেগ ছিল এবং যিনি প্রবল প্রলোভনের মুখোমুখি হয়েছিলেন, তিনি অনেক বড় ভুল করেছিলেন। কিন্তু যে কেউ ন্যায্য ও প্রজ্ঞাময় দৃষ্টিতে তার পুরো জীবনকে দেখবে, তাকে স্বীকার করতেই হবে, আমাদের এই দ্বীপ, যা বহু বীর ও রাষ্ট্রনায়কে পূর্ণ, তবু খুব কম সংখ্যক মানুষই অস্ত্রে ও পরামর্শে ক্লাইভের মতো মহান হয়েছেন।”
ক্লাইভের সুনাম যুগে যুগে পাল্টে গেছে। কখনও ঔপনিবেশিকদের চোখে, কখনও জাতীয়তাবাদীদের, কখনও ব্রিটিশদের দৃষ্টিতে, কখনও ভারতীয়দের। তাহলে আমরা কেন আজও তাকে নিয়ে ভাবি? হয়তো কারণ ক্লাইভ, ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি, পশ্চিমা সাম্রাজ্য বিস্তারের গৌরব ও দুর্বলতার প্রতীক হয়ে আছেন।
তিনি জন্মেছিলেন এক সাধারণ বংশে, এতিম হিসেবে বড় হয়েছেন মামা-মামির আশ্রয়ে। হয়তো অতিরিক্ত আদরে তিনি ছেলেবেলায় হয়ে উঠেছিলেন জেদি ও ঝগড়াটে। ইতিহাসবিদ ম্যাকাওলের মতে, এমনকি গ্রামের দোকানদারদের জানালা ভাঙার হুমকি দিয়ে মুক্তিপণ আদায় করতেন। বড় হয়ে তাকে বর্ণনা করেছিলেন লেখক হোরেস ওয়ালপোল, “অত্যন্ত বিশ্রী চেহারার এক মানুষ”।
ক্লাইভের শুরুটা হয়েছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির একজন সাধারণ কেরানি হিসেবে মাদ্রাজে। তবে সে সময়ই তার জীবনের এক বিখ্যাত গল্প, যদিও অনেকেই একে বানানো মনে করেন, তার আত্মহত্যার চেষ্টা। ম্যাকাওলে বলেন, “তিনি যখন নিশ্চিত হলেন তার পিস্তলে গুলি আছে, তখন হঠাৎ বলে উঠলেন, নিশ্চয়ই তার জন্য কোনো মহৎ কাজ অপেক্ষা করছে।”
পরবর্তীতে ক্লাইভ সেনাবাহিনীতে যোগ দেন, যদিও তার ছিল না কোনো আনুষ্ঠানিক সামরিক শিক্ষা। তিনি স্থানীয় সিপাহিদের সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে অংশ নিতেন, তাদের দুঃখ-দুর্দশায় শরিক হতেন, এবং এ কারণেই সেনাদের মধ্যে তিনি জনপ্রিয় ছিলেন। মাত্র ২৬ বছর বয়সে ক্লাইভ এক গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধ জিতে নেন, চন্দা সাহেবের রাজধানী আরকট দখল করে রাখেন, এবং ফরাসি বাহিনীর অবরোধ প্রতিহত করেন। তার সাহস ও কৌশল পুরো যুদ্ধের গতিপথ পাল্টে দেয়।

এই সময়ে তার দেহে প্রথমবার দেখা দেয় মানসিক ও শারীরিক রোগ। আজকের দৃষ্টিতে হয়তো একে ‘বাইপোলার ডিসঅর্ডার’ বলা যায়। তিনি কিছুদিনের জন্য ইংল্যান্ডে ফিরে যান, যেখানে তাকে ‘জাতীয় বীর’ হিসেবে অভ্যর্থনা জানানো হয়।
১৭৫৫ সালে, ক্লাইভ আবার ভারত ফিরে আসেন। এবার তিনি কর্নেল পদে উন্নীত এবং মাদ্রাজের উপ-গভর্নর। তখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ফরাসিদের সঙ্গে কর্তৃত্বের লড়াইয়ে ব্যস্ত। তবে ক্লাইভকে পাঠানো হয় বাংলায়, কারণ কোম্পানির কলকাতা ঘাঁটি দখল করে নিয়েছেন নবাব সিরাজউদ্দৌলা, যিনি তখন ফরাসিদের সঙ্গেও মিত্রতা করছেন।
