ভ্রমণগদ্য
Published : 17 Dec 2025, 12:07 AM
মেয়েটার কী নাম ছিল? ট্যাক্সিতে চড়ে হোটেলে ফেরার পথে কথাটা বার বার মনে পড়ছিল। কেমন স্নিগ্ধ, পরোপকারী একটা মেয়ে! ওই মেয়েটার সঙ্গে আজ দেখা হয়েছিল আমরা এক বিপদে পড়ার পর।
হংগুয়াংশান সোনালি বুদ্ধমূর্তির প্রধান ফটক বন্ধ হয়ে গেলে আমরা নেমে এসেছিলাম মূল অ্যাভিনিউ সড়কে। কুভিয়ান এনসিয়েন্ট সিটির সামনে দিয়ে, আলো-আঁধারি পাহাড়ি ঢালু পথ বেয়ে। নিচে এসে দেখি, চতুর্দিকে সব আকাশচুম্বী ভবন দাঁড়িয়ে আছে। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে যেন অবাক দৃষ্টিতে আমাদের দেখছে। তারপর মাথা নুয়ে কপাল কুঁচকে যেন জিজ্ঞেস করছে, কারা তোমরা? কোথা থেকে এসেছো?
ছয় জনের দল ছিলাম আমরা। আমি, মুকুল স্যার, ইমরুল হাসান রাসেল, নাজিম উদ্দীন শেখ, জাহিরা ইসলাম ও মো. আশরাফুজ্জামান। এর মধ্যে মুকুল স্যার বললেন, “দাঁড়ান, দেখি কাছাকাছি বিআরটি স্টেশন কোথায় আছে। আজ আমরা ট্যাক্সিতে যাব না, বিআরটি বাসের অভিজ্ঞতা নেব।” রাসেল লাফিয়ে উঠে বলল, “ওয়াও! ঠিক সিদ্ধান্ত স্যার। বিআরটিটা এক্সপ্লোর করা দরকার।”

বিআরটি বাস এই শহরে আর এক বিস্ময়। হরেক রঙের বাস। ছোট, বড় কিংবা জোড়া লাগানো (আর্টিকুলেটেড)। শহরজুড়ে তাদের নেটওয়ার্ক। বিভিন্ন সড়ক-উপসড়কে সারাক্ষণ ছুটে চলে এগুলো। উরুমচি আসার পর পরই আমাদের চোখে পড়েছিল ওই শব্দহীন, ধোয়াহীন, পরিবেশবান্ধব গণপরিবহন। শুনেছি ভাড়াও নাকি খুব কম। মাত্র ১ আরএমবি (বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ১৭ টাকা ৮০ পয়সা) খরচ করে শহরের যে কোনো গন্তব্যে যাওয়া যায়। সুতরাং আজই মোক্ষম সময় ওই বিআরটি ভ্রমণের।
কিন্তু বিআরটি স্টেশন কোথায়? প্রশ্নটা মাথায় আসতেই চট করে পকেট থেকে মোবাইল বের করে অ্যাপল ম্যাপ চালু করলাম। চীনে সরাসরি গুগল ম্যাপ কাজ করে না, ‘গ্রেট ফায়ারওয়াল’ দিয়ে ব্লক করা আছে। তবে চীনাদের নিজস্ব বাইদু বা এম্যাপ আছে। কিন্তু সেখানে ভাষাগত কিছু জটিলতা থাকায় আইফোন ব্যবহারকারীরা চীন ভ্রমণে ম্যাপ ব্যবহারে বাড়তি সুবিধা পান। যাই হোক, ম্যাপে দেখা গেল অনতিদূরেই একটা বিআরটি স্টেশন আছে। ফুটপাত ধরে সোজা গিয়ে বামে মোড় নিলেই সেটির অবস্থান।
দেরি না করে আমরা ম্যাপ ধরে হাঁটা শুরু করলাম। নিরুদ্দেশ দৃষ্টি ফেলে হাঁটতে হাঁটতে হঠাৎ মনে প্রশ্ন এলো, আচ্ছা, ‘দ্য ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট’ (ইআইইউ) প্রতিবছর পৃথিবীতে বসবাস উপযোগী যে সেরা শহরগুলোর তালিকা প্রণয়ন করে, সেখানে কি উরুমচি আছে? কই, চীনের কোনো শহরের কথা তো কখনও কানে আসেনি! অথচ গ্র্যান্ড বাজার, রেড হিল, হংশান, কুভিয়ান, হংগুয়াংশান দেখে তো আমরা মুগ্ধ! উরুমচির ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, পরিবেশ, অবকাঠামো ও নিরাপত্তা আমাদের বিস্মিত করে চলেছে প্রতিদিন! ইশ! মনে আফসোস হয়, ‘যদি আমাদের ঢাকাটা এমন হতো!’

