ভিনদেশে বাংলাদেশি বিজ্ঞানী
Published : 22 Feb 2026, 12:39 PM
বাংলাদেশের কৃষিভিত্তিক শিক্ষাধারা থেকে উঠে এসে আজ বিদেশের মাটিতে মেধার স্বাক্ষর রাখছেন ড. কাজী হোসেন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও অ্যাগ্রোফরেস্ট্রিতে স্নাতকোত্তর শেষ করার পর তিনি ইউনিভার্সিটি অব অ্যালবার্টা থেকে ফরেস্ট বায়োলজি অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে পিএইচডি অর্জন করেন। বর্তমানে কানাডার অ্যালবার্টা সরকারের সিনিয়র রিসোর্স অ্যানালিস্ট হিসেবে বন ব্যবস্থাপনা ও প্রাকৃতিক সম্পদ পরিকল্পনা বিভাগে কর্মরত।
কাজী হোসেনের এই কর্মজীবন আমাদের দেখিয়ে দেয় যে, বন রক্ষা মানে কেবল গাছ বাঁচানো নয়; বরং আধুনিক প্রযুক্তি, ডেটা ও বিজ্ঞানের সমন্বয়ে নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা। আমাদের স্থানীয় মেধাকে বিশ্বমানের দক্ষতায় রূপান্তর করে কীভাবে জটিল সমস্যার সমাধান করা যায়, ড. হোসেন তার এক অনন্য উদাহরণ।
সম্প্রতি এই গুণী বিজ্ঞানীর মুখোমুখি হয়েছিলাম। বন বৃদ্ধির পূর্বাভাস, সিলভিকালচার (বন পুনর্জন্ম), জলবায়ু এবং ডেটা-ভিত্তিক মডেলিং নিয়ে এই আলাপচারিতার কিছু অংশ পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো।
মশিউর রহমান: আপনার গবেষণার মূল ক্ষেত্রটি আসলে কী? সাধারণ মানুষের ভাষায় যদি বলতেন।
কাজী হোসেন: আমার গবেষণার মূল লক্ষ্য হলো বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে এটা বোঝা যে, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে একটি বনভূমির বৃদ্ধি ও উৎপাদন কীভাবে পরিবর্তিত হয়। আমি মূলত ‘গ্রোথ অ্যান্ড ইয়েল্ড মডেল’ নিয়ে কাজ করি। সহজ করে বললে, এটি একটি গণিতভিত্তিক পূর্বাভাস ব্যবস্থা, যা বলে দেয় একটি বনের গাছ কত দ্রুত বাড়বে এবং ভবিষ্যতে সেখান থেকে কী পরিমাণ কাঠ বা বায়োমাস পাওয়া সম্ভব।
এর পাশাপাশি আমি সিলভিকালচারাল পদ্ধতি বা বন পরিচর্যার কৌশল, মাইক্রোক্লাইমেট (ক্ষুদ্র জলবায়ু) এবং বিভিন্ন প্রজাতির গাছের আলো সহনশীলতা নিয়ে বিশ্লেষণ করি। জলবায়ু পরিবর্তনের এই চ্যালেঞ্জিং সময়ে কোন ধরনের ব্যবস্থাপনায় একটি বন টিকে থাকবে, সেটিই আমার গবেষণার উপজীব্য। আমার কাজের মূল উদ্দেশ্য হলো গবেষণার ফলাফলকে সরাসরি টেকসই বন ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনায় কাজে লাগানো।
মশিউর রহমান: আধুনিক বন ব্যবস্থাপনায় ‘রিমোট সেন্সিং’ বা দূর অনুধাবন কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
কাজী হোসেন: রিমোট সেন্সিং আমাদের এমন এক শক্তি দিয়েছে যার মাধ্যমে সশরীরে গহীন জঙ্গলে না গিয়েও আকাশ থেকে বনের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা যায়। স্যাটেলাইট, ড্রোন কিংবা ‘লাইডার’-এর মাধ্যমে পাওয়া ছবি বিশ্লেষণ করে আমরা খুব দ্রুত বুঝতে পারি কোথায় বন ঘন হচ্ছে, কোথায় গাছ কাটা পড়ছে কিংবা কোথায় বনের প্রকৃতি বদলে যাচ্ছে।
বিশাল এলাকার তথ্য খুব অল্প সময়ে পাওয়া যায় বলে পরিকল্পনা ও নজরদারিতে এটি দারুণ কার্যকর। তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি- আকাশ থেকে পাওয়া তথ্য সব সময় শতভাগ নির্ভুল নাও হতে পারে। তাই রিমোট সেন্সিংয়ের তথ্যের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তব মাপজোখ মিলিয়ে নেওয়া বা ভেরিফাই করা জরুরি। প্রযুক্তি আমাদের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে, কিন্তু সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তি হতে হবে নির্ভুল বাস্তব ডেটা।
মশিউর রহমান: আমরা এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে বাস করছি। মেশিন লার্নিং কি বন ব্যবস্থাপনায় কোনো বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনছে?