সেসময় সবচেয়ে প্রভাবশালী ছিলেন জগৎ শেঠ পরিবার, যারা নবাবের রাজস্বের দুই-তৃতীয়াংশ নিয়ন্ত্রণ করত এবং বছরে ৪০ লাখ টাকা উপার্জন করত। এছাড়াও ছিলেন নবাবের দেওয়ান রায় দুর্লভ, শিখ ব্যবসায়ী ও জমিদার উমিচাঁদ এবং হুগলির ফৌজদার, ব্রাহ্মণ নন্দকুমার। এসব স্থানীয় নেতারা চেয়েছিলেন নবাব সিরাজের জায়গায় এমন কাউকে বসাতে, যিনি কোম্পানি ও তাদের ব্যবসায়িক স্বার্থের প্রতি সহানুভূতিশীল হবেন। কারণ সিরাজের কারণে কোম্পানির বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। অনেকে বলেন, সিরাজের দরবার, যেখানে মূলত তুর্কি, আরব, ইরানি ও আফগান মুসলিমরাই ছিল, সেটিও ততটাই বিদেশি ছিল বাঙালিদের জন্য, যতটা ইউরোপীয়দের উপস্থিতি।
১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধ, ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের সূচনাবিন্দু হিসেবে পরিচিত, আসলে ছিল খুবই ক্ষীণ এক সংঘর্ষ। সিরাজের বিশাল বাহিনী যুদ্ধের সময় নিষ্ক্রিয় থাকে, কারণ সেনাপতি মীরজাফর ক্লাইভের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ ছিলেন। ফলে নবাবের সেনা ভেঙে পড়ে, আর ক্লাইভ বিজয়ী হন। এই যুদ্ধে ক্লাইভের প্রাপ্ত লুটের অংশ ছিল ২ লাখ ৩৪ হাজার পাউন্ড (আজকের হিসেবে প্রায় ৩২ মিলিয়ন পাউন্ড)। তিনি নবাবের উপদেষ্টাদের অতিরিক্ত ঘুষ প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। ম্যাকাওলে লিখেছিলেন, “যদিও আমরা মনে করি তার এইভাবে কিছু নেওয়া উচিত ছিল না, তবুও তাকে কৃতিত্ব দিতে হয়, তিনি অনেক কম নিয়েছিলেন।”
পরে ক্লাইভ নিজেই হাউস অব কমন্সের এক কমিটির সামনে বলেছিলেন, তিনি নিজেই অবাক হন যে, এত সুযোগের মাঝেও তিনি নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, “হিন্দু ধনকুবেররা ও অন্যান্য সম্পদশালীরা আমাকে অনেক প্রস্তাব দিয়েছিল… আমি চাইলে কোটি কোটি টাকার মালিক হতে পারতাম। কিন্তু ইংরেজ জাতির সুনাম, নবাবের স্বার্থ আর কোম্পানির মঙ্গলকে আর্থিক লাভের চেয়ে বেশি মূল্য দিয়েছি।”
পলাশীর বিজয়ের পর ক্লাইভ বাংলার গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেন এবং তিন বছর এই পদে থাকেন। এই প্রথম শাসনকালের উল্লেখযোগ্য দিক ছিল, তিনি নবনিযুক্ত নবাব মীরজাফরের অন্যায় অত্যাচার থেকে হিন্দু উচ্চপদস্থদের রক্ষা করেছিলেন। বিহারের উপদেষ্টা রাম নারায়ণ তো কৃতজ্ঞতায় ক্লাইভকে তুলনা করেছিলেন ‘খ্রিস্টের’ সঙ্গে।