সিগন্যাল মেনে রাস্তা পার হয়ে বিআরটি স্টেশনে পৌঁছাতেই দুইজন নিরাপত্তাকর্মীর মুখোমুখি হলাম আমরা। নিরাপত্তাকর্মী দু’জন মাঝারি উচ্চতার। গায়ে কালো ইউনিফর্ম, পায়ে কালো বুট জুতো। মাথায় সাদা হ্যাট। হ্যাটের নিচে ধূসর ছোট ছোট চোখ। চোখে প্রশ্ন, “কোথায় যাবেন?” আমরা তাদের হোটেলের কার্ড প্রদর্শন করলে তারা ইশারা করে আমাদের কাউন্টার দেখিয়ে দিল। আমরা ঝটপট টিকেট কেটে প্লাটফর্মে প্রবেশ করে বাসের জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।
একটু পরই একটা বাস এসে আমাদের তুলে নিলে ফুরফুরে মেজাজে আমাদের বিআরটি ভ্রমণ শুরু হলো। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ছিমছাম বাস। যাত্রীরা সবাই নিমগ্ন হাতের মোবাইলে। চীনাদের এই একটি অভ্যাস বিশেষভাবে আমাদের নজরে পড়েছে, মোবাইলে আসক্তি। ওরা এত মাত্রায় মোবাইল ব্যবহার করে, যা চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যাবে না। একবার আমাদের এক সহকর্মী এ.কে.এম রাকিবুল হাসান এ্যামিকে প্রশ্ন করেছিলেন, “দিনে তোমরা কয়বার মোবাইল চার্জ করো?” এ্যামি উত্তর দিয়েছিল, অন্তত দুই বার। প্রায় সবার সঙ্গেই পাওয়ার ব্যাংক থাকে।
হাসি-হাসি মুখে কয়েকটা সেলফি তোলা শেষে মোবাইল ম্যাপের দিকে দৃষ্টি পড়তেই আমাদের চক্ষু চড়কগাছ। ডেস্টিনেশন বা গন্তব্য থেকে আমরা উল্টো পথে যাচ্ছি! হুড়মুড় করে পরের স্টেশনে সবাই নেমে পড়লাম। রাত-বিরাতে আর কোনো অ্যাডভেঞ্চারের প্রয়োজন নেই ভেবে স্টেশন ছেড়ে রাস্তা পার হয়ে ফুটপাতে চলে এলাম। ফুটপাতে দাঁড়িয়ে দেখি চৌরাস্তার মতো একটা জায়গা। চারদিকে চারটি রাস্তা চলে গেছে। এলাকাটি জনমানবহীন। হুটহাট দুই-একটা গাড়ি চলে যাচ্ছে। ঘড়িতে রাত ১১টা।

আমরা তখন কী করি? কোন দিকে যাই? ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ চোখে পড়ে পাশেই এক তরুণী দাঁড়িয়ে আছে ফুল হাতে। চীনারা খুব ফুল প্রিয়। কারণ হোটেল থেকে রাস্তাঘাট, পার্ক, স্কয়ার, মার্কেটের বিভিন্ন জায়গায় ফুলের সমারোহ চোখে পড়েছে এই ক’দিনে। আমরা দ্রুত ফুল হাতে হাসি মুখের মেয়েটির দিকে এগিয়ে গেলাম। ‘হ্যালো’ বলে হোটেলের কার্ড দেখাতে চাইলে সে প্রথমে মাথা নেড়ে ইতস্তত করে একটু দূরে সরে গেল। “উই নিড হেল্প” বলে পুনরায় তার কাছাকাছি গেলে ঝট করে সে হাতের ফুল আর মোবাইল ফুটপাতে রেখে আমাদের কাছ থেকে হোটেলের কার্ডটা নিয়ে তাতে চোখ বোলাল।