কাজী হোসেন: অবশ্যই। মেশিন লার্নিং আমাদের কাজের ধরন বদলে দিয়েছে। বন থেকে যখন স্যাটেলাইট বা লাইডারের মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ তথ্য (বিগ ডাটা) আসে, তখন একজন মানুষের পক্ষে হাতে কলমে সেই বিশাল তথ্য বিশ্লেষণ করা প্রায় অসম্ভব। এখানেই মেশিন লার্নিং অসাধারণ কাজ করে।
আমরা যখন ‘র্যান্ডম ফরেস্ট’ বা ‘সাপোর্ট ভেক্টর মেশিন’-এর মতো অ্যালগরিদম ব্যবহার করি, তখন কম্পিউটার নিজেই বনের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের প্যাটার্ন বা ধারা খুঁজে বের করে। এটি আমাদের নিখুঁত পূর্বাভাস দিতে সাহায্য করে। তবে আমি সব সময় একটা কথা বলি- মেশিন লার্নিং কোনো জাদুকরী সমাধান নয়, এটি একটি শক্তিশালী সহায়ক টুল মাত্র। এর ফলাফলকেও আমাদের পরিসংখ্যান ও মাঠপর্যায়ের তথ্য দিয়ে যাচাই করতে হয়। প্রযুক্তিকে আমরা ব্যবহার করব, কিন্তু শেষ কথা বলবে বাস্তব ডেটা ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ।
মশিউর রহমান: আপনার এই বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা কি বাংলাদেশের বন সংরক্ষণে কাজে লাগানো সম্ভব?
কাজী হোসেন: অবশ্যই সম্ভব এবং সেটা খুব জরুরি। বাংলাদেশের বনভূমি আয়তনের তুলনায় ছোট, কিন্তু পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল। সঠিক তথ্য ছাড়া পরিকল্পনা করলে এখানে ক্ষতির ঝুঁকি অনেক বেশি। সুন্দরবন বা পাহাড়ি বনাঞ্চলে যদি আমরা নিয়মিত রিমোট সেন্সিং ও জিআইএস ব্যবহার করি, তবে কোথায় বনের ক্ষয় হচ্ছে বা কোথায় নতুন করে গাছ লাগানো দরকার, তা আগেভাগেই বোঝা যাবে।
মেশিন লার্নিং ব্যবহার করে আমরা অবৈধ বন উজাড় বা ভূমি দখলের প্রবণতা দ্রুত শনাক্ত করতে পারি। এছাড়া বন পুনর্জন্মের সঠিক পরিকল্পনায় আমাদের গ্রোথ মডেলগুলো দারুণ কাজে আসতে পারে। এক কথায়, ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহার করে আমরা বাংলাদেশে তথ্যভিত্তিক ও টেকসই বন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারি।
মশিউর রহমান: যারা আপনার মতো বিজ্ঞানের পথে হাঁটতে চায়, সেই তরুণ শিক্ষার্থীদের জন্য আপনার কোনো বিশেষ বার্তা আছে কি?
কাজী হোসেন: শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে আমার প্রথম কথা হলো- শুধু মুখস্থ করার জন্য পোড়ো না। কোনো বিষয় কেন হচ্ছে এবং কীভাবে কাজ করছে, সেই প্রশ্নগুলো নিজের মধ্যে লালন করো। প্রকৃতি বা প্রযুক্তি, যেটাই তোমার ভালো লাগুক না কেন, তাকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করো।
গণিত, পরিসংখ্যান আর প্রোগ্রামিংকে ভয় পেয়ো না, এগুলোকে বন্ধু বানিয়ে নাও। আধুনিক গবেষণায় এগুলো ছাড়া পথ চলা কঠিন। এছাড়া একজন ভালো মেন্টর বা শিক্ষকের পরামর্শ নেওয়া খুব জরুরি। মনে রেখো, বৈজ্ঞানিক যাত্রার শুরু হয় কৌতূহল থেকে, আর সাফল্য আসে নিরন্তর পরিশ্রমে। ধৈর্য ধরে শেখার এই পথটাকে উপভোগ করতে শেখো।