তবে এই সময়েই ক্লাইভ নিজের দেশের লোকদের লোভ ও দুর্নীতির প্রতি বেশ সহনশীল ছিলেন। কোম্পানির অনেক কর্মকর্তা নিজেদের জন্য অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের একচেটিয়া অধিকার দখল করে নিয়েছিলেন, যা নবাবের কোষাগার খালি করে দিয়েছিল এবং কোম্পানির বিদেশি বাণিজ্যও হুমকির মুখে পড়ে।
এই শাসন ব্যবস্থাকে বলা হয় ‘দ্বৈত শাসন’। মুঘল সম্রাট ও তার প্রতিনিধি নবাব ছিলেন নামেমাত্র শাসক, কিন্তু আসলে রাজস্ব আদায় ও বিচার ব্যবস্থা কোম্পানিরই হাতে ছিল। কারণ, তখন কোম্পানির নিজস্ব প্রশিক্ষিত প্রশাসক ছিল না। ক্লাইভকে কোম্পানির পরিচালকরা লিখেছিলেন, “আপনি হয়তো ভুলেই গেছেন যে আমরা ব্যবসায়ী, আর আমাদের প্রধান উদ্দেশ্য বাণিজ্য…।”
তবে এই সময় বাংলার অর্থনীতি ভেঙে পড়ে। প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, স্থায়ী ব্যবসায়ীদের সরিয়ে দিয়ে ইংরেজ কর্মচারীদের স্থানীয় গোমস্তাদের মাধ্যমে বাণিজ্য ইত্যাদি কারণে। ম্যাকাওলে পরে লিখেছিলেন, “কোম্পানির কর্মচারীরা প্রায় পুরো অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য দখল করে নিয়েছিল। তারা দেশীয়দের জিনিস বেশি দামে কিনতে ও কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য করত। পুলিশ, আদালত, সব জায়গায় তাদের প্রভাব ছিল। এমনকি এক ব্রিটিশ কর্মচারীর চাকরও কোম্পানির মতোই ভয় জাগাতো।”
তবে ক্লাইভের পক্ষে বলা যায়, তার নেতৃত্বে কোম্পানি এক অপ্রত্যাশিত রাজনৈতিক ক্ষমতার মুখোমুখি হয়েছিল, যার জন্য প্রস্তুতি ছিল না। ১৭৫৯ সালে তিনি ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী পিট দ্য এল্ডারকে একটি চিঠিতে লিখেছিলেন, তিনি চাইলে নিজেই নবাব হতে পারতেন, কিন্তু তার মনে হয় এই দায়িত্ব কোম্পানির বদলে ব্রিটিশ রাজকোষের হাতে থাকা উচিত।
ঐতিহাসিকদের মতে, ক্লাইভের ইংল্যান্ড প্রত্যাবর্তনের পরই কোম্পানির সবচেয়ে বড় অপব্যবহার শুরু হয়। ক্লাইভ এই বিশৃঙ্খলা মেনে নিতে পারেননি, কিন্তু তার শাসনের সময় ছিল খুবই কম, আর তার মন তখনও ওয়েস্টমিনস্টারের দিকে। বাংলাকে তুলনা করা হয়েছিল একটি ‘পাকা আমের’ সঙ্গে, যা ‘ইংল্যান্ডের কোলের ওপর পড়ে গিয়েছিল, যখন সে ঘুমাচ্ছিল।’
১৭৬০ থেকে ১৭৬৫ সাল, এই পাঁচ বছর ক্লাইভ ছিলেন ইংল্যান্ডে। এই সময় কোম্পানির শাসনে চরম বিশৃঙ্খলা, লোভ, দুর্নীতি ও ক্ষমতার দখলবাজি দেখা যায়। ক্লাইভ তখন ব্রিটেনে নিজের জাগিরের স্বীকৃতি আদায়ের জন্য লড়াই করছিলেন। এই জাগির ছিল বছরে ২৩ হাজার পাউন্ডের আয় (আজকের হিসেবে প্রায় ৩ মিলিয়ন পাউন্ড), মীরজাফর তাকে উপহার দিয়েছিলেন, আর মুঘল সম্রাট তাকে ‘মনসবদার’ উপাধিতে ভূষিত করেছিলেন।