তারপর ‘হুম’ বলে মাথা নেড়ে স্মিত মুখে ইশারায় আমাদের দাঁড়াতে বলে সে ট্যাক্সি ডাকতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। রাস্তা থেকে পর পর দুটি ট্যাক্সি ছুটে এলে দ্রুত আমাদের সেগুলোতে তুলে দিয়ে ড্রাইভারের সঙ্গে কী যেন বলে হাসিমুখে হাত নেড়ে আমাদের বিদায় জানাল। ট্যাক্সি ভোঁ ভোঁ করে সামনে ছুট দিতেই ঝট করে পেছনে ফিরে দেখি, মেয়েটি ফুটপাত থেকে ফুল আর তার মোবাইল কুড়িয়ে নিচ্ছে। তখনই আফসোস হলো, আহ! মেয়েটার নামটা তো জানা হলো না! আর কোনোদিন কি দেখা হবে তার সঙ্গে?
পরদিন সকালের সেশন শেষে লাঞ্চ করে আমরা রওনা হলাম শহর ছেড়ে দূরে। চীনের নগর দর্শন তো হলো, এবার গ্রামের পালা। আর আজই সেটা ঘটতে যাচ্ছে। উরুমচি থেকে আজ আমাদের নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ৭০ কিলোমিটার দূরে কোনো এক কৃষি খামারে। ভাবতেই রোমাঞ্চে শরীর শিউরে উঠছিল। আহ! কত কিছুই না দেখব তখন। চীনের গ্রাম, গ্রামীণ মানুষ, কৃষি জীবন, খামার, মাঠ, ফসল, পোশাক আর বাড়ি-ঘর আরও কত কিছুই না থাকবে সেখানে। যাই হোক, কল্পনাকে ধাওয়া করে বাস ছুটে চলেছে দিগন্ত চিরে, উকুই এক্সপ্রেসওয়ে ধরে।

আমরা বাসের ভেতরে নিমগ্ন হয়ে বসে আছি, দৃষ্টি ভাসিয়েছি বাইরে। যতদূর চোখ যায় চীনের দিগন্ত বিস্তৃত ফসলের মাঠ। মাঠে শরৎ শস্যের সমারোহ। ভুট্টা, তুলা, বাজরা। দূরে সুউচ্চ ভবনের সারি। হয়তো চীনের আরেক কোনো শহর। চোখে পড়ল চীনের ফ্রি ট্রেড জোন। মাঠের ভেতর কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা। চাষাবাদে আধুনিক যন্ত্রপাতি। ফসলের ওপর ড্রোন উড়ছে। পাকা ড্রেনে সেচ ব্যবস্থা। অনুধাবন করলাম চীনের বিশ্ব জয়ের পেছনের মাজেজা। সর্বক্ষেত্রে তারা আধুনিক প্রযুক্তির ব্যাপক বিস্তার ঘটিয়েছে।
প্রায় দেড় ঘণ্টা চলার পর বাস আমাদের ‘সিজিএন হুতোবি বায়োএনার্জি কোম্পানি লিমিটেড’ নামের এক জৈব সার ও বায়োগ্যাস উৎপাদনকারী কারখানার সামনে নামিয়ে দিল। সেখানে তারা দেখাল পুরো চীনে তারা কীভাবে জৈব সার ও বায়োগ্যাস ছড়িয়ে দিচ্ছে। এরপর ফেরার পথে ৪ হাজার গাভীর ‘জিনজিয়াং হুতুবি সিন্নিইও ডেইরি ফার্ম’ এবং ‘জিইও প্রিং ডেইরি প্রসেসিং প্ল্যান্ট’ আমাদের ঘুরে দেখানো হলো। এখানেই আমরা জানতে পারলাম, চীনের শিশুদের সরকারিভাবে স্কুলে মিল্ক ফিডিং বা দুধ পান করানো হয়। মেধাবী জাতি গঠনে চীনা সরকারের এ এক মহতী উদ্যোগ।