লন্ডনে ফিরে ক্লাইভ রাজা ও প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে পুনরায় সাদরে গ্রহণ পেলেন। সামরিক ক্ষেত্রে তার খ্যাতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে জর্জ তৃতীয় রাজা বলেছিলেন, “যদি কেউ যুদ্ধশিক্ষা নিতে চায়, তাহলে সে ক্লাইভের কাছে যাক।” পিট দ্য এল্ডারও তাকে সংসদে বর্ণনা করেছিলেন ‘স্বর্গপ্রদত্ত জেনারেল’ হিসেবে।

তার ভারতীয় জাগির ও এর আয় তাকে ধনী এবং রাজনৈতিকভাবে নিরাপদ করে তুলেছিল। তিনি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ১৭৬১ সালে, নিজের অনুগত সাতজন সংসদ সদস্যের একটি গোষ্ঠী নিয়েই। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ‘কোর্ট অব প্রোপ্রাইটরস’-এও তিনি বিশাল প্রভাব বিস্তার করেন। তিনি কোম্পানির শেয়ার কিনে বিভিন্ন বন্ধুদের নামে ভাগ করে দিয়েছিলেন, যাতে ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পান এবং তার জাগির অনুমোদন পায়।
এই সময়ে, বাংলায় এক নতুন নবাব, মীর কাসিম, কোম্পানির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যান এবং তার নেতৃত্বে আওধের নবাব ও মুঘল সম্রাট শাহ আলম একটি জোট গঠন করেন। বাংলায় পরিস্থিতি আবারও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। কোম্পানি তখন ক্লাইভকেই আবার ভারত পাঠাতে চায়। ক্লাইভ রাজি হন, এক শর্তে—কোম্পানির সবচেয়ে ক্ষমতাধর চেয়ারম্যান লরেন্স সালিভানকে সরাতে হবে। কোম্পানির সভায় সেই সিদ্ধান্ত হয়, আর ক্লাইভ প্রতিশ্রুতি দেন, এইবার তিনি আর কোনো অর্থ বা উপহার গ্রহণ করবেন না।
বাংলায় দ্বিতীয়বার এসে ক্লাইভ দেখলেন, সিংহাসন আর রাজনীতি লুটেরাদের হাতে পড়েছে। মীরজাফরের মৃত্যুর পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কয়েকজন কর্মকর্তা নবাবের কিশোর পুত্রকে গদিতে বসাতে গিয়ে বিপুল ঘুষ নিলেন। হতবাক ক্লাইভ লিখলেন, “আহা! ইংরেজ নামটি আজ কোথায় এসে ঠেকেছে! দুর্নীতির এ ছায়া আমি সরাবই, না হয় এতে ধ্বংস হব।”
কলকাতায় ফেরার পথে তিনি আরেক চিঠিতে লেখেন, “এ যেন হেরাক্লিসের সেই গোয়ালঘর; সবখানে নোংরামি, সীমাহীন লোভ, বিলাসিতার নেশা, মুহূর্তে ধনী হওয়ার পাগলামি।” সেই শুরু হয় তার এক নতুন যুদ্ধ, পলাশীর যুদ্ধের চেয়ে কঠিন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে। কোম্পানির কর্মীদের উপহার ও ব্যক্তিগত বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা জারি করেন। যদিও জানতেন, কম বেতনের এই কর্মকর্তাদের দুর্নীতি থেকে ফিরিয়ে আনা কঠিন।
সমাধান খুঁজলেন কৌশলে। লবণের ব্যবসা একচেটিয়া করে সেখান থেকে আয় দিয়ে বেতন বাড়ালেন, যাতে তারা ঘুষে না জড়ায়। নিজে উপহার ফেরত দিয়েছেন, রত্ন না নিয়েই ফিরেছেন। এমনকি মীরজাফরের উইলে নিজের নামে যে বিপুল অর্থ রাখা ছিল, সেটাও কোম্পানির তহবিলে দেন যুদ্ধাহতদের জন্য।
এরপর ঘটে বক্সারের যুদ্ধ, যেখানে মুঘল সম্রাট শাহ আলম ক্লাইভকে ‘দিওয়ানি’ দেন, অর্থাৎ বাংলার রাজস্ব আদায়ের পূর্ণ অধিকার। কোম্পানি হয়ে ওঠে বাংলার প্রকৃত শাসক। তবুও ক্লাইভ সম্রাটের প্রভুত্ব স্বীকার করেন, নিজেকে সাজান মুঘল উপাধিতে।
কিন্তু দ্বিতীয় গভর্নরশিপ দীর্ঘ হয়নি। শারীরিক ও মানসিক অবসাদে তিনি পদত্যাগ করেন। স্বপ্ন ছিল ব্রিটিশ পার্লামেন্টে মর্যাদা পাওয়ার, কিন্তু ইংল্যান্ডে ফিরে দেখলেন, তার বিরুদ্ধে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক অপবাদ আর বিদ্বেষ। যাদের বিরুদ্ধে তিনি লড়েছিলেন, তারাই এবার অভিযোগ এনেছেন, “যেসব অপরাধের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছি, সেগুলোই আজ আমার নামে লেখা হচ্ছে,” আক্ষেপ করেন ক্লাইভ।
তাকে দায়ী করা হয় সবকিছুর জন্য। বাংলার দুর্ভিক্ষ, বিলাসিতা, এমনকি দর্জির কাছে অর্ডার করা শার্ট নিয়েও ব্যঙ্গ চলে। তিনি হয়ে ওঠেন ‘বলির পাঁঠা’, যিনি দুর্নীতির প্রতীক নন, বরং সেই দুর্নীতির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় কণ্ঠ ছিলেন। তবুও তিনি পার্লামেন্টে নির্বাচিত হন, সিলেক্ট কমিটিতে কোম্পানির অব্যবস্থা তদন্তে কাজ করেন। সেখানেও জেরায় জর্জরিত হয়ে বলেন, “আমাকে যেন এক ছাগল চোরের মতো জেরা করলো।”
তবে অভিযোগের বেশিরভাগ থেকে তিনি মুক্তি পান। তার কাজের ভিত্তিতেই প্রতিষ্ঠিত হয় গভর্নর জেনারেলের পদ, আরোপ হয় কোম্পানির ওপর নিয়ন্ত্রণ, উপহার ও ব্যক্তিগত বাণিজ্যে নিষেধাজ্ঞা। এই আইনের পক্ষে ক্লাইভ যে ভাষণ দেন, সেটি সংসদে এক ঐতিহাসিক বক্তৃতা হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকে। প্রবীণ নেতা পিট দ্য এল্ডার বলেন, “এটি হাউস অব কমন্সে শোনা সেরা ভাষণগুলোর একটি।”
তবুও, ইতিহাস এক নির্মম পরিহাস। যিনি শাসন গড়েছিলেন, তিনিই হয়েছিলেন শাসনের যাঁতাকলে পিষ্ট। তিনি ছিলেন এক দ্বন্দ্বময় চরিত্র। একদিকে সাহসী সেনাপতি, অন্যদিকে অপবাদে বিদ্ধ শাসক। একদিকে শাসনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনকারী, অন্যদিকে ইংরেজ লোভের মুখ। একদিকে দুর্নীতিবিরোধী সংস্কারক, অন্যদিকে এক অকাল বিসর্জিত নায়ক।
আজও প্রশ্ন রয়ে গেছে, ক্লাইভ কি লোভী সাম্রাজ্যবাদী ছিলেন? নাকি সময়ের সেই দুর্ভাগ্যজনক নায়ক, যিনি ইতিহাসের কেন্দ্রবিন্দুতে দাঁড়িয়ে এক নতুন শাসনের পথ দেখিয়েছিলেন? হয়তো ইতিহাস এখনো তার উত্তর খুঁজে বেড়াচ্ছে।
সূত্র: হিস্টরি রিক্লেইম্ড ডট কো ডট ইউকে-এ প্রকাশিত ব্রিটিশ-ভারত বিষয়ে নিবন্ধক, ইতিহাসবিদ ও সাংবাদিক জারির মাসানির একটি প্রবন্ধ থেকে সংক্ষেপিত।