হুতুবি থেকে ফিরতে ফিরতে সন্ধ্যা গড়িয়ে গেল। সন্ধ্যার পর চীনের অধিকাংশ পার্ক, জাদুঘর ও বিনোদন কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যায়। তাহলে আজ কোথায় যাব? শুনেই এমি বলল, “এশিয়ান সিটিতে যেতে পারো। মধ্যরাত পর্যন্ত এশিয়ান সিটি খোলা থাকে।” আমরা অবাক। এটি আবার কোথায়? যাই হোক, এ কথা শোনার পর অধিকাংশের গন্তব্য হয়ে উঠল এশিয়ান সিটি। ডিনার শেষে সদলবলে আমরা ছুটলাম এশিয়ান সিটির মুখে। আলোকোজ্জ্বল উরুমচি দাপিয়ে শহরের পূর্বে জনবিচ্ছিন্ন নিরিবিলি এক জায়গায় পৌঁছে দেখি হাজারো লাল লন্ঠন বাতির এক শহর।

ভেতরে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ল আরব্য রজনীর সব বিখ্যাত চরিত্ররা দিব্যি ঘুরে বেড়াচ্ছে। আছে সিন্দবাদের জাহাজ, বোতলবন্দী রাজকন্যা, সাত মাথার সর্পরাজ, মৎস্যকন্যা, শামুক-কন্যা, বিশালাকৃতির উট, নীল সিংহ, সান হাই জিং শিংওয়ালা পক্ষীরাজ, পানির ফোয়ারা আর চীনা পাহাড়ি লাল বাড়িতে নিঃসঙ্গ রাজকন্যার নাচ ছাড়াও আরও কত কী! এশিয়ান মিথোলজির এমন জমকালো সম্মিলন দেখে মুগ্ধ হয়ে গেলাম। সবশেষে শুরু হলো সম্মিলিত নৃত্য। আমরাও কেউ কেউ তাতে যোগ দিলাম। হাতে হাত রেখে বিখ্যাত পৌরাণিক চরিত্রদের সঙ্গে পর্যটকদের এমন নৃত্য নির্মল আনন্দে আমাদের বিমোহিত করল।
রাত বেড়ে যাওয়ায় পেছনের গেইট দিয়ে শর্টকাটে আমরা এশিয়ান সিটি থেকে বেরিয়ে আসলাম। এসেই পড়ি ট্যাক্সি সিন্ডিকেটের পাল্লায়। পৃথিবীর সব দেশেই যে ভালো-মন্দ মানুষ আছে, তার এক চাক্ষুষ সাক্ষী হলাম। ঘটনাটা হলো- আসার সময় ট্যাক্সি নিয়েছিল ২৮ আরএমবি। এবার এরা চাইছে ৪০। তবে এরা ঠিক ট্যাক্সিচালক না, সম্ভবত ভাড়ায় চালিত গাড়ি। তাই দরাদরি চলছিল।
কিন্তু সমস্যা হলো, যখন নতুন আর একটি গাড়ি এলো, আগের চালক দৌড়ে গিয়ে ওই ড্রাইভারকে কী যে বলল! আর তাতেই সেও ৪০-এ অনড় হয়ে গেল। আমাদের আর বুঝতে বাকি রইল না। দুঃখ পেলাম। চীনে এরকমটা আশা করিনি। যাক, বিহ্বলতা কাটিয়ে হা-হা হেসে আমরা সামনের দিকে পা বাড়ালাম। তারাভরা নির্মেঘ আকাশের নিচে ফুরফুরে ঠান্ডা বাতাসে হাঁটতে হাঁটতে আমরা গেয়ে উঠলাম, “সে তারা ভরা রাতে/ আমি পারিনি বোঝাতে/ তোমাকে আমার মনের ব্যথা।”
চলবে...